অটোয়া, বুধবার ৮ এপ্রিল, ২০২০
রেড রিভারের তীরে – চিরঞ্জীব সরকার

০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উজবেক এয়ারওয়েজে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ থেকে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে আসি চাকুরী সুবাদে। তাসখন্দ এয়ারপোর্ট থেকে প্রথমে হো চি মিন সিটি, সেখান থেকে কিছুটা বিরতির পর হ্যানয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা। হ্যানয় পৌঁছতে রাত হয়ে গেল। নই বাই এয়ারপোর্টে আমাদের রিসিভ করতে এল দূতাবাসের প্রটোকল সহকারী নুয়েন দুই তিয়েন। বিমানবন্দর থেকে মিঃ তিয়েন লিং লাং এরিয়ার একটি হোটেলে আমাদের উঠাল। ২০০১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ দূতাবাস তাসখন্দে তৃতীয় সচিব হিসাবে যোগ দেই। প্রায় তিনবছর তিন মাস ওখানে ছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই বিদায়ের সময় মনটি পড়ে ছিল তাসখন্দের নীলাকাশ ও সবুজ গাছগাছালির ভিতর।

ভিয়েতনামে অবতরণ করে ভিতরে ভিতরে কেমন যেন রোমাঞ্চ লাগছিল। ভিয়েতনামের নাম অনেক শুনেছি। দেশটি যেন একটি আদর্শ। বিশেষকরে ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত সেই অকুতোভয় যোদ্ধাদের কথা যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত অমিতশক্তিধর একটি দেশকে সামরিক যুদ্ধে পরাজিত করেছিল। মার্কিনীরা ণাপাম বোমা মেরে ভিয়েতনামীদের পুড়িয়েছে, জ্বালিয়েছে কিন্তু তাদের মাথা নোয়াতে পারেনি। হোচিমিন ও তার আদর্শের সৈনিকদের হাতে সেদিন পরাভূত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা এজেন্ট অরেঞ্জ ছড়িয়েছে, নির্বিচারে বোমা নিক্ষেপ করেছে কিন্তু ভিয়েতনামীদের পায়ে শিকল পড়াতে পারেনি। এমনি সে ভিয়েতনাম নামক দেশটিতে পদার্পন করলে যে কারো একটু অন্য রকম অনুভূতি হতে পারে। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। রাস্তায় নেমেই দেখি মটরসাইকেলের সারি। অগনিত মটরসাইকেল পিঁপড়ের মত ছুটছে। বুঝতে বাকি রইল না আমি এসেছি মটরসাইকেলের দেশে। 

আমি ভিয়েতনামে প্রথম সচিব জনাব লুৎফর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হই। জনাব রহমান বদলী হয়ে যাচ্ছে করাচীতে বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনে। আবার ভিয়েতনাম থেকে অ্যামবাসেডর আশরাফউদ্দৌলা স্যার হাইকমিশনার হয়ে অষ্ট্রেলিয়াতে যাচ্ছে। তাই হ্যানয়ে এসেই কিছুটা ব্যস্ততার ভিতর পড়ে যাই। আমাদের দূতাবাস তখন ছিল দাইয়ূ কম্পানীর তৈরী দেহা নামক বিশাল বানিজ্যিক ভবনের একটি ফ্লোরে। অফিসের জানালার কাঁচের ভিতর থেকে নীচের চলমান রাস্তার মানুষের চঞ্চল পদচারনা প্রত্যক্ষ করা যায়। সামনের ফুটপাতে গাছের ছায়ায় কয়েকটি সিকলো দেয়া যেত। সিকলো হল বাংলাদেশের রিকশার এক ধরনের সংস্করণ। তবে একটু পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে রিকশাচালক সামনে ও পিছনের উঁচু আসনে যাত্রী বসে। কিন্তু সিকলোর ক্ষেত্রে ম্যাথমেটিকস ভিন্ন। যাত্রী সামনের ঢালু নীচের আসনে এবং চালক কিছুটা উঁচুতে পিছনের আসনে। তবে ভিয়েতনামে সিকলোর সংখ্যা খুব একটা বেশী না। যারা টুরিস্ট হিসাবে এদেশে ঘুরতে আসে মূলতঃ তারাই এর প্যাসেঞ্জার। আমরাও প্রথম প্রথম এসে কয়েকবার একটি সিকলোতে উঠেছি। সিকলোচালকটি আমাদের পরিচিত হয়ে উঠেছিল। বিকেলবেলা অফিসের সামনে থেকে উঠিয়ে লেকের পাশ থেকে ঘুরিয়ে দাও তান স্ট্রীটের বাসায় পৌঁছে দিত।

ভিয়েতনামের বাসাগুলি টিউব টাইপ, ভার্টিকাল। জমি যাতে নষ্ট হতে না পারে সে জন্যই এ ব্যবস্থা। যদিও বিষয়টি একটু একটু করে শিথিল হচ্ছে তারপরও এ দেশের বৃহদাংশে দেখা মেলে এ টিউব টাইপ বাড়িগুলির। ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের ব্যাপারে কত আগে থেকেই সচেতন ছিল। গ্রাম কিংবা শহরে কোথাও ইচ্ছেখুশি মত কেউ বাড়ি বানাতে পারবে না। এমনকি শহরের দুটো বাড়ির মাঝখানে দেয়াল তুলে জমি নষ্ট করা যাবে না। বাড়ি তৈরীর সময় প্রস্থস্তার দিক থেকেও বিধিনিষেধ ছিল। এর সুফল ভিয়েতনাম এখন ভোগ করছে। আমাদের দেশে প্রতিবছর বসতবাড়ি, কলকারখানা, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরীতে এক পার্সেন্ট হারে জমি কমে যাচ্ছে। অথচ জনসংখ্যা ক্রমশঃই ঊর্দ্ধগতিতে ধাবিত হচ্ছে। বাড়তি জনসংখ্যার আবাসন সমস্যা মিটাতে নিয়মনীতি না মেনেই অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। দালান ধ্বসে মৃত্যুও হচ্ছে। এর উপর রয়েছে ভূমিকম্পের মত আতংক। আমাদের সবার আর দেরি না করে এখনি এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।



