অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
চিঠি দিও প্রিয় - নয়ন চক্রবর্ত্তী

“করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।”  মহাদেব সাহার চিঠি দিও কবিতাটির মতো আমারও এখন চিঠি পেতে ইচ্ছে করে। 

প্রিয়, 
কতদিন চিঠি লিখি না। কত আবেগ, ভালোবাসায় মাখামাখি চিঠি। প্রিয়, অনেক চিঠি দিয়েছো। বরং আমিই কম লিখেছি। কত চিঠি হারিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। সুন্দর হাতের লেখার কারণে তোমার চিঠি বারবার পড়তাম। আর চিঠিতে থাকতো নকশা, কার্টুনের করা বিভিন্ন হাতের কাজ। জীবনে অনেকের প্রেমেই পড়েছি। কিন্তু তোমার মতো কেউ আবেগে ভেসে কেউ দু’কলম লিখেনি। চিঠির ভালোবাসা কেউ দেয়নি। হয়তো তাই প্রেম স্থায়ী হয়নি। না হয় আমিই তাদের যোগ্য ছিলাম না। 

চিঠিতে শত শত অভিমানের চিত্র থাকতো , অথচ দিনশেষে দেখা করার পরও। এখন সত্যি মিস করি। কত শত ব্যস্ততায় বলা হয়না ‘আমি ভালোবাসি’। এখন তো চিঠি নেই তাই ভালোবাসাও হয়তো মিহি হয়ে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর এই যুগে আধুনিক সকল মাধ্যম থাকার পরও চিঠিতে আমাদের ভালোবাসা ছিল প্রানবন্ত। নব প্রজন্ম হয়তো এই কথা শুনে বলবে আধুনিক যুগের বাঙাল। কিন্তু এটা ঠিক আমরা সেই প্রজন্ম, যারা শত আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ভীড়েও সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আবেগ ভালোবাসার বাহককে বহন করেছি বছরের পর বছর। 

তোমাদের ওই দক্ষিণের জানালার পাশে গোলাপ আর লেবু গাছটা আছে? যে গোলাপ এসেছিল প্রথম চিঠিতে। আর লেবু গাছটার কথা মনে পড়েছে ওই লেবু গাছের পাতাও থাকতো সেই চিঠিতে। একটি চিঠি আকর্ষণীয় করতে কত কি না করতে। জানো আমি এখন সত্যি সেই দিনগুলোকে ভেবে নিজেকে অপরাধী বলি। কারণ সেই দিনগুলোর প্রতিটি ক্ষণ ছিল স্মৃতিময়। চিঠির পৃষ্ঠা যেন বইয়ের সমান। অথচ তখন ভাবতাম ভালোবাসছো যখন চিঠি লিখতে কি বা! আমি লিখতাম কিন্তু এতবড় বড় চিঠি লিখার দুঃসাহস হতো না।

প্রিয় জীবন নাকি এখন খুব যান্ত্রিক? খুব কড়াকড়ি? নাকি আগের মতো সাবলীল? আমার মনে হয় আগের জীবন অনেক ভালো ছিল। যখন মনে হতো দুজন ঘুরতে যেতাম, ইচ্ছে হলে লম্বা চিঠি লিখে অভিমানে রাত ভোরে চোখের জলে কাগজ ভিজাতাম। এ যেন এক অন্য জীবন। তুমি কি এখন আর কাউকে চিঠি লিখ? যদি লিখ তাহলে তাকে বলো সে যেন আমার মতো ছোট্ট চিঠি না লিখে। কারণ ব্যস্ত হয়ে লিখার চেয়ে সময় নিয়ে লিখা উত্তম। প্রিয় ভালোবাসার মানুষ নাকি মাসে মাসে মানসিকতা পরিবর্তন করে? তুমি কি জানো? আমি শুনেছি কিন্তু সত্যতা পাচ্ছি না। আবার অনেকে বলে পুরানো প্রেম আবার নতুন করে ফিরে আসে, এটার প্রমাণ পেয়েছি। তোমাকে অনেক বার বলেছি। আমার ভালোবাসার ঝুলিতে অর্জনের চেয়ে ব্যর্থতার অংশ যেন ইতিহাসের মতো। প্রতারণা আর প্রতিশোধের অনলে তার বেশিরভাগ বিফলতায় পুড়ে শেষ হয়েছে। তুমি তো শেষ কয়েকটির সাক্ষী। 

সবুজতার মাঝে এমন নীল রঙকে কেন যেন তুমি আপন করে নিয়েছো তা আমি জানি না। চিঠির প্রেম বড্ড কাঁদায়। আজ চিঠি পেতে মন চাই। প্রিয়, বিদেশ থেকে আপন কেউ চিঠি পাঠায় না। নিজ হাতে তুলে দেয়া প্রেয়সীদের হাতের লিখা চিঠিগুলো এখনো আলমারি ভর্তি। নতুন চিঠি আসে না বলে তোমাকে বলছি। তুমি তাদের বলে দিও । কোলকাতার চিঠি এখন আর বিরক্ত করেনা। নরওয়ে, সুইডেনে যাওয়া অষ্টাদশীদের খুব অনুভব করি। তাদের পাঠানো চিঠিও এখনো আসে না, নাকি ডাকঘর পৌছায় না তাদের আলসেমির ভারে ? পুরানো সেই ডাকপিয়নটাকে দেখলে জিজ্ঞাসা করতাম কিন্তু এখন তারও কোন ব্যস্ততা নেই, দেখাও নেই। আচ্ছা তোমার সেই ক্ষ্যাপাটে বান্ধবী কি এখনো ছন্মনামে চিঠি পাঠায়? তাকে বলিও একখানা চিঠি পাঠাতে আর তাকে বকা দিব না। তার সেই শিশুসুলভ কান্না এখন আর চিঠির শব্দে পাইনা। জীবন পাল্টেছে শুধু পাল্টায়নি চিঠির আবেগ। পাল্টায়নি কয়েকজন। এখন সত্যি চাতকের মতো হয়ে গেছি চিঠির জন্য । ভালো থেকো। একটি চিঠি দিও। ভালোবাসা নিও। 
তোমার রুদ্র ####

নয়ন চক্রবর্ত্তী
রির্পোটার, দৈনিক দেশ রূপান্তর
চট্টগ্রাম, বাংলাদশে।