অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
ওবামার পিতৃভূমিতে – চিরঞ্জীব সরকার

১ ডিসেম্বর ২০১২ মাদ্রিদ থেকে আমিরাতের ফ্লাইটে দুবাই হয়ে নাইরোবীতে আসি চাকুরী সুবাদে। প্রায় ছ‘মাস আগে এখানে পোস্টিং হয়েছে।  কিন্তু নাইরোবীতে নিযুক্ত প্রথম সচিব সাখাওয়াৎ হোসেন মরিশাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন মিশন খোলার কাজে ব্যস্ত থাকায় দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত হতে পারছিলেন না, তাই আমারও এখানে আসা বেশ কয়েকবার পিছাতে হয়েছিল।  সপরিবারে এক রাতে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবীতে জোমো কেনিয়াটা ইণ্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে বোর্ডি ব্রীজ ধরে এগোচ্ছি, গেটে আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জাকির সাহেব, বাগেরহাটে বাড়ি। এখানে এসেছে তিন বছর হল। এর আগে কুয়েতে পোষ্টিং করেছেন। জাকির সাহেব রাতে আমাদের জন্য বাসা থেকে খাবার নিয়ে এলেন। পরের দিন দূতাবাসে আসি। বাংলাদেশ দূতাবাস কেনিয়াতে ওপেন হয়েছে ১৯৭৮ সালে। সেসময়ের দূতাবাস ভবনটি ছিল কেনিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কিবাকির।  কিবাকি বিগত ৮ এপ্রিল ২০১৩ নবনির্বাচিত প্রেসিডেণ্ট উহুরু কেনিয়াটার কাছে দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। কেনিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপতি উহুরু কেনিয়াটা কেনিয়ার জাতির পিতা জোমো কেনিয়াটার সন্তান।  নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দী ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রায়লা ওডিংগা। প্রায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। তেমন কোন গন্ডগোল হয়নি  নির্বাচনে। বিগত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের পর কেনিয়াতে এক ভয়াবহ দাংগা হয়। কয়েক হাজার লোক অফিসিয়ালী নিহত হওয়া ছাড়াও প্রায় ছয় লক্ষ লোক ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। এখানে আসার পর দরকারী অফিসিয়াল কাজগুলি করার পর প্রধান পারিবারিক কাজ হল বাচ্চা দু’টিকে স্কুলে ভর্তি করা।  আমার বাচ্চারা যে  ব্রেবার্ন স্কুলে  ভর্তি হয়েছিল সেখানে অনেক বিদেশী ছাত্রছাত্রী পড়ে। ইলেকশনের আগে সম্ভাব্য গন্ডগোলের ভয়ে তাদের অধিকাংশই কেনিয়া ছেড়ে চলে যায়। কিন্ত বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়ে কেনিয়া  অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশে তাদের জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। আমার বাসার সামনেই কিলিমানী স্কুলে একটি বড় ভোটকেন্দ্র ছিল। খুব শান্তিপূর্ণভাবে তাঁরা সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভোট দিয়েছে। সারা কেনিয়াতেই এভাবে ইলেকশন সম্পন্ন হয়েছে, ভোটের পর উহুরু কেনিয়াটার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রায়লা যখন দেখল তিনি হেরে গেছেন, সংবিধান নির্দেশিত পথে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন এ ভোট বাতিল করার জন্য। কোর্টে দু’পক্ষই তাদের স্বপক্ষে তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেছে। আদালত শুনানী শেষে উহুরু কেনিয়াটাকেই বিজয়ী ঘোষনা করেছে।  উহুরুর শপথের কয়েকদিন আগেই রায়লা দক্ষিণ আফ্রিকা চলে গিয়েছিলেন। তবে  দেশে এসে আবার উহুরুকে সরকারের কাজে সহয়োগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। উহুরু রায়লার মতামতকে গুরুত্ব দেবার কথা বলেছেন। ইলেকশনের আগে এবার তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল নিবার্চনের মত টেলিভিশন বিতর্কেও  অংশগ্রহণ করেছে। বারাক ওমাবার পিতার দেশ কেনিয়া, তাই হয়ত মার্কিনী স্টাইলের কিছুটা প্রতিফলন ঘটেছে।

