অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯
ইউরোপের পথে পথে (পনেরো)- দীপিকা ঘোষ

রাজধানী প্যারিস ছাড়িয়ে ফ্রান্সের দক্ষিণপূর্ব শহর নিসের দিকে TGV ট্রেন ছুটছে। পৌঁছুতে সময় নেবে ছয় ঘন্টা ষোলো মিনিট। TGV ফরাসি ভাষায়(Train a Grande Vitesse)। অর্থাৎ দ্রুতগামী প্যাসেঞ্জার ট্রেন। ঘন্টায় ৩২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটতে সক্ষম। ইউরোপের সবখানেই অভ্যন্তরীন রুটগুলোতে ফ্লাইটের চেয়ে ট্রেনে যাত্রীর আসাযাওয়া বেশি। সম্ভবত এয়ারলাইনসের সিকিউরিটি, বোর্ডিং প্রোসিডিওর, মালামাল সংগ্রহের ঝামেলাগুলো তারা এড়িয়ে চলতে চান। ট্রেনে শুধু টিকেট কেটে ওঠা। তারপর নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকা। কম চাহিদার কারণে প্লেনের ভাড়াও কম এখানে। ভেতরটা নিরবচ্ছিন্নভাবে বেশ আরামদায়ক। কলগুঞ্জন নেই। প্রতি সারিতে আসন সংখ্যা আট। আটজনের জন্য মাঝখানে দুখানা টেবিল। খাওয়া-দাওয়ার জন্য এতে যেমন সুবিধে তেমনি ল্যাপটপ বসিয়ে অনয়াসে কাজকর্মও প্রয়োজনে করা চলে। প্রতি স্টেশনে যাত্রীদের ওঠাপড়ার হুটোপুটিও নেই। 

কাকতালীয়ভাবে কণিষ্কর পাশের আসনটি এক প্রবীণ ভদ্রলোকের। শুচির আসন ডানদিকে অন্য তিন যাত্রীর সঙ্গে। পাশ্চাত্যের অধিকাংশ মানুষ অপরিচিতর সঙ্গে নিজের থেকে সচরাচর হঠাৎ করে আলাপ জুড়তে আসে না। একটু পরেই ব্যাগ থেকে ভারি একখানা বই বার করে তাই যথারীতি পড়তে শুরু করলেন ভদ্রলোক। আজকালকার বাস্তবতায় একটু অবাক লাগলো দেখে। কারণ এখনও পর্যন্ত লম্বা যাত্রায় যত জায়গাতে গিয়েছি হয় ল্যাপটপ নয়তো স্মার্ট ফোনে নিমগ্নতার চিত্রই দেখতে পেয়েছি ইউরোপে। বইয়ের পাতায় অবশ্য বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারলেন না। একটু পরে অচেনা সহযাত্রী ঘোষের সঙ্গে দিব্যি আলাপ জমিয়ে তুললেন। প্রথমে মামুলি কিছু প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়েই শুরু হলো। তারপর বিস্তৃত বিষয়ের আলোচনা। ফরাসি ভদ্রলোকের নাম মার্টিন ট্রাভার্স। ভারতবাসীর সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। চেন্নাইতে প্রাইভেট সেক্টরে ইনফরমেশন টেকনোলজির ব্যবসা রয়েছে। গত সপ্তাহে স্বদেশভূমিতে সস্ত্রীক এসেছেন মেয়ের বিবাহ উৎসব উপলক্ষে যোগ দিতে। মার্টিনের জন্মস্থান, ফ্রেঞ্চ রিভেএরা।

বললেন-

ফ্রেঞ্চ রিভেএরা ‘ইসিলা কোচ’ নামেও পরিচিত। বছর ভরেই সূর্যোজ্বল। কিন্তু আবহাওয়া মৃদু। নিস থেকে ১১২ কিলোমিটার দূরে। ট্রেনে যেতে এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিট সময় লাগে। নিসে যখন যাচ্ছোই তাহলে পারলে ওখানেও একটা ট্যুর নিতে চেষ্টা করো। ওখানকার সাগর সৈকত অসাধারণ!

ধন্যবাদ! নিশ্চয়ই চেষ্টা করবো! কিন্তু ফ্রেঞ্চ রিভেএরায় অভ্যস্ত হয়েও ভারতের গ্রীষ্মকালকে সহ্য করছো কী করে?

