অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩০ মে, ২০২৪
এক যে ছিল স্বপনচারিণী -মহিদুর রহমান

    রোহান তখন টগবগে যুবক। চেহারা আকর্ষণীয় তাই সহজেই সবার নজর কাড়ে। দিনমান টু টু করে ঘুরে বেড়ায়। অন্যের বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজের কাজের চেয়ে অন্যের কাজের প্রতি অধিক আগ্রহ। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে তার সমকক্ষ এ তল্লাটে আর কেউ নেই। এসব দেখে বড় ভাই রাকিব সাহেবের খুব একটা ভালো লাগে না। এমন উড়নচণ্ডী ভাইয়ের ভাবসাব দেখে তার মাথাটা কেমন জানি ভন ভন করে। তাদের বাবা মারা গেছেন বছর দুই আগে। তাই রাকিব সাহেব এতোদিন রোহানকে তেমন কিছু বলেননি। কিন্তু আজ রাকিব সাহেবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। 
  — তোমাকে বলেছি না রাত নটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে? 
     ছোট ভাই রোহানকে চড়া গলায় কথাটা বললেন রাকিব সাহেব। রোহান কোনো কথা না বলে রাকিব সাহেবের সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে অন্য একটা রুমে ঢুকেই রাগে খটমট করতে থাকে। বিড়বিড় করে সে বলে,
  — রাত নয়টা একটা রাত হলো? আটটার পর তো খেলাই শুরু হয় রোজ। তাছাড়া এক মাঠে তিন-চারটা টিম পালা করে খেলে। কোনো কোনো গেম শেষ হতে অনেক সময় লাগে। এমনও দিন যায় নটার আগে চান্সই তো মেলে না! কিন্তু এসব কথা কে বুঝাবে তাকে? 
     কিছুসময় পরে রোহান একটু সাহস করে রুম থেকে বের হয়ে রাকিবকে বলে, 
  — ভাইয়া খেলাই তো শুরু হয় রোজ রাতে। তাও আটটা পরে। আর নটার আগে তো সুযোগই মেলে না? তাহলে তো বেডমিন্টনটা বাদই দিতে হবে।
     রাকিবের মেজাজ তখন আরও বিগড়ে যায়। তিনি এসব আমলে নিতে চান না। জীবনযুদ্ধে একজন পোড়খাওয়া মানুষ তিনি। রোহানের কথা শেষ হলে তিনি কিছুটা চেচিয়ে বলেন, 
  — ঘরে কিভাবে দুইটা টাকা আসবে সেদিকে খেয়াল নেই, আর তুমি আছো খেলা নিয়ে?  
     রোহান আর কথা বাড়ায় না। ফ্যালফ্যাল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এবার রাকিব সেই চড়া গলায় বলেন,
  — কালকে থেকে রোজ সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টের ক্যাশে বসবে। জানো তাতে কতটুকু সাহায্য হবে? 
     রাকিব সাহেবের রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। সদর দরজার উপরে বড় একটা সাইনবোড সাঁটানো। বড় হরফে তাতে লেখা পিঙ্কি রেস্টুরেন্ট। এটি গাগুটিয়া পয়েন্টের সবচেয়ে বড় রোস্টুরেন্ট। দোকানটিতে সবসময়ই ভীড় লেগে থাকে। কোনো কোনো সময় এতো বেশি ভীড় হয় যে কর্মচারিরা কুলোতে পারে না। সন্ধ্যার দিকে সেই ভীড়টা একটু বেশিই জমে। রোহান ক্যাশে বসলে একটু হলেও সাহায্য হবে। 
     রোহান হ্যাঁ না কিছুই না বলে মাথা নিচু করে চলে যায় রুমের দিকে। বিছানায় শুয়ে আনমনে কতশত ভাবনায় সে হারিয়ে যায় কোন সুদূরে।  
     এরপর থেকে রোহান রাগে অভিমানে খেলতেও যায় না, দোকানেও বসে না। দিনমান বাইরেই কাটায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বাসায় ফেরে চুপ মেরে বসে থাকে। 
     রাকিব ব্যাপারটা দেখেও না দেখার ভান করেন। কিছুদিন বাদে বলে কয়ে একটা টেইলারিংয়ের ব্যবসায় বসিয়ে দেন রোহানকে। গাগুটিয়া পয়েন্টেই ব্যবসা। টেইলারিংয়ে বসে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে রোহান। আর ব্যবসাটা ভালোই চলতে শুরু করে।  

     ২.
