অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
সাংবাদিকতা—মেধা, মনন ও সততা - ফরিদ তালুকদার

পৃথিবী কোন দিকে যাচ্ছে? বোকার মত প্রশ্ন। আরে পৃথিবী তো সৃষ্টির সেই আদি থেকে এখনো নিজ কক্ষ পথেই আছে। সূর্যের সাথে তাল মিলিয়ে ঘড়ির কাটার বিপরীত আবর্তনে ঘুরে চলেছে। এটা আবার প্রশ্ন হলো? তাহলে আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীর অধিবাসীরা কোন পথে যাচ্ছে?  সহজ প্রশ্ন জটিল উত্তর।  মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।  ঠিক আছে। তাহলে আমাদের অতি প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ তুমি কোন পথে যাচ্ছো? সহজ প্রশ্ন সহজ উত্তর! বাংলাদেশ আবার কোথায় যাবে? বাংলাদেশ তো এখন বন্ধুত্বের নজরানা ইলিশ মাছ নিয়ে দাদাদের দেশে যাচ্ছে! ভালো ভালো বেশ ভালো। বন্ধুত্ব ভালো কথা। দেশ গোল্লায় যাক তবু বন্ধুত্ব টিকে থাক! সে ভালো কথা।  তবে এতে করে বাংলাদেশের মৎস ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্টই সন্দেহ আছে। দাদাদের কলজের যে দৌড় তাতে এত দামী একটা আস্ত ইলিশ কেনার সাহস তাদের আত্মা পোষণ করে বলে মনে হয় না ( নিদারুণ খরার সময় পড়শীদের এক ফোঁটা জল দিতে যাদের কলজে ফেটে চৌচির হয় তাদের জন্যে এটা একটু..?)। সেক্ষেত্রে অবশ্য ভাগা দিয়ে বিক্রি করতে পারে। এক ইলিশ সাত ভাগ। কোরবানির ঈদে আমাদের গরু যেমন, পূজোয় ওদের ইলিশ তেমন। কিছুটা মজা করলাম। যা হোক সব কিছুর পরেও বন্ধুত্ব তুমি অমর হও।

উপরোক্ত শিরোনামে লেখাটা এভাবে কেন শুরু করলাম তা আমার কাছেও পরিস্কার নয়। পুঁজির কালো থাবা, অতি দানবীয় লিপ্সা, ন্যূনতম ভাবে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম…। কারন যাই হোক বর্তমান পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই যে এখন হায়েনাদের নাট্য মঞ্চ (হয়তো আদি থেকেও এমনি ছিলো এবং আমরা এর পরিবর্তন আনতে পারিনি কিছুই, শুধু রুপান্তর ঘটিয়েছি)  সে বিষয়ে মনে হয় কারোর ই কোন সন্দেহ নেই।  বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আনুপাতিক এই হারটা হয়তো আরও বেশী। তবে তারপরও একটা প্রশ্ন থেকেই যায় এবং তা হলো এই হায়েনা হওয়ার প্রতিযোগিতায় কোন পেশার মানুষ সব চেয়ে বেশী এগিয়ে আছে? কোন পেশার মানুষ সবচেয়ে বেশী বিবেক বর্জিত বা বিবেক বর্জিত হওয়ার সুযোগ পায়? ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের লোক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি নাকি অন্য কোন পেশার লোক? এই নিবন্ধে এ প্রশ্নের উত্তর আপাততঃ পাঠকের কাছে ছেড়ে দিলাম। তা না হলে নিজের জীবনের লক্ষ্যের মতো ই এ নিবন্ধের লক্ষ্যও পথ হারিয়ে ফেলবে।

সাংবাদিকতার ব্যানারে লেখাটা শুরু করলেও এর মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলীর উপর একটুখানি আলো বর্ষণের চেষ্টা।  সুতরাং এখন সে পথই ধরা যাক।

“I do not agree with you what you have to say, but I'll defend to the death your right to say it” .. French writer philosopher Voltaire.
