অটোয়া, মঙ্গলবার ২৫ জুন, ২০১৯
বাদাইম্যা (৬) – কবির চৌধুরী

লের চতুর্দিকে দেখতে দেখতে হানিফ হোসেন মুনীর ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসে,
-স্লামালাইকুম মুনীর ভাই কেমন আছেন?
-আলাইকুম সালাম, ভাল আছি ভাই।  দেখছেন কি সুন্দর শহীদ মিনার!     
-হ ভাই! এতবড় শহীদ মিনার! বানাল কিভাবে? দেখছেন মানুষজন ও আসছে! আমি তো মনে করেছিলাম হাতে গোনা কয়েকজন হবে। আমার ধারনা তো দেখি ভুল। এখনও সাড়ে দশটা হয়নি, অথচ হল ভরে যাচ্ছে! মনে হয় ভাল মানুষই হবে!    
-আমারও মনে হচ্ছে মানুষের উপস্থিতি ভালই হবে। আপনাদেরকে ধন্যবাদ দিতে হয়। আজকের আয়োজন দেখে বলা যায়, আপনাদের গত একবছরের কষ্ট সার্থক হয়েছে।   
-জ্বী, সমিতিকে এই অবস্থানে নিয়ে আসতে আপনি, আমি আমরা সবাই-ই কষ্ট করেছি। নির্দ্বিধায় বলা যায় বর্তমান কমিটি অনেক কষ্ট করছে। কিন্তু মুনীর ভাই কষ্টটা একবছরের নয়, তারচেয়েও বেশী- অনেক বেশী সময়ের।     
-স্বপ্ন এবং চেষ্টা থাকলে যে অনেক কিছু করা যায় আজকের এই উদ্যোগ তা প্রমাণ করে। বিশেষ করে মীজান ভাই এবং আপনার চেষ্টার কথা বলতে হয়। পত্রিকা করার পর আপনারা সবসময় সমিতির প্রয়োজনীতা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন।     
-তা বলতে পারেন একটি স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন।

হানিফের স্বপ্নের শুরুটা ২০০৯ সালে। অনেক দিন হয় সে অটোয়াতে ফিরে এসেছে। শহরের ডাউনটাউনে একমাত্র বাংলাদেশি গ্রোসারি স্টোর ছাড়া আর কোথায়ও যাওয়ার জায়গা নেই। কাজের পর অনেকেই সেখানে যায়। কিছু আড্ডা কিছু সওদা। বাঙালিদের গতানুগতিক জীবন। হানিফও মাঝে মধ্যে সেখানে যায়। যদিও বছর কয়েক আগে তার এই অভ্যাস ছিল না। তখন তার আড্ডা ছিল হরেক রকম লাল-নীল বাতি জ্বালানো রাতজাগা মক্ষীরানীদের আনাগোনায় ভরপুর সব জায়গাতে। লিটল ইটালি থেকে শুরু করে চায়না টাউন হয়ে বাইওয়ার্ড মার্কেটের কসমোতেই তার আড্ডা ছিল বেশী। সদা ছন্নছাড়া হানিফের কাছে আলো ঝলমল জীবনটাই ছিল একমাত্র উপভোগ্য বিষয়। কিন্তু ২০০৭ সালে হঠাৎ করেই তার জীবনের গতিপথ বদলে যায়। হানিফকে অটোয়া ছেড়ে উইটবিতে চলে যেতে হয়। অবশ্য বেশীদিন সেখানে থাকতে হয়নি। ২০০৮ এর শেষ দিকে সে অটোয়াতে ফিরে আসে_ ফিরে আসে ভিন্নরূপে। পুরাতন বন্ধুদের সাথে আর আগের মত কোথায়ও যেতে চায় না, গেলেও নিজের উপস্থিতি বুঝতে দেয় না। হানিফ আলো ঝলমল জীবনের মায়াবী জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সেই চেষ্টারই অংশই ছিল কাজের আগে বা পরে রিডো স্ট্রিটের একমাত্র বাংলাদেশী গ্রোসারিতে চলে যাওয়া আর আড্ডা দেওয়া। হানিফ সেই ছোটবেলা থেকেই আড্ডা দিতে পছন্দ করে। সত্যমিথ্যার গল্প করতে এবং শুনতে তাঁর খুব ভাল লাগে। তাই তো তার ভাবী বলেন- হানিফের কথা শুনছেন। ওর কথা তো_ ‘গাউয়ে আধা-বন্দে আধা।’ জীবনবাঁকের এই দিনগুলিতে গ্রোসারিতে অনেকের মত সমিতির তৎকালীন সভাপতি শেহজাদ সাহেবও আসা যাওয়া করতেন। দেখা হলেই হানিফ তার কাছ থেকে সমিতির খবরাখবর নেওয়ার চেষ্টা করত। শেহজাদ সাহেব কয়েক বছর থেকে সমিতির সভাপতি। সমিতির নতুন কমিটি নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলতেন- ‘কেহ আসতে চায় না। আমরা তো দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চাই’। ইতিমধ্যে হানিফ অটোয়া থেকে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করে দিয়েছে। পত্রিকার কারণে অনেকের সাথে তার যোগাযোগ হয়। পত্রিকার পাশাপাশি সে সবার সাথে সমিতির তৎকালীন কমিটি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে। সবারই এককথা। সময় নাই- এছাড়া সমিতি তো নাই-ই, কমিটি দিয়ে কি করবেন। হানিফ হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে সমিতির পুরাতন দুয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে। এদের সবাই আগে কোন না কোনভাবে সমিতির সাথে অতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তারা যে হানিফকে একেবারে নিরাশ করেছিলেন তা নয়। তাদের মধ্য থেকে রহমান ভাই তাকে বলেছিলেন –‘হানিফ আমি তোমার সাথে আছি। চেষ্টা করে দেখ কিছু করা যায় কি না।’ এর পরের ঘটনা তো ইতিহাস। হানিফ ২০০৯ সালের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাতের এক গভীর ঘুমে রহমান সাহেবকে কেন্দ্র করে একটি স্বপ্ন দেখে। আবার সমিতির পুনর্জনম হয়। রহমান সাহেব নতুন কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। সেই কমিটির এক অনুষ্ঠানে উত্তর আমেরিকার পাঠকনন্দিত প্রয়াত লেখক ড. মীজান রহমান তাঁর প্রদত্ত বক্তব্যে বলেছিলেন- ‘বাপুরা আমার বয়স যদি কিছু কম হত তাহলে আজ এখানে লাফ দিয়ে আমি চল্লিশ হাত উপরে উঠতাম। তোমরা কিভাবে এই অসাধ্য সাধণ করলে?’ ২০০৯ সালের সেই বিখ্যাত স্বপ্নের ধারাবাহিকতাই আজকের এই অনুষ্ঠান।    
-কিভাবে আসলেন?      
-কিছু বাসে_কিছু হেঁটে।       
-একসাথে যাব। অনেকদিন হয় আপনার সাথে বসা হয়নি। 
-কোথায় বসবেন? অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে তো প্রায় রাত একটা বেজে যাবে। টিমহরটন্স ও বন্ধ থাকবে। অবশ্য মন্ট্রিয়ল রোডের টিমহরটন্স টুয়েন্টিফোর আওয়ারই খোলা থাকে। সেখানে যাওয়া যাবে।
-না, না। আমার বাসায়ই বসবো।  
-আপনার ইচ্ছা! আমার কোন অসুবিধা নাই।  

