অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
এ কোন্ স্বদেশ-এ কোন্ কলম? - ফরিদ তালুকদার

ক ভোর রোদে ধোঁয়া চনমনে সকাল 
দারুণ  
এমন একটা সকাল নষ্ট হয়ে যাবে শঙ্কায়
ভেবেছি আজ বোধের দুয়ারে তালা এঁটে দিবো
প্রতিদিনের মতো, খবরের পাতাগুলোতে চোখ বুলাব না আর
কিছু নামী দামী  সুবিধাবাদী চরিত্রের আদর্শকে সামনে নিবো
তারপর
শেখানো বুলির তোতা পাখি যেমন
খাঁচার মধ্যে গুটিগুটি পায়ে কাটিয়ে দেয় সারাদিন
তেমনি এক পুতুল নাচের আনন্দে সভ্য ভব্য হয়ে 
মিটি মিটি খুশির আমেজে মশগুল থেকে
গায়ে মেখে নিবো নীলাকাশ সোনালী রোদ

সান্ধ্য ভোজন শেষে ঢেকুর তুলতে তুলতে 
হেঁটে আসবো দু’ কিলোমিটার 
আর যানজটের কালো ধোঁয়া এবং
ফুটপাতের জীবন্মৃত ঐ মানুষগুলোর 
পিন্ডি চটকাতে চটকাতে ভাববো
আহ্.. দেশটা একেবারে জাহান্নাম হয়ে যাচ্ছে?

কিন্তু আমার মাথাটা যে এখনো জংলী  রয়ে গেছে
কখনোই সীমানার বাঁধনে থাকতে চায় না
কিংবা একটুখানি ঘুরিয়ে বললে
সীমা লংঙ্ঘনকারী স্বৈরোর মুখোমুখি 
ঘোরে বেঘোরে 
কেবলই দাঁড়িয়ে যায় একগুঁয়ে ষাঁড়ের মতোন।
তোষামুদির এ-তো রূপ, এ-তো গুন 
অথচ, বিজ্ঞ মঞ্চের সারিতে উঠতে 
স্কুলের ঐ পথটাই চিনলো না কোনদিন? 

এই যে খবর হচ্ছে
মনের দুয়ারে কড়া নাড়ছে একুশের বইমেলা
পড়ছি প্রতিবেদন, নিবন্ধ 
আমাদের স্বাধিকার অর্জনের স্মরণ মেলা, এখন না-কি  
পুলিশের বিবাচনে পাশ করা বইয়ের মেলা হয়ে গেছে?
আবারও বলছি, আমাদের প্রাণের একুশের বই মেলার বইগুলোকে নাকি 
এখন দূর্নীতির প্রতীক, পুলিশের প্রহরা পাশ করে তবে মেলায় ঢুকতে হয়!

না না ভুল শুনছেন না 
একটু পিছন ফিরে তাকালেই বুঝতে পারবেন
আমাদের ইতিহাসটাই যে এমন
আর্য থেকে মুঘল, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি হানাদর এবং তাদের দোসর 
এভাবেই যে আমরা পথ হাঁটছি হাজার বছর
আর এখন..??
ক্ষতগুলো আমাদের যে কেবল
কাগজের পাতায় ই থেকে যায় সব সময়!

আঁধারের কোণ থেকে ভেসে আসা 
একজন মুক্তমনা লেখকের নিঃশ্বাসে যে তা ই শুনতে পাই
তিনি বলছেন, তিনি আর বই মেলায় যেতে আগ্রহী নন!
বইয়ের মেলায় নাকি এখন ভালো বইয়ের চেয়ে,  পুলিশই বেশী
ওখানে নাকি এখন আর কেউ, অভিজিতের কথা মনে করে না
তার কোন নামও নেই কোথাও, কোন পোস্টার নেই 
তবে পুলিশের প্রহরা আছে 
শুধু মানুষের উপরেই নয়, বইয়ের উপরেও?!

খুব দ্রুত সব কিছু ভুলে যাওয়া, পাল্টে দেয়া যে আমাদের পূরণ অভ্যেস।
অভিজিতের শেষ নিঃশ্বাসেও কি আক্ষেপের এই কথাটি লেখা ছিলো?
এতোদিনে তাহলে ধন্য হলো আমাদের স্বাধীকার অর্জনের এতো ত্যাগ?
এতো রক্তের ধারায় লাল হয়ে বহতা বাংলার নদীগুলো, শান্ত হলো এতোদিনে!!

কিন্তু ছবিতে যে দেখছি মেলার সাড়ম্বর আয়োজনে
উপস্হিত কিছু বড়ো বড়ো কলম পন্ডিত? 
বিবেকের কোন্ কোন্ দুয়ার খুলে ওনারা এই মেলাকে সফল করতে এলেন?
সময়ের খোঁয়াড়ে আটক তাদের কলম কি তাহলে এখন চাটুকার?
নাকি সময়ের জোয়ারে ভাসমান লোলুপ বিবেকের ধন?

হয়তো শুধু আমার এই গোঁয়ার মাথাই তা কেবল বুঝে না
সময়টা এখন যে শুধু গা বাঁচানো চতুরতার
সময়টা এখন শুধু পুঁজির, শুধু বেনিয়ার
সময়টা এখন যে কেবল বিজ্ঞাপনের
এতোটাই বিজ্ঞাপনের যে 
বইয়ের পার্শ্ব দৃশ্য চিত্রের মোহনীয়তায়
ঢাকা পড়ে যায় প্রচ্ছদের ছবি!

হয়তো আমিই কেবল বুঝিনা, যে সাধারণ বিবেকের কাছে এখন
আমাদের কলমজীবিদের গ্রহণ যোগ্যতা একেবারেই তলানিতে 
কিন্তু তাতে তারা কিছুই মনে করেন না!

হয়তো আমিই শুধু বুঝি না, অনেক অনেক দিন হলো
কলমগুলো তাদের প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে 
কলমগুলো এখন আর বলে না
“ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো”
কলমগুলো এখন আর বলে না
“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না”
কলমগুলো এখন আর বলে না
পালাবার পথ নেই সুবোধ, হয় মরে যা, না হয় জ্বলে ওঠ

তাহলে কি আমরা সব পেয়ে গেছি?
নাকি সুবোধ মরে গেছে??
কলমগুলো এখন আর কোন সত্যকে সুন্দর মনে করে না!

হয়তো আমিই জানি না 
হতাশার নদীতে ভাসতে ভাসতে অনেকদিন হলো 
দুখিনী দেশ মাতা এখন ভাষাহীন আশাহীন 
একুশের বই মেলার এমন আয়োজনে ও তাই
নিরুত্তাপ থাকে তার শোকাহত বুকের আগুন!

মনে পড়ে আশির দশকের সেই উত্তাল তরঙ্গের দিনগুলো
নূর হোসেন, বসুনিয়ার রক্তে রাজপথে কোণঠাসা স্বৈরাচার 
প্রিয় কবি শামসুর রহমানের কবিতার লাইন
“উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়”

কেউ কি আমাকে বলতে পারবে 
কোন পিঠে সওয়ার এখন প্রিয় আমাদের জন্মভূমি?!

ফরিদ তালুকদার । টরন্টো, কানাডা  
ফেব্রুয়ারী ১১, ২০২০