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবীর আবহাওয়া চমৎকার। এ শহরে ফ্যান বা এসি চালাতে হয় না। টেম্পারেচার বেশ মডারেট। রাত্রে একটা ব্লাঙ্কেট হলেই চলে। এ কারণে ইউরোপিয়ান বা পশ্চিমা শীত প্রধান দেশের নাগরিকদের কাছে নাইরোবী খুবই প্রিয় জায়গা। সম্ভবত আবহাওয়ার এহেন বৈশিষ্ট্যের জন্যই নাইরোবীতে ইউনাইটেড ন্যাশনস্ এনভায়রমেন্ট প্রোগ্রাম (UNEP) এবং ইউনাইটেড ন্যাশনস্ সেটেলমেণ্ট প্রোগ্রাম (UN-Habitat) নামক জাতিসংঘের দুটি কার্যালয় রয়েছে।  জাতিসংঘের ইউনাইটেড ন্যাশনস্ অফিস অফ নাইরোবী (UNON) গিগিরী নামক জায়গায় অবস্থিত। এখানে বেশ কিছু বাংলাদেশী কর্মরত আছেন। ইউএন হ্যাবিটাটের ২৪তম গভর্নিং কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়ে গেল বিগত ১৮ জুলাই ২০১৩।  সম্মেলনটির উদ্বোধন করলেন কেনিয়ার নবনিযুক্ত রাষ্টপতি মিঃ উহুরু কেনিয়াটা। বাংলাদেশের আসন একেবারে সামনের দিকে থাকায় খুব কাছে থেকে কেনিয়াটাকে দেখলাম। বেশ ইয়াং ও স্মার্ট। মনে হচ্ছে ওবামার কিছুটা ছাপ আছে।

কেনিয়া সাফারীর দেশ। কয়েকটা বিশ্ববিখ্যাত সাফারী রয়েছে এখানে। তাই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে কেনিয়া একটি স্বর্গ। ন্যাশনাল জিওগ্রাফীর কল্যাণে ওয়াইল্ড বিস্টের অ্যানুয়াল মাইগ্রেশন প্রতিনিয়ত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করছে। তাঞ্জানিয়ার সেরেংগাটি ও এপাশের কেনিয়ার মাসাইমারা নিয়ে বন্যপ্রাণীদের মাইগ্রেশনের এ বিশাল ট্রাক।  বাঘ, হরিণ, চিতা, জিরাফ, জেব্রা ও হাতি ছাড়াও অসংখ্য জীবজন্তুতে পরিপূর্ণ কেনিয়ার ওয়াইল্ড লাইফ। নাইরোবী এয়ারপোর্টের কাছেও একটা বড় ন্যাশনাল পার্ক আছে। বিশেষ করে যারা অল্পসময়ের জন্য কেনিয়া ভ্রমণে আসেন তাঁরা নাইরোবী ন্যাশনাল পার্ক ঘুরেও কেনিয়ার জীব-জন্তুর অবাধ বিচরণ কিছুটা প্রত্যক্ষ করতে পারেন। জিরাফ ও সিংহ এখানে বিশেষ আকর্ষণ। গলা উঁচু খাড়া খাড়া চোখে জিরাফ দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় অবাক বিস্ময়ে।

