অটোয়া, মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
একদিন হারিয়ে যাব - আলম তৌহিদ

খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল আমার। এম্নিতে দেরি করে শয্যা ত্যাগের অভ্যাস। মাঝে মাঝে এরকম হয়। কাব্যলক্ষ্মি যখন এসে চুপিচুপি করোটির অভ্যন্তরে বসে থাকে, আমার ভেতরে একধরনের অস্থিরতা টের পাই। মনে হয় শব্দগুলো ভরতনাট্যমের মতো নৃত্যকলায় মেতে আছে। কখনো মনে হয় কোনো নারীকে অশরীরী কেউ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বনের ভেতর দিয়ে ছুটছে অসহায় নারীটি। পিছে পিছে আসছে দানব। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি আর নারীর সরু ফর্সা পায়ে নূপুরের রিনরিন শব্দ, একাকার হয়ে বনজুড়ে নেমে আসে অদ্ভুত মায়ার আবেশ। আমি কলম হাতে অস্থির হয়ে পড়ি। ঘোরের মধ্যে কতোকিছু লিখে ফেলি। একসময় ধীরে ধীরে অস্থিরতা কেটে যায়। তখন আমার করার মতো তেমন কিছু থাকে না। ঘুমও আসে না। 

ভোরে নিদ্রা ত্যাগের সুবিধাকে আমি কাজে লাগাই। ঊষার উদয় দেখার জন্য আমি ছাদে যাই। যামিনীর তারকা খচিত কালো চাদরে ঢাকা আকাশ তখন ফর্সা হতে শুরু করেছে। শিশির আর্দ্র বাতাস গায়ে এসে লাগে। প্রতিবেশী কবিতাদের শিরীষ বৃক্ষ থেকে বিহঙ্গের কাকলী ভেসে আসে। দূরে কোথাও দুই তিনবার মোরগ ডাকল। মনে হলো চামেলিদের ঘর থেকে। হতে পারে মহুয়া মাসীদের ঘর থেকে। সদ্য স্নান শেষ করে পুকুর থেকে ভেজা বসনে উঠে আসা নারীর মতো ভিজে আছে গাছের পাতা। গাছের পাতা ছুইয়ে ফোটা ফোটা শিশির ঝরে পড়ছে ভূমিতে। আমি কান পেতে শিশির পতনের শব্দ শুনার চেষ্টা করি। ইচ্ছে জাগে কুড়িয়ে কুড়িয়ে শিশির জমা করি। আমার তো সঞ্চয় করার মতো আর কিছু নেই। কিন্তু ঊষাদেবী যখন ধীরে ধীরে নচিকেতার রূপ নেয়, তখন আমি আর শিশিরের অস্থিত্ব খুঁজে পাই না। এক মোহাবিষ্ট জগৎ থেকে আমার পতন হতে থাকে। আমি যেন পেয়েও কিছু পাই না। সব মেঘ থেকে কি বৃষ্টির প্রত্যাশা করা যায় ?  

কবিতা তুমি আমার কাছে শিশিরের মতো। আমার মন তোমাকে চায়, আবার চায় না। চাওয়া না চাওয়ার মধ্যে তোমার চাওয়াটার গুরুত্ব প্রসূনের মতো বিকশিত হলো না আমার হৃদয়ে। আমি তোমাকে বোঝি, আবার বোঝি না। বোঝা না বোঝার খেলায় কতটা বছর পার হয়ে গেল। চূড়ান্তভাবে আমার মন কোনো সিদ্ধান্তে আসে না। তুমি রয়ে গেলে অমীমাংসিত।   