“ তুমি যা বলবে তার সাথে হয়তো আমি একমত হবনা, কিন্তু তোমার বলার অধিকার আদায়ের জন্যে আমি মৃত্যু পর্যন্ত লড়ে যাবো”…  ফরাসী লেখক, দার্শনিক ভলতেয়ার। 

বাক স্বাধীনতার অধিকারকে এভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন দার্শনিক ভলতেয়ার (জন্ম ১৬৯৪, মৃত্যু  ১৭৭৮)। বাক স্বাধীনতা..। সমাজের প্রতিটা স্তরের মানুষের জন্যে ই এ স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে গন্য হওয়া উচিত। পেশাগত দিক থেকে এ স্বাধীনতার  জন্যে সবচেয়ে বেশী সোচ্চার যে শ্রেণী তারা হলেন সাংবাদিক। পেশাগত কারনে তাদের কলমকে সত্য এবং বস্তুনিস্ঠ ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্যে তাদের ক্ষেত্রে এ স্বাধীনতার অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।  বর্তমান সমাজ ও তা স্বীকার করে নিয়েছে।  ‘সততা'..। জীবনের প্রতিক্ষেত্রে ই বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ।  প্রতি পেশায় অপরিহার্য একটি গুন। কিন্তু এই অপরিহার্যতা আরও অনেকগুন বেড়ে যায় যখন এর সাথে স্বাধীন শব্দটি সরাসরি জড়িয়ে যায়। একটা কলমকে যখন স্বাধীন করে দেয়া হয় তখন তার কাছ থেকে আমাদের সততার প্রত্যাশাটাও অনেকগুন বেড়ে যায়। যেটা আমরা সাংবাদিকতায় পেশাজীবীদের কাছে আশা করি। এই আশা পূরণে সংবাদ মাধ্যমগুলো বা ব্যক্তিগত ভাবে পেশা হিসেবে নেয়া স্বাধীন ( Freelance ) সাংবাদিকেরা এখন কতটুকু সফল? যেহেতু নিবন্ধের কেন্দ্র বিন্দুতে বাংলাদেশ এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সেখানের কিছু ঘটনা, তাই বিশ্ব বাজারের বড় সব মাধ্যম গুলোকে আলোচনায় নিয়ে আশার ইচ্ছে আপাততঃ নেই।  তারপরও এক্ষেত্রে সিএনএন এবং বিবিসি, এ দু' টা সংবাদ মাধ্যম কে একটুখানি ছুঁয়ে যেতেই হয়। স্বার্থ নির্ভর এবং একপেশে সংবাদ পরিবেশনের জন্যে বিশ্ববাসীর কাছে সিএনএনের বিশ্বাস যোগ্যতা এখন প্রায় তলানিতে।  এমনকি আমেরিকানরাও এই সংবাদ সংস্থাটির উপর এখন বীতশ্রদ্ধ বলেই ধারণা হয়।  আমার কেন জানি মনে হয় বিগত নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে সিএনএনের অতি এবং একঘেয়েমি ভাবে নেতিবাচক প্রচার ও ট্রাম্পের জয়ের পিছনে একটা পরোক্ষ ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমান বিশ্বে অধিবাসীদের মানসিকতা এখন এমন একটা জগতে বাস করে যে প্রচার একটা হলেই হলো তা নেতিবাচক আর ইতিবাচক। শুধু লাইম লাইটে আসতে পারলেই চলে। তুলনার হিসেবে বিবিসি কে এখনও অনেকটাই গ্রহণ যোগ্য মনে হয়। আর বাংলাদেশ..? জন্মভূমি না হলে লেখাটা এখানেই শেষ করে ফেলতাম বা এ বিষয় নিয়ে কলম ই ধরতাম না।