কেনিয়া এখনও দারিদ্র কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিগত দশবছর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মিউই কিবাকি দেশটাকে উন্নয়নের রাজপথে উঠাবার চেষ্টা করেছেন। দেশটিতে একটি আধুনিক সংবিধান প্রনয়ণ করা হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন সুসম্পন্ন হওয়ার পিছনে এ সংবিধানটির অবদান অপরিসীম। চীনারা সারা আফ্রিকাতে বিনিয়াগ করছে বিশেষ করে বিভিন্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলেপমেণ্ট প্রজেক্টে। কেনিয়াও এ থেকে ব্যতিক্রম নহে। সারা কেনিয়াজুড়ে নয়নাভিরাম হাইওয়ে তৈরী করেছে বিভিন্ন চীনা কোম্পানী। আরো অনেকগুলি তৈরী হচ্ছে। এখানে তেলক্ষেত্রও আবিস্কৃত হয়েছে।আধুনিক কৃষি পদ্ধতির দিকেও বিশেষ করে হর্টিকালচারে তারা ক্রমশঃ এগিয়ে যাচ্ছে। নাইরোবীর অদূরে ‘নাইভাসা’ শহরটি হর্টিকালচার বিশেষকরে রপ্তানীযোগ্য ফুল উৎপাদনের জন্য বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। এছাড়া চা ও কফিতেও কেনিয়ার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে যদিও প্রলম্বিত বিশ্বমন্দার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের চা ও কফি রপ্তানীতে কিছুটা মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে প্রচুর ফলও উৎপন্ন হয়।

পৃথিবীর এক একটা রাষ্ট্রের সমস্যা এক এক রকম। কেনিয়া একটি বিশাল দেশ হওয়া সত্ত্বেও সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা এখনও চরম দারিদ্রে দিনাতিপাত করছে। এর বড় প্রমাণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বস্তিটি ‘কিবেরা’ যেটি নাইরোবী শহরে অবস্থিত। সন্ধ্যার পর নাইরোবী পথচারীদের বিশেষ করে বিদেশী তথা এশিয়ানদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সন্ধ্যার পর তাই গাড়ী ছাড়া বিদেশীরা কেউ বের হয় না। কার জ্যাকিংও হয় প্রচুর।পৃথিবীর সব জায়গাতেই ক্রাইম হয়। কিন্তু নাইরোবীর ক্রাইম অসহনীয় যা একটা সভ্যদেশের জন্য কিছুতেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। এখানকার এলিট শ্রেণী কলোনীয়াল প্রভূ বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশের সম্পদ বিশেষকরে জমি নিজেদের ভিতর ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এক একজন ভূস্বামী হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক আর অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষ একটু মাথা গোজার ঠাঁই না পেয়ে কিবেরার মত বস্তিগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে।

এখানে আসার পর  নাইরোবীর কাছাকাছি কয়েকটা জায়গায় গিয়েছি। কিটেঙ্গালা নামক একটি জায়গায় অস্ট্রিচ বা উটপাখির ফার্ম কাম ট্যুরিস্ট স্পট। বিশাল বিশাল উটপাখিগুলি সত্যিই মরুভূমির জাহাজ। বাচ্চারা উটপাখির পিঠে চড়তে পারে, সে ব্যবস্থাও আছে।  কিন্তু আমরা যেদিন ওখানে গেলাম সেদিন এ রাইডটি বন্ধ ছিল। একটি বক্সের ভিতর বিশাল বিশাল উটপাখির ডিম সাজানো আছে। কয়েক হাজার শিলিং এর বিনিময়ে কেনাও যায়। এখানকার রেস্টুরেন্টে শুধুমাত্র বারবিকিউ আইটেম যার ভিতর উটপাখির মাংসও আছে। এজাতীয় মাংসকে এখানে গেমমিট বলা হয়। এখানে খোলামাঠে সরু লোহার তারের বেড়া দিয়ে উটপাখিগুলিকে রাখা হয়েছে। পুরুষ উটপাখিগুলির ডানা কালো। এরা নাকি সবসময় এ কালারেরই হয়। কিটাঙ্গালা এরিয়াটায় মাঝে মাঝে সিংহ আক্রমন করে। তাই ওখানকার গাইড আমাদের নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া কোথাও বেড়াতে নিষেধ করলেন।

