অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু সরকার, যুদ্ধশিশু ও দত্তক প্রথা সম্পর্কে অজানা কথা - মুস্তফা চৌধুরী

স্বাধীনতা সংগ্রামকালে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ইতিহাস কমবেশি সবার জানা আছে। বিশেষ করে, যারা ষাটের উর্দ্ধে তারা বাংলাদেশের তেতুলিয়া থেকে টেকনাফের গ্রামে, গঞ্জে,  শহরে পাকসেনা কর্তৃক অগনিত নারী হত্যা, নির্যাতন, ও ধর্ষণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষদর্শী, গত ৪৯ বছরে স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর অগনিত গবেষণা হয়েছে। সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচার থেকে শুরু করে বাঙ্গালীর আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন ও বিজয়ের উল্লাসের কাহিনী বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু একথা অস্বীকার করা যায় না যে, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ-এর ইতিহাস নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও নারী ধর্ষণের ফলশ্রুতিতে  জন্ম নেয়া যুদ্ধশিশুদের কোন মৌলিক গবেষণা হয় নি। যুগে যুগে ঐতিহাসিকরা বলে গিয়েছেনঃ “History is not concerned with the quality of the past, but with the past as such, whatever it might be.”

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনেক শূন্যস্থান রয়েছে ।  যেখানে হাজার এবং লাখো বাঙ্গালী পুরুষ-নারী-শিশু প্রাণ বিসর্জন দেন। যথার্থ নথিবদ্ধকরণ না হওয়ায় যৌন অপরাধ, ধর্ষণ ও ধর্ষণের শিকার কত হাজার ছিল, তাও ইতিহাসের আপেক্ষিকতায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বলা যায়, ঐতিহাসিকদের হাতে যা কিছু সাক্ষ্য প্রমানাদি রয়েছে তার বাইরে আর কিছু নেই।

এত বছর পর ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জবরদস্তিমুলক গর্ভধারণ, গর্ভমোচন, জন্ম, মৃত্যু, পরিতাক্ত হওয়া যুদ্ধশিশুদের দত্তক গ্রহন পর্যন্ত সকল ঘটনাবলি মিলে ১৯৭১-১৯৭২ সালের এক অলিখিত, অজ্ঞাত ইতিহাসের অধ্যায় আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাসের টুকরো এসব অঘটন। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর ক্ষমতাসীন সরকার স্বাধীনতা আন্দোলন এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলির ওপর কালো পর্দা টেনে দেন। বাংলাদেশের জনগণ বহু বছর যাবত যুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক অধিকৃত বাংলাদেশের নারীদের উপর অত্যাচার ও ধর্ষণের ভয়ঙ্কর ঘটনাবলী এক রকম অগ্রাহ্য করেছে। মনে হয়, যেন এক ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঘটনাপঞ্জি থেকে যেন ঐ অন্ধকার  দিনগুলো মুছে দেয়া হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্ধকারাছন্ন অধ্যায় থেকে নিজেদের যারা সরিয়ে নিয়েছেন, তাদের কেউই কিন্তু তেমন লাভবান হননি, এতে কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসের একাংশ অনালোকিত রয়ে গিয়েছে। কিছু কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সত্যও মানুষের চোখের আড়ালে থেকে গিয়েছে। আমাদের জানা আছে মাইলাই হত্যাকাণ্ড, যাকে বিয়োগান্তক বা শোকাবহ অভিজ্ঞতা বলা হতো। প্রথম দিকে আমরা এটাও জানি যে, পরে ইতিহাসের আলোকে সেটা একটি, ‘ঘটনায়’ পর্যবাসিত হয়েছিল। তেমনি বাংলাদেশি নারীদের ধর্ষণ বলাৎকার ও বিকৃত কামচরিতার্থ   করতে ব্যবহারের ঘটনাবলী সকলেই ক্রমশঃ ভুলে গিয়েছিল। ভুলেনি কেবল কয়েকটি নারী সংগঠন ও নারী লেখক সংঘ। এ কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে না যে, বাংলাদেশের জাতির বিবেক থেকে যুদ্ধশিশুদের জন্ম ও তাদের জীবনে ইতিহাস এক রকম মুছে ফেলা হয়েছে।