      মা আমি একটু শহরে যাচ্ছি, সন্ধ্যার আগেই ফিরব— কথাটা বলেই রোহান ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। তার পরনে জিন্সের প্যান্ট ও টি-শার্ট। তখন চারদিকে সূর্যের গনগনে আলো। ঘড়ির কাঁটায় সকাল নটা কি দশটা হবে। এক হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ অন্য হাতে নিজের মোবাইল সেট। পেন্টের পেকেটে একটা চিরকূট। চিরকূটটা আছে কি না একবার দেখে নেয়। বাজার থেকে কি কি জিনিস কিনবে তার একটা লিস্ট তৈরি করেছে সে। রোহান যখন শহরে পৌঁছে তখন দোকানপাঠ মোটামুটি খোলে গেছে। লিস্ট ধরে ধরে থান কাপড়, সূতা এটা সেটা ঘুরে ঘুরে কিনতে থাকে রোহান। এই সামান্য কটা জিনিস কেনার জন্য কত ঘুরাঘুরি! যখন জিনিসগুলো কেনা শেষ হলো তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দুপুরের পর থেকে আকাশের চেহারাটা কেমন গোমট হয়ে যায়। যত সময় গড়ায় ততই আকাশের চারদিক যেন ঘনকালো মেঘে ঢেকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝড় আসবে এটা প্রায় নিশ্চিত। রোহান সিএনজি স্টেন্ডে গিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। যাত্রীদের মধ্যে একটা তাড়াহুড়ো ভাব। তাড়াহুড়োটা বৃষ্টির আশঙ্কায়। রোহান হঠাৎ শোনে একটা সিএনজির ড্রাইভার চেচাচ্ছে, 
  — বনগাঁ...! বনগাঁ...! বনগাঁ...!
     রোহান বনগাঁয়ের লাইনের যাত্রী। একটু ভরসা পায় সে। তার হাতে ভারি ব্যাগ। খুচরো আরও কিছু জিনিস। রোহান জোরকদমে হেঁটে গাড়ির কাছে যেতেই দেখে পেছনের সিটে একটি মেয়ে বসে আছে। মেয়েটির নাম সায়মা। সায়মাকে দেখে প্রথমে সে থমকে যায়। গাড়িতে ওঠবে কি ওঠবে না ইতঃস্তত করে। মেয়েটা তখন রোহানের চোখের উপর চোখ রেখে মৃদু হেসে বাম দিকে একটু সরে বসে। রোহান তখন কিছুটা সাহস পায়। এক পলকে মেয়েটার আপাদমস্তক পড়ে নেয় সে। সায়মার চেহারা ফরসার দিকে। চুল ছাড়া। ঘন কালো দীঘল। মুখ জুড়ে মায়াবি একটি আভা। রোহান মনে মনে বলে,
  — তুমি যেমন যাত্রী, আমিও তেমন। সুতরাং ভয় কিসের?
     রোহানের হাতের গাইটগাটুরি সিএনজির পেছনে রাখে। তারপর সন্তর্পনে গাড়িতে ওঠে বসে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। আবহাওয়ার আভাস খুব একটা ভালো নয়। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হবে ভারি বর্ষণ। ড্রাইভার হেঁকে চলেছে, 
  — বনগাঁ...! বনগাঁ...! বনগাঁ...!
     পাঁচজন হয়ে গেলেই সে সিএনজি ছেড়ে দেবে। কিন্তু এতো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে কে উঠবে সিএনজিতে? কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আর দেরী সহ্য হয় না মেয়েটার। সায়মা সিএনজি ড্রাইভারকে বলে,
  — তুমি তো পাঁচজন না হলে ছাড়বা না, তাই না?
  — না আপা। পোষাইব না। 
  — আমরা না হয় বাকি তিনজনের ভাড়া দিয়ে দিতাম। 
  — সত্যি আপা দিবেন আপনারা? 
  — হ্যাঁ দেব। চল!