আমাদের ঘরে তোমার আসা-যাওয়া, গল্প করা, কখনো নদীর নতুন জেগে উঠা সিকস্তি ধরে মাইলের পর মাইল হাঁটা; সবকিছু প্রদোষের ন্যায় ম্লান হয়ে আসে যখন মনে পড়ে তুমি আমার কবিতা পড় না। এমন কি কোনো কবিতা তোমাকে আকর্ষণ করে না। তুমি এমন কবিতা বিমুখ তা আমি পূর্বে বোঝতে পারি নি। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ তুমি না পড়ার আগেই কীটে কেটে ফেলেছে বলে টাট্টা করেছিলে। আমি খুব আহত হয়েছিলাম। আমি যাকে ভালোবাসব সে যদি কবিতার কাছাকাছি না থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসার কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। যে নারী কবিতা ভালোবাসে না তার হৃদয়ে সত্যিকার  প্রেম থাকে না। তোমার প্রেমের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমি সন্দিগ্ধ। তারপরও তুমি যখন আস তোমার সান্নিধ্য আমি উপেক্ষাও করতে পারি না। মানুষের মন কতো বিচিত্র। মন তো কতো কথা বলে। জানো, এভাবে কতবার শান্তনা খুঁজেছি। 

মনে আছে একবার আমরা নদীর ধারে একটা উঁচু জায়গায় বসেছিলাম। অনেকগুলো সাকুন্দা গাছ ছিল সেখানে। থোকা থোকা সাদা সাকুন্দা ফুলের উপর পতঙ্গের উড়াউড়ি দেখে তুমি মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলে। আমার ইচ্ছে হলো তোমার একটা আঙুল ছুঁতে। অবচেতন মনে আমি তোমার তর্জনী ধরে বসে আছি। তুমি কিছু বললে না। আগের মতোই সাকুন্দা ফুলের প্রতি নিবেশিত হয়ে আছো। আমি দেখি তোমার সাদা নখে তিলপুষ্পের মতো ফুল ফুটেছে। ছোটবেলায় আমরা মনে করতাম নখে ফুল ফুটলে নতুন জামা পাওয়া যায়। আমি তোমাকে বললাম, কবিতা তুমি নতুন জামা পেতে যাচ্ছ। তুমি বোঝতে না পেরে বললে- মানে ! 
আমি হাসতে হাসতে বললাম-তোমার নখে ফুল ফুটেছে। 
তুমি হো হো করে হেসে উঠলে। বললে-এখন কেউ আর জামা দেয় না। ছোটবেলাটা অনেক ভাল ছিল। তখন অনেক জামা পেতাম। 
এইসব টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলোও আমার মনে স্থায়ী কোনো দাগ বসাতে পারে না। আমি যেমন ছিলাম তেমন থাকি। আমার ভেতর জোয়ার-ভাটার মতো কোনো পরিবর্তন আসে না। 

আমরা সমবয়সী। প্রতিবেশী বলে পুতুলের বিয়ে, চড়ুইভাতি আরও কতো খেলাধুলা করে আমরা বেড়ে উঠেছি। তবে আমাদের ইস্কুল ছিল আলাদা। কবিতা পড়তো শহরের শেষপ্রান্তে মিশনারিদের ইস্কুলে। আমরা বলি খ্রিষ্টানদের ইস্কুল। আমাদের পরিবার রক্ষণশীল। বিধর্মীদের ইস্কুলে পড়ার চিন্তা করাও পাপ। ছোটবেলা থেকেই অনেককে বলতে শুনেছি ওদের ইস্কুলে পড়লে একদিন না একদিন খ্রিষ্টান হয়ে যেতে হয়। এই জাতীয় ভয় ছোটবেলা থেকেই আমার মনে জন্ম নিয়েছিল। তাছাড়া কবিতাদের পরিবার তো আমার কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তাদের পরিবারও হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। কবিতার বাবার ছিল কাপড়ের ব্যবসা। ভাল আয়-রোজগার হতো। কবিতা যখন ক্লাস টুতে পড়ে তখনো তারা হিন্দু ছিল। তাদের পুজোর ঘরে রাঁধা-কৃষ্ণের যুগল ছবি ছিল। কৃষ্ণের হাতে থাকত বাঁশি আর রাঁধার পরনে রানীর পোশাক। এই ছবির পাশে আরও একটি ছবি ছিল। সেটি সিদ্দিদাতা গণেশের। ক্লাস টুতে পড়াকালীন আমি একবার কবিতার দেখাদেখি গণেশের ছবিকে প্রণাম করেছিলাম। পাড়ায় দুষ্ট লোকের অভাব ছিল না। কথাটা আমার বাবার কানে কে তুলেছিল জানিনা। 

