অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
বৃষ্টির কবিতা -মোহাম্মদ রফিক

বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি /

আজ, সেই মধ্যরাত থেকে
অবিরাম, ঘুঙুরের বোল,
না কি, ডুকরে কান্না নূপুরের;
স্মৃতি ও বিস্মৃতি, বানভাসি
ঘূর্ণির আবর্তে, উথলায়;
হবে, সাতষট্টি, উনিশ শ’,
বাজিতপুর, জলে ডোবা ডাঙা,
কচুরিপানার ফুল, মশা
পতাগন্ধ, আসবে উছল,
এক মধ্যযুগীয় বাড়ির
ছাদের ওপর, আজ কেউ
নৃত্যরত, বিদেহী কথ্থক;
সে কি বা হারিয়ে গিয়েছিল
বৃন্দাবন হয়ে, তীর ছুঁয়ে
যমুনাভাটিতে, মোহনায়,
যেখানে সাগর ঊর্ধ্বশ্বাশ,
কুহু- কেকা বিলীন অসীমে
পাখসাটে, স্বপ্নপঙ্ক্ষী নাও
ভেড়ে ঘাটে, রূপকে পুরাণে;
রূপকথা উপকথা গীত
গীতিকাব্য, প্লাবন, বেবান,
পুবেন বাতাসে কুজ্ঝটিকা, 
অশনি সংকেত বিদ্যুতের,
হাহাকার যজ্ঞের শাসানি;
তেপান্তরে ধোঁকে বালুচর;
অশ্বক্ষুর, নিছক আবেগ,
বিভ্রম, ধ্বনি প্রতিধ্বনি,
ছলাৎ ছলাৎ ছল ছল
অপস্রিয়মাণ, কালান্তর
ধেয়ে আসে, আসক্ত নিশ্বাস
কামদীপ্ত, আপ্লুত ছোবল;
বৃষ্টি অধিবাস চুড়িশব্দ
হৃৎকমলে কমলিকা হৃদ
কার ছায়া, দেয়ালে। ক্ষণিক
শ্যাওলাভেজা পলেস্তরা ছেয়ে
কার মুখ, হঠাৎ উধাও,
অশরীরী, বৃষ্টিজলে আঁকা,
কেশদাম, আতুর শরীর,
স্তব্ধ হাসি লোল ওষ্ঠ জিহ্বা
জ্বলে ধুপ, নর্তকী মুদ্রায়,
বৃষ্টি বৃষ্টি আভঙ্গে উদাম
কোন কাল হতে কালান্তে বা
জলদগ্ধ ছ্যাঁকা লাগে ত্বকে;
বিস্মরণে, স্বপ্ন ধনুরঙা  !

পরিচয়, আত্মপরিচয় / 

অধমের পরিচয় যেন;
জলকাদাধুলোবালুখড়
পুষ্পপাখিলতাপাতাবৃক্ষ
উড়ো ছন ন্যাঢ়া ভূমি জল
চষা খেত জলশূন্য খাঁড়ি
গৃহহারা গৃহ পথে পথে
ঘূর্ণিঝড় আন্দার কুয়াশা
খাল বিল কূলভাঙা নদী
মেঘেমেঘে ক্রমে নুয়ে আসা
হতশ্বাস, সমুদ্রে  আকাশ,
মানুষের ছায়ার স্বজন;
আমিও মানুষ, তা হলে বা;
নিশ্চুপ ব্রহ্মাণ্ড, থমথম!