     অতিরিক্ত ভাড়ার ব্যাপারে রোহানের মতামতের কোনো প্রয়োজনই মনে করে না সায়মা। রোহানও এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।    
     গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসতে ড্রাইভার আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করে না। মুচকি হেসে সে সিএনজি স্টার্ট দেয়। যেই স্টার্ট করেছে অমনি অঝোর ধারায় বৃষ্টি। তড়িঘড়ি করে রোহান ও সায়মা দুজনেই গাড়ির দু পাশের পর্দা টেনে বেঁধে রাখে। এতে গাড়ির ভেতর আবছা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সিএনজি এগিয়ে চলে। ঝড়ো বাতাসের তোড়ে মাঝে মাঝে পর্দা ভেদ করে বৃষ্টির হলকা এসে দুজনকেই ভিজিয়ে দেয়। কিছু দূর যেতে না যেতে দুজনই ভিজে কাক। বৃষ্টির এমন ধারা সহজে দমবার নয়। সায়মা বৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য একটু ডান দিকে সরে। রোহানও বৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য একটু বাম দিকে সরে। এভাবে সরতে সরতে দুজন কখন যে একে-অন্যের শরীরের এতো কাছাকাছি এসে যায় তা কেউই টের পায় না। রোহান ভাবে পরিবেশ মানুষকে কখন কোথায় নিয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। জীবনের প্রবল পরিক্রমায় পরিবেশের নিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করার সুযোগ কই? একটা মেয়ে এমনভাবে শরীরের সাথে নিবিড় হয়ে মিশে গেছে যে, মনে হচ্ছে দুজন দুজনার কত চেনা। কত আপন। অথচ আজই প্রথম কোনো মেযের কাছে আসা। তুমুল ঝড়—বৃষ্টির মধ্যে গাড়িখানা এগিয়ে চলে বনগাঁর উদ্দেশ্যে। মেয়েটি রোহানকে লক্ষ করে বলে,
  — ভাই আজকে কপালে অনেক দুঃখ আছে।  
  — না না আর বেশি সময় লাগবে না। একটু ধৈর্য ধরো। 
     রোহান ভেবেছিল সায়মা মেয়েটি বোকা সোকা হবে। কিন্তু না, মেয়েটি যেমন স্মার্ট তেমনই সাহসী। সায়মা একটু দম নিয়ে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে,
  — আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না? আমি কিন্তু আপনাকে চিনেছি। 
  — আচ্ছা আচ্ছা। কিন্তু তুমি কার বাড়ি যাচ্ছ?
  — কারো বাড়িতে নয়। নিজের বাড়ি।  
  — কোন এলাকায় তোমার বাড়ি?
  — চা বাগানের পাশে একটা ফুটবল খেলার মাঠ আছে না? মাঠের ঠিক পূবের বাড়িটা আমাদের। 
  — তাই নাকি? ওবাড়িতে তো আমি দুএকবার গিয়েছি। অবশ্য অনেক আগে।  কিন্তু তোমাকে তো কখনও দেখিনি। 
  — জি আমি আপনাকে ঠিকই দেখেছি। আপনি খেলা শেষে আমাদের পুকুরে গোসল করতেন। আফজাল ভাই আমার বড় ভাই। তিনিও ফুটবল খেলতেন।  
  — তুমি আফজলের বোন? তা এতক্ষণ বলনি কেন? আফজাল তো বিদেশে থাকে তাই না? আমার সাথে ওর মোটামুটি পরিচয় ছিল। ও ভাল ফুটবল খেলতো। আমিও খেলতাম। এখন ছেড়ে দিয়েছি।    
     মুহূর্তেই দুজন দুজনের কাছে কত আপন হয়ে উঠল। দুনিয়াটা এমনই। কে কখন কার আপন হয় তা বলা যায় না। 
     গাড়ি চলছে। বৃষ্টিও ঝরছে। হঠাৎ সায়মা টের পায় তার মাথাটা ঘুরছে। দুপুরের পর থেকে এমনটি হচ্ছে। এর জন্য বাড়ি ফেরার একটা তাড়া ছিল তার মধ্যে। বেশিক্ষণ নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না। সায়মা আর তেমন কিছু বলতেও পারে না। তার শরীরটা নেতিয়ে পড়ে রোহানের উপর। মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে যায় সায়মা। রোহান দু হাত দিয়ে সায়মার মাথাটা ধরে রাখে। এই অবস্থায় রোহান কি করবে ভেবে পায় না। একা গাড়িতে একটা মেয়ে এভাবে তার কোলের উপর নির্জীব পড়ে আছেÑ কথাটা ভাবতেই তার গা শিউরে ওঠে। রোহান তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, না বাড়িতে নিয়ে যাবে ভেবে পায় না। সে বাইরে হাত রেখে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের চেষ্টা করে। হাতের মুঠো করে কিছু পানি এনে সায়মার চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। এভাবে দশ মিনিটের মতো সময় অতিবাহিত হয়। এই দশ মিনিট রোহানের কাছে যেন দশ ঘণ্টা। বার বার সায়মার চোখেমুখে পানি ছিটাতে থাকে রোহান। খানিক বাদে জ্ঞান ফেরে সায়মার। তখন স্বস্তি ফিরে আসে রোহানের মনে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে। রোহান কিছুটা বিচলিত হয়ে বলে,
  — তোমার কি কোনো সমস্যা?
