অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
ফেরা (শেষ পর্ব) - শাহীনুর ইসলাম

ফেরা  -১ম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন 

মি তন্দ্রা থেকে জেগে দেখি বাবা সত্যি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কোনো নড়চড় নেই। চোখদুটো পুরো বন্ধ। মুখখানিতে একটা নিস্পাপ আভা স্পষ্ট। হাতে স্যালাইনের সুচ লাগানো। অথচ এ ঘুম তিনি ঘুমাতে চেয়েছিলেন তার ঘরে। কিন্তু ভোরের দিকে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় ৯১১ এ কল দিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স চলে আসে এবং তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়।
এসব উন্নত দেশে ত্বরিৎ গতিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ ধরণের বিরাট সুবিধা পাওয়া যায়। মূলত এ রকম বেশ কিছু কারণে মানুষজন এক সময় অভিবাসী হয়ে থেকে যায়। কিন্তু একবার স্থায়ী হয়ে গেলে এরপর শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে প্রগাঢ় বেদনা জন্ম নেয় তার দ্বারা বাকি জীবন গোবেচারা মনটা ক্ষত-বিক্ষত হতেই থাকে। 
কোনো কোনো বন্য প্রাণী ভাল খাবারের স্বাদ পেয়ে যেমন মানুষের কাছে চিরদিনের জন্য বন্দী হয়ে যায়, স্বাধীনতা হারায়, ক্ষিপ্রতা হারায়, মুক্ত জল-হাওয়া-গন্ধ-স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়, মনের খোরাক বিসর্জন দেয়, বিষয়টা অনেকটা সে রকম।
কিংবা কোনো কোনো সূফী সাধক যেমন বলেন— জন্মানোর আগে আমরা সবাই ঈশ্বরের সাথে একাকার হয়ে ছিলাম। এ জগতে আমাদের যত দুঃখ-কষ্ট তা আসলে ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ারই দুঃখ-কষ্ট। সে কষ্টই নানা রূপে এসে হাজির হয় আমাদের জীবনে। এ ধারণার সাথে অভিবাসীদের মা-মাটি রূপী দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনাটা পুরোপুরি যেন খাপ খায়।
আমি বাবার বিছানার পাশে একা বসে আছি ভোর চারটা থেকে। এক ঘণ্টা পর পর নার্স এসে বাবাকে দেখে যাচ্ছেন। আমার অন্য ভাই, বোন, ভাবী ও মা এসেছিল হাসপাতালে। তারা চলেও গেছে। কারণ এখানে সবার থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। 
হাসপাতালে বাবার বিছানার পাশে একা বসে থাকতে থাকতে আধো ঘুম আধো জাগরণে রাতের ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়ছিল আমার। তবে নিরবচ্ছিন্ন নয়। থেকে থেকে ভাই-ভাবী ও ঘনিষ্ট দু’একজনের ফোন কল আমার মাঝরাতের অবধারিত স্মৃতিচারণে বিরতি ঘটায়। উৎকণ্ঠিত হয়ে তারা একটু পর পরই বাবার অবস্থা জানতে আমাকে ফোন দেন। সে সময়টায় কিছুক্ষণের জন্য সেখান থেকে বাইরে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলি। 
সংক্ষেপে কথা বলে বার বার ফিরে আসি এই আশা নিয়ে যে, বাবা এবার হয়ত আমাকে ডাকছেন। কিন্তু ভেতরে এসে দেখি তিনি তেমনই শুয়ে আছেন। একটুও নড়চড় নেই। চোখদুটোও পুরোপুরি বন্ধ। এর মধ্যে কয়েক বার তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকও দেই। তিনি কোনো সাড়া দেন না। আমার ডাক শুনেছেন বলেও মনে হয় না।
-এবার তোমার স্বপ্ন পূরণ করব, বাবা।