হাহ্… বাক স্বাধীনতা..! ঘটনা প্রবাহের দিকে চোখ দিলে, বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথা বললে যে চিত্রটি দেখতে পাই তাতে মনে হয় ঐ ভূখন্ডে এই শব্দটি অনেকদিন হলো তার অধিবাসিত্ব হারিয়ে শুধুমাত্র অভিধানের পাতায় কোনভাবে মরমে মরিয়া আছে। সংবাদ মাধ্যম গুলো এক্ষেত্রে কি করছে? হয় নিশ্চুপ কিংবা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তোষামুদির রূপ রস গন্ধে আমাদের অন্তরাত্মাকে পঁচিয়ে ফেলছে। দোষই বা কতটুকু দিব? অভিজিৎ,  সাগর-রুনি দম্পতির ঘটনাতো চোখের সামনে ঘটে গেল, শহিদুল ইসলামের হেনস্থা হওয়ার বিষয়টাও তো সেদিন সবাই দেখলো। তবে সেক্ষেত্রে আমার আবেদন এমন একটা পেশায় যদি সৎ ও বস্তুনিস্ঠ হতে না পারেন তবে কলমটাকে অন্য পেশায় ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। 

“A good news paper, I suppose, is a nation talking to itself”... Arthur Miller (‘আমি মনে করি একটা ভালো খবরের কাগজ যেন একটি জাতি যে নিজের সাথেই কথা বলছে’..  আর্থার মিলার)। একটা জাতির জীবনে দায়িত্বশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার গুরুত্ব এতোখানিই। শিক্ষকতা, ডাক্তারী পেশার মতোই এটি একটি মহৎ পেশা। যে সমাজ জীবনে এধরণের পেশাগুলো ঘুণপোকা’র বসতি হয়ে যায় সে সমাজের ভবিতব্য অনুধাবন করতে দ্বিতীয়বার আর মাথা খাটাতে হয় না।  যে সরকার ব্যবস্হা এই কন্ঠকে চেপে ধরে তাকে আর যা ই বলা হোক একটি দেশ প্রেমিক সরকারও বলা যায় না। বলাবাহুল্য প্রায় জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ নামক দেশটিতে তাই ই হয়ে আসছে এবং বলা যায় বর্তমানে আমরা তার পূর্ণ বিকশিত রূপই দেখতে পাই! দু'একটা মাধ্যম যারা সত্য প্রকাশের প্রয়াশে একটু এগিয়ে আসার চেষ্টা করে তাদের দেখে মনে হয় তারা জানেই না স্হান, কাল, পাত্র ভেদে সংবাদিকতার আদর্শিক দিকগুলো কি হওয়া উচিত। সাম্প্রতিক ঘটনার উপরে ইউটিউবে এমন দুটো প্রতিবেদন দেখেই মূলতঃ অন্যসব চিন্তা বাদ দিয়ে এ নিবন্ধটি লিখতে বসলাম। 

তাজা খবর.. আজকের গরম খবর.. ঢাকা শহরের পাড়ায় মহল্লায় ক্যাসিনো, নেতা পাতি নেতাদের রুমে রুমে টাকার ভল্ট, আজকের তাজা খবর..! সাব একটা পেপার নেবেন? সাব আজকের গরম খবর আছে। সাব একটা পেপার নেন। বা বগলে একগাদা এবং ডান হাতে একটি খবরের কাগজ নিয়ে কৃশকায় এক কিশোর রাস্তার ট্রাফিক যানজটে আটকে যাওয়া রিক্সা আর গাড়িতে বসে থাকা এক প্যাসেন্জার থেকে আর এক প্যাসেন্জারের দিকে এভাবেই ছুটে যাচ্ছে।  দেশের বড় বড় শহর গুলোতে এ দৃশ্য বর্তমানে আর দেখা যায় কিনা ঠিক জানিনা। তবে চোখ বুঝে কয়েকদিন পূর্বের দেশের পথ পরিক্রমার দৃশ্যটি ভাবার চেষ্টা করলে এমন একটি চিত্রই ভেসে উঠে। এ প্রবন্ধটা লেখা যখন শেষ হবে ততোদিনে দেশের বাতাসে এর ছিঁটেফোঁটা গন্ধ থাকলেও থাকতে পারে। কারণ তিনটা।  প্রথমত জাতিগত ভাবে আমাদের আবেগের স্ফুরণ ও যেমন আগ্নেয়গিরির লাভার চেয়ে দ্রুত হয় আর এর স্হায়িত্বকাল ছোটবেলায় এরনের কষ দিয়ে তৈরী বাবলের চেয়েও সংক্ষিপ্ত হয়। কোন কিছুরই আর কোন ফলো-আপ থাকেনা। গোটা জাতিই যেন এক শিশু হয়ে আছে এখনও!  দ্বিতীয় বিষয়টি হলো  কোন এক অদৃশ্য কারনে কয়েকদিনের মধ্যেই সবকিছু যেন ধামচাপা হয়ে যায়। যেমন প্রিয়া সাহার ঘটনাটি। এর পরে যে কারনটি রয়েছে তা হলো এর চেয়েও বড় আর একটা খারাপ তথ্য প্রকাশিত হয়ে পূর্বেরটার গুরুত্বকে কামিয়ে দেয়া। তারপরও লিখছি। ফকিরাপুলের ক্যাসিনোর কথাই ধরা যাক। যতটুকু তথ্য জানা গেছে মনে হয় জনাব মেনন সাহেব ই এটির ফিতা কেটেছেন এবং তিনিই এটার সভাপতি।  