  — দুপুর থেকে শরীরটা যেন কেমন করছে। কিন্তু কেন?
  — এই যে তুমি অজ্ঞান হয়ে আমার কোলের উপর পড়ে রইলে। আমিতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। 
  — ও তাই? অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম বুঝি? ভয়ের কি আছে? কিন্তু মানুষ তো মানুষের জন্য, তাই না?
     এসব কথা শুনতে ভালো লাগে রোহানের। রোহান কোনো কথা বলে না। সায়মা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রোহানকে বলে,
  — আপনি মনে কিছু নেবেন না। আমাকে একটু বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবেন। আমার মাথটা কেবল ঘোরছে।  
  — হ্যাঁ অবশ্যই। 
     সাতপাঁচ না ভেবে সম্মতি জানায় রোহান । রোহান কেন, তামাম দুনিয়ার কোনো যুবক কি পারবে এমন একটি পরিস্থিতিতে এরকম একটা মেয়ের অনুরোধকে উপেক্ষা করতে? প্রেমের শুরুটা এখান থেকেই।               
     রোহানের উচাটন মন কি ভেবে আর ব্যবসায় বসতে চায় না। কি সকাল কি বিকাল ছোটে যায় সায়মাদের বাড়ি। সায়মা ছাড়া ঘরে তার মা-বাবা আছেন। বাবা রোজ সাত সকালে চলে যান চা ফেক্টরিতে। আর ফেরেন রাতে। ওখানে তার চাকরি। মাসের ত্রিশ দিনই তার ডিউটি। তবে বন্ধের দিনের জন্য আছে ওভার-টাইম সেলারি। রোহান সায়মার সাথে— সায়মার মায়ের সাথে গল্পস্বল্প করে সময় কাটায়। রোহান বুঝতে পারে সায়মার প্রতি তার এক অপ্রতিরুদ্ধ টান তৈরি হয়ে গেছে। সায়মা যেন তার অস্তিত্বে মিশে গেছে। অথচ কথাটা সায়মাকে সে জানাতে পারছে না। 

    ৩.
     ক দিন থেকে গাগুটিয়ার আকাশে বাতাসে একটা খবর চাউর হয়ে গেছে। রোহান সায়মাকে ভালোবাসে। শুধু ভালোবাসা নয়, রোহান বিয়ে করতে চায় সায়মাকে। এমন একটা খবর যখন রাকিব সাহেবের কানে আসে তখন তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েন। খোঁজখবর নিয়ে ঘটনার সত্যতা জেনে তিনি তো রেগেমেগে একেবারে আগুন। আমার সাথে রাকিব সাহেবের সম্পর্কটা ভালোই ছিল। অবশ্য সেটা রোহানের মাধ্যমেই হয়েছে। রোহান আমার বন্ধু। সে হিসেবে তিনি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতোই দেখেন। হঠাৎ রাকিব সাহেব আমাকে ফোন করে তার সাথে সময় করে একবার দেখা করতে বলেন।
     আমি তো বুঝে গেছি দেখা করার হেতুটা কি? দেখা করি কিভাবে আর নাইবা করি কেমনে? শেষমেশ রাকিব সাহেবের সাথে দেখা করি পরদিন সন্ধ্যায়। তিনি তখন রেস্টোরেন্টের ক্যাশে বসা। আমি মুখোমুখি দাঁড়াতেই স্মিত হাস্যে ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর আমাকে নিয়ে গেলেন তার বাড়ির ভেতরের একটি রুমে। তিনি একটি চেয়ারে বসলেন। আমি বসলাম অন্য একটিতে। প্রথমে তিনিই কথা তুললেন। নিজেদের স্ট্যাটাস সামাজিক মানমর্যাদার কথা নিজেরে মতো করে ব্যাখ্যা করলেন। তারপর বললেন,  
  — আরফান! ওকে বলে দিও এই মেয়েকে কোনোদিনও আমি ঘরে তুলবো না। জানো ওদের সামজিক মানমর্যাদা কোনো ভাবেই আমাদের সাথে যায় না! 
