অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
মাছি - খুরশীদ শাম্মী

মাছি

খুরশীদ শাম্মী

ভোরের কোমল আলোতে গা ডুবিয়ে বাদশা ফকির কলকিতে তামাক সাজিয়ে, টিক্কা জ্বালিয়ে কলকির তামাকের উপর রেখে বাড়ির খোলা বারান্দার মাটি লেপা মেঝেতে বসে। কিছুক্ষণ পর পর সে নারিকেলের মালার হুঁকায় লম্বা একটা  টান দেয়, আর আপন মনে মাথা দুলিয়ে, আল্লাহু! আল্লাহু! জিকির করে আনমনে। শেষ রাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় তার ছোট ছোট চোখ দু’টো দেখতে ঠিক লাল করমচার মতো হয়েছে। মুখ ভর্তি সাদাকালো দাড়ি-গোঁফ। মাথায় তার লম্বা চুলের জট। পরনে তার একটা ছেঁড়া সবুজ ফতুয়া আর সবুজ লুঙ্গি। আল্লাহু, আল্লাহু জিকিরের সাথে এক অজানা উৎস থেকে আগত দোতারার ধ্বনি সকাল সকাল তার জিকিরকে শ্রুতি মধুর এবং নান্দনিক করে তোলে। সে চোখ খুলে চারদিকে তাকায়। কেউ নেই। আবার চোখ বন্ধ করে হুঁকায় টান দিয়ে হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কোন শব্দ নেই। আবার সে আল্লাহু, আল্লাহু জিকির শুরু করে। আবার সে দোতারার ধ্বনি শুনতে পায়। এবার বাদশা দোতারার ধ্বনির উৎস খোঁজে মনে মনে। কিন্তু চারদিকে কেউ নেই। কে বাজাবে দোতারা? তার বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ থাকে না। মনে মনে সে ভাবে, গত রাতের নেশা কাটেনি এখনও!

এবার সে হাসে। শব্দ করে হাসে। নিজেই ছন্দ করে একা একা বলতে থাকে, বাংলা মদ! গাঁজা, আফিম আর ভাং খাইয়া  মাঝ রাইত পর্যন্ত মাজারের উরসে দফায় দফায় জিকির আর সুফি গান গাওয়া কি আমার জীবনে আইজ প্রথম? আমার বোলে নেশা কাটে নাই! হোনছো তোমরা? আমার মন এইডা কি কয়!

সারারাত এমন করে সে এবং তার দল প্রায়ই মাজারে জিকির করে। মাঝে মাঝে দল নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঘুরে মুর্শিদী, জারী, বাউল, মাইজভান্ডারি গান করে। আধ্যাত্মিক গানের আসর ডাকে নিজের বাড়িতেও। এমন করে নিজের মনের টানে অজানা অচেনা মানুষের আপন করে তাদের সাথে ঘুরে ঘুরে মনের শান্তির উৎস খুঁজতে বেরিয়ে সে হারিয়েছে নিজের সংসার। ভাই-বোন, চাচা-ফুপু, মামা-খালা কেউ তার খবর রাখে না। তার পৈত্রিক সম্পত্তি এই বাড়ি ছাড়া  আর কিছুই নেই।
  
ভাবনার দেয়াল ডিঙিয়ে আবার তার কানে ভেসে আসে দোতারার ধ্বনি। একবার, দুইবার এভাবে প্রায় কয়েকবার। শব্দের উৎস বুঝতে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চারপাশে আবার ভালো করে দেখার চেষ্টা করে। কিছু খুঁজে না পেয়ে নিজের মাথা চুলকায়। আঙ্গুল বুলিয়ে দাড়ি-গোঁফ আঁচড়ায়।

বাড়ির সামনে দিয়ে একজন কৃষককে হেঁটে যেতে দেখে। তাকে উদ্দেশ্য করে সে প্রশ্ন করে, কেডা? হানিফা না?  কই যাও এত সকাল সকাল?