ভিয়েতনাম দেশটি সর্পিলাকার। একটি লম্বা সাপের মত সাউথ চায়না সি ঘেষে দেশটি অবস্থিত। ভিয়েতনামের সমূদ্র ঘেষে তাই অনেক সুন্দর সুন্দর শহর তৈরী হয়েছে। হ্যানয়কে প্রশাসনিক রাজধানী ধরলে হো চি মিন সিটি হবে তাদের বানিজ্যিক রাজধানী। আমি যে সময়টাতে ভিয়েতনামে থেকেছিলাম (সেপ্টেম্বর ২০০৪-সেপ্টেম্বর ২০০৭)সে সময় দেশটির অর্থনীতি খুবই উদীয়মান ছিল। প্রচুর এফডিআই (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) অর্থনীতিতে বেশ গতি সঞ্চার করেছিল। আমেরিকা, জাপান, কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের কারনে ভিয়েতনামের অর্থনীতি তখন খুবই রমরমা। অবস্থাশালী ভিয়েতনামীরা মোটরসাইকেল ছেড়ে প্রাইভেট কারের সান্নিধ্য নিচ্ছিল। টিউববাড়ী ছেড়ে সুপরিসর প্রসস্ত বাড়ীতে আবাস গড়ছিল। সরকারও ভোগবাদের এ বাস্তবতাকে অনুধাবন করে সংশ্লিস্ট আইন কানুন শিথিল করেছে। অনেকটা চীনের দেন জিয়াও পিং এর মুক্ত নীতির মত। চীনের সে নীতি দেশটিকে আজ আমেরিকার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত করেছে। আর ভিয়েতনাম দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এক সমৃদ্ধ অর্থনীতির সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশ ভাল অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছে। 

ভিয়েতনামের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হ্যালং বে। সাউথ চায়না সী-এর ভিতর একগুচ্ছ দ্বীপমালা নিয়ে হ্যালং বে। ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জগুলি নানান সাইজের ও নানান আকৃতির। আমাদের দেশের লঞ্চের মত বোট ভাড়া করে দ্বীপগুলিতে ঘুরতে হয়। আবহাওয়া ভাল থাকলে হ্যালং বে দেখতে অসম্ভব ভাল লাগে। বোটগুলিতে খাবারের ব্যবস্থাও আছে। আমাদের দেশে যেমন ঢাকার সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলিতে রাতে যেরকম অর্ডার দিয়ে খাবার নেয়া যায় হ্যালং বের বোটগুলিতে খাবারের এরকম ব্যবস্থা আছে। বোট আপনাকে দ্বীপগুলির পাশ থেকে ঘুরিয়ে আনবে। সমুদ্রের স্বচ্ছ হাওয়ায় দ্রুত ক্ষুধা অনুভূত হবে এবং রেডি থাকবে সামুদ্রিক মাছ ও সবুজ সবজির সাথে সাদা ভাত। সমুদ্রে ছোট ছোট বোটে ভিয়েতনামীজ মহিলারা প্রচুর স্থানীয় ফল নিয়ে পসরা সাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ইচ্ছে করলে আপনি এ ফ্রেশ ফল দিয়ে আহার শেষ করতে পারেন।

হ্যালং বের একটা দ্বীপে বিশাল এক গুহা আছে। গুহাটির দেয়াল থেকে চুয়ে চুয়ে এখনও পানি পড়ে। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য জেনারেটর দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশাল জলরাশির আঘাত সময়ের ব্যবধানে প্রস্তরকেও যে একটু একটু গলিয়ে দিতে পারে তা এখানে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করা যায়। ভিয়েতনামে থাকতে আমরা ওখানে কয়েকবার গিয়েছি। একবার গিয়েছি মিঃ সুবিনয় নন্দী ও সানজু ভাইয়ের পরিবারের সাথে। সুবিনয় নন্দী দাদা তখন ইউএনডিপিতে কাজ করতেন। উনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর ভাই। সুবিনয়দাও ভাল গান করে। বিশেষ করে এ গানটি ‘বধুয়া তোমার চোখে জল এসেছে বিনা কারনে’। যেকোন ঘরোয়া আসরে আমরা সবাই দাদাকে এ গানটা গাইতে অনুরোধ করতাম। দাদার একমাত্র ছেলে রায়য়ান ও আমার মেয়ে ফিজি হ্যানয়ের মনিংস্টার স্কুলে পড়ত। সুবিনয়দা এখন আমেরিকাতে থাকে। সানজু ভাইয়ের স্ত্রী সুমী ভাবিও ভাল গান গায়। সানজু ভাই তখন হ্যানয় শেরাটনে চাকুরী করতেন। সুমী ভাবি ও সানজু ভাই যৌথভাবে গানের অ্যালবামও বের করেছেন। সানজু ভাইর প্রিয় গান ‘তুমি যে আমার কবিতা’।