আকুল কণ্ঠের এমন প্রতিশ্রুতিতেও কোনো কাজ হয় না। হয়ত গভীর ঘুমের মধ্য থেকে তিনি বিদ্রুপের হাসি হাসছেন আমার এতদিনের মিথ্যে প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি শুনে। 
হয়ত মনে মনে বলছেন—আবারও মজা নিচ্ছিস! 
কিংবা ভ্রুদুটি উপরে কুঁচকে বোদ্ধার মতো নিতান্তই বলছেন—তোর ফাঁকি আমার বোঝা শেষ!
সকাল পৌনে সাতটা বাজে। আমি অপেক্ষা করে আছি বাবা কখন জেগে উঠবেন, কখন চোখদুটো খুলে আবার আমাকে দেখবেন, আবার আগের মতো করে আমার পাশে বসে থাকবেন, কথা বলবেন। সবাইকে জানিয়ে দেব সুখবরটা। কিন্তু বাবা তখনো জাগেন না। আমার খবর দেওয়াও হয় না। সত্যি তিনি গভীর ঘুমে মগ্ন। 
আমি তখন হাসপাতালের চত্বরে কিছুক্ষণের জন্য পায়চারি করতে চলে যাই। গিয়ে দেখি সূর্য উঠে দিগন্তের উপরে চলে গেছে তার চিরাচরিত নিয়মে। হাসপাতালের দেয়ালে, চত্বরে, জানালায়, রাস্তায় বাবার মনটার মতো নরম নরম রোদ ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাতাসও সে রোদের ভাগ নিয়ে নিজেকে উষ্ণ করছে। কিন্তু এখানে বেশিক্ষণ দেরি করতে ইচ্ছে করে না আমার। বাবা যদি জেগে উঠে আমাকে ডাকেন…!
হাসপাতালের রুমটার দিকে ফিরতেই লক্ষ্য করি নার্স আমাকে খুঁজছেন। আর রুমে গিয়ে দেখি ডাক্তার এসেছেন বাবার অবস্থার উন্নতি-অবনতি দেখতে। মনে নতুন আশা নিয়ে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি, কেমন দেখলেন। তিনি শুধু বললেন, আপনার আত্মীয়-স্বজনদের আসতে বলেন। রোগির অন্তিম সময় এখন। এটা শোনার জন্য আমি একদম প্রস্তুত ছিলাম না। এমনটা প্রত্যাশাও করিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে যা হবার তা-ই হল।
মুহূর্তের মধ্যে আমার ভেতরে, বাহিরে, চারদিকে অসীম শূন্যতা শো শো করে বেজে ওঠে বাবার বলা বুড়ো পাকুড় গাছের পাতাগুলোর মতোই। আর ধীরে ধীরে সে শব্দ প্রকাণ্ড বায়বীয় পাথরে পরিণত হয়ে আমাকে থেঁতলে পিষ্ট করে, কাচের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে, গুঁড়াযন্ত্রের মতো করে গুঁড়া করে এবং অবশেষে আমার হৃদয়কে হাজারটা টুকরো করে।

***

আকস্মিক, ভয়াবহ, অপূরণীয় শূন্যতাটা এক সপ্তাহ ধরে আমাকে ঘিরে রেখেছে। এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যেন ঘন কুয়াশার অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক চাদরে আচ্ছাদিত হয়ে আছি তো আছিই। সেই পাকুড় গাছটার নিচেই এখন বসে আছি আমি। আর বাবা আছেন শুয়ে। জোহরের নামাজের পর আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবাই চলে গেছে। এখানে বসে একা একা বাবার স্মৃতির সাথে জড়ানো কত কথা মনের মধ্যে স্রোত আকারে বয়ে যাচ্ছে! স্মৃতির একটা স্রোতের মধ্যে আরেক স্রোত এসে অনুপ্রবেশ করছে। স্মৃতির পেছনের স্মৃতিও এসে ভিড় জমাচ্ছে। 
যে পাকুড় গাছটার কথা বাবা বলতেন বার বার এবং তার স্বপ্নের সাথে জুড়ে দিতেন সেটি দীঘির কিনারে। এ দীঘিটার কথাও বাবা বলতেন। গাছটার নিচে আমার জন্মেরও আগ থেকে দাদা-দাদী শুয়ে আছেন। এখন তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন বাবা।  
বাবা ঠিক যেমনটা বলতেন, আর আমি চোখ বন্ধ করে যেমনটা শব্দের সাথে চিত্রকে মেলাতাম ঠিক তেমনই শো শো শব্দ হচ্ছে বাতাসে। তাকে হারানোর বেদনাটা দুপুরের চড়া রোদের চেয়েও তীব্রভাবে পুড়েছে আমাকে এ কয়দিন বিভিন্ন জায়গায়—বিমানে, গাড়িতে, আমাদের গ্রামে, এমনকি এ পাকুড় গাছটার নিচেও।

বাবার স্বপ্ন আজ কারো কারো স্বপ্ন পূরণের মতোই সত্যি। তিনি তার গ্রামে ফিরেছেন। তবে তার শেষ স্বপ্নটাও হয়ত পূরণ হত না যদি আমি একগুঁয়ে আচরণ না করতাম। কারণ সেদিন হাসপাতালে বাইরে থেকে দেখতে আসা লোকজনের মুখে উচ্চারিত নানান কথা একই সুরে বাজে—
দরকার নেই দেশে নেওয়ার। 
শুধু শুধু টাকা নষ্ট। 
তাড়াতাড়ি দাফন না করলে মৃতের আত্মা কষ্ট পাবে। 
তার সবাই তো প্রায় এখানে। 
এখানেই মাটি দাও। 
দেশে নিয়ে যাওয়া ঝামেলারও। 
মানুষ মরে গেলে এক জায়গায় মাটি দিলেই হল। 
মরার পর তো আর কোনো অনুভূতিও থাকে না।
-ইত্যাদি ইত্যাদি। 