কোন এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বললেন তার সারমর্ম দাঁড়ায়, তিনি এর সাথে তেমন ভাবে জড়িত নন শুধু ফিতা কাটার জন্যে ই গিয়েছিলেন।  তার কথা যদি সত্যিই ধরে নেয়া হয় তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। ক্যাসিনো বাংলাদেশ সংস্কৃতিতে  এখনো কোন  স্বীকৃত স্বাভাবিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। সেক্ষেত্রে ফিতা কাটতে যাওয়ার আগে তার মত একজন দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তি এর বৈধতা সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর না নিয়েই কেন এ কাজটি করতে গেলেন?  কার প্ররোচনায়ই বা গেলেন? তাদের সাক্ষাৎকার কই? আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলোর কি সে পর্যন্ত খনন করার স্বাধীনতা আছে? থাকলে তারা তা করছেন না কেন?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বাংলাদেশে এখন অলিতে গলিতে ভুঁইফোঁড়ের মতো সংবাদ সংস্থা গজিয়েছে।  তারই একটা মনে হয়  ( Broadcaster-- BD NEWS 18)  ইউটিউবে একটি ফুটেজ ছেড়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে ওটার সাথে জড়িত বা কর্মরতা দু’জন অসহায় মেয়েকে জেরার পরে জেরা করে চলেছে। তাদের একজন লজ্জায় মাথানত করে রেখেছে এবং তার চেহারাটাকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার জন্যে জোর করা হচ্ছে। যেন ওরা বিশেষ কোন অপরাধ করে ফেলেছে।  বাহ্..  বেশ  আমাদের সাংবাদিকতা..! নপূংশক এবং পৌরুষদীপ্ত!? মাথায় কোনভাবেই আসছে না কি ধরনের সাংবাদিকতার ডিসপ্লে এটি। আরে ন্যুন্যতম ভাবে বেঁচে থাকার তাকিদে এরা তো এখানে শুধু একটা কাজ করে যাচ্ছে।  এদের জবাবদিহিতা কতটুকু?  যে ভাবে এদের প্রশ্ন জর্জরিত করছেন তাতে তো মনে হয় এরা বিশাল একটা অন্যায় করে ফেলেছে। (একটা দেশে একটা ক্যাসিনো থাকাও তো অন্যায় নয় যদি তা সরকার অনুমোদিত বৈধতা নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে পড়ে আসছি)  মুরোদ যদি থাক,  সততা যদি থাকে তবে আসল হোতাগুলোকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন না কেন?  এরকম আর একটি  ফুটেজ ( Broadcaster-- Bangla News Today) দেখা যায় গুলশানের একটি স্পাকে কেন্দ্র করে।  যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি ভিডিও প্রতিবেদন তৈরী করার জন্যে কয়েকজন মহিলাকে (সম্ভবত ওখানে কাজ করেন তারা) মুখ ঢেকে রাখতে বলা হচ্ছে।  ভালোকথা। কিন্তু খুব সহজেই তো এদেরকে অন্যরুমে সরিয়ে সে রুমের ভিডিও করে আবার তাদেরকে সেই রুমে এসে বসতে বলা যেত। ফুটেজটিতে এদেরকে দেখানোটা দৃষ্টিকটু লেগেছে। মেনে নিতাম। এধরণের স্পা চালানো বা এখানে যা ঘটছে তা যদি সমাজ বিরোধী ই হয় তবে স্পার মালিক কেন ভিডিও তে নেই? তাকেই তো সর্বপ্রথম আকাশে প্রকাশ করা দরকার। সাংবাদিকতার সঠিক দায়িত্বটা এখানে কতটুকু পালিত হচ্ছে? 