বাবা আমাকে বেত দিয়ে এমন মার দিয়েছিল, তখন আমার মনে হয়েছে বাবার মতো নিষ্ঠুর লোক পৃথিবীতে আর একটিও নেই। 

কবিতা ক্লাস থ্রিতে উঠল। তখন দেখতাম সাদা পোশাক পরা ফাদার তাদের বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াত করত। একদিন শুনি তারা স্বপরিবারে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। এরপর কবিতাদের বাসায় গিয়ে দেখি রাঁধা-কৃষ্ণের ছবির জায়গায় স্থান পেয়েছে মেরীর কোলে শিশুপুত্র যীশুর ছবি এবং গণেশের ছবির জায়গায় ক্রুশবিদ্ধ যীশুর ছবি। এরপর থেকে প্রতি রোববারে কবিতাদের পরিবার চলে যেত চার্চে। ওখানে তারা বাইবেল পাঠ করত। কবিতার নামও কিছুটা বদলে গেল। কবিতা গুপ্তা হয়ে গেল কবিতা খ্রিষ্টিনা।   

বাবার ইচ্ছা ছিল আমাকে মক্তবে পড়াবে। কোরআনে হাফেজ কিংবা মৌলভি টাইপের কিছু একটা বানাবে। দ্বিনের শিক্ষা ছাড়া অন্যকোনো শিক্ষার গুরুত্ব তার কাছে নেই। তিনি বলেন, ওসব বেদ্বিনদের শিক্ষা। ইহ জীবনে দ্বিনের আলো জ্বালাতে না পারলে পরকালে নাজাত পাওয়া যাবে না। আমাদের পরিবারে অনেক সমস্যা লেগে থাকত। পরকালে মুক্তির আশায় সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত থাকতেন। মাকে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হতো। তাই মায়ের জেদের কারণে আমার আর মক্তবে পড়া হয়নি। মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলেকে ডাক্তার বানাবে। না, আমাকে দিয়ে ওসব কিচ্ছু হলো না। আমি উভয়কে দারুণভাবে হতাশ করেছি। পারি নি জ্বালাতে দ্বিনের আলো। বৈদ্য-কবিরাজেও আমার মন মঝলো না। আমি তো চেয়েছি কেবল মানুষের মনের আলো জ্বালাতে।  

ধর্ম সম্পর্কে আমি আগের মতোই উদাসীন। যেখানে ইহকালেই মানুষের হাজার সমস্যা থেকে পরিত্রাণ মিলে না, সেখানে পারত্রিক কালে অকল্পনীয় আমোদ-ফুর্তির জীবন আমাকে টানে না। কথাটা কবিতাকে বলতেই সে জিবে কামড় দিয়েছিল। চোখ দুটো পাখির ডিমের মতো গোল হয়েছিল তার। সে বলল-পরকালে প্রত্যেক আত্মাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, কথাটা বাইবেলে আছে। 
আমি জানি। ভূত-পেত্নী-প্রেতাত্মা তাদেরও কি শাস্তি পেতে হবে ? প্রশ্নটা করতেই কবিতা উত্তর দিল-জানি না। 
মানুষকে ভয় দেখানোর অপরাধে তাদের শাস্তি দেয়া উচিৎ। তুমি কী মনে কর ? 