      আমতা আমতা করে আমি কিছু একটা বলতে চাইলে তাঁর সাফ কথা,
  — মেয়েটাকে ভুলে যেতে বলো আরফান। আমার ভাই রোহান তো জানে না ওরা কত অর্থলিপ্সু, আর লোভী। জীবনের অর্ধেক সময় অপব্যয় হয়ে গেছে। সারা জীবন তো মানুষের পেছনে দৌড়াল। বলতে গেলে অকারণেই ছুটলো। আচ্ছা আরফান! তার কি বড়ো হওয়ার কোনো স্বপ্ন নেই?   
     রাকিব সাহেবের কথায় আমি শুধু মাথা নাড়ি। কান ভরে তার কথাগুলো শুনি। জানি রাকিব সাহেব পোড় খাওয়া বাস্তববাদী মানুষ। কিন্তু রোহান কি আমার কথা শুনবে? রোহান যে বিষে আক্রান্ত হয়েছে এ যে সাপের বিষের চেয়ে ভয়াবহ। একরাশ দ্বিধা ও সংকোচে আমি রাকিব সাহেরে কাছ থেকে বিদায় নিই। 
     বিষয়টি মনে মনে ভাবতে থাকি। রাকিব সাহেবের অনুভূতিগুলো রোহানকে জানাতেই হবে। আমি জানি কোনো কাজ হবে না তারপরও। খানিক বাদে রোহানের সাথে সাক্ষাৎ। আজ আর কোনো খুনসুটি নয়। রিয়েল লাইফের কথাবার্তা। আমি রোহানকে বলি,
  — সায়মাকে নিয়ে তোমার আরও ভাবা উচিত। হুটহাট কোনো কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ সবসময় ভালো হয় না। শত হোক বড় ভাইতো! তাঁর মতের একটা প্রাধান্য তো অবশ্যই আছে। 
     কথাগুলো রোহানের কাছে মোটেও ভালো লাগে না। শুধু বলে,
  — বুঝলে আরফান, রাকিব ভায়ের চিন্তা একদম সেকেলে। এসব কথা বাদ দাও। সময় আসলে দেখা যাবে। 
     বিষয়টা নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাতে চাইনি। রাকিব সাহেব রোহানকে ফেরানোর জন্য আমাকে অনুরোধ করেছেন। আমিও রোহানকে বলে কয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু কথা না শুনলে তো করার কিছু নেই।  

     ৪.
     সে ছিল এক বৃষ্টিস্নাত রাত। টানা বৃষ্টি ঝরছিল বিরামহীন। ঝড়বাদলের কারণে বিদ্যুৎ ছিল না কোথাও। একটা মোমবাতি জ্বলছিল টেবিলের উপরে। বাউরি বাতাসের হলকায় বার বার নিভে যাচ্ছিল মোমবাতিটি। রাকিব সাহেব অসুস্থ। হঠাৎ করেই শরীরটা খারাপ হয়ে গেছে। স্থানীয় একজন ডাক্তারকে আনা হলো। তিনি অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে কোনো ঔষধ না দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ। রোহান একটা এম্বুল্যান্স যোগাড় করার জন্য হিমসিম খায়। রাকিব সাহেব নির্জীব পড়ে আছেন বিছানায়। জ্ঞান হারিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে। তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। এম্বুল্যান্স আসতে তখনও ঘণ্টা আধেক দেরী। রাকিব সাহেবের স্ত্রী মোমেনা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। মা তো রীতিমতো পাগলের মতো হয়ে গেছেন। তাদের রোদন থামছেই না। 
     আধ ঘণ্টার মধ্যে এম্বুল্যান্স আসে। তখনও রাকিব সাহেব নির্জীব বেঁহুশ। ধরাধরি করে তাকে স্ট্রেচারে করে গাড়িতে তোলা হলো। কোনো নড়াচড়া নেই। রোহানের কপালে চিন্তার ভাঁজ। গাড়ি হুইসেল বাজিয়ে এগিয়ে চলে। গাড়িটি হাসপাতালে পৌঁছামাত্রই রোহান একটা স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে। সে ভাবে, এখন নিশ্চয়ই সেরে উঠবেন ভাইয়া। কিন্তু কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন। ডাক্তারের অনুমান এ ব্রেনস্ট্রোকে মৃত্যু। যা কেউ কল্পনাই করতে পারেনি। রোহান লুটিয়ে পড়ে লাশের উপর। হাউমাউ করে কেঁদে সেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। স্ত্রী মোমেনা শোকে প্রলাপ বকছেন। 
  — আমাকে ছেড়ে তুমি কই যাচ্ছো গো? আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো গো?