ভিয়েতনামে থাকতে আরও কয়েকটি বাঙালী পরিবারের সাথে মেলামেশা হত। এর একজন হল রহমান সাহেব। হ্যানয় সফিটেল হোটেলের ফিন্যানসিয়াল কন্ট্রোলার ছিলেন। ওনার দুমেয়ে নিয়ে সংসার। এক মেয়ে ঢাকায় বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে হেভেন বাবা মার সাথে হ্যানয়ে থেকে পড়াশোনা করত। উনি ভিয়েতনাম থেকে চীনে বদলী হয়ে গিয়েছেন। অক্সফ্যামে চাকুরীরত প্রভাসদার পরিবার এখন লাওসে আছে। স্ত্রী মনোরমা বৌদী ও পার্থ, প্রতীতি এ দুসন্তান নিয়ে ওনার পরিবার। ওনারা পরিবারের সবাই মিলে খুব হাঁটত। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই ভাল লাগত। মনোরমা বৌদী পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বেশ শুচিবাতিকগ্রস্ত বলা চলে। উনি বাইরে থেকে এলে জুতাও ধৌত করতেন। গাজীপুরের আলী সাহেব ভিয়েতনামী মেয়ে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে ওখানেই থাকছেন। হ্যানয়ের উপকন্ঠে রেড রিভারের উপরের পুরানো ব্রীজ ক্রস করে সামান্য একটু পথ গেলেই ওনার বাসা ছিল। উনি জার্মান মালিকাধীন একটি গার্মেন্টস কোম্পানীর কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। অমায়িক মানুষ। ফ্যাক্টরীর যে শার্ট, টিশার্টগুলি কোয়ালিটি চেকে রিজেক্ট হত উনি তা হ্যানয়ের বাঙালীদের মাঝে বিতরণ করে দিত। ওখানকার বাঙালীদের আলী সাহেবের বদান্যতায় আর জামা-কাপড় কিনতে হত না। গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম কলেজের কাছে উনি সুন্দর একটি বাড়ী বানিয়েছে। আমরা যখন ঢাকায় তখন একদিন ওনার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তিনতলাতে বিশাল একটি ব্যালকনি করেছে। এছাড়া ওখানে কিবরিয়া সাহেব নামে আরেক বাংলাদেশীও ভিয়েতনামিজ মেয়ে বিয়ে করেছেন। 

ভিয়েতনাম ফলের দেশ। নানান রকমের ফলে ভরপুর দেশটি, দামও সহনশীল। আম, লিচু, কাঠাল, লংগান, ম্যাংগোস্টিন, ডুরিয়ান, কমলা, আংগুর, আতা, কলা কি নাই ওখানে। ফলগাছে পাখি বা বাদুরের তেমন কোন উপদ্রপ নেই। আমাদের অফিসের মেসেঞ্জার মিঃ ফং-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে যা উত্তর দিল তাতে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। সে বলল ভিয়েতনামীরা নাকি এমনি এমনি পাখি শিকার করে ফেলে শুধুমাত্র আনন্দের জন্য। কিছুটা হতাশ হলেও হতবাক হয়নি। অনেক ভাল দিকের মাঝেও কিছু কিছু ব্যাপারে তারা বেশ বেপরোয়া, কোন কিছুই যেন মানে না। যেমন তাদের মটর সাইকেল আরোহীদের হেলমেট পড়ানো বেশ কষ্টসাধ্য। অনেক আইন কানুন করেও তাদের মাথায় সহজে হেলমেট উঠানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন অনেক মানুষ মটর সাইকেল দূর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে, তবুও তারা কেন জানি নির্বিকার। হয়ত অনেকগুলি যুদ্ধ করে মৃত্যুর সাথে দীর্ঘদীন সহঅবস্থান করে এটাকে তারা স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে মেনে নিয়েছে। 

ভিয়েতনামের বাজারে আমাদের দেশের ইলিশ ও অন্যান্য কয়েকটি মাছ ছাড়া মোটামুটি সকল মাছই পাওয়া যায়। শাকসবজীরও সমাহার প্রচুর। ওদের প্রিয় খাবার রাইস নুডলস ও শাকসবজীর সাথে মাংসের কিমা বা টুকরো। চীনাদের মত চপস্টীক দিয়ে তাঁরা আহার করে। তাদের প্রিয় মাংস পর্ক। সাথে অবশ্যই থাকবে গ্রীনটি। কড়া কষ স্বাদের এ চা। আমাদের মত দুধ চিনি দিয়ে চা খেতে তারা তেমনটা অভ্যস্ত নহে। যদিও আজকাল তাদের আধুনিক মানের রেস্তোরাতে ব্লাকটি ব্যাগের দেখা মেলে। এছাড়াও ভিয়েতনামীরা প্রচুর কফি পান করে। মূলতঃ তারা আইস কফিতে অভ্যস্ত। গরম কফির কাপে বরফের খন্ড বা আইস কিউব ডুবিয়ে দেয়া হয়। আমাদের দূতাবাসের প্রটোকল অ্যাসিস্ট্যান্ট মিঃ নুয়েন দুই তিয়েনের সাথে আমার আইস কফি খাবার অনেক সুখস্মৃতি আছে। বিশেষ করে দেশ থেকে যখন কোন সরকারী প্রতিনিধিদল আসত তখন তিয়েন ও আমাকে প্রায়শঃই হ্যানয়ের নই বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেতে হত। গেস্ট না আসা পর্যন্ত আমরা এয়ারপোর্টের এক কোনায় কফিশপে বসে দুজনে দুই গ্লাস আইস কফি খেতাম। দূতাবাসে জয়েন করার দুএকদিনের ভিতর অফিসের ক্লিনার মিস্ হিয়েন একধরনের একটি ছোট কেক প্রিসে করে আমার টেবিলে রাখল। জিজ্ঞেস করতে বলল এটার নাম মুন কেক। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় উৎসবে এ মুন কেকের বহুল প্রচলন।এ কেকের ভিতর সিদ্ধ করা ডিমের অর্ধেক কুসুম থাকে। সম্ভবতঃ ডাল ও চালের গুড়া ও ডিমের সংমিশ্রনে এ মুন কেক তৈরী। মুখের স্বাদে অন্তত তাই বলে। রংবেরংয়ের কাগজে এ কেকগুলি রেপিং করা থাকে। তাদের আর একটি প্রিয় খাবার হল স্প্রিংরোল। বিভিন্ন রকমের স্প্রিংরোল বাজারে পাওয়া যায়। সবজি, মাংস যে যেরকম পছন্দ করে। 