পূর্বের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো,  ক্যাসিনো খবরটি যেভাবে মিডিয়ায় ফাঁস হলো তাতে মনে হয়েছে দুদিন আগে হঠাৎ করে আকাশ থেকে ৬০টি ক্যাসিনো ঢাকা শহরে নাযেল হয় এবং দু’দিনেই এর হোতা ব্যক্তিরা হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে।  মাত্র দু’দিন আগে থেকেই  জি কে শামীম ৬জন বডি গার্ড নিয়ে চলাচল শুরু করেছে এবং গণপূর্ত অধিদফতরের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেছে।  আর একটি যে বিষয় লজ্জাস্কর ভাবে লক্ষ্যনীয়, তাহলো ক্ষমতাসীন দলের সব ব্যাপক নেতারা এই সব দিনদুপুর ডাকাতির সব দোষ আবারও বিএনপি জামায়াতের ভূতের উপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও তা একরকম পরিস্কার! প্রায় ১২ বছর ধরে নিরঙ্কুশ একনায়কের মত ক্ষমতায় থেকে তার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত কেন সে প্রশ্ন কোন সাংবাদিককেই তুলতে দেখিনি। মাত্র একবছর পূর্বেই তো তিনি এই রাব্বানীদের মাথায় হাত বুলিয়েছেন। তার দলের ভবিষ্যৎ সোনার ছেলে হিসেবে দেখেছেন। কারা এদেরকে তার কাছে এভাবে পরিচিত করেছিলেন? এ প্রশ্নও কাউকে করতে শুনিনি। এখন পর্যন্ত দায়িত্বশীল বড় কোন পত্রিকায় এ নিয়ে লেখা কোন সম্পাদকীয় ও তো এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি।  নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলনের সময় সাংবাদিক শহীদুল ইসলামকে বন্দী করতে ঘন্টাও লাগেনি। আর এখন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা সম্রাটকে বন্দী করতে এতো সময় লাগছে কেন? এ নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগছে। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি বলে একটি কথা আছে যা সাংবাদিকতার পেশায় খুবই জরুরী।  এই যে বছরের পর বছর ধরে ছিঁচকে চোরেরা সব বিশ্ব মানের ডাকাত হয়ে গেল এটা কি কোন সংবাদ মাধ্যমেরই চোখে পড়েনি?  কেন পড়লো না? এর পিছনের কারন কি? ভয়, অসততা না অদক্ষতা? এ সব কিছুই হলো মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনের ছায়ায়। এ জন্যে তার দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।  তাও কোন প্রান্ত থেকে শুনিনি। এর পিছনের কারন ও কি ভয়? সাংবাদিকতা মানে কি কোন নেতা বা নেত্রী যা বলবেন সেটুকুকেই শুধু জন সমক্ষে তুলে ধরা? এই সব কিছুর বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর সকাসে অনুরোধ.. আপনার নিজস্ব সততায় যদি কোন সংশয় না থাকে তবে মিডিয়ার কন্ঠকে মুক্ত করে দিন। হ্যাঁ.. গুণকীর্তন ও হবে সমালোচনা ও হবে। নেত্রী হিসেবে এ দু'টোকেই আপনার স্বাগত জানানোর উদারতা থাকতে হবে। দেখবেন সবাই না হলেও কিছু মেধাবী, সৎ, নির্ভীক সাংবাদিক ঠিকই বেড়িয়ে আসবে। আর যদি