কবিতা ঈষৎ হাসল। শীতল জোছনার মতো হাসি। কেবল মায়া ছড়ায়, প্রলুদ্ধ করে না। সে কথাকে আর দীর্ঘায়িত করেনি। স্বভাবে স্বল্পভাষী। পা দুটো ভাঁজ করে বসেছিল আমার বিছানার উপর। কথার ধুমে তার শাড়ীর আঁচল বুকের উপর থেকে অনেকখানি ঝুলে পড়েছে। কাস্তের ন্যায় ব্লাউজের গলার ফাঁক থেকে পাখির ছানার মতো কমনীয় স্তনের অংশবিশেষ উঁকি দিচ্ছিল। যেন এখনো উড়াল শিখেনি। আমি পুরুষ। না তাকিয়ে পারিনি। এই জায়গায় এসে মহাপুরুষও আত্মসমর্পণ করেছে নারীর কাছে। আমি কবি। প্রেমিকও বটে। সত্যিকারের প্রেমিক বীর্যকে সংযত করবে। এটাই প্রেমিকের ধর্ম হওয়া উচিৎ। অথচ সেদিন নদীরধারে উম্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে আমার ইচ্ছে হয়েছিল তার একটা আঙুল ছুঁতে। আজ অনুরূপ কোনো ইচ্ছা জেগে উঠল না বলে আমি খুব বিস্মিত হলাম। কবিতার নীরব আহবান আমি বুঝি। বডিল্যাংগুয়েজ থেকে অনেক কিছু জানা যায়। সে চায় তাকে বাহুডোরে বেঁধে রাখি। পুষ্পকোমল বুকে নাক ঘষি। ওষ্ঠপুটে এঁকে দিই আমার পুরুষ্ট ঠোঁটের চুম্বন। অতদূর যাওয়ার অভিরুচি আমার কোনোদিন হয়নি। আমি তো তাকে চেয়েছি আমার কবিতায়। শব্দে-উপমায়-রূপকে-অলংকারের মাধুরী মিশিয়ে আমি প্রতিদিন তাকে সাজাতে থাকি। সে হয়ে উঠে আমার কাছে কবিতানন্দিনী। 

একদিন কবিতাকে বলেছি নীল শাড়ীটা পড়ে এসো। কোনো প্রশ্ন করেনি সে। যেন শর্তহীন আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত। বিকেলের খয়েরি রোদ মাড়িয়ে সে এলো আমাদের বাড়িতে। শাড়ীর সাথে মানিয়ে কপালে পরেছে নীলটিপ। মনে হলো নীলটিপ থেকে বের হচ্ছে অপূর্ব এক দ্যুতি। তার সারা মুখমণ্ডল জুড়ে ছড়িয়ে আছে সেই আভা। এই মুহূর্তে তার মুখ যেন পুকুরে ভাসমান শ্বেত মৃনাল যেখানে আপন মনে খেলছে চতুর্দশীর পূর্ণিমা। কবিতা মুখ টিপে হাসল। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হলে মানুষ যেভাবে হাসে। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কেবল আছে স্নিগ্ধ-সজীবতা। কবিতা বলল-কোথাও যাবে নিশ্চয়। নতুন কোনো পাগলামি----? আমি মাথা দুলিয়ে হাসলাম। 

আমরা রিক্সা নিলাম। যেখানে যেতে চাই শহর থেকে দূরে। একদম শেষ প্রান্তে। জীবনের খুঁটিনাটি আলাপ করতে করতে আমরা শহরের শেষ পাদদেশে এসে উপস্থিত হয়েছি। রিক্সা যাওয়ার মতো আর রাস্তা নেই। হাঁটাপথে আমাদের আরও কিছুদূর যেতে হবে। কিছু ঝোপঝাড় ও কয়েকটি ছোট টিলা পেরিয়ে আমরা একটা মাঠের মতো জায়গায় এসে উপস্থিত হলাম। মাঠের এক পাশ দিয়ে একটা গোরুর গাড়ি যেতে দেখলাম। মাঠ পেরিয়ে আমরা পেয়ে গেলাম একটা মাঝারি আকারের দিঘি। দিঘির চতুর্পার জুড়ে ঘন গাছ-গাছালিতে ভরা। বাইর থেকে বুঝার উপায় নেই এখানে একটা দিঘি আছে। আমরা বকুল গাছটার নিচে এসে বসলাম। শেষ বিকেলের হরিদ্রাভ জলে গাছ-গাছালির ঘন ছায়া পড়েছে। দিঘির কিছু দূরে সারিবাঁধা পাহাড়। পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে ধানক্ষেত। জায়গাটা বেশ নির্জন। দিঘির জলে একঝাঁক হাস খাবারের সন্ধানে এদিক ওদিক ঘুরছে। মাঝে মাঝে হাঁসেরা ভেক ভেক করে ডাকছে। হাঁসের ডাক ও পাখির কলকাকলী ছাড়া শহরের কোনো প্রকার উত্তাপ এখনো এখানে প্রবেশ করেনি। বলা যায় ছবির মতন সাজানো প্রকৃতি। আমি এখানে আগেও কয়েকবার এসেছি। কবিতাকে নিয়ে এই প্রথমবার। নির্জনতার মধ্যে এক প্রকার প্রেরণাদায়ক শক্তি থাকে। এখানে এসে প্রতি নিঃশ্বাসে আমি সেটিই আহরণ করি। শহরের কোলাহলে তা কোনোভাবেই পাওয়া যায় না। 