পৃথিবীর এক এক দেশের খাবার এক এক রকম। দেশভেদে একি খাবার একটু হলেও রন্ধনপ্রনালী বা পরিবেশন পদ্ধতিতে আলাদা। দূতাবাসের পিও আমজাদ সাহেব হ্যানয় থেকে একটু দূরে মটরসাইকেলে চড়ে গ্রাম থেকে খাশির মাংস নিয়ে আসতেন। আমিও একদিন আমজাদ সাহেবের সাথে গেলাম উনি কোথা থেকে মাংস আনে তা পরখ করার জন্য এবং সাথে সাথে ভিয়েতনামের গ্রাম দেখা। মিনিট চল্লিশেক মটর সাইকেলে আরোহনের পর যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। অনেক খাশি ছাগলে পরিপূর্ন বাড়িটি। আমজাদ সাহেব একটি পছন্দ করল। দাম মিটানোর পর জবেহ্ কার্য সম্পাদন হল। এরপরি দেখলাম একজন কীটনাশক স্প্রে করার মত একটি মেশিন নিয়ে আসল চামড়া থেকে পশম ছাড়ানোর জন্য। আমজাদ সাহেব জানাল ভিয়েতনামীদের কাছে খাশির মাংশের চেয়েও খাশির চামড়া বেশী প্রিয়। এর আগে আমি কখনো শুনিনি যে খাশির চামড়া কেউ খায়। আমার বাসার কাছেই একটা জনপ্রিয় রেস্তোরা ছিল। সন্ধ্যাকালে সেখানে প্রচুর তরুন তরুনীরা ভিড় করত এবং কিসের একটা আইটেম যেন বেশ ঘটা করে খেত। আমাদের দেশে যেমন সিংগারা, পুরি, পিয়াজু মানুষ বেশ পছন্দ করে খায় এ রেস্তোরাতে তেমনি সন্ধ্যার পর দলে দলে তরুন তরুনীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ত এ ঝলসানো খাশির চামড়া কাঁচা কলার ফালির সালাদের সাথে খাবার জন্য।

আমরাও একদিন ওই রেস্তোরাতে এক সন্ধ্যায় ঢুকলাম। চেয়ারে আসন গ্রহনের কিছু সময়ের মধ্যেই এক প্লেট লম্বা লম্বা ফালি করা কাঁচা কলা ও গ্রিল করা খাশির চামড়া আনল ওয়েটার। কাঁচা কলা একটু টেস্ট করলাম। চামড়া মুখে দিব কি দিবনা এ ভেবে ইতস্তত করতে থাকলাম। বুঝলাম এহেন খাবার আমাদের জন্য নহে। তাদের আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হল কামরাঙার সালাদের সাথে ছোট ছোট শামুক যাকে আমরা বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় লেরি বলি তা খাওয়া। রাস্তার পাশে ছোট ছোট প্লাস্টিকের টুলে আসন পেতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বিকেল হলে এটি খেতে বসে পড়ে। চপস্টিক দিয়ে শামুকগুলোর ভিতর থেকে মাংস বের করে কামরাঙার কুচি দিয়ে মহাতৃপ্তিতে তাঁরা ভোজন করত। একদিন একটা লেকের পাশের রেস্তোরাতে বসে আমরা খাবার খাচ্ছিলাম। খাবার শেষ করার পর যখন বিল দিতে কাউন্টারের কাছে গেলাম তখন দেখলাম অনেকগুলি কাচের জারে সাপ ঢুকানো ছিল তরল কোন মিশ্রনে। ওই রেস্তোরাতে ওটাই আমাদের শেষ যাত্রা ছিল।

হ্যানয়ে আমাদের বাসার সন্নিকটে সুন্দর একটি পার্ক ছিল। প্রায়শঃই অফিস শেষে পার্কটিতে সপরিবারে হাঁটতে যেতাম বিশেষ করে উইকএন্ডে। খুব ভোরে পার্কে ক্যাসেট বাজিয়ে মিউজিকের তালে তালে স্বাস্থ্যসচেতন ভিয়েতনামীদের শরীর চর্চা শুরু হয়ে যায়। হাই বিটের গানের তালে তলে চলে ব্যায়াম। বিকেল হলেও এ ধরনের সংগীত কাম ব্যায়াম চলে। পার্কটির ভিতরে বেশ একটা বড় লেক ছিল। কয়েকজন সৌখিন মৎস্য শিকারীকে নিয়মিত বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে দেখতাম। ছোট ছোট তেলাপিয়া মাছই তাদের বড়শিতে ধরা পড়ত। ছুটির দিনে পার্কটির একটি বড় গাছের নীচে বসত কক্ ফাইটের আসর। কয়েকজন তাদের পোষা মোরগ নিয়ে এখানে আসত। মোরগের পায়ে ছোট ফিতে দিয়ে পেঁচিয়ে দেয়া হয়। এরপর দুপক্ষের দুটি মোরগ ছেড়ে দেয়া মাত্র ফাইটিং শুরু হত। মোরগের ঠোকর ও নখের আঁচড়ে মোরগগুলি আহত হলে ওদের মাথায় পানি ঢেলে শুশ্রুষা চলত।তবে কিছু সময়ের মধ্যেই কোন একটি মোরগ পরাজিত হত। বাজি ধরে এ খেলা চলত এবং এটি দেখতে পার্কটির ভিতরে উ্যসুক জনতার ভিড় লেগে যেত।

