অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
ক্লাব হিমালয়ার হিমেল পরশে – চিরঞ্জীব সরকার

     হিমালয়ের দেশ নেপাল।আমাদের দেশ থেকে খুব একটা দূরে নয়। কাছে কিছু থাকলেই যে সেটা দেখা হয়ে যাবে তা কিন্তু সবসময় সত্যি নয়। তাইতো গুনীজনেরা একথা বলে গেছেন “বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।“ পাশের দেশ হিমালয় কন্যা নেপালের বরফগলা বারিবিন্দু না দেখা আর ধানের শিষে ভরকরা টলটল শিশরবিন্দু না দেখা তো একি সূত্রে প্রোথিত। ১৯৯৯ সনের ডিসেম্বরে আমরা ফরেন সার্ভিস একাডেমী থেকে বারজন ঢাকা থেকে আকাশপথে রওহনা দিলাম কাঠমুন্ডুর পথে। আকাশযান অবতরনের পর চারদিকে পাহাড়েঘেরা ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিকে সেদিন অসম্ভব সুন্দর মনে হচ্ছিল।২০১৮ সনে ইউএস বাংলা ফ্লাইট বিএস ২১১ দূর্ঘটনার পর বুঝতে পারলাম এভিয়েশনের সিকিউরিটির দিক থেকে এটি একটি অত্যন্ত ঝুকিপূর্ন বিমানবন্দর। কোন কারনে হিসাবে একটু ভুল হলেই প্লেনের উঠা এবং নামার সময় বিপর্যয় ঘটে যাতে পারে। সৌন্দর্যের আড়ালেও অনেক সময় বড় বিপদ লুকিয়ে থাকে। “মনিনা ভূষেন সর্পেন কিম্ অসৌ ন ভয়ংকর”-অর্থাৎ সর্পের মাথায় মনি থাকলেও সেটা কি ভয়ংকর নয়।
     নেপাল দেশটি অনেক কারনেই আমাদের খুব পরিচিত।বিশাল হিমালয় পর্বতের পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেষ্টের (ঊনত্রিশ হাজার ঊনত্রিশ ফুট ) দেশ নেপাল। এ এভারেস্টের আবার উচ্চতা নির্নয় করেন তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রশাসনের জরীপ বিভাগে কর্মরত বাঙ্গালি গনিতবিদ রাধানাথ শিকদার।চীন ও ভারতের মাঝে অবস্থিত দেশটি বহুলাংশে পর্বতময়।মহামতি বুদ্ধ এ দেশটিরই কপিলাবস্তু নগরের লুম্বিনী নামক জায়গায় মাতা মহামায়াদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহন করেন। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদও উদ্ধার হয় নেপালের রাজকীয় লাইব্রেরী থেকে। “১৯৪২ –এ লাভ স্টোরী” নামক বলিউডের একটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করে নেপালী অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা একটা সময় খ্যাতির তুঙ্গে উঠেছিলেন। সে ছবির একটি গান “পেয়ার হুয়া চুপকেছে’ –তে মনীষাকে দেখলে আজকে কে বলবে সে আজ ক্যানসারের সাথে লড়ছে। বাংলাদেশের প্রথম ডিভিশন ফুটবল লীগে নেপালী খেলোয়াড় গনেশ থাপা একটা সময় বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। এছাড়াও নেপালের বহু ছাত্রছাত্রী আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নে নিয়োজিত আছে।
     পর্যটকদের স্বর্গ নেপাল বিশেষ করে যারা মাউন্টেনিয়ারিং-এর জন্য আসে। নেপালের পর্বতগুলোর পাদদেশ ঘিরে রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর লেক যেমন পোখারার লেক। এছাড়াও এদেশে রয়েছে জঙ্গল, সমতলভূমি ও উপত্তকা। তবে নেপালে সবচেয়ে যেটা সুন্দর রয়েছে সেটা হল এক সহজ সরল জীবনের নিস্তরঙ্গ ছন্দের সাবলীল প্রবাহমানতা। পশ্চিমা দেশের অনেক পর্যটক যারা পারিবারিক সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত তাঁরা অনেক সময় নেপালের কোন গ্রামে গিয়ে কোন একটা পরিবারের সাথে থেকে তাঁদেরি সাথে জীবন কাঁটাতে থাকে অনেকটা পরিবারের সদস্যদের মতই। এ ‘হোমস্টে টুরিজ্যম’ নেপালে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে গৃহস্থালী কর্মে ঐ পরিবারের সাথে সামিল হয়ে এ ধরনের পর্যটকেরা পারিবারিক আত্মিক বন্ধনের স্বাদ নিয়ে থাকে। একি সাথে তারা সুযোগ পায় ধীরে চলা গ্রামীন জীবনকে সাক্ষাত অনুধাবনের। নেপালে পর্যটকদের অনেকটা দেবতাজ্ঞানে দেখা হয়।রাজনৈতিক চরম অস্থিরতার মাঝেও কোন পর্যটক আক্রান্ত হয়েছে এরকম খবর তেমন একটা আজ পর্যন্ত নেই।