মার্টিন হাসলেন-

অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে! প্রথম দিকে কষ্ট হতো। আর এখন তো নিজেকে ভারতীয় বলেই মনে হয়! বলেই একটু হেসে উঠলেন। পরে বললেন-

তবে জ্যাকি, মানে আমার স্ত্রীর খুব পছন্দের জায়গা! কারণ ওখানে প্রাকৃতিক নিয়মেই ট্যান হওয়ার অনেক সুবিধে! নিসে কতদিন থাকবে?

পরশু সকালেই ইটালিতে যাচ্ছি!

বাঃ! খুব ভালো! ওখানকার ভ্যাটিকান সিটি আর কলোসিয়ামটা দেখতে ভুলো না!

হ্যাঁ, আমাদের লিস্টেও রয়েছে!

দুর্দান্ত সাইক্লোন হয়ে তীব্রগতিতে ট্রেন ছুটছে মাঝে মাঝে হুয়িসেলের প্রতিধ্বনি তুলে। চারপাশের দৃশ্যছবি ক্ষণকালের জন্য স্ফুলিঙ্গ হয়ে ঝলছে উঠছে দৃষ্টিসীমায়। কী অনন্যসাধারণ সৌন্দর্য আটলান্টিক, ভূমধ্যসাগর পরিবৃত ফ্রান্সের ভৌগলিক শরীর ঘিরে। শহরের বাইরে গৈরিক জলের অচেনা সর্পিল নদী রিজিওন্যাল পার্ক, বিশাল অরণ্যানীর ফাঁক ফোকর গলে অদৃশ্য হয়েছে কোথাও কোথাও। আবার হঠাৎই পাহাড়ের পাদদেশ ছুঁয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কলকল্লোলে। পাথরের বাড়িঘর। উপত্যকার ঢেউখেলানো নিম্নভূমিতে সবুজ ফসলের মাঠ। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে জুনিপাড়, ব্ল্যাক পাইনের সঙ্গে ইউরোপীয়ান লার্চ। কদাচিৎ পামজাতীয় গাছ। আর চারপাশের বন্য রূপে তরঙ্গ তুলেছে প্রাইমরোজ, পাহাড়ি লিলি এবং ডেইজির বিস্তৃত ঝাড়। তারপরেই আবার আরম্ভ হয়েছে পাহাড়ের সুদীর্ঘ রেঞ্জ। আরও নিচে পাথরে মোড়া রকি কোস্টলাইন। গোটা ফ্রান্সটাই যেন নিসর্গের এক অপরূপ ঐশ্বর্যশালা! স্রষ্টার সৌন্দর্যলীলার নান্দনিক লীলাভূমি!

দুপাশে অবারিত দ্রাক্ষাকুঞ্জের সারি চোখে পড়তেই অজান্তে হঠাৎ বাংলায় বলে ফেললাম-

দেখেছিস পাপান, চারদিকে কত আঙুরের বাগান?

কণিষ্ক অবশ্য উত্তর দিলো না। শুরু থেকেই নীরব ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে বসে রয়েছে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু উত্তরে মার্টিন তাকালেন আমার মুখে। ভদ্রতা রক্ষায় বললাম-

আমরা আঙুরের বাগানের কথা বলছিলাম। প্রচুর দেখতে পাচ্ছি এখানে!

হ্যাঁ, এখানে লাল, গোলাপি, সবুজ বেগুনি সব রকমেরই চাষ হয়। কারণ গ্লোবাল মার্কেটের ৩০% ওয়াইনই রফতানি হয় ফ্রান্স থেকে। আমাদের প্রধান কাস্টোমার হচ্ছে রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, জাপান, ব্রিটেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যাণ্ডস আর জার্মানি।

তাহলে আঙুরই এখানকার মেইন...? ঘোষের প্রশ্ন সমাপ্ত না হতেই মার্টিনের জবাব এলো-

না একদমই নয়। গম, ভুট্টা, ওট আর বার্লির চাষ প্রচুর হয় এখানে। এমনকি রিভার রোনের অববাহিকা অঞ্চলে সামান্য পরিমাণে ধানের চাষও হয়। তাছাড়া আলু আর বিট তো রয়েইছে। 

ঘোষ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলো-

নিসের সিকিউরিটি কণ্ডিশন এখন কী রকম?

প্রশ্ন শুনেই মার্টিনের মুখের ওপর বিষাদছায়া ছড়াতে দেখে অপ্রস্তুত হলো সে-

দুঃখিত! আমি আসলে প্রশ্নটা...!