একদিন আমি ও আমার ছোট্ট মেয়ে ফিজি বাসা থেকে একটি বল নিয়ে পার্কটিতে ঘুরছিলাম। পার্কের একপাশে মাঠের মত একটু জায়গা আছে। অনেকেই ফুটবল খেলে এখানে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভিয়েতনামে ফুটবল একটি অসম্ভব জনপ্রিয় খেলা যদিও তারা নিজেরা এ খেলাটি তেমন ভাল খেলে না। ফিজির সাথে ছোট্ট ছোট্ট মারে ফুটবল খেলছি। হঠাৎ বলটি পার্কটির মাঝখানের বড় লেকটিতে পড়ে যায়। বাতাসে ভাসিয়ে ভাসিয়ে বলটি প্রায় লেকের মাঝখানে চলে যায়। আমি ও ফিজি ভাসমান বলটির আশা ছেড়ে দিলাম। তারপর আমরা পার্কের ভিতর অনেকক্ষন ঘুরে যখন বাসায় ফিরব তখন দেখি বলটি বাতাসে ভেসে পার্কের অন্য পাশে কিনারের কাছে চলে গেছে এবং এক বৃদ্ধা একটা শুকনো গাছের ডাল দিয়ে সেটি পারে আনার চেষ্টা করছে। এক সময়ে ঐ বৃদ্ধা বলটি ধরতে সক্ষম হল। আমি ভাবলাম বৃদ্ধার ঘরে হয়ত ছোট্ট নাতি-নাতনী আছে তাই স্নেহবশে তাদের দেবার জন্য বলটি ধরল। বেশ কয়েকদিন চলে গেল, আবার এক ছুটির দিনের সকালে ফিজিকে নিয়ে পার্কে হাঁটছি। হঠাৎ লেকের দিকে চেয়ে দেখি লেকের যে জায়গাটা থেকে ঐ বৃদ্ধা বলটি তুলেছিল সে আবার বলটি ঐখানে ছেড়ে দিচ্ছে। আমার চোখের কোনে পানি আসল। ভাবলাম দুটো কারনে বৃদ্ধা হয়ত এটা করেছে। প্রথমটি হয়ত তার সন্তানেরা- ছেলে বা মেয়ে তাকে তিরস্কার করেছে সে কেন একটা অন্যের জিনিস তার নাতি-নাতনীদের জন্য আনতে গেল অথবা বৃদ্ধা নিজেও হয়ত নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছিল কাজটি কি সে ঠিক করেছে। হয়ত তার বিবেক বলেছে না ব্যাপারটি সঠিক হয়নি। তাই  সবার অগোচরে আবার বলটি যেখান থেকে এনেছিল সেখানে আবার রেখে গেল।

মিঃ ফং আমাদের অফিসের ম্যাসেঞ্জার। মটর সাইকেলে চড়ে সারা হ্যানয় চষে বেড়াত। ফং-এর সাথে বেশ কিছুদিন বাইসাইকেলে ঘুরেছি। দুজনার দুটি সাইকেল। একদিন রেডরিভারের পুরানো ব্রীজের নীচ ধরে নদীর চরে ওর সাথে সাইকেল নিয়ে ঘুরছি। রেড রিভারের পানিতে পা ভিজালাম। নদীটির পানি পুরোপুরি লাল না হলেও বেশ লালচে আভা আছে। এ রেড রিভার অনেক রক্তের সাক্ষ্য বহন করে বয়ে চলছে। চরে বসে সাইকেল রেখে ভোরের বাতাস গায়ে লাগাচ্ছি আর সামনে প্রবাহিত নদীটির দিকে তাঁকিয়ে ভিয়েতনামের নানা যুদ্ধের রক্তাক্ত গাঁথা নিয়ে ভাবছিলাম। আজ আর সেখানে যুদ্ধ নেই। চলছে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মানের এক নতুন যুদ্ধ।

মিঃ ফং তার বিয়েতে আমাদের সবাইকে দাওয়াত করে খাওয়াল। ওর দীর্ঘদিনের বান্ধবীকেই ও বিয়ে করেছে। এর আগে অফিসের ক্লিনার মিস্ হিয়েনের বিয়েতেও সপরিবারে গিয়েছি।ওয়েডিং গাউন ও স্যুট-টাই পড়া ফং ও তার স্ত্রীকে দেখে মনে হল সত্যিই তারা একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। ফং-এর বাবা ঘরবাড়ি বিক্রি করে শেয়ার বাজারে টাকা খাটিয়ে ফতুর হয়ে গিয়েছে। প্রতিবেশী ও নিকটআত্নীয়দের কাছ থেকেও কিছু লোন করেছিল ফং-এর বাবা। তাই পাওনাদারদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ফং-এর বাবা-মা কিছুদিন থাইল্যান্ডে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ হ্যানয় শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে ওদের একটি বাড়ী ছিল। ফং-এর উপর এ সময়টায় প্রচন্ড অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ পড়ে। কিন্তু অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রচন্ড পরিশ্রম করে ও এ নাজুক সময়টা অতিক্রম করে। অফিসের প্রটোকল সহকারী তিয়েনের পরামর্শে ফং ছোটখাট একটি দোকান দেয় ও তার বৌকে সেখানে কাজে লাগায়। ওদের দুজনের সার্বিক পরিশ্রমে এহেন মানসিক ও অর্থনৈতিক আঘাতটা ওরা কিছুটা হলেও প্রতিহত করতে পেরেছে। অফিসের ড্রাইভার মিঃ হা একসময় সৈনিক ছিলেন। খুবই সহজ সরল মানুষ। কোন প্রকার প্যাঁচের ভিতর নাই। যা বেতন পায় তার প্রায় সবটাই মাসের প্রথমে বৌয়ের হাতে তুলে দিত, নিজের হাতে পকেট খরচের কিছু টাকা রেখে।

মিঃ তিয়েন সজ্জন ব্যাক্তি। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়াতে পড়াশোনা করেছেন। রাশান ট্যাংকের মত দেখতে তার একটি গাড়ি আছে। স্টয়িক ফিলসফীতে বিশ্বাসী। কোন কিছুর প্রতি তাঁর তেমন কোন আকর্ষন নেই, রেস্তোরাতে বসে কফি ও ফুটবল খেলা দেখা ছাড়া। তাঁর একটা দামী মোবাইল সেট ছিল। শুধুমাত্র কল করা ও কল রিসিভ ছাড়া অন্য কোন অপশনে মোবাইলটির ব্যবহার করত না। আমাকে একদিন বলে আমার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। গ্রেট কিছু আর আমাকে দিয়ে হবে না। বেঁচে আছি এমনিতেই। যাচ্ছে দিন তো যাচ্ছে। তেমন কোন শখ বা ভবিষ্যত পরিকল্পনা আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে বলল একবার তার এ গাড়িটা নিয়ে সারা ভিয়েতনাম ঘুরার ইচ্ছে আছে। রিসিপসনিস্ট লান্ দূতাবাসের চাকুরী ছেড়ে ভাল বেতনে অন্য একটা কম্পানীতে চাকুরী নিয়েছে। আমার মেয়ের জন্মদিনে আমি ওদের সবাইকে বাসায় দাওয়াত দিতাম। আজ সবি তার স্মৃতি। আমি তখন ওখানকার পোস্টিং শেষ করে ঢাকায়। আমার বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ওরা সবাই মিলে একশত ডলার আমার কাছে পাঠিয়েছে আমার মৃত বাবার উদ্দেশ্যে খরচ করতে। তাদের এ ভালবাসার ঋণ আমার মত একজন অতীব ক্ষুদ্র মানুষের কাছে জীবনের পরম পাওয়া।