বাংলাদেশ ছাড়ার পর এই প্রথম হানিফ একুশের প্রথম প্রহরে তার বর্তমান আবাসভূমি অটোয়ায় অস্থায়ীভাবে নির্মীত শহীদ বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের সাক্ষী হল। মুনীর ভাইয়ের সাথে সে যখন ব্রনসন সেন্টার থেকে বের হয় তখন রাত প্রায় ১টা। বুধবারের রাত। নিঝুম-নিশ্চুপ। রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা। রাস্তা দেখলেই বুঝা যায় ঘন্টা দু’য়েক খুব স্নো পড়েছে। লোরিয়ার স্ট্রীট ধরে গাড়ীটি যখন মুনীর ভাইয়ের বাড়ির দিকে যাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল ওরা যেন আকাশের তারার মেলা অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।   
-হানিফ ভাই, আয়োজনটা খুবই সুন্দর হয়েছে। এতরাত এবং এই ঠান্ডার মধ্যে এত মানুষের উপস্থিতি সত্যিই প্রশংসনীয়।        
-জ্বী ভাবী। ঠিকই বলেছেন। আমি ভাবতেই পারিনি এই ঠান্ডা এবং স্নোর মধ্যে এত মানুষ আসবে।
-আমার মেয়ের খুব ভাল লেগেছে
-ভাবী আমার খুব খুশি লাগছে। আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে এতরাতে একুশের ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলেন। শহীদ মিনারে ফুল দিলেন। এই জিনিসগুলোই কেউ করছে আমরা দেখতে চেয়েছিলাম। এইসব কাজ বছরে মাত্র দুচারদিন– দুচারঘন্টা করতে হয়। এসব জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো ছেলেমেয়েদেরকে তার পিতামাতার জন্মভূমির প্রতি- সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। কস্ট করে এতরাতে মেয়েকে এই মহতী অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়াটা আপনার বৃথা যাবে না। একদিন না একদিন কাজে লাগবে।   
-সুমি তোমাকে বলি, শহরে এভাবে একুশ পালিত হবে_ জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো উদযাপিত হবে_ শহরে একটি সমিতি থাকবে_ এটি উনারই স্বপ্ন। উনি সব সময় বলেন আমাদের শহরে সার্বজনিন একটি সমিতি দরকার। মনে নাই তোমাকেও একবার সমিতিতে ঢুকিয়ে দিলেন।  
-মুনীর ভাই প্লিজ লজ্জ্বা দিবেন না। এইসব করতে আমার ভাল লাগে, তাই একটু আধটু করার চেষ্টা করি।  

সব মানুষেরই কিছু স্বপ্ন থাকে। হানিফেরও ছিল। সে সবসময়ই চেয়েছে সমাজের প্রতি নিবেদিত কিছু মানুষ সমিতিটার দায়িত্ব নেবে এবং মনে হয় সমিতি অবশেষে সেই মানুষগুলোকে পেয়েছে। … চলবে। 

কবির চৌধুরী
অটোয়া, কানাডা।