অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
জিজীবিষা অফ সামিরা - দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু

নিবার বিকেল।
পৌনে চারটে।
অফিস ছুটি।
চারটে পর্যন্ত ঘুমোতে পারলে ছুটিটা যথার্থ উপভোগ করা যেত। ছুটির দিন বলে সকাল নয়টা পর্যন্ত বসে টগল সিরিজের ১৭১নং ছড়াটি শেষ করে ঘুমিয়েছি। ঘুমটা হঠাৎ ভাঙ্গলো কেন প্রথমে ঠাওর করতে পারি নি। তৎক্ষনাৎ বুঝতে পারলাম ওয়াশরুমে জলের শব্দ। ভাবলাম পানি পড়ছে বন্ধ করে আসি। ওয়াশরুমে ঢুকতেই আমার চোখ কপালে উঠে গেলো। 
সামিরা।
সামিরাকে ঠিক এমনভাবে কখনো দেখিনি। তন্দ্রা ভাব কখন কেটে গেলো বুঝতেই পারি নি। 

সামিরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। সামিরা পোষা বিড়ালের মত নিরবে বুকের উষ্ণতায় জড়িয়ে ছিলো।
     কেউ দেখে নিবে। ছাড়ো। ছাড়ো না! 
ও এক হাতে আমায় জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে শাওয়ারের জল ছেড়ে আমায় ভিজিয়ে দিয়ে দৌড়ে দিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে গেল।

ভেজা শরীর তাই আমিও শাওয়ার করে নিলাম। বের হয়ে লুঙ্গিটা পড়ে কাঁধে তোয়ালের এক পাশ রেখে অন্য পাশ  দিয়ে চুল মুছতে মুছতে শোবার ঘরে ঢুকতেই আমি তো হতবিম্ব। আমি আজ কী দেখছি? অন্য  রকম সামিরাকে দেখছি। কখন যে ওর কাছাকাছি মিশে গেলাম বুঝতেই পারি নি। চুলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে সুগন্ধ নিচ্ছি। 

তখন সামিরা বললো, কী দেখো? বললাম, তোমাকেই। 
আমি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই, তুমি কী দেখো? কি ভাবছো? আমি জানতাম উত্তরে ও বলবে 'তোমাকেই'। কিন্তু না। সে এমন কিছুই বলে নি। কিছুক্ষণ আমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে রান্না ঘরে চলে গেল।

মিনিট দশেক পর, দু'কাপ চা হাতে একটাতে চিনি বেশি অন্যটা তে কম। আমি চায়ে চিনি বেশি খাই বলে রাখা ভালো। 
আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো, বলতো কোনটা তোমার? 
কাপ দেখে কী বলা যায় কোনটায় চিনি বেশি কোনটায় কম?
আমি বলতে নারাজ। 
বলাবোই না। 
আমি বললাম, আচ্ছা বলতো তখন তুমি কেঁদেছো কেনো? 
ও বলল যদি তুমি বলতে পারো কোনটা তোমার চা, তাহলে বলবো।
আমি বললাম বাম হাতের টা। বাম আমার পছন্দ। কারণ, আমি বামপন্থী। 
সামিরা বললো, You are right। আমি সামিরার দিকে তাকিয়ে বললাম এবার..... 
এবার বলাতেই ও বলতে শুরু করলো। গত পরশু। অফিসে ভালো লাগে নি। ওর অফিস সেগুনবাগিচায়। মানবাধিকার সংস্থার অধীনস্থ একটি সংস্থায় কাজ করে ও। অবশ্য এর আগে ও বেশ কয়েকটি কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে মডেলিং এর কাজও সামিরা স্বেচ্ছায় ছেড়েছে।
কেন অফিস ভালো লাগে নি সেটা জিজ্ঞেস করায় ও বললো।  
গত পরশু পাঁচ বছরের একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
খবরটি এখনো মিডিয়া পাড়ায় আসে নি। 
ও বলছিল নির্যাতনকারী একই ভবনের আট তলায় থাকে।
সামিরা  অনবরত মেয়েটার বলে যাচ্ছিলো কিন্তু আমি তখন সামিরার কোন কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। আমার চোখে ভাসছিল সামিরার যখন বয়স পাঁচ ঠিক  তখনকার গল্প। 
তখনও সেই নিদারুন ঘটনার কোন বিচার হয় নি।

