অটোয়া, মঙ্গলবার ২৫ জুন, ২০১৯
অসমীকরণ ( প্রথম পর্ব) - শুভেন্দু_খান

মা'র শরীর টা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। বয়স হলে যা হয়। নানান ব্যাধি এসে শরীরে বাসা বেঁধেছে। বাবার শরীরটাও খারাপ। তাই অল্প কিছু খেয়ে শুয়ে পড়েছে। আমিই বললামঃ
-আমার বিশেষ খাওয়ার ইচ্ছে নেই। বাইরে থেকে অল্প খেয়ে এসেছি। তোমরা বরং খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়। একটু বিশ্রাম নাও। আমি পরে থালা বাসন তুলে রাখবো। 
মা একটু গাঁইগুঁই করছিলঃ
- তা কি করে হয়। রাতে কিছু না খেলে চলে? অল্প কিছু তো খেয়ে নে।
-পেট টা কেমন ভারভার লাগছে মা। আজ আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তোমরা বরং খেয়ে নাও। আমি ততক্ষণে তোমাদের বিছানা টা ঠিকঠাক করে দিই।।
বাবা-মা খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। থালা বাসন গুলো তুলে রান্নাঘরের সিঙ্কে রেখে দিই। কাল মালতী মাসি এসে পরিষ্কার করবে। 
কিছু ভালো লাগছিল না। আজ বইমেলায় না গেলেই হত। পুরোনো দিন গুলো যে হঠাৎ এভাবে পিছু ধাওয়া করবে বুঝতে পারিনি। ভুলতেই তো বসেছিলাম প্রায়। দিনের হাজারো কর্মব্যস্ততায় আর নিত্যদিনের টানাপোড়েনে দিনগুলো যে হারিয়েই গিয়েছিল প্রায়। বুঝিনি মনের অন্ধকার কোণে ঘাপটি মেরে বসেছিল সে। শুধু দুয়ার খোলার অপেক্ষা। হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক।
বারান্দায় একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসি। ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি। শীত যাইযাই করেও মাঝেমাঝেই কামড় বসিয়ে দেয়। জানান দেয়, আমি আছি এখনও। আজও এমনি একটা দিন। গত দুদিন বৃষ্টি হওয়ার ফলে শীত একটু জাঁকিয়ে বসেছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মন কেমন করা হাওয়া। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিই। সিগারেট ধরাই। অমাবস্যার আর কয়েকদিন বাকি। পরিষ্কার আকাশে তারা গুলো জ্বলজ্বল করছে। বাড়ির সামনের রাস্তাটা একটু এগিয়ে গিয়ে বড় রাস্তার সাথে মিশেছে। বারান্দা থেকে সামনের রাস্তাটা যতদূর দেখা যায় জনমানবহীন। কয়েকটি কুকুর রাস্তার ধারে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। কোথায়ও বা কোনো নাম না জানা পাখির ডাক শোনা যায়। আশেপাশের গাছপালার পাতায় আলতো আটকে ঝুলে আছে হালকা কুয়াশার চাদর। দোকান গুলোর ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। দিনের ব্যস্ত কোলাহলে মাখা রাস্তাটি এখন বড় নির্জন, বড় একাকী। রাতজাগা নিঃসঙ্গ একাকী প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে কয়েকটি ল্যাম্পপোষ্ট। সোডিয়ামের ফিকে হলুদ আলো রাতকে বড় মায়াবী করে তুলেছে। বড় একাকী লাগে আজ। প্রিয়াকে যে এভাবে বইমেলায় দেখতে পাবো ভাবিনি। বেশ তো ছিলাম। মেনে নিয়েছিলাম সবকিছু। সময়ের প্রলেপে ক্ষতটা আসতে আসতে শুকিয়ে আসছিল। একটা হালকা আস্তরণে ঢাকা পড়েছিল যেন। বইমেলায় প্রিয়ার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়াটা যেন দরজার শেকল খুলে দিল। শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত যেন রক্তাক্ত হয়ে উঠল। 

********

অনেক বছর হলো বইমেলায় যাওয়া হয়নি। প্রতিবারই ভাবি, যাবো। আর তারপর নানান কাজের ব্যস্ততায় যাওয়া হয়ে ওঠে না। এবারে তাই ঠিক করে নিয়েছিলাম যাবোই। ব্যক্তিগত কিছু কাজের জন্য কয়েকদিন ছুটি নিয়েছিলাম। আজ শনিবার। তাই হাতে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে দুপুর নাগাদ মেদিনীপুর লোকালে চেপে বসলাম। গন্তব্য কোলকাতার বই মেলা।
বইমেলায় স্টলে স্টলে ঘুরছি। এটা সেটা বই দেখছি। একটা বই খুঁজছিলাম- One Part Woman. বইটার একটা রিভিউ পড়েছিলাম ইন্টারনেটে। রিভিউটা বেশ ভালো লেগেছিল। ইচ্ছে ছিলো কেনার। 
পেয়েই গেলাম বইটা। বইটা হাতে নিয়ে পাতা উলটে পালটে দেখছি। হঠাৎ কাঁধে একটি হাতঃ
-চিনতে পারছো? 