না না ঠিক আছে! প্রশ্নের জন্য নয়! নিসের ওই ট্র্যাজিক ঘটনায় আমাদের একমাত্র সন্তান ফ্রাঙ্কা তার স্বামী আর পাঁচ বছরের ছেলেকে হারিয়েছিল! সেই জন্যই..! বিগত বছর দুটো ছিল আমাদের সবার জন্যই ভীষণ যন্ত্রনার! যাই হোক, আমরা লাকি যে মেয়েটা শেষ পর্যন্ত সামলে নিয়েছে নিজেকে! সামনের সপ্তাহে ওর বিয়ে হচ্ছে!

সত্যিই খুব ট্র্যাজিক ঘটনা! সংবাদটা প্রতিদিন আমরাও ফলো করেছি! ইউরোপের সবগুলো জঙ্গি আক্রমণের মধ্যে দুর্ধর্ষতার দিক দিয়ে এটাই ছিল সবচাইতে ভয়ংকর!

অবশ্যই! বিশাল জনসভায় আক্রমণের ছক খুব সুপরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছিল! আর যে জঙ্গি আক্রমণ চালিয়েছিল সেও ছিল খুব বন্য ধরনের!

কথা বলতে বলতে থেমে গেলেন মার্টিন। সম্ভবত স্মৃতির জগতে মন হারালো। পরে বললেন-

ফি বছর ১৪ই জুলাই প্রমিনেড ডেস অ্যাঙ্গলেইসে বিরাট গ্যাদারিং হয়! হঠাৎ সন্ধ্যেবেলা কার্গো ট্রাক চালিয়ে নিমেষের মধ্যে হুলুস্থুলু বাধিয়ে দেয় দুর্বৃত্ত! উঃ কী সাংঘাতিক দৃশ্য! আমি আর জ্যাকি ওদের সঙ্গে ছিলাম! কী করে মেয়েকে নিয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম জানি না!



ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ এর ১৪ই জুলাই। সেদিন ফ্রান্সে জাতীয় ছুটি চলছে ‘বাস্তিল ডে’ উপলক্ষে। ‘বাস্তিল ডে’ ফ্রান্সে গণতন্ত্রের জন্মদিন। বাস্তিল দুর্গ আজও ফরাসি জনতার কাছে রাজস্বৈরতন্ত্র এবং রাজপ্রশাসনের নির্যাতনের প্রতীক। এখানেই রাজা চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামল থেকে শুরু হয়েছিল রাজবন্দীদের আটকে রেখে নির্যাতন চালানোর কুখ্যাত ইতিহাস। নির্যাতন চালিয়ে এদের হত্যাও করা হতো রাজানুগত্য অস্বীকার করার কারণে। ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই বাস্তিল আক্রমণ করে প্যারিসের কয়েকজন দুর্ধর্ষ মানুষ ফরাসি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। ফ্রান্সের গণতন্ত্রকামী মানুষ তাই প্রতি বছর দিনটিকে উৎসব মুখরতায় স্মরণ করে।

২০১৬ এর ১৪ই জুলাই। রাতের আলোছায়ার সান্ধ্য পরিবেশে নিসের শহর প্রমিনেড ডেস অ্যাঙ্গলেইসে তখন জমে উঠেছে শত শত মানুষের ভিড়। হঠাৎ ৩১ বছরের চরমপন্থী তিউনিশিয়ান যুবক আনন্দিত জনতার ভিড়ে ১৯ টন ওজনের একটি কার্গো ট্রাক চালিয়ে দেয় দুরন্ত গতিতে। ৮৬ টি নিরীহ প্রাণের বলি হলো তাতে। আহত হলো ৪৫৮ জন দর্শক। ফ্রান্স জুড়ে মুহূর্তেই নেমে এলো হতবিহ্বল শোকের ছায়া। গোটা বিশ্ব রুদ্ধশ্বাস বেদনায় টেলিভিশনের পর্দায় সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে দেখতে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলো শয়তানের অমানুষিক বীভৎস আচরণ! সভ্যতা ধ্বংসের সীমাহীন ক্ষমতা!

মার্টিন কিছু সময় নিঃশব্দে থেকে ভারি গলায় বলেন-

পুলিশের গুলিতে গাড়ির ভেতরে জঙ্গির মৃত্যু না হলে আরও কত প্রাণ যে বলি হতো কে বলতে পারে! এই ট্রাকটিও সে ছিনতাই করেছিল পথে এক ট্রাকের চালককে হত্যা করে!