তাহের আলি। তিনি দিব্যি ভালোই আছেন। 
আপনাদের কেউ কেউ হয়তো উনাকে ভালো ভাবে চিনেন। 
সামিরা সেদিন নিকৃষ্ট ঘটনার ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবে না, শুধু বেঁচে থাকতে চায় এ শর্তে জীবন ফিরে পেয়েছিলো।
তারপর পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু সামিরা বিনা টিকেটে রেল ধরে চলে যায় ঈশ্বরদী, তারপর চাঁটগাঁও। 

সামিরা বলো উঠলো, কী হলো? তুমি শুনতে পাচ্ছো না? হ্যাঁ হু কিছুই  বলছো না। আমি কার সাথে কথা বলছি?
সরি বাবা। বলো, আমি শুনছি তো বলেই ওর চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চায়ে চুমুক দিলাম এবার আমি আকাশ থেকে যেন মাটিতে পড়লাম।
এই কাপেও একই পরিমাণ চিনি দেওয়া।
আমি ব্যাপারটা জানতে চাওয়ায় ও বলল- আমি তোমার সব অভ্যাস আমার করে নিতে চাই। 
আমি বললাম তুমি পারবে না, ও বলল পারবো।
সামিরা বললো, আমি তোমাকে কোন কিছু  লুকোই নি আর কখনো লুকোবোও না। 
তুমি কি ভাবছিলে আমি জানি, আমার প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়েছে সেটাও জানি।
তুমি এতক্ষণ আমার কোন কথাই শুনো নি।

আমি বললাম, নারে পাগলি  "ভালোবাসি"।

সামিরা বলল, আর ভালোবাসতে হবে না।
রেডি হও।
আম্মার বাসায় যেতে হবে।
ওখান থেকে প্রাপ্তিকে ডাক্তার দেখিয়ে আবার সাংবাদিক ফেডারেশনে যেতে হবে।
ও হ্যাঁ প্রাপ্তি আমাদের মেয়ে।
পৌঁনে নয়টায় দিকে সাংবাদিক ফেডারেশনে ঢুকলাম সাংবাদিক কবির এর সাথে দেখা করবে ভেবে সামিরা ভিতরে গেল। দশ সেকেন্ড পর বের হয়ে এসে বলল, চলো বাসায় যাব। আমি কোন প্রশ্ন করি নি। 
প্রাপ্তি সাথেই ছিল।
আমরা গাড়িতে গিয়ে বসলাম। কারওয়ান বাজারে আমার প্রকাশকের সাথে সামান্য কাজ থাকায়, গাড়িটি কারওয়ান বাজারমুখী চলছিল। 
ঐ যে সকল কাজে নাক গলানো পাজি-জ্যাম। পান্থপথের জ্যাম।
ততক্ষণে, প্রাপ্তি ঘুমিয়ে পরেছে। সামিরাকে জিজ্ঞেস করলাম, ওখানে  কী হলো?
বদমাইশ মোসলেম তালুকদার, সাংবাদিক কবিরের সাথে হয়তো দহরম-মহরম। এদের সাথে কথা বলে লাভ হবে না।
তাই চলে আসলাম।
জ্যাম সরে গেলো। গাড়ি চলছে। ড্রাইভারকে বললাম প্রথম আলো'র গলি দিয়ে ঢুকতে।
গাড়ি চলছে। সামিরা মাথা নিচু করে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। আমি তখন ভাবছি মোসলেম তালুকদার এর কথা।  
বদলোক তার কোম্পানীর একটা প্রজেক্টের জন্য কক্সবাজার ট্যুরের আয়োজন করে। সেই ট্যুরে সামিরাও ছিলো। তখন সামিরা ঐ কোম্পানিতে ছিল।
হোটেল রুমে যা ঘটেছিল।
সেদিন তার বিচার হয় নি।
এসবের বিচার হয় না। 
আমি বামপন্থী। 

আমি বিচার চাইতে গেলে বা দু'পাতা লিখতে গেলেই লোকে বলে উঠে Enough is enough। ড্রাইভার বললো স্যার এসে গেছি। 

আমি সামিরাকে বললাম তুমি গাড়িতে থাকো।
আমি আসছি।
এগারো টায় বাসায় ফিরলাম। খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সোমবার বিকেলে।
অফিস শেষে সরাসরি বাসায় ফিরলাম।
তখনও সামিরা ফেরে নি।
সারাবাড়ি শান্ত। 
আমার মামনি প্রাপ্তির কিচিরমিচির নেই। 
দেখি ও ঘরের এক কোণে বসে আছে।
বললাম মামনি কি হয়েছে? 
এখানে কেন? মন খারাপ? 
ও কথা বলছে না। অনেকক্ষণ ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। চকোলেট দিলাম। PUBG খেললাম। তারপর দুজনে খেতে খেতে আবার জিজ্ঞেস করবো ভাবলাম–
কিন্তু জিজ্ঞেস করার আগেই ও বললো–
বাবাই, আমি স্কুলে যাবো না, নাচ শিখবো না।