ভিয়েতনামীরা একটি শিক্ষিত জাতি। নিরক্ষরতা তাঁরা মোটামুটি দূর করে ফেলেছে। একজন সাধারন শ্রমিকও নিউজপেপার পড়তে পারে। আমার বাসার কাছে যে পার্কটিতে নিয়মিত হাঁটতে যেতাম সেখানে মাঝে মাঝে এক মহিলাকে দেখতাম ওজন মেশিন নিয়ে আসতে। খেয়াল করতাম মহিলার যখন কাস্টমার থাকত না তখন বড় একটা গাছের ছায়ার নীচে বসে ব্যাগ থেকে বের করে নিউজপেপার পড়ত। আমাদের দেশে শহরে যেমন রিকশাওয়ালারা মানুষ পরিবহন করে ভিয়েতনামে রিকশার বদলে মটরসাইকেল চালকেরা মানুষকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় বা রাস্তার মোড়ে মোটর সাইকেল চালকেরা খদ্দেরদের জন্য অপেক্ষা করে। তাদেরকেও দেখি নিউজপেপার পড়তে। ভিয়েতনামীদের আর একটি বড় সাফল্য গ্রামে গ্রামে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়া ও পাঁকা বাড়ির ব্যবস্থা করা। ওদেশে বস্তি বলতে আর কিছু নেই। ছোট ছোট খরস্রোতা পাহাড়ী নদীতে বাঁধ দিয়ে স্বল্প পরিমান বিদ্যুত উৎপাদনের মাধ্যমে দূর্গম এলাকার স্থানীয় চাহিদা মিটাচ্ছে তাঁরা। হোয়া বিন নামক একটা হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট ঘুরতে একবার সেখানে গিয়েছিলাম। জায়গাটা হ্যানয় থেকে খুব একটা বেশী দূরে নহে। রাশানরা এটা পাহাড়ের ভিতর বিশাল টানেলের মাধ্যমে তৈরী করে দিয়েছে যাতে যুদ্ধের সময় বিমান আক্রমনের দ্বারা এটি ধ্বংস করা না যায়। এত যুদ্ধ তাদের সইতে হয়েছে যে ভিয়েতনামীদের কোন বড় প্রজেক্ট আরম্ভের আগে সম্ভাব্য যুদ্ধ জিনিসটা মাথায় রাখতে হয় যেমন জাপানীদের রাখতে হয় ভূমিকম্পের বিষয়টি।

নিম বিন নামক একটি জায়গায় ফংকে নিয়ে একদিন ঘুরতে যাই। বোট ভাড়া করে লেকে ঘুরতে হয়। বোট একটা সময় পাহারের ফাঁকের ভিতর ঢুকে গেল। অর্থাৎ পানির উপরে পাহাড় অনেকটা তোরনের মত প্রাকৃতিক ভাবে সৃস্টি হয়েছে। বোটটি গুহার নীচের অন্ধকার সুরঙ্গে প্রবেশ করলে একটা আদিম পরিবেশ অনুভূত হল। অন্ধকার গুহাগুলি বেশ ঠান্ডা। একটু পর যখন বোট সূর্যের আলোতে বের হয়ে আসল তখন মনে হল আমরা যেন আবার সভ্যতায় প্রবেশ করলাম। ছোট্ট লেকের দুপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত। এক মধ্যবয়সী মহিলা মহিলা তাঁর ছেলেকে নিয়ে বৈঠা দিয়ে আমাদের বোটটি চালাচ্ছিলেন। নিম বিন পাহাড় পরিবেষ্টিত। আসার সময় উঁচু পাহাড়ে কতগুলি ছাগলকে চড়তে দেখলাম। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে যে লতাগুল্ম জন্মেছে তা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ওরা। ক্ষুন্নিবৃত্তির নিবারন জীবজগতের সবাইকে করতে হয়।এ থেকে কারো রেহাই নেই।

হ্যানয় শহরের ভিতরেই ওয়েস্টলেক নামে বিশাল একটি লেক আছে। লেকের কোল ঘেষে সুন্দর একটি প্যাগোডা আছে। এখানে বেড়ানোর জন্য বোট ছাড়াও লঞ্চের ব্যবস্থা আছে। লেকটির এক কোনের অগভীর পানিতে অনেক পদ্মের গাছ। যখন পদ্মফুলগুলি ফোটে তখন তা দেখতে অপরুপ লাগে। ভিয়েতনামে যে নানা রকম সুগন্ধী চা পাওয়া যায় তার অন্যতম হল পদ্মরেনু মিশ্রিত চা। এ চা বেশ দামী। পদ্মের পাতার উপর পতিত শিশিরের পানি খুব সকালে সংগ্রহ করে পদ্মরেনু মিশ্রিত সুগন্ধী চা তৈরী করত ওয়েস্টলেক সংলগ্ন একটি রেস্তোরাতে। ওয়েস্টলেকের একেবারে কোল ঘেষে সেদোনা রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স। এখানে মাহবুব সাহেব ওরফে সানজু ভাইর বাসা ছিল। বহুবার তাদের বাসায় গিয়েছি এবং কমপ্লেক্সের কোল ঘেষে থাকা ওয়েস্টলেকের ফুটে থাকা পদ্মের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাঁকিয়ে থেকেছি বহুদিন। আমরা যখন ভিয়েতনাম ছেড়ে চলে আসব তখন আমাদের দূতাবাসের ভিয়েতনামী সহকর্মীরা এ ওয়েস্টলেকের কিনারে ‘লোটাস’ নামক একটি রেস্তোরাতে আমাদের সৌজন্যে পার্টি দেন। এখানে অসংখ্য মেন্যু। ব্যুফে সার্ভিং। সেদিন সন্ধ্যায় ভিয়েতনাম ছাড়ার প্রাক্কালে এক আনন্দঘন সময় কাটাই এ রেস্তোরাতে।



