অটোয়া, মঙ্গলবার ২৫ জুন, ২০১৯
অটোয়ায় বাকাওভের একুশ - মহসীন বখত

গত ২০শে ফেব্রুয়ারী রাত ১২টা ১মিনিটে অটোয়ার পরীযায়ী  বঙ্গবাসী এই প্রথম বাঙালির আবেগরঙ্গিন  একুশের শহীদবেদীতে নগ্নপদে ফুলের অর্ঘ্য দেয় আবেগে, ভালবাসায়, শ্রদ্ধায়।স্বাধীন বাংলাদেশের সমান বয়েসী ‘বাংলাদেশ-কানাডা এসোসিয়েশন অব অটোয়া ভ্যালী’ নামের এই প্রাচীন সংগঠন আয়োজন করে এই অনুষ্ঠানটি। উষ্ণমন্ডলীয় সমুদ্রমেঘলা বাংলার ভূখন্ড থেকে ১২ হাজার মাইল দূরের এই মেরু অঞ্চলে ফেব্রুয়ারীর প্রকৃতি প্রচন্ড শীত ও তুষারের আচ্ছাদনে আকীর্ণ  থাকে বিশেষ করে কানাডার রাজধানী অটোয়া। এখানে এই সময়ে কোনো ফুল ফুটেনা,পলাশ-কৃষ্ণচূড়ায় শহীদের রক্তরঙ্গের মেলা বসিয়ে জানান দেয়না এসেছে ফাগুন, এসেছে একুশ। তবু ভুবনময় ছড়িয়েপড়া বাঙালির মন ও মননের  ক্যালেন্ডারে একুশের কৃষ্ণচূড়া ফুটে-পলাশ ফুটে। এর ব্যত্যয় ঘটেনা কখনো। ভুবনায়নের এই যুগে বিশ্বজুড়ে বাঙালির বাস। হরেক মেজাজের প্রকৃতির কোলে বসুন্ধরার সর্বত্র নানা ভাষাগোষ্ঠীর আবহে বাস করলেও বাঙালির কুলপুঞ্জিকায় একুশ এলেই বাঙালি শীতঘুম থেকে জেগে ভাবে ‘ একদিন বাঙালি ছিলামরে !’ লেগে যায় একুশের ধুম।সম্প্রতি জাতিপুঞ্জ ঘোষিত ‘ ২১শে ফেব্রুয়ারী বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ মর্যাদাটি বাঙালির প্রাণকে  যেন আরও বেশী  উথলে দিয়েছে। সকলেই উৎফুল্ল এই ভেবে যে, ৩০কোটি বাঙালি বা  ধরাধামের ৬ষ্ট জনগোষ্টীর ভাষা বাংলা। এজন্য বাঙ্গালির গর্বের অন্ত নাই। একুশ এলেই সরব হয়ে যান রাজনীতিবিদেরা, পুষ্পাচ্ছাদিত মঞ্চেমঞ্চে, টেলিবাকসোতে টকশোগুলোতে বুদ্ধিজীবিদের কিন্নরকন্ঠে ফুলকি ঝরে সর্বস্থরে বাংলা চালুর কথা,প্রমিত বাংলার কথা,ভাষাদুষণ বা ভাষার নাব্যতার কথা।কিন্তু রাজপাঠে বসতে পারেনি বাংলা কোনোদিন। সেই মোঘল আমলে রাজপাঠে বসে ফারসী,ইংরেজ আমলে বসে ইংরেজি। এখন কাগজি আবেগের খাতায় রাজভাষা বাংলা ক্ষয়কাশী রোগীর মত ধুঁকছে। এজন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আকুলভাবে আবেদন করতে হয় এই বলে যে, ‘হাইকোর্ট সুপ্রিমকোর্টের রায়গুলো বাংলায় লিখুন দয়া করে যেন মানুষ পড়ে নিজের ভাষায় বুঝতে পারে। ‘ তাহলে প্রশ্ন জাগে খোদ প্রধানমন্ত্রীও কি অসহায় আমলাতন্ত্রের অচলায়তনের কাছে,প্রথার কাছে? নাকি উচ্চশিক্ষিত বাঙালির বাংলা নাজানা পরভাষার প্রতি দাস্য মনোবৃত্তির কাছে বন্ধি হয়ে পিছিয়ে আছে বাংলা? অথচ যারা খবর রাখেন তারা ঠিকই জানেন যে, বহু ভাষাগবেষক প্রমান করে দিয়েছেন বাংলাভাষার অমিতশক্তির কথা। বাংলাভাষা পদার্থবিজ্ঞানের অতি জটিল তত্ত্বের অন্ধিসন্ধি নিজস্ব শব্দবন্ধে ব্যাখ্যা করতে