বাহ্‌ ! বেশ চমৎকার ! কবিতা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আগে তো কখনও বলনি এরকম নিরিবিলি জায়গার সন্ধান তুমি জান। সত্যি আমার বেশ ভালো লাগছে ! ইচ্ছে করছে হারিয়ে যায়। সত্যি একদিন আমি হারিয়ে যাব। 

জায়গাটা এতদিন আমার ছিল। একান্ত আমার। আজ তোমার সাথে শেয়ার করলাম। জান, কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম একটা কবিতা লিখব। গেল রাতে হঠাৎ লিখে ফেললাম। আমার ইচ্ছে হলো কবিতাটি আবৃত্তি করে তোমাকে শুনাব। তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। 
কবিতা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। কিছু বলতে চাইছে, আবার বলছে না এরকম একটা ভাব ধরে থাকল। এরকম পরিস্থিতিতে প্রশ্নকর্তাকে অপ্রস্তুত হতে হয়। আমি ওভারলুক করলাম। খুব স্বাভাবিকভাবে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে কবিতাখানা বের করে পাঠ শুরু করি। পাঠ শেষ হলে কবিতা কোনো মন্তব্য করল না। কেন জানি আমার নিজেকে বেহায়া বেহায়া লাগছে। কবিরা কি এরকম হয় ! 
কবিতা কথা বলল। দেখ, কবিতা ছাড়া মানুষের জীবনে আরও অনেক বিষয় আছে। 
আমাদের সমাজে-রাষ্ট্রে হাজার সমস্যা। মানুষের কষ্টগুলো কী তুমি ছুঁতে পার ? কবিতা দিয়ে যে জীবন চলে না এই উপলব্ধি তোমার কোনদিন হবে না। তুমি থাকো তোমার জগতে। আমি জানি আমার সঙ্গ তোমার প্রয়োজন। এর বেশি কিছু তুমি ভাবতে পার না।
হঠাৎ করেই যেন দৃশ্যপট বদলে গেল। দিঘির হরিদ্রাভ জলে নেমে এলো কালো অন্ধকার। পাখির কাকলীকে মনে হলো  অনর্থক চেঁচামেচি। কবিতার কপালের নীলটিপে নেমে এসেছে মেঘের ছায়া। সন্ধ্যার বিষণ্ণতা ঢেকে দিয়েছে তার কান্তিময় মুখ। নিজেকে মনে হলো অনিকেত মেঘ। আমি উড়ে যাচ্ছি অনন্ত আকাশের দিকে।    