হ্যানয়ের একেবারে কেন্দ্রস্থলে বা দিন স্কোয়ারে ভিয়েতনামীদের মহান নেতা হো চি মিনের মসলিয়াম। হো চি মিনের মৃতদেহটি এখানে সংরক্ষন করে রাখা হয়েছে। তবে বছরের একটি বিশেষ সময়ে মৃতদেহটির পুনঃসংরক্ষনের জন্য রাশিয়াতে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিন অসংখ্য লোক হো চি মিন কে দেখতে এ বা দিন স্কোয়ারে সমবেত হন। সবাই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে মসলিয়ামের ভিতর প্রবেশ করে। হো চি মিনকে দেখা যায় সামরিক পোষাক পড়া অবস্থায়। শুধুমাত্র মুখমন্ডলটিই দৃশ্যমান। এ মহান নেতা ভিয়েতনামবাসীকে দিয়েছে স্বাধীনতা। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও তাদের এ লেজেন্ডারী লিডারকে দেখে দেশপ্রেমে নতুনভাবে প্রেরনা পায়। বা দিন স্কোয়ারের একটু পাশেই প্রেসিডেন্ট ভবন। বিশাল কয়েকটি গাছ আছে প্রেসিডেন্ট ভবনের দেয়াল ঘেষে। রাষ্ট্রদূতদের ক্রিডেনশিয়াল প্রেজেন্টেশনের সময় মোট দুবার ও ভবনে গিয়েছি। তখন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ছিলেন চান দুক লুং ও নুয়েন তিন মিয়েং। বা দিন স্কোয়ারের আর এক পাশে রয়েছে চিকন চিকন সুদৃশ্য বাঁশের ঝোপ।

হ্যানয় শহরের কেন্দ্রস্থলে বড় লেক ঘেষে একটি প্যাগোডা আছে। ভিয়েতনামী উপকথা অনুযায়ী এ লেকে থাকা কচ্ছপ একটি তরবারী এনে দেয় যা দ্বারা তারা তাদের এনিমিকে বিতারিত করে। এখনও নাকি মাঝে মাঝে দুএকটি বিশাল কচ্ছপ এ লেকে দেখা যায়। প্যাগোটাটির এক কক্ষে বিশাল একটি কচ্ছপকে মমি করে রাখা হয়েছে। এর পাশেই হ্যানয়ের পুরানো কোয়ার্টার। ফ্রেঞ্চ আর্কিটেকচারে সমৃদ্ধ বিল্ডিং। প্রচুর ক্যাফে ও রেস্তোরার দেখা মেলে এখানে। এছাড়াও হ্যানয়ের কাছাকাছি থাকদা, আবুউয়া, পারফিউম প্যাগোডা, চায়না বর্ডার এসব জায়গাগুলি টুরিস্টদের জন্য বেশ আকর্ষনীয়। পারফিউম প্যাগোডা পাহাড়ের অনেক উঁচুতে। ওখানে রোপওয়েতে করে উঠেছি। যেইনা রোপওয়ের বক্স দড়ির উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে শুরু করল অমনি নীচে তাঁকিয়ে দেখি গভীর গিরিখাঁদ। একটু এদিক ওদিক হলেই ছিটকে পড়ে যেতে হবে অতল খাঁদে। ইস্টনাম জপ করা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। অবস্থাটা এরকম খেলা তো শুরু হয়ে গেছে, এখন আর মাঠ ছেড়ে দৌড়ে পালাবার কোন উপায় নেই। এসব যখন ভাবছি তখন রোপওয়ের বক্স পাহাড়ের ও প্রান্তে গিয়ে পৌঁছল। আমরা যেদিন ওখানে গিয়েছিলাম সেদিন পারফিউম প্যাগোডাতে একটা অনুষ্ঠান ছিল। লোকে লোকারন্য, পা ফেলা যাচ্ছিল না। ছোট্ট মেয়ে ফিজিকে কাঁধে নিয়ে আমরাও তীর্থযাত্রায় সামিল হলাম। পাহাড়ের গুহার ভিতর কয়েকটি মূর্তি। সেখান থেকে প্রজ্বলিত আগরবাতি সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। হাতজোড় করে সবাই প্রার্থনা করে ফিরে যাচ্ছে। যারা ট্রেকিং করতে ভালবাসে তারা হাতে একটি ছড়ি নিয়ে ও পিঠে টাইট করে ব্যাগ বেঁধে এখানে উঠছে। ভিয়েতনামের একটি পাহাড়ী শহরের নাম সাপা। খুব সুন্দর একটি শহর। কোন একদিন রাতের ট্রেনে করে হ্যানয় থেকে সাপার উদ্দেশ্যে রওহনা হই। ট্রেনের দোতলা বেডের স্লিপিং বার্থে খুব সুন্দর একটা ঘুম হল। খুব সকালে পৌঁছে হোটেলে উঠলাম। নাস্তা সেরে যখন বের হব তখন মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হল। সাথে অফিসের তিয়েন আছে যথারীতি। গায়ে রেইনকোট ও মাথায় ছাতা দিয়ে বৃষ্টির ভিতর হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু বৃষ্টি এত জোড়ে হচ্ছে যে ছাতা তেমন কাজে লাগল না। এর সাথে শুরু হল প্রচন্ড বজ্রপাত। খোলা আকাশের নীচে হাঁটা আর ঠিক হবে না মনে করে পাশের একটা দোকানে আশ্রয় নিলাম। বিকেলে পিক আপে করে ঘুরতে বের হলাম। ধোয়ার মত মেঘ গাড়িকে ঢেকে দিচ্ছে, সামনের পথ আর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ড্রাইভারের মনে হয় রাস্তা মুখস্ত। চোঁখ বন্ধ রেখেও সে হয়ত এ রাস্তায় গাড়ী চালাতে পারবে। কিছুক্ষন পর মেঘ সরে গেল। পথও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আবার মেঘরাশি এসে সবকিছু গ্রাস করল। মেঘমালার সাথে এরকম লুকোচুরি খেলার পর সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরলাম। রাতে একটা রেস্তোরাতে যখন ডিনার সারতে গেলাম তখন দেখলাম ওখানে স্থানীয় উপজাতীয় ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা নাঁচছে মহা আনন্দে। কাঠের গুড়ি দিয়ে চেয়ার টেবিল বানানো। খাওয়া দাওয়া শেষে ছোট উপজাতীয় বাচ্চাদের সাথে কিছুক্ষন মজা করলাম। তারপর আবার হোটেলে।