নাইরোবী থেকে ঘণ্টা আড়াইয়ের ভিতর নাইভাসা যাওয়া যায়। নাইভাসায় একটি বিশাল লেক আছে। আমরা পরিবারের সবাই মিলে একদিন ওখান থেকে ঘুরে এসেছি। লেক থেকে জেলেদের কাছ থেকে সদ্য উঠানো তেলাপিয়া মাছ ও কিছু বড় রুই মাছ কিনলাম। এখানে জলাভূমির অনেক মাছ ও পাখির সমাহার। বড় বড় স্টর্ক, ক্রেন, করোবেট ইত্যাদি পাখির প্রচুর দেখা মেলে। বাংলাদেশে হোগল বা শর জাতীয় জলজ উদ্ভিদ-এর ভিতর এদের বাসাগুলি। নাইভাসা লেকের কয়েকটি পয়েণ্টে হিপ্পো বা জলহস্তির দেখা মেলে। আমরাও বোটে বসে মাথা জাগানো কয়েকটি জলহস্তি পরিবারের সাক্ষাত পেলাম। হঠাৎ তারা পানির উপর মাথা জাগিয়ে মুখ ফাঁক করে আবার ডুব দেয়। আমাদের দেশের নদীতে শুশুক/ডলফিন যে রকম পিঠ জাগিয়ে ডুব দেয় এ জলহস্তিদেরকেও সেরকম ভঙ্গিতে পানিতে অবগাহন করতে দেখলাম। নীল আকাশের নীচে বিশাল লেকের পানিও সম্পূর্ণ নীল। লেকের বোটের ভিতর থেকে খেয়াল করলাম একটু দূরে মেঘ করে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের পানি লেকের সাথে মিশে একটা পাইপের মত ধোয়াশা সৃষ্টি করেছে। স্কুল বাসে করে প্রচুর বাচ্চাদের দেখলাম এখানে ট্যুরে আসতে।  বাসা থেকে রান্না করে আনা খিচুরী ডিম চলন্ত বোটে বসে বেশ মজা করে খেলাম। নাইভাসা শহরটিতে প্রচুর গ্রীনহাউজ দেখলাম। বড় বড় কিছু হোটেলও তৈরী হচ্ছে।নাইরোবী শহরের একেবারে উপকণ্ঠেই মাম্বা ভিলেজ। এখানে কুমিরের ফার্ম আছে। আমরা একদিন হুট করেই সেখানে ঢু মারলাম। প্রায় গোটা পঞ্চাশেক কুমিরকে দেখলাম রোদে চরম তৃপ্তিতে ঘুমাচ্ছে। কোন প্রকার নড়াচড়া নেই। অবিকল পাথরের মত স্থির হয়ে আছে। হঠাৎ একটি কুমির মুখ ফাঁক করায় তা দেখে আমার ছোট ছেলে অত্রি বেশ ভয় পেয়ে গেল। সে আর কিছুতেই কুমিরের নেটের কাছে যাবে না। এর কিছুক্ষণ পর আরো একটা কুমিরকে সন্তর্পনে পানিতে নামতে দেখলাম। মনে হচ্ছে যেন ক্যামোফ্লেজ  করে শিকার ধরার অপেক্ষায়। শুধু চোখ দুটি দেখা যাচ্ছে।ছোট ছোট বাচ্চা কুমিরদের জন্য আলাদা পুল। এগুলোকে আমাদের দেশের অনেকটা গুই সাপের মত দেখতে। এখানে কয়েকটি কচ্ছপও আছে। বেশ শক্ত খোলস। বড় কচ্ছপটির আয়ু কত তা জানা গেল না। কিছুদিন আগে ইকিউডরের গ্যালাপাগাস আইল্যান্ড যেখানে চার্লস ডারউইন প্রকৃতি নিয়ে গবেষনা করেছিলেন সেখানকার সবচেয়ে দীর্ঘজীবী কচ্ছপটি মারা গেছে। শত শত বছর নাকি কচ্ছপ বাঁচে। মাম্বা ভিলেজে কিছু উটপাখি ও বাচ্চাদের জন্য কয়েকটি রাইড আছে। আমরা একটা বোটে মিনিট পনেরর জন্য চড়লাম। অনেককে দেখলাম এখানে এসে বারবিকিউ করতে। আমাদের যেহেতু হঠাৎ করে আসা তাই অতিরিক্ত কিছু করার প্রস্তুতি ছিল না।



