অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩০ মে, ২০২৪
করোটির ঘ্রাণ গ্রন্থের আলোচনা - মামদোহা বেগম

গ্রন্থ পরিচিতি : করোটির ঘ্রাণ
গ্রন্থটি প্রকাশক- ছায়াবীথি, 
৪৫/১ পুরানো পল্টন,(চতুর্থ তলা) ঢাকা ১০০০। 

মুহম্মদ বজলুশ শহীদ একজন কানাডা প্রবাসী কবি। বাংলাদেশের নানা পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর অজস্র  লেখা৷ তাঁর প্রথম কবিতা গ্রন্থ  'করোটির ঘ্রাণ।' এই গ্রন্থের প্রথম  কবিতার নামানুসারেই হয়তো তিনি বইটার নামকরণ করেছেন। কবিতা গ্রন্থটি পড়ে আমি বিমোহিত হয়েছি এর প্রতিটি পাতা যেন হৈমন্তিক সুঘ্রাণে ভরে আছে। প্রতিটি চরণই যেনো এক একটা পূর্ণ কবিতা৷  এখানে আছে- অটোয়ার ব্রিটেনিয়া পার্কের পড়ন্ত বেলায় দীর্ঘ ছায়া (যা তাঁর কবিতার প্রচ্ছদ), আছে জন্ম ভুমি বাংলাদেশ আর অন্নদাত্রী স্বদেশ  কানাডার প্রকৃতির নিবিষ্ট ছায়া, যে ছায়া একদিনমিলিয়ে যাবে মহাকালের মাঝে, রেখে যাবে অনাদিকালের স্মৃতির সুঘ্রাণ। 
কবি যখন বলেন,
এই ঘাস এই ব্রিটেনিয়া পার্কের প্রতিটা ফুল, প্রতিটা পাখির জানা আছে
আমার ছায়ার রঙ,
অটোয়া নদীর জলে তরঙ্গিত গান,
রৌদ্রস্নানে ক্লান্ত সুন্দরী, গাংচিল,
সারসীর দল,
সবাই জানে, আমি এখানে 
এই ছায়াদের সাথে।"  ( করোটির ঘ্রাণ) 

বাংলাদেশ আর কানাডার প্রকৃতির কী এক অসাধারণ মেলবন্ধনের সৃষ্টি করেছেন কবি তাঁর ম্যাপেল রাণী কবিতায়: 
"ম্যাপেল রাণী বলছে হেসে 
রঙিন হবে লালে, 
লাল পদ্মের পাপড়ি মেখো 
তোমার কোমল গালে। 
মাথার পরে দাও বিছিয়ে 
শিমুল ফুলের লাল,
মাথায় তোমার নাও জড়িয়ে
রক্ত জবার শাল।"

শুধু প্রকৃতি নয় - কবির  চোখ  কবিতায় পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের হয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে চাবুক হেনেছে:
"আমরা এসেছি আল সালভাদর থেকে,আমরা এসেছি ফিলিস্তিন থেকে, ইয়েমেনি শিশুদের 
লাশ দেখে দেখে, 
আমরা এসেছি বাংলাদেশের 
গৃহকর্মীর আর্ত চিৎকার থেকে।
তুমি কি এই লক্ষ চোখের ভাষা বুঝো?
তুমিতো এই চোখের উজ্বল আলো দেখনি, 
ঈগলের চোখ আজ বিদ্ধ হয়েছে 
ওদের শরীরে,সময় অত্যাসন্ন, 
হে রাজন, সাবধান!
আমরা আসছি৷"( চোখ) 

এর পর কবির করোটিতে খেলা করেছে "৭ই মার্চ ১৯৭১ মহাকবির উচ্চারণ।' আমার মনে হয় সাত মার্চকে নিয়ে লেখা এযাবৎ কালের শ্রেষ্ঠ কবিতা। 
কবিতার প্রতিটি ছত্রে যেনো সাতই মার্চের আগুন ঝরে পড়েছে।
কবিতার শুরুতেই কবি বললেন, 
"আজকে একটা প্লাবন হবে
বাঁধ ভাংগা বান, ছুটছে সবাই,
ঘরের তালা বন্ধ আজি, শক্ত বাঁধন, রক্ত নদী, বইবে জোয়ার।"

কবিতার প্রতিটি শব্দ সেদিনের কথা বলে: 
"রুদ্ধ শ্বাসে সবাই ছোটে,রমনা মাঠে
রৌদ্র ফাটে করোটিতে
পথের ধুলো আজকে সবার মথার পরে, জামার ভাঁজে, সবাই আজ এক কাতারে মহাকাব্য শুনবে বলে" 

সবশেষে কবি চিত্রিত করলেন:
"লক্ষ  বুকে স্বপ্ন বুনি বললে কবি সবার শেষে, আজকে থেকে স্বাধীন আমরা নইকো অধীন কারো কাছে,
কাব্য কলার রঙ তুলিতে আকাশ ছোঁয়া বিজয় গানে- সবুজ টিয়ার লাল পতাকা সবার বুকে প্রলয় আনে। 
জয়বাংলা ধ্বনিত হলো সারাদেশের প্রতি কোণে,
স্বাধীনতা ঘোষিত হলো-
মহাকবির উচ্চারণে।"

এ কবিতাটা পড়ে আমার মনে হলো কাব্য গাঁথায় ৭ই মার্চের এক চিরন্তন ইতিহাস। কবি জাতির জনক শেখ মজিবর রহমানকে অনন্য এক উচ্চমার্গে নিয়ে যেয়ে বলেছেন: 
"আমি আমার কবিতার কোন নাম দেবো না, 
কেননা বাংলাদেশ বলতেই কবিতা - আর সমস্ত কবিতার নামই -
শেখ মুজিব। " ( মুজিবই আমার কবিতা)। 