সকাল দেখলা কই ফকির? এহন তো বেলা অনেক! আমাগো কাম কইরা খাইতে হয়। ক্ষ্যাতে যাই।  জবাব দেয় হানিফা।

তা বেলা একটু হইছে! তোমার কি একটু বয়োনের সমায় হইবে? আমি একটা সমস্যায় পড়ছি। দোতারার আওয়াজ পাই মাগার কেউরে দেহি না। যদি একটু আমার লগে খুঁইজ্জা দ্যাখতা?- অনুরোধ করে বাদশা ফকির।

তোমার পাছে খোয়ানের লইগ্যা মোর কোন সমায় নাই। তোমার ফাও প্যাঁচাল হোনতে আর কেউরে ডাইক্কা লও। -হানিফা তার পথে হাঁটতে হাঁটতে জবাব দেয়।

তুমি কি বোঝো আধ্যাত্মিক শক্তি কি? – গলা নামিয়ে নরম কন্ঠে বলে বাদশা ফকির।
 
হানিফা শুনতে পায়নি বাদশা ফকিরের মন্তব্য। সে চলে যায় নিজের জীবিকার খোঁজে জমিতে ধানের বীজ পরিচর্চায়। বাদশা আরো কিছুক্ষণ একা বসে থেকে এবার সে আড়মোড়া দিয়ে উঠে চুলা জ্বালায়। হাঁড়িতে চাল ঢেলে পুকুর ঘাটে যায়। চাল ধুয়ে এনে ভাত রান্না করে। ঘর থেকে দু’টো আলু এনে ভাতের সাথে সেদ্ধ করে। দু’টো শুকনো মরিচ আগুনে পুড়ে। পেয়াজ, লবন দিয়ে ডলে আলু ভর্তা করে সে ভাত খায়।

এবার তার পেট এবং মন দু’টোই পরিপূর্ণ। দোতারা হাতে নিয়ে আবার সে বারান্দার মেঝেতে বসে। হুঁকা হাতে নিয়ে পুরানা তামাকে জ্বলন্ত টিক্কা দিয়ে লম্বা দুই টান দিয়ে, চুপ করে থাকে। চারপাশ কেমন নিশ্চুপ। সে চোখ বন্ধ করে টুং টাং আওয়াজ করে গান বাঁধে।

“দুই দিনের এই দুনিয়ায়, রঙ্গ মঞ্চের ঠিকানায়
 
আছি আমি এক পত্র প্রাপক।

ডাকযোগের নেই কোন যোগাযোগ
 
আছে কেবল মনের সাথে মনের কথোপকথন।

আমি পাপী, আমি দোষী, আমি নরকের জলন্ত আগুন।”

গান গাইতে গাইতে, হঠাৎ কিছু একটা মনে হয় তার। সে গান বাঁধা বন্ধ করে। গামছা গলায় ঝুলিয়ে ঘরের আলগা দুয়ার টেনে বাইরে বেরিয়ে যায় সে।

বাড়ির সীমানা পেরুতেই পুকুর ঘাটে তার বড় ভাইয়ের মেয়েকে দেখে তার কাছে এগিয়ে যায় সে। পেছন থেকে তাকে ডাকে, খালেদা। কেমন আছিস মা?

কাকু আমি ভালো নাই। - জবাব দেয় খালেদা

কেন রে মা? ভালো নাই ক্যান? কি হইসে?

কাকু তুমিই কও। জামাই ভালো না হেইডা কি আমার দোষ? বাপজান খালি কয় আমি সংসার করতে পারি না। আমি বোলে তোমার মত বাদাইম্মা হইছি।

তোর বাপ বুঝবে না। গান, সুর, জিকির, এইগুলান কি আর হগগোলে বোঝে? ওগো আছে খালি চাই চাই। ওরা আত্মার শান্তি কি খোঁজে?


তুমি ঠিকই কইছো। বিয়ার পর প্রথম প্রথম বাড়িতে গান ধরলেই তোমাগো জামাই খালি আমারে মারত। মাইরের ডরে আমি তো গান গাওন ছাইড়াই দিছি। এহন তোমাগো নাতি, কুদ্দুস গান গাইলেও আমারে মারে আর কয়, ছাওয়ালডারে তো বানাইছো তোর নিজের মতো। তুমিই কও, আমি কি আর মানুষের মন বানাইতে পারি?
 
কুদ্দুস কি ভালো গাইতে পারে?