চমকে পিছন ফিরে দেখি প্রিয়া। সেই একই রকম আছে। একটু যা মোটা হয়েছে আগের চেয়ে। হলুদ রঙের শাড়িতে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। চোখে রোদ চশমা। খোলা চুলগুলো বাঁধ ভাঙ্গা ঢেউ হয়ে এলিয়ে পড়েছে ঘাড়ের ওপর। কানে ঝোলা দুল। ঘোরাঘুরি করার ফলে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কাঁধে একটা সাইড ব্যাগ। বাঁহাতে ধরা মোবাইল আর একটা ছোট মানিব্যাগ। 
অপার বিস্ময়ে বলিঃ 
-তুমি এখানে?
-হ্যাঁ, আমরা তো এখন কোলকাতায় আছি। বেশ কিছুদিন হল। বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তোমাকে দেখি। তা তোমার খবর কি?
-এই চলছে। মোটামুটি। 
-আজকাল তো তোমার খুব নামডাক। এক নামে সবাই চেনে। স্বনামধন্য ডাক্তার বলে কথা। বিশিষ্ট হার্ট সার্জন। ব্যাপারস্যাপারই আলাদা! মাঝেমাঝেই তোমার খবর শুনি। 
আমি হাসতে থাকি। জিজ্ঞেস করিঃ
-তোমার বর ও তো শুনেছি বেশ বড় বিজনেসম্যান। 
-এভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবে? এতদিন পরে দেখা হলো, চা খাওয়াবে না? ঘুরতে ঘুরতে পা ব্যথা হয়ে গিয়েছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। 
-বেশ তো চলো, কফি খাওয়া যাক। কফি চলবে তো?
-চলবে মানে? রীতিমত দৌড়বে!
টী স্টলে দুটো কফি নিয়ে বসি। পুরনো দিনের কথা গুলো নানানভাবে ঘুরে ফিরে আসে। এক একটা শব্দ যেন এক একটা ঘটনার মত জীবন্ত হয়ে ওঠে। জিজ্ঞেস করিঃ
-তোমার বর আসেনি? তুমি একা এসেছো?
-ওর কি আসার সময় আছে? সারাদিন বিজনেস নিয়েই ব্যস্ত। বইমেলায় আমার কয়েকটি গল্প বেরিয়েছে। এটা সবাই মিলে লেখা। আমার একার নয়। এই দেখ বইটা। 
ব্যাগ থেকে বইটা বের করে দেয়। বইটা হাতে নিয়ে দেখি। "চেনা অচেনার ভীড়ে"। কবিতা আর গল্প সংকলন। 
-তুমি এখনো লেখালিখি কর? খুব ভালো লাগছে দেখে।
-কি আর করবো। সময় কাটেনা যে। ও তো সারাদিন ব্যস্ত। এত সময় কোথায় আমাকে সময় দেবার। তাইতো আমার অঢেল সময়। যেন শেষই হতে চায় না। কিছু একটা নিয়ে তো থাকতে হয়। সময় কাটেনা যে। 
একটা যেন দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। একটু থেমে তারপর বলেঃ
-দেখেছো, আমি তখন থেকে শুধু আমার কথাই বলে যাচ্ছি। তোমার কথা বল। বিয়ে করেছো? ছেলেমেয়ে কয়টি? 
আমি হো হো করে হেসে উঠি। 
-বিয়ে করা আর হলো কোথায়?
-সেকি! কেন?
-পাত্রী পেলাম কই! আর একজন কে পেয়েছিলাম, সে তো না করে দিলো। 
চুপ হয়ে যায় প্রিয়া। হাতের বই টা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে। কফির কাপে আঙ্গুলগুলোর অনাবশ্যক নড়াচড়া। তারপর নীরবতা ভেঙ্গে বলেঃ
-আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আজ পেয়েছি কতখানি জানিনা, কিন্তু হারিয়েছি অনেক। সেইদিনটার কথা খুব মনে পড়ে। যেদিন তুমি অপমানিত হয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলে। ভুলতে পারিনা দিনটার কথা। একাকী রাতে সেই মুখটা ভেসে ওঠে, একটা আবছায়া অবয়বের মত নড়াচড়া করে। একটা ছায়ামূর্তি দেখি। ধীর পায়ে তুমি নেমে যাচ্ছিলে সিঁড়ি দিয়ে। অবিন্যস্ত চুল, মুখে তীব্র কাঠিন্য, চোখের কোণে জল নাকি প্রচন্ড এক ঘৃণা। ঠিক বুঝি না। মুখটা ভেসে ওঠে বারবার। তাড়িয়ে বেড়ায় আমাকে। স্বপ্নে একটা ঘোরের মধ্যে ভেসে ওঠে। কিছু বলতে গেলে আলেয়ার মত দূরে সরে যায়। হাসতে থাকে। বিদ্রূপ করে।সেদিনের সেই ঘটনার পর তোমার মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস আমার হয়নি। লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিলাম আমি। আর কি বা বলার ছিলো তোমাকে? কি বা বলতে পারতাম- আমাকে ক্ষমা কোরো? আমাকে ভুলে যেও? আমার বাবার হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি? এছাড়া আর কি বা বলার ছিলো? তোমার মুখোমুখি হবার সাহস পাইনি তাই। কিন্তু আজ বুঝি, দাঁড়াতে পারলে বোধহয় ভালো হত। দুটো জীবন হয়তো অন্যভাবে লেখা হত। সেই মুখটা এভাবে আমাকে যন্ত্রণা দিত না। এভাবে আমাকে এক অদৃশ্য ভূতের তাড়নায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো না। আমার প্রতিরাতের ঘুমকে এভাবে যন্ত্রণাময় করে তুলতো না।