বাস্তবিকপক্ষে বলা যেতে পারে যে, যুদ্ধশিশুদের অবিদিত ইতিহাসের কোন তথ্যই বাংলাদেশে কোন সমাজচিন্তক ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের পাঠক ও ইতিহাস গবেষকদের কাছে নেই। কিন্তু, আমরা জানি যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ডেনমার্ক, সুইজারলান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতে যুদ্ধশিশুদের আন্তর্জাতিক ও আন্তবর্ণনীয় দত্তকায়নের বিষয়ে দুর্লভ ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিলাদি রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রন্থগার  ও আর্কাইভসে এ যুদ্ধশিশু বিষয়ে কোন নথিপত্র নেই,  এমন কী মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরেও নেই। সম্প্রতি কানাডীয় দত্তকগ্রাহী বাবা-মা, ফ্রেড ক্যাপাচিনো ও বনি ক্যাপাচিনো মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরে শিখা ক্যাপাচিনো দত্তক নেয়ার বিষয়ে যেসব দলিলাদি তাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল, সেগুলো যাদুঘর কর্তৃপক্ষকে দান করেন।

বিচারপতি কে এস সোবহান, যিনি ১৯৭২–এ নারী পুনর্বাসন বোর্ডের দায়িত্বে ছিলেন, ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে এক সাক্ষাৎকার আমাকে বলেছিলেন যে, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে পরবর্তি সরকারগুলো যুদ্ধশিশু ও বীরঙ্গনাদের বিষয়ে যেসব প্রাসঙ্গিক দাপ্তরিক নথিপত্র ছিল, তার সবগুলোই পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেয়।  

যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশে পা দিয়েই বঙ্গবন্ধু দেখতে পান নবজাত শিশুদের করুন অবস্থা। তিনি খেয়াল করেন কীভাবে প্রথমদিকে বাংলাদেশের মানুষ ঐ শিশুদের প্রতি নির্মম ও উদাসীন মনোভাব দেখিয়েছিল। ১৯৭২ এর খবরের কাগজে নবজাত যুদ্ধশিশুদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল নানাভাবে। যেমন- ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ শিশু, ‘অপ্রবঞ্চিত’ শিশু, ‘অবাঞ্ছিত ’ শিশু, ‘বেজন্মা’, ‘পরিত্যক্ত’ শিশু, ‘অনিস্পীত’, ‘জারজ’ সন্তান এবং ‘শত্রু’ সন্তান। হাজার বছরের ঘুণে ধরা সমাজের আষ্ঠে-পৃষ্ঠে যে কুসংস্কার ও রক্ষনশীলতা জমে আছে, সেই ক্ষুদ্রতা ও কূপমণ্ডূকতার বেড়া ভেঙে আলোর পথে কোনো বাংলাদেশি সেই ‘অবাঞ্ছিত’ শিশুদের কলে তুলে নিতে পারে নি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীর এ সময়ে আমি গভীরভাবে তাকে স্মরণ করছি। আরও স্মরণ করছি, বঙ্গবন্ধু কালক্ষেপন না করে ১৯৭২ সালে যখন নবজাত যুদ্ধশিশুরা ছিল ব্যাপকভাবে ঘৃণিত, অবহেলিত এবং প্রত্যাখ্যাত, তখনি যুদ্ধশিশুদের মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে আইনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ১৯৭২ সালে জেনেভাস্থ International Social Services (ISS) এর কয়েকজন উপদেষ্ঠা বাংলাদেশে যুদ্ধশিশুদের দত্তক বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা আসেন এবং বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট শিশু কল্যান প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পরিত্যাক্ত যুদ্ধশিশুদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন।

বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন সোনার বাংলা গড়তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তখনি আবার তাকে নানা ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল নিরন্তর। একদিকে যেমন গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের চাপ ছিল, তেমনি সরকারকে অন্যদিকে ‘অনাথ’ ও ‘অবাঞ্চিত’ যুদ্ধশিশুদের নিয়ে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়েছিল। বছরের প্রথম থেকে যখন যুদ্ধশিশুর জন্ম হওয়া শুরু হলো, জন্মদাত্রী মায়েরা তাদের সাথে সাথে পরিত্যাগ করেছিলেন। যেহেতু সমাজ সেসব শিশুদের চায় নি, বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার সরকারকেই তাদের লালন-পালন ও দেখাশুনার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। অত্যান্ত দক্ষতার সাথে বঙ্গবন্ধু দেশের ঝুঁকিপূর্ণ মানবগোষ্ঠির মধ্যে যুদ্ধশিশুর ইস্যুটাকে তার পরিকল্পনাতে একটি জরুরী আলোচ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করেন।

যুদ্ধশিশুদের জন্মের ইতিহাসে গভীর কলঙ্কের দাগ রয়েছে। তাতে ঐ শিশুদের বাংলাদেশে গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানো অথবা দত্তক নেয়া একরকম অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উন্নত সমাজ ব্যবস্থায় যেমনটি হয়, তার বিপরীতে বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে অনাথ শিশুদের লালন-পালনের দায়িত্ব শিশুর বর্ধিত পরিবারের উপর পড়ে। আরও বেশী যেটা ঘটে, সেটা হলো কারও ব্যাক্তিগত দয়া-দাক্ষিন্যের ওপর এরকম এতিম শিশুদের দেখভালের দায় পড়ে, বঙ্গবন্ধু  সেটি বুঝতে  পেরেছিলেন। দেশ তখন নতুন মাটিতে পা রেখেছে। মোকাবেলা করছে অত্যান্ত গভীরভাবে প্রথিত এক সামাজিক ইস্যুর। শুরু থেকেই ব্যপকভাবে যুদ্ধশিশুদের পরিত্যাগ, সরকারকে  অস্বস্তিতে ফেলে দেয় । যে হারে যুদ্ধশিশুরা জন্ম নিচ্ছিল নানা মাতৃসদনে, শহরে বন্দরে, বিলে-কান্দারে তার কোনো পরিসংখ্যান কারও কাছে ছিল না। বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে যেমন শিশুর জন্ম ইতিহাস অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন, তেমনি কিন্তু এসব যুদ্ধশিশুদের বেলায়ও তাদের জন্মদাতা বাবাদের অনুপস্থিতিতে, তাদের গ্রহণযোগ্যতা সামাজিকভাবে ছিল না বললেই চলে। এমতাবস্থায় তাদের জন্মদাত্রী মায়েরাও অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুদের পরিত্যাগের মাধ্যমে তাদের নিজেদেরকে জঞ্জালমুক্ত করতে চেয়েছিল। ব্যাক্তিগতভাবে বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল।

তিন মাসের মাথায় International Social Services (ISS) বংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে আন্তর্জাতিক ও আন্তবর্নীয় দত্তক প্রক্রিয়াকে একটি কার্যকরী বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে সুপরিচিত করে। চুড়ান্ত পরামর্শসমূহ পাবার পর, সরকার সেগুলির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেন এবং সরকারের প্রশাসন ঐক্যমতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আরেক দফা আলোচনা করেন। তারপর বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশমালায় তার অনুমোদন দেন।