ইউরোপে জঙ্গি আক্রমণের ঘটনা ২০১৬ তেই অবশ্য প্রথম নয়। ইসলামি রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবীতে ২০১৫ এর নভেম্বরেও চরমপন্থীরা ১৩০ জন মানুষকে হত্যা করেছিল প্যারিস শহরে। দেশ জুড়ে জরুরী অবস্থা ঘোষিত হয়েছিল তখন। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে নতুন আইনও পাস করা হয়েছিল তারপরে। সিংহভাগ মানুষ সেই পদক্ষেপকে সেদিন সমর্থন জানিয়েছিল অকুণ্ঠভাবে। কিন্তু মার্টিন এসব নিয়ে  মুখ খুলতে অনিচ্ছুক, বোঝা গেলো দ্রুত তার প্রসঙ্গ পরিবর্তনের আগ্রহ দেখে। কারণ ইউরোপ, আমেরিকার শিক্ষাসংস্কৃতিতে শিশুকাল থেকেই পারিবারিকভাবে শেখানো হয়, রাজনীতি, ধর্ম এবং টাকার বিষয়ে উপযুক্ত স্থানকাল ছাড়া কখনো আলোচনা করা উচিৎ নয়। কেননা তিনটেই বড় স্পর্শকাতর বিষয় সমাজ ভাবনার যে কোনো পর্যায়ে।

হোটেলে পৌঁছুতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো। একটু দূরে ভূমধ্যসাগরের তীরভূমি। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে সকালে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বেশ খানিকটা সময় পেরুলো। নিসের  নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থান দেখার বিষয় আমাদের। সকালবেলা ঘুম ভাঙতে দেখি মেঘলা আকাশ থেকে ফুলঝুরির মতো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। দেখতে দেখতে ফর্সা হয়ে গেলো চারপাশ। ব্রেকফাস্ট সেরে একটু পরেই বেরিয়ে পড়লাম তাই। হোটেলের চারপাশের পরিবেশটি বেশ। অনেকগুলো পামগাছ লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে। পামঅলিভের ঝুরি নেমে প্রায় মাটি ছুঁয়ে রেখেছে। হোটেলের অফিস ম্যানেজার ইভান ক্যারন মানুষটি খুব সদালাপি। কাল রাতে পরিচয় হতেই বলেছিলেন–

তোমরা অনেক কিছুই এখানে দেখবে জানি! তবু একটা ইন্টারেস্টিং জায়গায় তোমাদের যেতে বলছি। গিয়ে দেখো, ভালো লাগবে।

সেটা কী? শুচির গলায় আগ্রহের ফুলঝুরি উড়েছিল।

কুয়র সেলিয়া মার্কেট! সপ্তাহের এক দিন সোমাবার, সেখানে ফ্লি মার্কেট বসে। ফ্রান্সের নগরসভ্যতার অনেক কিছুই তোমরা দেখেছো, ওখানে গিয়ে লোকজীবনের কিছুটা আভাস পাবে।

সেটা কি অনেক দূরে?

না না একেবারেই নয়। তোমরা কিসে যেতে চাও? ট্যাক্সিতে চাইলে আমি ফোন করে আনিয়ে দেবো। বাইরে থেকে যারাই এখানে আসেন, আমার পরিচিত দুই ট্যাক্সি ড্রাইভার বরাবরই তাদের সার্ভিস দেয়। কারণ এরা কিছুটা ইংরেজি বলতে পারে।

তাদের ডিম্যাণ্ড কি খুব বেশি?

ট্যাক্সির ভাড়া বেশি এখানে সেটা তো জানোই। বিশেষত অপরিচিত যারা, তারা মিটারটা বাড়িয়েই রাখে। তবে এরা তোমাদের সঙ্গে সে রকম কিছু করবে না! নিশ্চিন্ত থাকো! 

ইভান ক্যারনের সুপরিচিত ট্যাক্সি ড্রাইভার অলিভারের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিন বছর আগে নিসের সোফিয়া এ্যন্টিপোলিস ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্টে ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেছে। পড়াশুনো করতে ভালো লাগলেও সংসারজীবনে প্রয়োজনের তাগিদে বাঞ্ছিত ছাত্রজীবন ছাড়তে হয়েছে গ্রাজুয়েশনের পরেই। ইচ্ছে আছে এদিকটায় একটু গুছিয়ে নিয়েই আবার শিক্ষাজীবন আরম্ভ করা। তার কথা শুনতে শুনতে কখন যে ফ্লি মার্কেটে এসে পড়েছি খেয়াল ছিল না। অলিভার জিজ্ঞেস করলো-

তোমরা কি আমার ট্যাক্সিতেই এরপরে আর কোথাও যেতে চাও? তাহলে সময়টা বলো, আমি এসে যাবো। কারণ এখান থেকে ট্রেন পেতে গেলে অনেকটা হাঁটতে হবে।

ঘোষ অভ্যাসমতো হাতঘড়িতে চোখ ছোঁয়ালো-

কী বলো পাপান, আসতে বলে দিই?