     মোমেনার চিৎকারে রাতের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। রোহানের জ্ঞান ফিরলে দেখে এম্বুল্যান্সটি বাড়িতে চলে এসেছে। তখন মধ্যরাত। তারপরও বাড়িতে কিছু মানুষের জটলা। চেঁচামেচি। কয়েকজনের ধরাধরিতে লাশ নামানো হলো। কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাড়ির সবাই। তাদের মা দাঁড়িয়ে রইলেন দরজার এক পাশে। তাঁর চোখে কোনো কান্না নেই। অধিক শোকে যেন পাথর। ফোনে ফোনে খবরটা ছড়িয়ে গেল সর্বত্র। অনেকে রাতেই এলো। অনেক আসলো সকালে। এমন আকষ্মিক মৃত্যুতে গাগুটিয়ার বাতাস ভারি হয়ে ওঠলো। সর্বত্র নেমে এলো শোকের ছায়া। 

     ৫.
     রাকিব সাহেবের মৃত্যুর পাঁচদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। রোহান একদম ঘুমোতে পারে না। একের পর এক নিদ্রাহীন রাত পার করে তার চোখজোড়া লালচে হয়ে গেছে। আজকে সকাল বেলায় রোহান আনমনে বিছানায় বসেছিল। তখন তার গায়ে জড়ানো ছিল পাতলা একটা টি শার্ট। পরনে ছিল লুঙ্গি। এমন সময় তার বাবার কথা খুব মনে পড়ে। বাবার মৃত্যুর পর রাকিব সাহেবই সংসারের হাল ধরেছিলেন। সংসারের হাল ধরা সহজ কাজ নয়। কতরকম ঝাক্কি যে পোহাতে হয়। এসব কথা ভাবতে থাকে রোহান। রোহানের মনে পড়ে রাকিব ভাই রোজ রাতে দোকান থেকে বাড়ি ফিরে সবার আগে গোসল সারতেন। বাথরুম থেকে মাথা মুছতে মুছতে ঝরঝরে মেজাজে বের হতেন। বালতি আর মগ বেওয়ারিশ পড়ে থাকতো বাথরুমে। তার পরনে থাকতো লুঙ্গি। শরীরে সাদা গেঞ্জি। তারপর খাওয়া-দাওয়া শেষে শান্ত মেজাজে সবার সাথে দিনের নানা ঘটনা নিয়ে মজা করে গল্প জুড়তেন। দোকানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটতো। ঝগড়াঝাটি, চেঁচামেচি, তুচ্ছ বিষয় আসয় নিয়ে তাচ্ছিল্য ছিল নিত্য দিনের সঙ্গী। বাবুর্চি ও হোটেল বয়দের মধ্যে বনিবনা ছিল না। তারপরও রাত নয়-দশ বেজে গেলে চূলোর আগুন নিভে যেতো। তখনই সবাই বাড়িতে ফিরে যেতো। বাবুর্চির স্ত্রি ছিল ঝগড়াটে। বাড়িতে ফেরামাত্রই এটা সেটা বলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলতো। কিন্তু বাবুর্চির চোখ তখন থাকতো ঘুমে ভারী। তার স্ত্র্রী জেগেই থাকতো। আর বাবুর্চি নাক ডাকিয়ে স্ত্রীর পাশে ঘুমোত। কখন যে আরেকটি সকাল এসে দোরগোড়ায় হাজির হতো তা সে টেরই পেতো না। সাতসকালে সবকিছু ভুলে গিয়ে স্ত্রীকে কোনো না কোনো আশার বাণী শুনিয়ে বাবুর্চি কাজে যোগ দিতে রওয়ানা দিত বাড়ি থেকে। 
     রাত একটু রেড়ে গেলে রাকিব সাহেব সবাইকে বলতেন,
  — ঘুমোও এখন। যাও তাড়াতাড়ি কর। সকালে উঠতে হবে যে!