যুদ্ধশিশুদের ‘মানব-সন্তান’ আখ্যা দিয়ে বঙ্গবন্ধু এ সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে, পরিত্যক্ত যুদ্ধশিশুদের বাঁচার মতো মৌলিক অধিকার রয়েছে। কালক্ষেপণ না করে যাদের উপর দায়িত্ব ন্যাস্ত ছিল, তারা যখন সামনে এগিয়ে এলো, তারা একঝাক প্রশ্নের সম্মুখীন হোন। ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, সামাজিক বাস্তবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে নিজেকে অনেক প্রশ্ন করেছিলেন । তার মন্ত্রিসভায় সহকর্মীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ দত্তক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রন করা হবে কীভাবে? জন্মদাত্রী মায়েরা নবজাতকদের পরিত্যাগ করার ব্যাপারটা কীভাবে নিবেন? তার ফালাফল কী দাড়াবে? সরকারকে বলা হয়েছিল যে, শিশুদের দত্তকগ্রাহি মা-বাবার নিকট হস্তান্তর চূড়ান্ত করতে সর্বপ্রথমে যা করতে হবে, সেটা হলো এ বিষয়ক একটি নতুন আইনের খসড়া চুড়ান্ত করা, অর্ডিন্যান্সটি যথাশিগ্রই জারি করা। একটি আইনি নির্মাণ কাঠামোর প্রয়োজন হবে, যার সাহায্যে যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেয়া আইনসম্মত করা হবে। একবার দত্তকায়নের উদ্যোগে এই শিশুদের পরিত্যক্ত শিশু হিসাবে গণ্য করা হলে স্বাভাবিকভাবে সরকারকে আইনগতভাবে তাদের অভিভাবক হিসাবে গণ্য করা হবে। পিতামাতাহীন শিশুদের আর কখনও “পরিত্যাক্ত শিশু” বলা হবে না । সরকার শুরু থেকেই অবগত ছিলেন যে, এ বিষয়ক আইন তৈরির প্রক্রিয়াটি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগের জন্যই সম্ভব হয়  Bangladesh Abandoned Children (Special Provision) Order, 1972  অর্ডিন্যান্সটির প্রণয়ন। এই ওর্ডিন্যান্স এর মাধ্যমেই নিগৃহীত যুদ্ধশিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায় এবং তাদেরকে দত্তকায়নের সুযোগ করে দয়া হয় । সরকারি নথিপত্র এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আইনে এ বিশেষ অর্ডারটি প্রস্তুতকালেও তারা ঐ মৌলিক নীতি ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে’ শব্দবন্ধ এর বাণী ও তাৎপর্য দ্বারা অনুপ্রাণিত ও পরিচালিত হয়েছিলেন।

১৯৭২ এ অর্ডারটির উপর ভিত্তি করেই শুরু হয় আন্তর্জাতিক ও আন্তবর্নীয় দত্তকায়ন । ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ১৫টি যুদ্ধশিশু নিয়ে শুরু হয় দত্তক প্রক্রিয়া। প্রথম ব্যাচটি গিয়েছিল কানাডাতে ।  যুদ্ধশিশুরা কীভাবে বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে, তাদের নতুন আবাসে দত্তকগ্রাহী বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য তাদেরকে নিজেদের সন্তানরূপে লালন পালনের সংকল্প  নিয়ে কীভাবে বুকে জড়িয়ে ধরেন, সেটা আমরা জানিনা । আমরা শুধু জানি, স্বাধীনতাত্তোর  বাংলাদেশ থেকে অগনিত  যুদ্ধশিশুদের দত্তকায়নের মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে লালিত পালিত হওয়ার জন্য।

যদিও আজ ৪৯ বছর পার হয়ে গিয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের, আজ অবধি আমরা যে সব হত্যাকাণ্ড যুদ্ধশিশুরা বাংলাদেশের বাহিরে দত্তকায়নের মাধ্যমে যেতে পারে নি, তারা আজ কোথায়? আমরা জানি, স্বাধীনতাত্তর বাংলাদেশ তাদের জন্মধাত্রি মাদের যেমন মাথা গুঁজার স্থান ছিল না, তেমনি সেসব মাদের ‘অনাকাঙ্কিত’ শিশুদেরও ছিল না কোন নিরাপদ আশ্রয় । চরম বৈরী পরিবেশে জন্ম  নেয়া আশ্রয়হীন যুদ্ধশিশুদের দায়িত্ব নেবার মত কাজটি সে সময় বাংলাদেশিদের কাছে অচিন্তনীয় এবং অনভিপ্রেত শিশুরা ছিল অনাদেয়।

সমাজের নিম্মস্তরের দারিদ্র যেখানে নির্মম সেখানে যুদ্ধশিশুদের যে সমাজ বর্জন করেছিল, সে সমাজে বিষয়টি অস্বাভাবিক হিসাবে কখনও দেখা হয়নি। বস্তুতঃপক্ষে হৃদয়হীনতার বিপরীতটি দারিদ্রের পক্ষে স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে বাস করার যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, সে বিষয়েও কেউ কোনো জোর দাবি করেন নি। সামাজিক স্তরবিন্যাসে তাদের জায়গা কোথায়?