কথাগুলো শুনছিলাম। আর সেদিনের সেই ক্ষত যেন আরো রক্তাক্ত হয়ে উঠছিল। একটা নিদারুণ অপমান আমাকে চাবুকে চাবুকে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে। আরো দু-কাপ কফি নিই। কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বলিঃ 
-কি আর করার আছে! যা না পাওয়ার তা না পাওয়াই থাক। আমার কিন্তু এই নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। আর তুমি তো এর জন্য দায়ী নয়।  তাহলে কেন যন্ত্রণা পাও? কেন নিজেকে যন্ত্রণা দাও? হ্যাঁ, এটা ঠিক, যে সেদিনের সেই ঘটনা আমাকে যন্ত্রণা দেয় ঠিক। তবু সেই যন্ত্রণা বোধহয় আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। আজ আমি যেখানে পৌঁছেছি, হয়তো সেদিনের সেই ঘটনার জন্যই। সেদিনের সেই তাড়নাই আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে নিজেকে যোগ্য প্রমাণের লক্ষ্যে। 
-বিয়ে করলে না কেন?
-সত্যি বলবো? 
-খামোখা মিথ্যে বলতে যাবে কেন?
- আসলে আমি একজনকেই ভালোবেসেছিলাম। একজনেরই জায়গা আছে এই হৃদয়ে। তার জায়গায় অন্যকারো কে যে বসাতে আর ইচ্ছে হয়নি। 
চুপ করে যায় প্রিয়া। মুখটা কেমন যেন বেদনাবিধুর  হয়ে ওঠে। মুখ নামিয়ে নেয়। আমারও খারাপ লাগে। এভাবে কথাটা না বললেই হত। হয়তো আঘাত দিয়ে ফেললাম। বিগত দিনের স্মৃতি কে এভাবে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে তুলে তো শুধু যন্ত্রণাই বাড়িয়ে তোলা। যে আগুন আছে ছাইচাপা, থাকনা সে চাপা। জ্বলতে থাকুক ধিকিধিকি নিরবধি। তাকে লোকচক্ষুর সামনে এনে লাভ কি? ঝিনুকের খোলসে মুক্ত হয়েই থাক সে। চোখের সামনে এনে হাতের তালুর মধ্যে রেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তার দরদামের হিসাব নিকাশে লাভ কি।
নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বলিঃ
-অনেকক্ষণ কথা হলো। এবার যেতে হবে। আমি তো যাবো সেই মেদিনীপুর। 
-কিসে যাবে? গাড়ি এনেছো? 
-না না। গাড়ি আনিনি। আমি ট্রেনে এসেছি। ট্রেনেই ফিরবো।
-তুমি তো এখন খুব নামকরা ডক্তার। একনামে সবাই চেনে। ট্রেনে তোমাকে মানায় না কিন্তু। 
হাসতে থাকিঃ
-ট্রেনের আনন্দটাই আলাদা। আমি এখনো মাঝে মাঝেই ট্রেনেই যাতায়াত করি। খুব উপভোগ করি। কত মানুষ জন, তাদের বিচিত্র জীবনযাত্রা। আমার বেশ লাগে। 
-আচ্ছা বেশ। এস তাহলে। আর একটা কথা। সামনে পাঁচ তারিখ আমার ছেলের অন্নপ্রাশন। তোমাকে কিন্তু আসতেই হবে। কোনো কথা শুনবো না। আমার বরের সাথে তোমার আলাপ করিয়ে দেবো। 
-আচ্ছা, ঠিক আছে, দেখবো। 
-উহুঁ, দেখবো নয়, আসতেই হবে। এটা কিন্তু তোমার এড়িয়ে যাওয়া। কথা দাও আসবে।
-আসবো, আসবো, আসবো!
প্রিয়া ঠিকানা সমেত একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দেয়। 
-এতে আমার ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব আছে। এসো কিন্তু। আচ্ছা, তোমার ফোন নাম্বারটা দাও
আমিও মানিব্যাগ খুলে আমার ভিজিটিং কার্ড টা এগিয়ে দিই। তারপর অল্প একটু কথা বলে ট্যাক্সি নিয়ে হাওড়ার পথে। … চলবে 

শুভেন্দু_খান
কোলকাতা, ভারত।