সামিরা ফেরার আগেই প্রাপ্তি ঘুমিয়ে পড়লো।

রাতে আমি সামিরাকে কথাগুলি বললাম।
সামিরা বলল, ও বেশ কিছু দিন একটানা ক্লাস করছে তো, তাই  হয়তো  ভালো লাগছে না।
আমার তো অফিস আছে, তাছাড়া ঐ যে বলেছিলাম পাঁচ বছরের মেয়েটার কথা। 
এজন্য কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে। তুমি বরঞ্চ প্রাপ্তিকে নিয়ে ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকদিন ঘুরে এসো।
সাতদিন পর ঢাকায় ফিরলাম।
খুব বুঝিয়ে প্রাপ্তিকে স্কুলে পাঠালাম।
বুধবার।
সকাল ১০ টা।
প্রাপ্তি মায়ের সাথে স্কুলে গেলো। ড্রাইভার প্রাপ্তিকে স্কুলে নামিয়ে সামিরাকে অফিসে দিয়ে আসবে।

আমি অফিসের কাজে নরসিংদীর বেলাবো যাচ্ছি। আমি যখন অফিসের কাজ শেষ করে ঢাকায় ফিরছি  তখন বিকেল পাঁচটা।
কাঁচপুর ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই সামিরার ফোন পেলাম–
ফোনের ওপার থেকে শুনতে পেলাম–প্রাপ্তিকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমি আমার প্রাণ হাতে নিয়ে কীভাবে ঢাকায় ফিরলাম বলতে পারবো না–
কোথাও পাচ্ছি  না প্রাপ্তিকে।
আমার বন্ধু তানিমের ফোন–বলছিল প্রাপ্তির মত কাউকে টিভিতে দেখাচ্ছে। 
আমরা ছুটে গেলাম ঢাকা মেডিকেলে।
তখনও প্রাপ্তির নিঃশ্বাস চলছে বলে ডাক্তার জানাল।
জানতে পারলাম– কারওয়ান বাজারের কোন এক ময়লার ড্রামে ছিল। পরিছন্ন কর্মীরা হসপিটালে এনেছে প্রাপ্তিকে।
ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালো,
যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়েটি।
বিকেলে প্রাপ্তির ব্যাগ পেলাম। 
বাংলা খাতা ভর্তি লেখা ছিল-

মা,
বাবা,
টিচার-রা নাচ শেখাতে গিয়ে বুকে হাত দেয়, পিঠে হাত দেয়, পিছনে হাত দেয়। 
মা,
বাবা,
আমি স্কুলে যাব না।

তিনদিন ধরে প্রাপ্তি কোমায় আছে। 

টিচারদের নামে থানায় অভিযোগ করায় টিচারদের পক্ষে দেখলাম অনেক লোকের আমদানি। 
তাহের আলিকেও দেখলাম।
মূলত তাহের আলি  স্কুলটির অন্যতম কর্ণধার।

সেদিন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাচ্ছিল তাহের আলির বাসায়।
ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে। 
তিনি নব নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান। 

প্রাপ্তির জ্ঞান ফিরে নি এখনও, 
কথা বলছে না, 
নড়াচড়া ও করছে না।

আর সামিরা হু হু করে কেঁদে উঠলো।
বলল, আমি অনেকবার বাঁচতে চেয়েছি, 
আমি বাঁচতে চাই না আর,
প্রাপ্তিকে বাঁচাও।
ওরা আমাকে ছাড়েনি, প্রাপ্তিকেও ছাড়ছে না। 
প্রাপ্তিকে বাঁচাও।

মামলা কোর্টে উঠে গেছে।

মনগড়া ও ডিজিটাল মারপ্যাঁচে সেই রাজনৈতিক বাহুবলে তথ্য ও প্রমাণে মামলার অবস্থার পঁচাশি শতাংশ আসামিদের পক্ষে।

আগামীকালর রবিবার।
বিকেলে প্রাপ্তির জ্ঞান ফেরার কথা।
ডাক্তার প্রাপ্তিকে কেবিনে আনতে নার্সদের নির্দেশ দিল।

কেবিনে আনতেই ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ বজ্রপাতের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো।

 দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু । ঢাকা, বাংলাদেশ