বাংলাদেশি সমাজে যেহেতু যুদ্ধশিশুদের বিষয়ে তেমন কোন উৎসাহ দেখা দেয়নি, এ কথা বলা যেতে পারে যে, তারা ভবিষ্যতে উৎসাহ দেখাবে বলেও মনে হয় না। সেদিক দিয়ে দেখলে এটা সহজেই অনুমেয় যে, যুদ্ধশিশুরা কেন আত্মপরিচয় দিতে  অনাগ্রহী । ২০১৪ সালে ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক ১৯৭১ এর ধর্ষণের শিকার নারী ও যুদ্ধশিশুদের জাতির ‘শ্রেষ্ঠ সন্তান’ বলে আখ্যা দিয়ে সরকারকে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার নির্দেশ দেন। পরিতাপের বিষয়, বঙ্গবন্ধু যাদের জন্য ১৯৭২ সালে লালন পালনের আইনি উদ্যোগ  নিয়েছিলেন; তাদেরকে এখন ‘শ্রেষ্ঠ সন্তান’ বলে আখ্যায়িত করলেও, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসন বা ‘৭০ এর দত্তকায়নের ফলাফল দেখে যেতে পারে নি ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায়ের প্রেক্ষিতে আমি বাক্তিগতভাবে আশা করেছিলাম যে, বাংলাদেশিরা যুদ্ধশিশু বিষয়ে এত বছরের সামাজিক নিষ্ঠুরতা  প্রত্যাখ্যান করে সামাজিক দায়িত্বভার গ্রহনের ব্যপারে সচেতন হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ছয় বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও কোন যুদ্ধশিশু নিষ্ঠুরতার বেড়াজাল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে নি।  যারা মনোজ্বালা নিয়ে বেঁচে আছে, যাদের গৃহ নেই; যারা  সর্বহারা মানবিক অধিকার থেকে চিরবঞ্চিত; সামাজিকভাবে বৈষম্যতার শিকার; জীবনের আরম্ভ থেকে তারা হয়ত দারিদ্রপীড়িত জনগোষ্টির মধ্যেই মিলেমিশে আছে । যুদ্ধশিশু হিসাবে তাদের পৃথকভাবে পরিচিত হবার কোন দাপ্তরিক রীতি-প্রক্রিয়া নেই। ফলে একের পর এক সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের ভাগ্য উন্নয়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় নি। পরিতাপের বিষয় ছয় বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও একটি যুদ্ধশিশুও বেরিয়ে এসে তার আত্মপরিচয় দেয় নি। তারা ভয় করে যে, তাদের প্রকৃত পরিচয় জানলে তারাও বা তাদের পরিবারের সদস্যরও সমাজে বৈষম্যের শিকার হবে।

বাংলাদেশিরা কি সামাজিকভাবে তাদেরকে আলিঙ্গন করে বুকে  তুলে নেয়ার জন্য এখন প্রস্তত? বা আমরা কি সত্যিকার অর্থে আলোকিত হয়েছি? জন্মদাতা পিতার কথা ভাবলে মনে পরতে পারে তাদের মা’দের নৃশংসভাবে বলাৎকার কথা, তাদের পাপাসিক্ত জন্মদাতা বাবা’দের তারা কি বিচার চায়? তারা কি কখনও সহজভাবে গ্রহন করতে পারবে মনুষ্যত্বের অবমাননা?