তবে, আজ /

কামার্ত যক্ষের মৃত্যু নেই,
ছুঁয়ে গেল স্বর্গীয় উল্লাস;
পরাণে পরম শি-শিৎকারে
অঝোরে অবাধ বৃষ্টি ফোঁটা
জুঁইচামেলির রেণু রেণু
তোমার কন্দরে, যোনিমুখে;
চতুর্দিকে সৃষ্টি সৃষ্টিসুর
বেদনা উদাম মোহাসিক্ত
অধীর অধরা, আজ তাই
বিরহরহিত স্বপ্নলোকে
সম্মিলন, শরীরে শরীর
বর্ষণের ধারা; তুমি এই
নেমে এলে ভুঁয়ে, যক্ষীণির
ধাম ছেড়ে মানব সংসারে
বিবাহ-বাসরে, দেখা হল
বেভুল সায়রে, ঢেউ ঢেউ
মথিত মন্থনে কামে শ্রমে
অবিরাম অবিরল, শোনো,
জলরক্ত স্রোত বাসনার
উত্তাল জোয়ারে, অবিশ্রাম
ডাকে, ডাকে জলার্ত আহ্বানে
তোমার মোহনা ছিঁড়ে খুঁড়ে
নব-নবীনার ভেজা কণ্ঠে
শুদ্ধ পাললিক অভিসারে;
তোমার শরীর ধোয়া বৃষ্টি
জল, চুমু খায় ঢেউ ফেনা
ঘামসিক্ত লালা দু’টি স্তনে
বাজে, কোন ভুবনের নয়,
তীরময়, ভাঙন, ভাঙন,
উদ্ভাসন, লৌকিকে অলীক:
অন্য এক, মরমি যক্ষক,
শবসাধনার তটপ্রান্তে
প্রেমযজ্ঞে, অমর, অক্ষয়,
কর্মে শ্বাসে উদ্দীপ্ত স্ফুলিঙ্গ;
বাতাসে বৃষ্টিতে, কাঁদে শিশু
ধ্বনি প্রতিধ্বনি বেশুমার
মাতৃদেহ খুঁড়ে খুদে খুদে
চিত্রে আঁকে জীবন প্রদীপ
তেলেজলে ভেজা সলতে দিয়ে,
ভালোবাসা, পরাণ পথিক;
সুরদাসী আকুল মল্লার ।

নবজন্ম, প্রভাতীয়া  /

ব্রহ্মাণ্ড তাড়িয়ে তা-তড়পিয়ে
অবিরল হুঁস হাস হুঁস
যে দিকে তাকাই, অবিরাম
দীর্ঘ দীর্ঘ তীব্র তীক্ষ্ণ ধারা
বল্লমের ফলা, মরা তৃণ
ডগা, নাগ-কেশরে ফুটন্ত
পাপড়িধোয়া তৃষিত তিয়াসা
দমিত বাসনা, খরামাটি
আস্তরণ, ভেদ করে যায়
পৌঁছে যায়, আদি সৃষ্টিক্ষণে
অগ্নিময়, শীলিভূত শিলা
ছুঁয়ে ছেনে, দূর, আরও দূর
ভিতরে-বাহিরে, খুঁড়ে খুঁড়ে
কামদীপ্র ঠোঁট জিহ্বা দাঁত
এঁকে দেয় চুম্বন আরতি
ফুলমতির দু’স্তন কুঁড়িতে
এবার উৎসব শুরু হোক
আদি-অন্ত গহিন অধীর
শরীর গহ্বরে, নেশাতুর;
দিব্যজ্যোতি পরম শিৎকারে
গান হবে পরাণ পিয়াসী
জন্ম নেবে ফের, কাকচক্ষু
টলমল জল; তুমি তবে যেন,
সাত-সাগরের মোহনায়
জেগে উঠছো, আজন্ম যাপিত
আবর্তে বিবরে, বিষহারি
শঙ্খচূড় শঙ্খিনীর বাড়া,
এমন বেঘোরে বিস্ফোরণ
কে কবে দেখেছে, কোন লোকে;
অন্ধকার, আতুর আকুল,
ধুম  বৃষ্টি মাথার ওপর;
তারে বসে দু’জোড়া চড়ুই
দেখি, ঠোঁটে-ওষ্ঠে চুমু খায়
প্রাণময় ডাকে টিউ টিউ
কণ্ঠ ছেড়ে, আনন্দ ভৈরবী;
এইবার দে উড়াল দে দে
দশ-বিশ তলা অন্তরাল
বস্তুর বিভ্রম, পিছে ফেলে
বেশুমার বাঁশরির সুরে
প্রার্থণায় মুক্ত জাগরণে
বান ডাকে সৃষ্টির মোহনা;
আজ ভোর, জলার্ত মাতাল
দাহমুক্ত অগ্নি অগ্নিময়ী
কালান্তর, জলেতে-ডাঙায়;
জন্ম নিল মৃত্যুহীন ভোর !

ঝমঝম রুমঝুম / 

স্বপ্নের ভিতরে ধূমবৃষ্টি
বিহ্বল চমক অন্ধকারে
চকিত আলোর বিস্ফোরণ
বিস্মরণে, বেঘোর আবর্ত,
নিগূঢ় গুহায়, বাসনার 
কামের অধিক আয়োজনে;
লোলচর্ম ঘর্মাক্ত শরীরে
উঠে দেখি, শুনশান বাতাস,
কড়া রোদ, ত্বকে বিন্ধে কাঁটা,
চোখে, চোতরাবিষ আলো;
যেন, ঘটেছিল আবির্ভাব
তোমার, এবং তিরোধান;
অবিশ্বাস্য পরোক্ষ ভুবনে!