কিন্তু বাংলাদেশে জাতির জনককে আজ ভূলুণ্ঠিত করেছে তাঁরই দলের দুর্নীতিবাজ লুটেরারা। তাইতো কবিকে বলতে শুনি: 
"পিতার নাম আজ গ্রাস করে ফেলেছে কতকগুলো ভয়ার্ত অজগর, বিষধর সাপ,
কতকগুলো বারবণিতার মুখে আজ তোমার নাম, কতকগুলো কাক আজ সেজেছে কোকিল, 
লুটেরারা লুটে খায় -তোমার বাংলাদেশ, আমি কেমনে উচ্চারণ করি ক্রুশবিদ্ধ মুজিবের কথা ( ক্ষমা করো পিতঃ ক্ষমা করো)। 

অন্য একটি কবিতায় স্বাধীনতাত্তোর অতৃপ্ত বাংলাদেশ দেখে কবি বললেন: 
"কবি আজ খুঁজে দেখলেন - তার সেই প্রিয় পান্ডুলিপির প্রতিটি পাতা,
উই পোকারা কাটছে নিরন্তর, 
বিদ্রোহী শব্দগুলো নতজানু হয়ে 
ভুলেছে অতীত, 
জল্লাদরা কালো কাপড়ে বেঁধেছে চোখ, কবি খুঁজে ফিরে কোথায় একাত্তর কোথায় ৭ই মার্চ। (৭১ এর পান্ডুলিপি) 

কবির কাছে মনে হয়েছে - অত্যাচারী  শাসক গোষ্ঠী  ইতিহাসের শিক্ষা নেয় না৷ তাই কবি তাঁদেরকে সাবধান করে  বলেন: 
"জল্লাদেরাও প্রহর গুনতে গুনতে 
নিজহাতে একদিন পরে নেয় ফাঁস,
মানুষ হত্যার নারকীয় উৎসবে মেতে ছিল যারা, তারাও দেখতে পায়,
বুলেটে ঝাঁঝরা ক্ষত, নিজেদের প্রচ্ছয়ায় দেখে নিজেদের নাম।" ( ঈশ্বরের দিন লিপি)। 

কিন্তু কবি আশা ছাড়েননি। রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা একদিন শহীদদের রক্তঋণে ফিরে আসবে:
" আজো ঘুম ভাঙলো, দেখলাম বিশাল একটা হীরকোজ্বল চাঁদ 
আমাকে ডেকে বলছে জোৎস্না দেখবে এসো,
আমি তাকালাম- ওর সারা গায়ে আজ বাংলাদেশের মানচিত্র " (মরাচাঁদে বেনো জোস্না)৷ 

বাংলাদেশে ধর্ষকদের মহোৎসব দেখে কবি নারীদেরকে আহ্বান জানলেন এভাবে: 
"এবার তোমার খেলা হোক আজ শুরু, 
বজ্র নিনাদে কাঁপুক আকাশ খানি, 
মা ভগ্নীরা কেনো আছো আজ দূরে
ছিঁড়ে ফেলো আজ মুখের ঘোমটা টানি। 
হোক শুরু আজ সর্বনাশের ছোবল,
নাগিনীর বিষে পুড়াও তাদের দেহ
এমন আগুন জ্বালাও বাংলাদেশে,
ভষ্ম করো সব ধর্ষকের গেহ।" ( জাগো)

কবি যখন যখন করোটির ঘ্রাণের কবিতা গুলো লিখছেন তখন সারাবিশ্বে নেমে এসেছে করোনার ভয়াল থাবা। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন। কবি তাই লিখলেন: 
"গ্রহণ লেগেছে পৃথিবীর গায়,
গ্রহণ লেগেছে মনে, 
গ্রহণ লেগেছে আকাশ তারায়
গ্রহণ প্রতিটা ক্ষণে।" ( গ্রহণ) 

এখানেই শেষ নয়, কবি করোণার ভয়াল গ্রাসে সারা পৃথিবীর চিত্র আঁকলেন এভাবে:
"আমি অসুস্থ হলে অসুস্থ হয়ে যায় মা,
মা - অসুস্থ হলে আমার সমস্ত পৃথিবী 
অসুস্থ হয়ে যায়,
পৃথিবী অসুস্থ হলে সবাই অসুস্থ হয়। 
আজ পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসা অসুস্হ, পৃথিবীর প্রতিটি গৃহ অসুস্থ,  
প্রতিটি বৃক্ষ অসুস্থ, 
আমি কার কাছে যাবো!" (চতুষ্কোণে স্বরবৃত্তি)। 
এভাবে আমি, মা, পৃথবী আর সমস্ত মানুষকে কবি গাঁথলেন সমান্তরাল সুতোয়। সবশেষ কবিতা,  সবুজ ভূমির প্রার্থনায়, কবি সবাইকে আহ্বান জানালেন : 
এসো জননীরা, এসো মুক্তবুদ্ধির বালক, রবীন্দ্রনাথ এসো, সুকান্ত নজরুল, তোমরা সবাই আজ এসো, এসো প্রার্থনা করি সবুজের,
পায়রারা দল বেঁধে এসো,
কবিতারা স্বপ্ন হয়ে এসো।" 

এভাবে তিরানব্বইটি কবিতায় লেখা করোটির ঘ্রাণ।  প্রতিটি কবিতা যেনো বকুল ফুলের মালা, যার  প্রতিটি পাপড়ি স্নায়ুকে ছুঁযে ছুঁয়ে যায়৷
সবাইকে গ্রন্থটি পড়বার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি৷ 

মামদোহা বেগম
অটোয়া, কানাডা