পারে। আর নাপারলে শব্দ বানিয়ে নেবার যথেষ্ট কাঁচামাল বা রসদ বাংলাভাষার রয়েছে। বাংলাভাষার রয়েছে ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি যা পৃথিবীর প্রধানতম চর্চিত ভাষাগুলোর মধ্যে বিরল। এইসব গবেষণা কিছুকিছু নিবেদিত গবেষক গত দুই দশক ধরে প্রচার করে যাচ্ছেন। কেউ খবর রাখেনা, পড়তে চায়না, বাংলা ভাষার শক্তির প্রশ্নে নেতিবাচক মনোবৃত্তি প্রকাশ করে এই কথা বলা হয় যে, বাংলায় কি সম্ভব বিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিজ্ঞান তর্জমা করে নেয়া। এসব কথা আকারে ইংগিতে হরহামেশা শোনা যায়।এসব প্রসংগে পৃথিবীর সবখানে একুশের আলোচনা অনুষ্ঠানে কথা বলেন সকলেই, একই দাবী। সর্বস্থরে বাংলা চালুর আকুতি ঝরে বাকাওভের সভাপতি শাহ বাহাউদ্দীন শিশিরের স্বাগত বক্তব্যেও। এই সংগঠন যেহেতু বাংলাদেশের জন্মকালীন বেদনাকে ধারণ করে জন্ম নিয়েছিল সেহেতু বাকাওভ একুশসহ সকল জাতীয় উৎসবগুলো পালন করবে এই প্রত্যয়ের কথা জোর দিয়ে ঘোষণা করেন বাকাওভের নবনির্বাচিত সভাপতি। তিনি অভিবাসী সকল বাংলাদেশীদের সাহায্য ও মানসিক সহযোগিতা কামনা করে বলেন যে, আমরা এই পরবাসে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি জাগিয়ে রাখতে চাই, কানাডার বহুজাতিক সংস্কৃতির মূলশ্রোতে থেকেও আমাদের সন্তানগুলো যেন বাঙালি থাকে এই চেষ্টায় সকল বাংলাদেশীরাকে কায়মনোবাক্যে সহযাত্রী হবার আহবান জানান তিনি। বাকাওভের একুশের মঞ্চ থেকে সভাপতি শাহ বাহাউদ্দিন শিশির এই অকুতিটি সকলের কাছে ব্যক্ত করেন। সকলকে সরব হতে অনুরোধ জানান।

কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্টদূত জনাব মিজানুর রহমান এর সাথে উপস্থিত বাংলাদেশিদের একাংশ 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বাকাওভের সভাপতির সূচনা বক্তব্যের পর মঞ্চে আসেন কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্টদূত জনাব মিজানুর রহমান। তিনি সরকারের নানা জনহিতকর নীতি ও কর্মযজ্ঞ বর্নণা করে প্রত্যয় প্রকাশ করেন যে, প্রবাসীদের সকল রকমের সাহায্য ও সহযোগিতা দূতাবাসের পক্ষ থেকে করা হবে। অটোয়ায় বাংলাদেশীদের একুশসহ সকল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রশংসা করেন তিনি। ব্রনসন সেন্টারের সুউচ্চ মঞ্চে স্থাপিত অতিকায় শহীদমিনারের বেদীমূল একসময় পুষ্পবর্ষণে ছেয়ে যায়। মাননীয় রাষ্টদূতের নেতৃত্বে অটোয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের পাশাপাশি সারিবেধে শহীদবেদীতে ফুল দিতে আসে অটোয়ার অনেকগুলো সংগঠন। একুশের আবেগমথিত গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ গাইতে গাইতে ফুল দিতে আসে