বৃষ্টি, বৃষ্টি, বাংলাদেশ /

পুরো আকাশটাই ভেঙে নামে,
মাথার ওপর, তবে কি সে
বাইবেলে বর্ণিত সন্ধিক্ষন.
বজ্রবৃষ্টি ছুঁড়ছে অগ্নিবাণ
ভেদ করে, মাটি ও পাতাল,
বাতাসে সমূহ বিপন্নতা
তীব্রধূম স্ফুলিঙ্গ দাঊদাউ;
হয়তো.ভালোবাসা, অন্ধকূপে
নিরুদ্ধ আবদ্ধ এতকাল,
দমিত কামের বুভুক্ষায়,
বিরাম বিরতিহীন, হীন
মেতেছে উন্মত্ত সহবাসে
তীক্ষ্ণহিংস্র ক্ষুধার্ত সংগমে
ছিঁড়ে খাবে , রিরংসা তঢ়িত,
লোভের অতৃপ্ত বন্যতায়;
এমন  আদিম বর্ষণের
পাশবিক  উদ্যাম উৎসব,
ধর্ষণ বেবান শিশুহত্যা
নরমেধ যজ্ঞ চতুর্দিকে,
নরক কি এত নারকীয়,
কেউ কি দেখেছে কোনোকালে;
দেখবেই বা কেন, কী করে,
তেজারতি লম্পট ব্যবসা
বিশ্বায়ন মুক্ত লেনদেন
সাগর অধিক বিষাবর্ত, 
কোথায়, সে প্রেম, নীলকণ্ঠ,
কবিকে বা রেহাই দেবে কে;
ফেরি করি, শহীদের লাশ
মুক্তিযুদ্ধ মুক্তি স্বাধীনতা
রক্তস্নাত জাতীয় সংগীত,
রবীন্দ্রব্যবসা, রমরমা,
নরুরুল, তেলেজলে বেশ,
শুনি, পণ্য এখন বাজারে
জীবন, জীবনানন্দ দাশ;
হা হা গোটা জীবন সে খাসা,
চুল তার বিদর্ভ বিদিশা,
নির্জনতা, অন্ধকার, জল
দূর- সাগরের ঢেউ, তীর
এতদিন কোথায় ছিলেন
শঙ্খমালা, দুধে আর্দ্র  স্তন,
ভালোবাসা, পদ্মের পাতায়,
নবনী, ভরাট গাঢ়, ক্রেতা
গান, নৃত্য, লাম্পট্য. সংরাগ,
সংস্কৃতি, সংস্কৃতিমান, চাল
ধূপধুনো অগুরু লোবাণ,
জুটবে, উপচে-পড়া ভিড় ঠেলে,
কাব্যকলা, অনিত্য আহার,
দাঁতে-ওষ্ঠে ঘিয়ের প্রদীপ,
বিনিয়োগ, উপহার, হার
নিশ্চিন্তে ঘুমাও টান-টান;
রক্তস্রোতে ডুবছে বাংলাদেশ
নূহের প্লাবন, খরতর,
সময় যখন, খোল থেকে
লাফ দেবে, ইঁদুরের পাল;
বানভাসি জলে ভাসমান
হাবুডুবু পরাণ বৈকুণ্ঠে,
জীবনে, মরণোত্তর, আমি
দধিচীর ভস্ম, বেঁচে উঠি
অকালে, না গোরে না চিতায়,
শূন্যে শূন্যে মহাশূন্য পার,
নিবাস-ঠিকানা বাস-ধাম,
দেশ, খুঁজি তলে, অতলের;
বাংলাদেশ, সসীম সাগর,
প্রতি অঙ্গে ব্রীড়ারত তিমি
হাঙর কুমির অক্টোপাস
কামে অঙ্গীকারে প্রহসনে;
বৃষ্টিফোঁটা, কপোলে চুম্বন,
বাজিছে ডম্বারু, পাখওয়াজ,
বরযাত্রী, থই থই হাওয়া,
বিবাহ-বাসর, বিশ্বময়,
বাজে খোল, সানাই-করতাল
বৃষ্টি বৃষ্টি সাগর মাতিয়ে
ভেঙে নামছে, নীলান্ত, আকাশ,
স্বপ্নধোয়া জল, আশীর্বাণী,
জলদগম্ভীর অন্তরীক্ষে, জয় !

কবি মোহাম্মদ রফিক এর পক্ষ থেকে 
মানিক বৈরাগী
কক্সবাজার