এই ঘটনার পর আরও একটা বছর কেটে গেল। তেল ছাড়া যেমন সেঁজুতি জ্বালিয়ে রাখা যায় না, তেম্নি কবিতাকেও আর ধরে রাখা গেল না। দেরিতে হলেও কবিতা বুঝে গিয়েছিল আমি 'চলো ঘর বাঁধি' টাইপের প্রেমিক নই। আমার বন্ধুসুলব সান্নিধ্যে হয়তো তার মনোযন্ত্রণা বৃদ্ধি হচ্ছিল। তাই আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেল। সে তো প্রায় বলতো একদিন আমি হারিয়ে যাব। আমি কথাটা কখনো সিরিয়াস ভাবে নিই নাই। এখন তার অভাব খুব পীড়া দিচ্ছে। ক্রমে মেঘাচ্ছন্ন হচ্ছে আমার আকাশ। সুলভে প্রাপ্ত দ্রব্যের গুরুত্ব যে খুব বেশি থাকে না ; কবিতার অনুপস্থিতিতে তাই প্রবলভাবে অনুভূত হতে লাগল আমার হৃদয়ে। 
কবিতা নিরুদ্দেশ। কেউ কিছু বুঝতে পারল না হঠাৎ সে ওরকম একটি কান্ড করবে। অনেক খোঁজাখুঁজির  পরও তার কোনো হদিস পাওয়া গেল না। এই ঘটনার পর তার বাবা অসম্ভব রকমের গম্ভীর হয়ে গেলেন। পরিচিত জনদের এড়িয়ে চলেন। করো সঙ্গে কথা বলেন না। মাথা নিচু করে চলেন। যে মুখে মেয়ে চুনকালি দিয়েছে, সেই মুখ নিয়ে মাথা উঁচু করে রাখা যায় না। পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেক বাঁকাকথা তিনি শুনতে পান। কিন্তু সেইসবের প্রতিবাদ করার মতো শক্তি তার নেই। তিনি সকালে বেরিয়ে ব্যবসার গদিতে গিয়ে বসেন, একেবারে রাত্রে ঘরে ফিরে আসেন। 

মাসী সারাদিন ঘরে একা থাকেন। মেয়ের জন্য চোখের জল ফেলতে ফেলতে তার চোখে এখন খরা। কবিতার অন্তর্ধানের পর আমি আজ প্রথম তাদের ঘরে এলাম। মাসীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। মাসী ধূসর চোখ তুলে তাকালেন। কোনো কথা বললেন না। আমিও নির্বাক হয়ে আছি। কি বলা উচিৎ তা স্থির করতে পারছিলাম না। এই মুহূর্তে আমরা দু'জন যেন প্রাগৈতিহাসিক কোনো নগরীর ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা দু'টি প্রত্ন। আমাদের দেহ আছে প্রাণ নেই। যেন দুটি ফসিল ডুবে আছে বাকহীন যন্ত্রণার উত্তাপে। 

এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল। মাসী শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললেন। খুব শীতল। মনে হলো বুকের গভীরে অনেক মেঘ জমে আছে। ধীরে ধীরে মাসীর চোখ ডুবে গেল জলে। তুঁষের আগুন যেমন নিরবে জ্বলে ছাই হয়ে যায়, তেম্নি নীরব কান্নাও তিলে তিলে পোড়াতে থাকে। এইসময়ে আপনজন কেউ কাছে না থাকলে ঘনীভূত শোক আরও বাড়তে থাকে। মাসীর অবস্থা হয়েছে অনুরূপ। একাকিত্ব শোককে আরও উসকে দিচ্ছে। 

পুরুষদের চোখ জলের সহজ প্রস্রবণ নেই। শেষ কবে কেঁদেছিলাম মনে পড়ে না। দীর্ঘকাল যাবৎ আমার চোখ নির্জল। এখন টের পাচ্ছি আমার চোখ আর্দ্রতায় সিক্ত হচ্ছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। মাসীকে মনে হচ্ছে শ্বেতপাথরের প্রতিমার মতো। কেবল তার চোখ দুটো জলে ভাসছে। এখন তার একটা অবলম্বন দরকার যা তার শোকের ভার কিছুটা হলেও হাল্কা করবে। আমি মাসীর আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। মাসী আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। যেন কোন শোকাভিভূতা মা তার হারানো সন্তান ফিরে পেয়েছে।     

আলম তৌহিদ । বাংলাদেশ 
লেখক- কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার  
মেইল- alamcxb053@gmail.com