নাইরোবী শহরের উত্তরদিকে প্যারাডাইস লস্ট নামে সুন্দর একটা জায়গা আছে। বাংলাদেশের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর প্রতিনিধি মিঃ সালাউদ্দিন, ডেণ্টি¯ট ডাঃ তাপস ও মেজর মাহবুব (অবঃ) ও কর্নেল (অবঃ) রায়হানের পরিবারসহ একদিন সেখানে বেরাতে গেলাম। ওখানে ঢোকার পথেই কফির বাগান দেখলাম। ডালে ডালে ফুল ধরেছে। এর আগে আমি কখনো কফির বাগান দেখিনি, অনেকটা চা বাগানের মত দেখতে। কফির ডালে ডালে যে এত মনোরম ফুল ধরে থাকে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। কিছু কিছু কফি গাছে কফির গুটিও ধরেছে। মাকে দেখাবার জন্য আমি কয়েকটি গুটি তুলে পকেটে রাখলাম।

বাগানের পাশেই একটা বড় লেক। সেখানে একজন নৌকায় চড়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। নাইরোবী বা তার উপকণ্ঠে মাছ বলতে তেলাপিয়া ও নাইলপার্চ যা আমাদের দেশে কোরাল মাছ বলে পরিচিত এ দু’টোই পাওয়া যায়। আমাদের সাথের ডেণ্টিস্ট ডাঃ তাপস বাংলাদেশ থেকে ঝাকি জাল নিয়ে এসেছে। সে কিছু তেলাপিয়া মাছ ও একটি চিংড়ি মাছ ধরল মহা উৎসবে। ডাঃ তাপসের বাড়ি ময়মনসিংহে। বাবা পুলিশ অফিসার ছিলেন। এখানে আদম আর্কেডে একটা ক্লিনিকে বসে। প্যারাডাইস লস্টে স্টোন এইজের একটি বিশাল গুহা আছে। আমরা গুহার ভিতর ঢুকলাম। এখানে লাইটের ব্যব¯হা আছে। গুহায় প্রবেশ করলাম আর মনে হচ্ছিল হাজার হাজার বা লক্ষ বছর আগে আদিম মানুষেরা এখানে দলবেধে থাকত। হয়ত পাথরের অস্ত্র নিয়ে বন্যজন্তু শিকার করে ক্ষুধা নিবারণ করত। গুহা সংলগ্ন একটি বড় জলপ্রপাত আছে। পাথরের বুক চিড়ে জল পড়ছে। প্যারাডাইস লস্টের লেকটি বেশ বড়। আমরা সেখানে কিছুক্ষণ বোটে চড়লাম। বাসা থেকে একেকজনের আনা আইটেমগুলি দিয়ে বেশ ঘটা করেই মধ্যহ্ন ভোজ সম্পন্ন করা হল। সন্ধ্যার দিকে বেলা গড়িয়ে গেলে আমরা নাইরোবীতে ফিরলাম। ফেরার পথে মেজর (অবঃ) মাহবুবের বাসায় ঢু মারলাম। তার স্ত্রী ফারজানাভাবী সুন্দরকরে চা বানিয়ে আমাদের সবাইকে আপ্যায়ন করল। মাহবুব সাহেবের সোমালিয়া পোস্টিং হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বহুবছর অশান্তির পর সোমালিয়াতে এখন একটু একটু স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। মোগাদিসুতে এখন কেন্দ্রিয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ সরকারকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে।

কেনিয়া থেকে চলে আসি জুলাই ২০১৬, মিনিষ্ট্রতে। কিন্তু বিশাল আফ্রিকার তৃনভূমি, গাছপালা, মানুষগুলো এখনও স্মৃতিপথকে তাড়িত করছে।

চিরঞ্জীব সরকার । অটোয়া, কানাডা