দেশের মঙ্গল চান তবে এদের নিরাপত্তা আপনাকেই দিতে হবে। এদের মাধ্যমেই আপনি দেশের সঠিক চিত্রটি দেখতে পাবেন। চারপাশের তোষামোদকারীদের কাছ থেকে এটা শুনতে ভালো লাগলেও তা দেশের জন্যে মঙ্গলজনক নয়। এটা নিশ্চয়ই এখন বুঝতে পারছেন। আর একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি। কোন ক্ষমতাসীন সরকারই যদি মনে করে যে তার দলের লোকজনই একমাত্র দেশপ্রেমিক, তাহলে তা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। থানা, পুলিশ, সেনাবাহিনী  র‍্যাব এর প্রসংগ তোলার আর প্রয়োজনই বোধ করিনা। দূর্নীতি করতে করতে এবং অযাচিত সুবিধা ভোগ করতে করতে এদের পকেট তো এখন ফুলে ফেঁপে আকাশ ছুঁতে চলেছে।  বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা এখন মিয়ানমারের পুলিশের সাথেও লড়ে টিকে থাকতে পারবে না। এ নিয়ে ঐ ক্যাসিনোতেই আমি কয়েন ফেলতে রাজী আছি। অসুবিধে নেই।  যুদ্ধ নয় আমরা শান্তি চাই। তবে আপনাদের দূর্নীতি পুষ্ট ঐ জীবন তো সে কথা বলেনা। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিছু সৎ কর্মচারী কর্মকর্তা প্রাণে বেঁচে গেছেন।  কিন্তু দেশজুড়ে গেঁথে বসা দূর্নীতির খুঁটি তাতে একটুও নড়েনি। বরং আপামর জনসাধারণের ভোগান্তি তাতে আরও বেড়েছে।  এ দুঃখ প্রধানমন্ত্রী কোথায় রাখবেন জানিনা!

বলছিলাম ক্যাসিনোর বিষয়ে আবার ফিরে আসবো। বাংলাদেশের মত একটা গরীব দেশকে বিশ্ব মঞ্চে টিকে থাকতে হলে সর্বাত্মক ভাবে বাইরের পুঁজিকে আকর্ষণ করার চেষ্টার কোন বিকল্প নেই।  এটা শিল্প ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, সমান গুরুত্ব পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রেও। আর এই পর্যটন শিল্পকে আকর্ষণীয় করতে হলে দেশের বিশেষ যায়গা গুলোতে সরকারের অনুমতি এবং তদারকির আওতায় কিছু ক্যাসিনো চালু করার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখতে পারে। যেখানে সরকার অন্য খাতের তুলনায় বেশী আয়কর ধার্য করতে পারে। এর সাথে একই ভাবে নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতায় সীমিত ভাবে বিয়ার, ওয়াইন জাতীয় পানীয় ও পর্যটকদের জন্যে সহজলভ্য করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। দেশের সর্বস্তরেই যেখানে ঘুষ, দূর্নীতি সহ সব রকম অনৈসলামিক কাজ নির্বিঘ্নে চলছে সেখানে ধর্মের ঐ অজুহাত দেখিয়ে এটাকে নিষিদ্ধ করে রাখার কোন কারণ দেখি না। বরং সরকারের আয়ের পাশাপাশি দেশের প্রজন্ম ইয়াবার মত নেশার বিষাক্ত ছোবল থেকে অনেকটাই বেঁচে যাবে। চোলাই বা স্পিরিট জাতীয় পানীয় গ্রহণ করে অকালে প্রাণ হারাবে না। একটুখানি ভবিষ্যৎ সংকেত।  গার্মেন্টস শিল্পও ধীরে ধীরে আফ্রিকার দিকে চলে যাচ্ছে বলে মনে হয়।  ৩০/৩৫ বছর আগে বাংলাদেশে ইলেক্ট্রনিক্স এর সেমি নক ডাউন লেভেলের এসেম্বলিং শুরু হয়েছিল। আজও সেখানেই পড়ে আছে। এখান থেকে কমপ্লিট নক ডাউন পর্যায়ে উত্তরণের বিষয়টিতেও জরুরী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।  পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি আমদানি করার নামে বিলিয়ন ডলার নজরানা না দিয়ে নিজ দেশের মেধা ও জনশক্তিকে ঐ পর্যায়ে উন্নীত করা দরকার। এবং এ জন্যে প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্হাকে ঢালাও করে সাজানো। স্কুল প্রাঙ্গনে সিগারেট বন্ধ এবং নামাজ বাধ্যতামূলক করেছেন ভালোকথা। কিন্তু তা করে তো এ সমস্যার সমাধান হবে না। এ পর্যন্ত এসে যারা নিবন্ধটিকে ছুঁড়ে ফেললেন তাদের কাছে অনুরোধ আর একটু ধৈর্য ধরুন। 

আপনাদের কাউকে যদি চোর ডাকাত বা খুনী বলা হয় তাহলে কি নিজেকে ছোট মনে হয়? আত্ম শ্লাঘায় আঘাত লাগে? তাহলে ভাই, বন্ধু, চাচা, মামা, খালু, আত্মীয়-স্বজন যে যেখানে এবং যে পেশায় আছেন আপনি যদি দূর্নীতিবাজ হন তাহলে আপনাদের সবার কাছে একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ, প্রতিরাতে ঘুমুতে যাওয়ার পূর্বে শুধু একবার করে এই সত্যটা মনে করে বিছানায় যাবেন, যে আপনি একজন চোর, একজন ডাকাত, একজন খুনী। কারন পরের দিনের সকালটা হয়তো আপনি নাও দেখতে পারেন। সুতরাং নিজের বিবেকের কাছে অন্তত সত্যটিকে স্বীকার করে ঘুমান। আপনার বাড়ি, গাড়ি যদি অবৈধ ভাবে উপার্জিত টাকায় হয় তবে ভাবুন আপনি যে ঘরটিতে ঘুমুতে যাচ্ছেন তা চুরি করা ঘর। যে গাড়িটিতে আপনি বা আপনার পরিবারের লোকজন আজ চড়ে বেড়ালেন তা চুরি করা গাড়ি। বোন, ভাবী, খালা, চাচী আপনারা নিজেরাও যদি কর্ম ক্ষেত্রে একই রকম দূর্নীতি করে থাকেন তবে আপনাদের কাছেও একই অনুরোধ।  আর যদি নিজে না করেও আপনার স্বামীর দুস্কর্মে  সম্মতি দিয়ে থাকেন তাহলেও ঘুমুতে যাবার আগে একবার ভাবুন আজকের দিনটায় আপনিও একজন চোর ছিলেন। সম্মতি না দিলে ভাবুন আপনি একটা চোরের সাথে এখন রাত কাটাতে যাচ্ছেন। মনে করিয়ে দেই যে সত্যিকারের পেটের দায়ে যে চুরি করে সে চোর নয়। আপনাদের এ চুরি হলো অতিরিক্ত লোভের দায়ে। একদম খাঁটি চোর। না না ঐ নামাজ পড়ে বা হজ্জ- যাকাত করে কিছু হবেনা। এটা কোন না জেনে ভুল নয়। জেনেশুনে সজ্ঞানে এগুলো আপনারা দিনের পর দিন করে আসছেন। আপনার এই চুরির কারনেই আজ রাস্তার পাশে ঐ শিশুটি না খেয়ে পড়ে আছে। আপনার ধর্ম কর্ম তার কষ্টকে তো ফিরিয়ে দিতে পারবে না। যদি ভাবেন সৃষ্টিকর্তা আপনাদের মাফ করে দিবেন তাহলে সে সৃষ্টিকর্তাকে আপনারাই আপনাদের সুবিধা মত রূপ দিয়েছেন। তিনি যদি সত্যি ই থেকে থাকেন তাহলে অন্যরূপে আছেন। এটা খুব সাধারণ বোধ।  একটু ভাবলে হয়তো বুঝতে অসুবিধা হবে না।।

ফরিদ তালুকদার । টরেন্টো
 সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