নিঃসন্দেহে এসব প্রশ্নের উত্তর সহজলভ্য নয়। আমাদের যেসব যুদ্ধশিশু দেশের বাহিরে লালিত-পালিত হয়েছে তাদের কথা যদি ভাবি বা যারা বাংলাদেশে পরিবারহীনভাবে বেড়ে উঠেছে, তাদের আসল পরিচয় গোপন রেখে বা সচেতনা বজায় রেখে- নতুন, তথ্য উদঘাটন করা কি সম্ভব হবে!

এ কথা ভাবলেই আমাদের পীড়া দেয় যে, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক উদ্যোগেই Bangladesh Abandoned Children [Special Provision] Order 1972  প্রণয়ন সম্ভব হয়েছিল; যার ফলে বৈধভাবে দত্তক নেবার পথ প্রশস্থ হয়। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ এবং পূর্ব পাকিস্তানের দত্তক নেবার ব্যাপারে কোনো আইনিই ছিল না। কাজেই এই  আইনী উদ্যোগ বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনকালের মধ্যে অন্যতম সেরা অর্জন এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ বটে। অথচ দুর্ভাগ্যজনক, আজ পর্যন্ত জাতির জনকের এই সেরা অর্জন ও দূরদর্শী পদক্ষেপটি সম্পর্কে কোন কিছু লেখা হয়নি, কিংবা সেদিক দিয়ে বিচার করলে বলতে হবে যে, আমরা যুদ্ধশিশু নিয়ে গবেষণার বিষয়ে এখনও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছি। একথা স্বীকার্য যে, যুদ্ধশিশু ও বীরঙ্গনা বিষয়টি অতান্ত সংবেদনশীল, জটিল এবং গবেষণার পথ অনেক প্রতিবন্ধকতাপূর্ন।

যেসব যুদ্ধশিশু বাংলাদেশের বাইরে তাদের দত্তকগ্রাহী বাবা-মা’র বাড়িতে লালিত পালিত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আমরা কতোটুকু জানি। আমরা কি জানি, দত্তকায়িত যুদ্ধশিশুরা তাদের জন্মের ইতিহাস কতোটুকু জানে? তারা কি জানে, তাদের জন্মদাত্রী ধর্ষিত মা’দের করুন কাহিনী ও তাদের অভিশপ্ত জীবনের অলিখিত ইতিহাস?  

তাদের বংশগত পরিচয় কি? তারা কি পাকিস্তানি? না বাংলাদেশি? না যে দেশে লালিত পালিত হয়েছে সে দেশী? যার জন্মদাতা মা সমাজ রীতি বিরুদ্ধে কামুকতার শিকার, যার জন্মদাতা বাবা লম্পট ও বিকৃত মানসিকতার মূর্তিমান প্রতীক, তার অন্তরজ্বালা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারবো? তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যতো সহজ স্বাভাবিকই হোক না কেন, তাদের জন্মদাত্রী মা’র কথা স্মরণ করলে তাদের মনে ভাসতে পারে, মা’দের জবরদস্তিমুলক গর্ভধারণ ও গর্ভযন্ত্রনার কথা জনসম্মুখে প্রচার করা হয়নি।

যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্ত্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের যে অজানা দিক রয়েছে, সে দুর্জয় বিষয়ে গবেষণা করে যে সব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি, সেই বিদিত অংশটুকু আমি ৭১ এর যুদ্ধশিশুঃ অবিদিত ইতিহাস  নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছি। এ মুহূর্তে আমাদের যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন সেটা হলো যুদ্ধশিশু বিষয়ে ব্যপক গবেষণা।  

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যুদ্ধশিশুদের গবেষণাধর্মী ইতিহাস এক উচ্চতর মানবিক চেতনাকে উজ্জীবিত এবং শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। সেগুলো বর্তমান একুশ শতকের পরিস্থিতিতাড়িত বিপর্যস্ত মানুষের মনে নতুন অনুসন্ধিৎসা, আশা, ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা ও মানব কল্যাণের সর্বোৎকৃষ্ট মতবাদ গ্রহনের আগ্রহ জাগাবে।

মুস্তফা চৌধুরী  
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও লেখক
অটোয়া , কানাডা 
ইমেইলঃ mustafa.chowdhury49@gmail.com