পরের দিন সকালে সাপা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা পাহাড়ী স্রোতধারার কাছে ঘুরতে গেলাম। নদীটির উপর সুন্দর একটা কাঠের ব্রীজ আছে। হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শেষে রোদ উঠল। ব্রীজ ক্রস করে আমি একা একা হাঁটতে শুরু করলাম। ছোট্ট একটি ঝর্না পাহাড়ের গা ঘেষে নেমে সর্পীলাকারে বয়ে গেছে। কেডস খুলে স্বচ্ছ পানিতে পা ভিজিয়ে ওপারে গেলাম। নদীটির ওপারে লক্ষ্য করলাম পাহাড়ের গায়ে ঢেউ খেলানো সবুজের খেলা। অপরিচিত জায়গায় গাইড ছাড়া যেতে নাই এ আপ্তবাক্যটি মনে থাকলেও হঠাৎ কি যেন মনে হল নদীটির পাশ ঘেষে মনের আনন্দে দৌঁড় দিলাম। দৌঁড়াচ্ছি আর ঢালু পাহাড়ের উপর উঠছি। অনেকটা উঁচুতে উঠে পিছন ফিরে যখন তাঁকালাম তখন বুঝতে পারলাম আমি অনেকদূরে চলে এসেছি। পিছনের কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। এমন সময় হঠাৎ করে কতগুলি কুকুর কোথা থেকে যেন আমার দিকে ছুটে আসল। ওরা সংখ্যায় পাঁচ ছটি হবে এবং বেশ বড় সাইজের। আমি একা জনমানবহীন প্রান্তরে সারমেয় কর্তৃক পরিবেষ্টিত। নীচে চেয়ে দেখি অনেক গভীরে পাহাড়ী নদী প্রচন্ড স্রোতে বয়ে যাচ্ছে। বড় বড় পাথরের খন্ড নীচে। লাফ দিবারও কোন উপায় নাই। দিলে প্রস্তরের আঘাতে দেহ চূর্ন বিচূর্ন হয়ে যাবে। কুকুরগুলি আমার গা শুঁকতে লাগল। মনে মনে সৃস্টিকর্তাকে স্মরন করছি আর নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজেকে ধিক্কার জানাচ্ছি। কুকুরগুলি পা ও মুখ দিয়ে আমার শরীর ঘষাচ্ছে ও ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করছে। একা নিশ্চল হয়ে আমি দাঁড়িয়ে। আমাকে কামড়াচ্ছেনা সম্ভবত আমি দৌড়ানোর চেষ্টা করছিনা এটা দেখে। এমনি কুকুরের চিৎকারের ভিতরে মিস্যাইয়ার মত হাজির হল পাহাড়ী একটি মেয়ে, হাতে একটি লাঠি নিয়ে। ও এসেই লাঠিটা ঘুরাল এবং ওর নিজস্ব ভাষায় কুকুরগুলিকে কি যেন বলল। কুকুরগুলি আমার কাছ থেকে সরে গেল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে মেয়েটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে পিছনে রওহনা হলাম। খেয়াল করলাম তিয়েনও কোথা থেকে একটা শুকনো বাঁশর কঞ্চি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। সারমেয়দের ঘেউ ঘেউ তারাও টের পেয়েছে। জিম্মিদশা থকে মুক্ত হয়ে আমি হাসতে হাসতে নিকটজনের কাছে ফিরলাম। সে এক মহাআনন্দের অনুভূতি।

আর একবার মাহবুব সাহেব অর্থাৎ সানজু ভাইয়ের পরিবারের সাথে দো সান নামক ভিয়েতনামের একটি কোস্টাল শহরে যাই।ষাড়ের লড়াইয়ের জন্য বিখ্যাত দো সান। আমি অনেক্ষন হাঁটু ভিজিয়ে সমূদ্রের বীচে হাঁটলাম। ওদিন সন্ধ্যায় হ্যানয়ে ব্যাক করে শুনি এক মহাপ্রলয়ংকারী সুনামী ঘটে গেছে ইন্দোনেশিয়াতে যার ঢেউ আঘাত হেনেছে ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, ভারত এমনকি সোমালিয়ার কোস্টেও। ভূপৃষ্ঠগত গঠনের কারনে হয়ত ভিয়েতনামী কোস্ট বেঁচে গেছে এ সুনামীর আঘাত থেকে। তা না হলে সেদিনের প্রলয়ংকারী সুনামীতে আমাকেও হয়ত সাউথ চায়না সীতে সপরিবারে ভেসে যেতে হত। ওই সুনামীটা এতই ভয়ংকর ছিল যে আমাদের বাড়ী বরিশালের বানারীপাড়া থানার বাইশারী গ্রামের পুকুরের পানি গর্জন করে কিনারে ছিটকে উঠেছিল। ভিয়েতনাম থেকে দুহাজার সাত সালের পঁনের সেপ্টেম্বর বদলী হয়ে দেশে চলে আসি। আসার কয়েকমাস আগে শুনতে পেলাম বাবার প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়েছে। অবস্থা ভাল না। চিকিৎসায় কোন কাজ হবে না। ঊনিশে নভেম্বর দুহাজার সাত বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। একটা বড় বৃক্ষ কেটে ফেললে সে জায়গায় যেরকম একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয় বাবাহীন বাড়ীতেও এখন তেমনি বিশাল শূন্যতা।

চিরঞ্জীব সরকার । অটোয়া, কানাডা