কাকু তোমার মতোই তার কন্ঠে সুর। যেই টান দেয় এতটুক ছাওয়াল! হুনলে তোমার মাথা খারাপ হইবে।
 
বাড়িতে আইজ রাইতে গানের আসর আছে। লিখন বাউল আইবো। কুদ্দুসরে পাঠাইয়া দিস। পারলে তুইও আসিস।

দেহি। রাইত নামুক। বাপজানের মর্জি বুইজ্জা আওনের চেষ্টা করমু।

গুনগুন করে বাদশা ফকির এবার নিজ মনে তার গানের বাকি অংশ বাঁধতে বাঁধতে চলে নিজ পথেঃ

“দুই দিনের এই দুনিয়ায়, রঙ্গ মঞ্চের ঠিকানায়

আছি আমি এক পত্র প্রাপক।

ভুল করে যদি সে পাঠায় আমার ঠিকানায়

আমার মতো কোনো আদম

শান্তির তরে উৎসর্গ করে যে সংসারের বাঁধন।

আলিঙ্গন করি, উজার করে দেই তারে

আমার এই জীবন বাউল।

জীবে প্রেম, আত্মার শান্তি খোঁজে যে জন

ভবের মায়ায় তারে যায় না গো বাঁধন।


দুই দিনের এই দুনিয়ায়, রঙ্গ মঞ্চের ঠিকানায়

আছি আমি এক পত্র প্রাপক।

ডাকযোগের নেই কোন যোগাযোগ

আছে কেবল মনের সাথে মনের কথোপকথন।

আমি পাপী, আমি দোষী, আমি নরকের জলন্ত আগুন।”

বাদশা ফকির গান গাইতে গাইতে চলে যায় গ্রামের বাজারে। সেখানে সে আলু, সবজী, চাল, ডাল কিনে। হাট থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাতে গান শোনার জন্য দাওয়াত দেয় আরো কয়েকজনকে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই, সে শুনতে পায় নির্ভুল সুরে মধুর কন্ঠে দরদ দিয়ে কেউ গাইছে তার নতুন গান,

“দুই দিনের এই দুনিয়ায়, রঙ্গ মঞ্চের ঠিকানায়

আছি আমি এক পত্র প্রাপক।

ডাকযোগের নেই কোন যোগাযোগ

আছে কেবল মনের সাথে মনের কথোপকথন।

আমি পাপী, আমি দোষী, আমি নরকের জলন্ত আগুন।”

বাদশা ফকির মুহুর্তেই নিজের মনের ভাবনা এবং নানান প্রশ্নের মধ্যে কেমন যেন গোলক ধাঁধায় আবৃত্ত হয়ে পড়ে। তার মনের ভাবনাগুলো ওলোট পালট হয়ে মনের মধ্যে যাতায়াত করে বারবার, এই গান তো আমি আইজই বানলাম। অহনও কোনো গানের আসরে এই গান গাই নাই। আমার এই গান অন্য মানুষ জানলো কেমনে? আইজ সকালে আমার জিকিরের লগে দোতারা বাজাইলো কেডা? যারে অনেক চেষ্টা কইরাও দেখতে পারি নাই। আবার এক গান এক বসায় গাঁথলাম। তয় কি? সত্যিই আমি খোদার পেয়ারের পাত্র হয়ে ধরা পড়লাম? আইজ লিখন বাউলরে এই কথা কইতে হইবে।

নানান ইতিবাচক ভাবনায় মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরে বাদশা ফকির দেখে বাড়ির আঙিনায় আম গাছের ডালে বসে, পা দুলিয়ে কুদ্দুস গলা ছেড়ে আপন মনে গাইছে তার গান। বাদশা নিজের হাতের বাজার মাটিতে রেখে কুদ্দুসের কাছে যায়। কুদ্দুস বাদশাকে দেখে গান বন্ধ করে দেয় এবং বলে, ফকির নানা আমি তোমার জন্যই বইয়া আছি।

কুদ্দুস, থামিস না। গাইয়া যা ভাই। অনুরোধ করে বাদশা

না ফকির নানা, তোমার সামনে গাইতে আমার ভয় লাগে। যদি ভুল হয়?
 
তুই তো নির্ভুলই গাইছিলি। তয় তুই এই গান শুনলি কোথায়?