বাকাওভ, বাংলা ক্যারাভান, পিস, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশী স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন, সঞ্চারী, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ অটোয়া সহ অনেকগুলো সংগঠন। অটোয়ায় প্রবাসী একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ সহ বিপুল উৎসাহে সর্বস্থরের প্রবাসীরা শহীদবেদীতে ফুল দিতে দেখা যায়। কানাডা ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত শেষে শহীদের সন্মানে দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন  করা হয়। ক্ষুদে বাঙালি এক কিশোরী আদিয়ানার আবৃত্তি দিয়ে সাংস্কৃতিক পর্বটি শুরু হয়। স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন মহসীন বখত ও আবৃত্তি করেন শিউলি হক ও মাসুদুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাকাওভের প্রাক্তন সভাপতি বেগম রাশেদা নেওয়াজ, এমপি চান্দ্রা  আরিয়া, আনিতা ভেদ্রাবেল সনদপ্রাপ্ত মিঃ ড্রামসফিলড প্রমুখ। বেহা্লায় অস্তিত্ব ধৌতকারী সুরে ‘আমার  ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ বাজিয়ে শ্রোতাদের আবিষ্ট করে আরেক বাঙালি কিশোরী পৃথা আলী। অর্ণব দেওয়ানজীর গীটার বাদনে গায়িকা মৈত্রী দাস ‘আমি বাংলায় গান গাই “ সেই বিখ্যাত গানটি গেয়ে সারা হলঘর আবেগে আপ্লুত করে দেন। অটোয়ার কোকিলকন্ঠী খ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নাসরিন শশী কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যথাক্রমে আবরার জাহিন, ইসরাত জাহান, সাকিব মুরতাজা সাদ, নাফিজুল হক রাঈদ, আহনাফ রিয়াসাত, ছালেহ মুতাসিন নাহিয়ান সহযোগে একটি ব্যতিক্রমী দলীয় সঙ্গীত  পরিবেশন করে শ্রোতাদের মনোযোগ কাড়েন। এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন গায়িকা রোয়েনা খানম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সোহেল মুনাকো নামের এক বাকপটু সুদর্শন যুবক, কথার খাপে বাহারি কথা চারিয়ে দর্শকশ্রোতাদের মুগ্ধ করার দারুন ক্ষমতা তার। সোহেলের কথার ফুলঝুরিতে আমার বারবার মনে পড়ে, কথার আছে শতেক বাণী যদি কথা কইতে জানি। গোটা আয়োজনের মধ্যে মূল আকর্ষণটাই ছিল নগ্নপদে একুশের বেদীতে ফুল দিয়ে শহীদদের সন্মান জানানোর বিষয়টা যা অটোয়াতে এমন ঘটা করে পালিত হয়নি ১২টা ১মিনিটে প্রভাতফেরীর আদলে। অটোয়ার বাঙালি ঐদিন একুশের গর্বে বুক ফুলিয়ে প্রভাতফেরীর শ্রদ্ধাবনত আমেজ নিয়ে গভীর রাতে ঘরে ফেরেন হিমাঙ্কের নীচে ২০ডিগ্রি শীতের বৈরীতার মধ্যে। হাড়কাঁপুনে তীব্র শীত বাঙালির একুশের আবেগের কাছে তুচ্চ হয়ে যায় ঐদিন।

মহসীন বখত
অটোয়া, কানাডা।