     ২০১৫ সনের এপ্রিলে ঘটে যাওয়া প্রবল এক ভূমিকম্পে রাজধানী কাঠমুন্ডুসহ সারা নেপালের অনেক স্থাপত্য ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়।যদিও সেগুলি একটু একটু করে পুনঃনির্মান করা হচ্ছে তবুও সেগুলিতে আর প্রাচীন ফ্লেভার পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। কাঠমুন্ডুর থামেল এরিয়া, দরবার স্কোয়ার, নারায়ননিথি প্রাসাদ,সার্ক সেক্রেটারিয়েট এগুলি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এখানে উল্লেখ্য যে ২০০১ সালের ১ জুন এ নারয়ননিথি রাজ প্রাসাদেই নেপালের তৎকালীন রাজা বিরেন্দ্র, রানী ঐশ্বর্যসহ নেপাল রাজপরিবারের বারজন সদস্য এক পারিবারিক ডিনারে প্রাসাদ হত্যাকান্ডের শিকার হন। এ হত্যাকান্ডের মাঝেই নেপালের রাজতন্ত্রের বিদায়ের ঘন্টা বাজতে বাজতে একটা সময় থেমে যায়।এরপর অনেক চড়াই উৎরাইয়ের পর দেশটি এখন ডেমোক্রেসির পথে হাঁটছে।
     কাঠমন্ডুতেই রয়েছে শম্ভুনাথ ও পশুপতিনাথ নামক দুটি বিখ্যাত মন্দির। এক সন্ধ্যায় বাগমতি নদীর অপর পারে বসে এপারের পশুপতিনাথ মন্দির দেখছি। ছোট্ট নদীতে ছোট ছোট সলতেতে প্রদীপ জ্বালিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে ভক্তরা। প্রদীপগুলি মিটমিট করে জ্বলে ভেসে যাচ্ছে নদীর মৃদু স্রোতে। আর এক পাশে চিতার আগুনের নীল ধোঁয়া আকাশে মিশে যাচ্ছে। আমি এপাশে বসে এসব দেখছি আর ভাবছি জীবনের নশ্বরতার কথা। জীবনের হাটের লেনদেন যেদিন বন্ধ হয়ে যাবে সেদিন এহাটে হবেনা কোন লেনদেন, হিসাবের খাতায় জমা হবে না একটা পয়সাও। যাদেরকে ছাড়া ভাবতাম কিভাবে চলব,তাঁরাও সব আমাকে রেখে চলে যাবে চিরতরে। একদা পরিব্রাজক সাধু দত্তাত্রেয় বহু নগর, বন্দর, শস্যক্ষেত্র, খনি, জঙ্গল, উপত্যকা,পাহাড় পর্বত পেরিয়ে মহারাজ ঋতকেতুর রাজ্যের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে সরাসরি রাজাকে বললেন আপনার এ ধর্মশালায় (যেখানে বিনামূল্যে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে) আমি কি দুরাত থাকতে পারি। রাজা সাধুর কথায় অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন আপনি কেন আমার রাজপ্রাসাদকে ধর্মশালা বলে ছোট করছেন। আপনি একজন পরিব্রাজক সাধু, তা আমার এ বিশাল সাম্রাজ্য,প্রাসাদ সম্বন্ধে আপনার কোন ধারনা আছে বলে আমার মনে হয় না।  আপনার কথা প্রত্যাহার করুন।দত্তাত্রেয় তখন বললন হে রাজন, আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে এ প্রাসাদে আমি এসেছিলাম। আপনার প্রপিতামহ তখন এ রাজ্যের রাজা ছিলেন। তাঁর বিশাল ছবি দরবার হলে ঝোলানো ছিল। আপনার তখন জন্মও হয়নি। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে যখন আপনার বাবা এখানের রাজা ছিলেন তখনও আমি আরও একবার এখানে এসেছিলাম। আপনার বাবার মাথায় কারুকর্যকরা পাগড়িটির কথা এখনও আমার মনে আছে।  আপনার সে বাবা আজ কোথায়। সবাই তো ধর্মশালার মত এ প্রাসাদে দুদিন থকে আবার চলে যাচ্ছে। আত্মজ্ঞান লাভ করে রাজা ঋতকেতু একধরনের আনন্দ অনুভব করলেন এবং এটাও বুঝলেন প্রকৃত আনন্দানুভূতি হল আত্মিক যার সূচনা হয় বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে।
     পরের দিন আমরা গেলাম ভক্তপুরে। অনেকগুলি প্রাচীন মন্দির রয়েছে এখানে। এখানে ঘুরলে মনে হয় যেন সময় নিয়ে গেছে কত শতাব্দী পূর্বের সমৃদ্ধ এক জনপদে। এরপর আমাদের যাত্রাপথ নাগরকোট। আশ্রয় হল ক্লাব হিমালয়ায়। রাতে একাকী দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ী শহরের বাতির আলোকরশ্মি দেখছিলাম। এ যেন এক অন্য মায়াবী জগত যে জানান দিচ্ছে পাহাড়ের বুকে লেগে থাকা অন্য এক নগড়ের কথা। আমারও মনে হচ্ছিল মিটমিট করা ওপারের আলোকসাগরে আমিও যদি এখন ভেসে যেতে পারি। পরেরদিন সকালে প্রত্যক্ষ করলাম হিমালয়ের শৃঙ্গে প্রভাতের রক্তবর্নের অপরূপ সূর্যোদয়। প্রতিমিনিটে যেন পর্বতশৃঙ্গের সাদা বরফের আভা সূর্যালোকে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। বিশাল হিমালয়কে হিমেল সকালের সে ক্লাব হিমালয়ার খোলা রেলিং-এ দাঁড়িয়ে অতীব ক্ষুদ্র আমি মনে মনে ভাবছিলাম আমরাওতো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছি আমাদের কুহেলিকাময় জীবনের এ রহস্যময় যাত্রাপথে।

চিরঞ্জীব সরকার। অটোয়া, কানাডা