কেন? তুমিই তো গাইলা এই গান।

আমি তো এই গান আইজই বানলাম

হ, তুমি সকালে এইহানে বইয়া ই তো গাইলা। আবার পুস্কনির ঘাটে মায়ের লগে কথা কইয়া যাইতে যাইতেও গাইলা। আমি দূরে আড়ালে থাইক্কা সব শুনছি।

ঘরে আয়। তোর লগে কথা আছে।

কুদ্দুস গাছ থেকে নেমে বাদশা ফকিরের সাথে তার ঘরে আসে। সাহস নিয়ে দোতারা তুলে হাতে নেয়। এক, দুই করে দুইবার দোতারার তারে টুং টুং শব্দ করে। বাদশা জানতে চায় যে সে দোতারা বাজাতে জানে কি না? কুদ্দুস মাথা নেড়ে জানায়, না। বাদশা তাকে আশা দেয় যে সে তাকে দোতারা বাজাতে শেখাবে। কুদ্দুস খুব খুশী হয়। বাদশা মাটিতে বসে দোতারা নিজের হাতে নিয়ে অল্প কিছুক্ষণ বাজায়। বাদশা কুদ্দুসকে জিঙ্গেস করে, ছিলিম বানাইতে জানো?

জানি। বানাইয়া দিমু? তামাক, চিটাগুড় কই? প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে কুদ্দুস।

এতো দেখছি পাকা পাপী! তোর বয়স কতো নবীন বাউল?

মায় কয় দশ।
 
তোর মায়ের গানের গলাও কিন্তু অনেক ভালো। তোর মায়ও ছোট কালে আমার লগে গান গাইতো। সে দশ বছর থেইক্ক্যা আমার লগে গানের আসরে গান গাইতো। তোর মায় যেন গান না গাইতে পারে, হেরলইগ্যা তোর নানা তোর মায়রে দূরের গ্রামে বিয়া দিয়া দিছে। কিন্তু তুই গান শিখলি কই?

মায় বাড়িতে একলা কতো গান গায়! তারপর নানা বাড়ি আইলে, দূরে থেইক্ক্যা আমি তোমার গান শুনি।

বাদশা ফকির কুদ্দুসের জবাব শুনে চুপ করে থাকে কয়েক মিনিট। আস্তে আস্তে নিজের আঙ্গুল আলগা করে কুদ্দুসের হাতে দোতারা দিয়ে নিজে কলকিতে তামাক সাজায় বাদশা ফকির। হুঁকায় কয়েকটি দীর্ঘ সুখ টান দিয়ে নিজের গলায় একটা ভাব আনে সে। কুদ্দুসের বাজানো দোতারার সুরে নিজের গলা মিলিয়ে দিয়ে বাদশা ফকির ধরে গান।

দুপুর পেরিয়ে বিকেল প্রায়। খালেদা এসে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় কুদ্দুসকে। কিন্তু কুদ্দুস যেতে রাজী হয় না। সে ফকির নানার সাথে আজ থাকার বায়না ধরে। খালেদা তাকে তার নানার ভয় দেখায়, “তোর বাপ বাড়ির থেইক্ক্যা বাইর কইরা দেছে, এমন করলে তোর নানায়ও বাড়ি ছাড়া করবে। আর জ্বালাইস না আমারে। চল বাড়ি চল। নাওয়া খাওয়া কইরা, রাইতে আসিস আবার।”

নবীন বাউল, এবার বাড়ি যাও। মায়ের কথা শোনো। রাইতে লিখন বাউল আইলে তোমারে তার লগে পরিচয় করাইয়া দিমু। প্রথমবার এতো বড় বাউলের লগে বসবা, একটু পরিপারি হইয়া আসো। - কুদ্দুসকে আদেশ করে বাদশা ফকির।

কুদ্দুস তার মায়ের সাথে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার ফিরে আসে। ফকির নানা, তুমি না এহন রান্ধন বসাইবা। আমি তোমার লগে সাহায্য করি। তুমি একলা এত কষ্ট করবা? আমিও না হয় তোমার লগে থাকি। - এক নিঃশ্বাসে বলে কুদ্দুস।

খালেদা নিজ পুত্রের মধ্যে নিজের শৈশিবের স্মৃতি খুঁজে পায়। এবার সে একটা পিঁড়ি টেনে বসে আর বলে, কাকু তোমার বাড়িতে এত গন্ধ কিসের? দেখছো, কতো মাছি ভনভন করছে। তোমার বটি দেও, সবজী গুলান কাইটা দেই। তাড়াতাড়ি রান্ধনের কামটা শেষ করো।