তারা যে বাস্তবসম্মত কথা বলেছে তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব কথা কেন জানি একটুও সহ্য হচ্ছিল না আমার। কথাগুলো শোনামাত্রই আমার জিদের সলতেটা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সে আগুনের তেজে সামনের কোনোকিছুই মানতে ইচ্ছে করছিল না। কারো কারো সাথে ক্ষুব্ধ আচরণ করতেও আমার বিন্দুমাত্র বাঁধেনি তখন। আমার মাথায় শুধু ঘুর ঘুর করছিল বাবার অপূর্ণ ইচ্ছাটা। নিজেকে শুধু অপরাধীই মনে হচ্ছিল। তার আত্মাটা যেন প্রতি মুহূর্তে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল যে, দেশের মাটি ছাড়া তিনি কোথাও শান্তি পাবেন না। অন্য কিছু তখন জানতাম না, বুঝতামও না। 
তবে বাবাকে দেশে আনার সিদ্ধান্ত নিতে ও তা কার্যকর করতে নিজের ভাই-ভাবীরা যদি সবদিক দিয়ে সাহায্য-সমর্থন না করতেন, তবে কে জানে আসলে কী হত? কারণ আমার আর্থিক জোরটা ততটুকু ছিল না যতটুকু ছিল মুখের ও মনের জোর।
শেষ পর্যন্ত বাবার স্বপ্ন সত্যি হল তার ভূপৃষ্ঠের আলো-হাওয়া থেকে ভূগর্ভের অন্ধকারে চলে যাওয়ার পর। তার স্বপ্নের জায়গায় তাকে রেখেও দিয়েছি। তবে স্বপ্ন পূরণের আস্বাদনের দৃশ্য, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ ও স্বাদের কোনো অনুভব ছাড়াই। ভাবতেই চোখদুটো বার বার জলে ভরে ওঠে। এখনকার বয়ে যাওয়া বাতাসটাও আমার উছলানো এ জলকে পুরোটা শুকিয়ে দিতে পারছে না যেন। 
পাকুড় গাছটার নিচে বসেই আছি দু’ঘন্টার মতো সময় ধরে। এখানে বাবার কবরের দিকে তাকিয়ে অমলিন স্মৃতির অবসন্ন পথে পথে হেঁটেই প্রায় পুরোটা সময় কেটে গেল। এবার কবরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসা অবস্থায় শুধু দীঘিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। এ দীঘিটাতেই বাল্যকালের অনেক সময় কেটে গেছে ডুব-সাঁতারে। যেদিন বেশি সময় ধরে গোসল করতাম, সেদিন বাবা এসে বকাবকি করে ধরে নিয়ে যেতেন পাছে জরাক্রান্ত হয়ে ভুগি। 
স্মৃতির এ অংশটুকু মনে আসতে না আসতেই আমার ডান কাঁধে হাতের তালুর মতো একটা মৃদু স্পর্শ অনুভব করি। তবু পিছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছা হয় না। জীবনের সব আয়োজনকে অনর্থক মনে হয়। মনে হয় বৃথাই সব। অযথা!

মুহূর্তখানেক পরে পিছন থেকে একটা অস্ফূট কণ্ঠস্বর শুনতে পাই,
‘দোস্ত…!’ 

এবার স্বর শুনে চিনতে একটুও কষ্ট হয় না আমার। কিন্তু তখনো পিছন ফিরে তাকাই না আমি। সত্যিকারে যার দিকে তাকিয়ে ছিলাম এতক্ষণ সেই তো অন্য জগতে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবাই যে যার মতো চলে গেছে। শুধু বন্ধুটিই ফিরে এসেছে। অবশ্য ফিরে আসার মতো এ গ্রামে সে ছাড়া এখন আমারও আর কেউ নেই। ‘দোস্ত’ বলার পর সেও আর কিছু বলতে পারছে না যেন। 
আমার সামনে, ডানে, বামে, উপরে অসীম শূন্যতা, আর ভেতরে বুক ভরা হাহাকার। পিছনে রয়েছে শুধু বন্ধুর এক টুকরো মায়া। অসীম শূন্যতা ও হাহাকারের ভার সইতে না পেরে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে যাই। সোজা বুকে জড়িয়ে ধরি তাকে। যেন পাকুড় গাছের ছায়া খুঁজি বন্ধুর মায়ায়। ঠিক সাগরকে হারিয়ে জল যেমন হাতড়ে বেড়ায় মেঘের ঠিকানা। 
তার ডান কাঁধে থুতনি রাখি। আমার কয়েক ফোঁটা অশ্রু নীরবে নিঃশব্দে তার পিঠে গিয়ে গড়ায়। আর ঝাপসা দৃষ্টিটা আবার চলে যায় বাবার কবরটার দিকে। দু’ঘন্টা আগের ভেজা ভেজা কালচে মাটির দলাগুলো রোদ-বাতাসে এখনই কেমন যেন শুকিয়ে শাদাটে হয়ে গেছে। শুধু বাবার স্মৃতিগুলো সজীব হয়ে এখনো ভাসছে আমার মনের গভীরে। আর এভাবেই ভাসবে আজীবন!

শাহীনুর ইসলাম
সম্পাদক, প্রকাশক
মিউজিট্রেচার ম্যাগাজিন (Musitrature Magazine) 
অটোয়া, কানাডা।