হ্যাঁ বলো। স্টেশন এখান থেকে সত্যিই বেশ দূরে!

তুমি দুটোর দিকে চলে এসো অলিভার। আর এখান থেকেই আমাদের তুলে নিয়ো তাহলে।

জমজমাট হাট বসেছে পুরনো শহরের মূল কেন্দ্রে। আঠারো শতকের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই নাকি এই বিশাল বাজারের সমাবেশ। দুই পাশে নানা অফিস। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় লোকালয়। মাঝখানে ভারি প্লাস্টিকের ডোরাকাটা ত্রিপল দিয়ে তৈরী ছাউনির নিচে মহাসমারোহে হাটবাজার। কী নেই এখানে? ঔষধি থেকে বিচিত্র আচার। মধু থেকে মোমবাতি। কৃষকের বাগান থেকে সদ্য আসা টাটকা ফল। শাকসব্জী। সতেজ ফুল। ফুলের গাছ। ফার্নিচারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। জামাকাপড়। হস্তশিল্প। কড়া মূল্যের অ্যান্টিক জিনিষপত্র। কাঠের হাতি, বাঁদর, ঘোড়া, মানুষ, পুতুল। ট্রাভেল ব্যাগ, হ্যাণ্ডব্যাগ, পার্স, জুয়েলারি। সেকেণ্ড হ্যাণ্ড বইয়ের দোকান। বিপ্লবপূর্ব ফ্রান্সের ইতিহাস নিয়ে ম্যাগাজিন। আরও দূরে হরেক চেহারার সরাবপাত্র। পরিফিউম, কসমেটিকস। সি ফুড, এ্যাপিটাইজার, সরবত, পাস্তা। বিয়ার, ওয়াইন, হুয়িস্কি, ভোদকা। সর্বোপরি মহাহাটের দু’পাশে খোলা আকাশের নিচে টেবিল চেয়ার সাজিয়ে আহারপর্বের আয়োজন। 

ঘুরতে ঘুরতে চোখ পড়ছে রোদতপ্ত চেয়ারে বসে ছেলেবুড়ো, নারীপুরুষ ভোজনবিলাসে মত্ত ।খেতে খেতে অবিরাম কথা বলছে তারা। এলোমেলো খোলা হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে মাথার চুল। ইউরোপের এমন দৃশ্য উত্তর আমেরিকার কোনো প্রান্তে আছে কিনা জানা নেই। এই জীবন জোয়ারের অফুরন্ত আবেগ দেখতে দেখতে ফ্রান্সের লোকজীবনের পরশ সত্যিই যেন চিনিয়ে দিলো তার মেজাজটাকে। জ্যাজব্যাণ্ডের জমাট শব্দ কানে ভেসে এলো। উৎস আবিষ্কারের চেষ্টা করতেই দেখি, একটি উঁচু বিল্ডিং-এর সামনে অনেকগুলো মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট বাজিয়ে সুরের ঝর্ণা বইয়ে দিচ্ছেন একদল রোমান্টিক মানুষ। আর দুটি নধরদেহী তরুণী প্রস্ফুটিত ফুল হয়ে দুলে দুলে নাচছে তাদের সঙ্গে।

আকর্ষণে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নজরে এলো একটি তিন চার বছরের বালিকা মাথার সোনালি রঙের পোনি টেইল নাচিয়ে ক্যাণ্ডিবার খেতে খেতে বার বার চঞ্চল পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল এতক্ষণ। প্রতি পদক্ষেপেই ফুলে ফুলে উড়ছিল তার বাটারফ্লাই ছোট্ট ড্রেস। নিজের নিষ্পাপ উপস্থিতিতে পবিত্র হাওয়ার পরশ লাগাচ্ছিল সবখানে। হঠাৎ হাঁটা বন্ধ করে দুই তরুণীর সঙ্গে সেও নাচতে শুরু করলো উড়ন্ত প্রজাপতি হয়ে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুতগতি তীর হয়ে একটি আহবান ছুটে এলো তার দিকে-

এ্যানা, চলে এসো এদিকে! চলে এসো বলছি!

উচ্চারণ শুনে মুহূর্তেই স্পষ্ট হলো, এই নারী সরাসরি উত্তর আমেরিকা থেকেই আগত। চলবে...

দীপিকা ঘোষ । ওহাইয়ো, আমেরিকা