বাদশা নিজের বটি এগিয়ে দিয়ে, নিজে হাড়িতে চাল ডাল ঢেলে পুকুরে যায় চাল ধুইতে। চাল ধুইয়ে এবং পানি এনে সে রান্না ঘরের মাচা থেকে জমানো পাটখড়ি বেড় করে। খালেদা জ্বালানীর স্বল্পতা অনুভব করে কুদ্দুসকে বলে, কুদ্দুস! তোর ফকির নানার খিচুড়ি রানতে আরো খড়ি লাগবে। বাগানে যাইয়া কয়ডা খড়ি টোকাইয়া আন। 

কুদ্দুসের বাগান থেকে বেশকিছু খড়ি এনে ভেঙ্গে গুছিয়ে দেয়। খালেদা চুলা জ্বালিয়ে খিচুড়ি রান্না করে। বাদশা গুনগুন করে আনমনে গাইতে গাইতে বাড়ির বারান্দা এবং উঠান ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে। সবাই কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ বাদশার কানে ভেসে আসে দোতারার আওয়াজ। সে মনে করে হয়তো কুদ্দুস দোতারা বাজাচ্ছে। কিন্তু পাশে তাকিয়ে দেখে কুদ্দুস দোতারা থেকে বেশ দূরে, অতিরিক্ত খড়ি আঁটি বাঁধতে ব্যস্ত সে। বাদশা আবার নুইয়ে বাড়ির বারান্দার মেঝে পরিষ্কার করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবার একই শব্দ। এবার সে প্রশ্ন করে, খালেদা, কুদ্দুস, তোরা কি দোতারার আওয়াজ শুনছিস? না আমি একাই শুনছি?”

কাকু, কি কও এই সব? তোমার দোতারা বাজাইবে কেডা? আমরা সবাই তো বাইরেই। তোমার দোতারা ঘরে। -জবাব দেয় খালেদা।

ফকির নানা, আমিও হোনলাম দোতারার আওয়াজ দুইবার। - জবাব দেয় কুদ্দুস।

সকালেও কয়েকবার এমন আওয়াজ শুনলাম। কিন্তু কাউরে খুইজ্জা পাইলাম না যে সে দোতারা বাজাইবে। মনে হয় আধ্যাত্মিক কিছু ঘটতে আছে আমার বাড়িতে- মনের ভাব প্রকাশ করে বাদশা ফকির।

ফকির নানা, এক কাম করি, আমি ঘরের ঐ কোনায় গুপটি মাইরা বইস্যা থাকি। দেহি কোন আলো দেখা যায় কিনা? জ্বীন! না, পরী! তুমি তো আবার পুরুষ মানুষ, তোমার কাছে আসলে পরীই আসবে। পরী আসলে তাকে দেখা যায় কি না? – খুব আগ্রহ নিয়ে বলে কুদ্দুস।
       
আচ্ছা যা, ঘরের ঐ কোনায় গিয়া বস। দেখ তোর নানার লগে কোন পরীর ভাব হইলো আবার। - ব্যঙ্গ করে বলে খালেদা।

যেমন কথা, ঠিক তেমন কাজ। কুদ্দুস অন্ধকার ঘরের এক কোনায় বসে। বাড়ির কাজ প্রায় শেষ। বিকেল হয়ে গেছে। কিন্তু আর কোন শব্দ নেই। খালেদা কুদ্দুসকে ডাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। ঠিক তখনই আবার টুং, টুং করে দুইবার শব্দ হয়।

এক লম্ফে কুদ্দুস ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং বাদশা ফকিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, ফকির নানা তোমার পরীরে তো দ্যাখলাম! সে তো মানুষের মতো না। সে দ্যাখতে ঠিক মাছির মতো। সে তোমার বাংলা মদের কলসে গা ভিজাইয়া মদ খাইয়া মাতাল হইয়া উইড়া যাওনের সময় পাখনা নাইরা দোতারার তারে দুইডা বাড়ি দিয়া গ্যালো। আর তোমারে নাচাইয়াও গ্যালো। এইবার তোমার পরীর লগে গিয়া কথা কও। আমি এহন যাই। রাইতে আবার আসমু।

টরন্টো, কানাডা
 

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন

 প্রবন্ধ: নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ বনাম সাধারণ জীবনযাপনঃ খুরশীদ শাম্মী