     বাড়ির সবাই তখন যে যার মতোন ঘুমিয়ে পড়তো। এসব এখন শুধুই স্মৃতি। এসব ভেবে রোহানের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। 
     সে আর তেমন কিছু ভাবতে পারে না। এভাবে কেটে যায় প্রায় তিন মাস। পিংকি রেস্টুরেন্টের সাঁটার আর খোলেনি। টেইলারিং ব্যবসাও লাটে ওঠে। রোহান নিজেকে এক ভিন্ন মানুষ হিসেবে আবিস্কার করে। সংসারের হাল এখন তার হাতে। কিন্তু কিভাবে এই ভবসংসার সে পাড়ি দেবে? সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় চলে যাবে বিদেশে। 
     রোহান নিজের এমন একটা সিদ্ধান্তের কথা সবার আগে জানায় সায়মাকে। খবরটা শুনে সায়মার যেন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ে। আর এতে বাধ সাধে সে। সায়মা বলে,
  — বিদেশে যাওয়ার আগে আমাকে ঘরে তুলো। তা না করলে আমার কি অবস্থা হবে একবার ভেবে দেখেছো? এমনিতেই সবাই কানাঘোসা করছে। ওদের মুখ বন্ধ করতে আমাদের বিয়েটা খুবই প্রয়োজন।
     রোহানের এখন আর গড়িমসি করার সুযোগ নেই। এক অনারম্বড় আয়োজনে সায়মাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে। এরই মধ্যে সায়মার একটি এপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে আসে। জুটে যায় হেলথ এসিসটেন্টের সরকারি চাকরি। এই দুঃখের মধ্যেও যেন রোহানের জীবনে এক চিলতে আনন্দের ছোঁয়া। খুশিতে সে সায়মার হাতটা একটু চেপে ধরে।   
     রোহান চায় সায়মা বাইরে যাক। সবার সাথে মিশুক। নিজের বাজারপাতি নিজেই করুক। নারীর ঘরবন্দি জীবন ছিন্ন করে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করুক। রোহানের পরিবারের কেউই বিষয়টা নিয়ে অত মাথা ঘামায় না। সবকিছু ঠিকঠাক মতই চলছে। রোহানও চলে গেছে বিদেশে। 
     সায়মার সামনে এখন দুটো চ্যালেঞ্জ। একটি তার চাকরি অন্যটি পরিবার। কিন্তু সায়মা কি পারবে দুটো চ্যালেঞ্জেকে উৎরে যেতে? একদিকে রোহানের জন্য সায়মা সবসময়ই মনমরা হয়ে থাকে। সায়মার যেন ‘জাগরণে যায় বিভাবরী’। দুচোখে ঘুম নেই। অপরদিকে নতুন চাকরি নতুন কলিগ-বন্ধু-বান্ধব। আড্ডা-গান-গল্প। শত দুঃখের মাঝেও যেন এক চিলতে সুখের পরশ।  

     ৬. 
     রোহানের টানা দুই বছর কেটে গেছে বিদেশে। এই দুই বছরে অনেকেরই উল্টাপাল্টা ফোন রিসিভ করেছে রোহান। স্ত্রী সায়মা সম্পর্কে শুনেছে অবিশ্বাস্য অনেক কীর্তিকাণ্ডের খবর! কিন্তু কোনো কথাই কানে তুলেনি রোহান। কানে না তুললে কি হবে মনের ভেতর একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন যে তাকে প্রতিনিয়ত কুড়ে খায়। বিদেশের কর্মব্যস্ত দিনগুলোকে বিষাক্ত করে তুলে। তারপরও সায়মাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায় না রোহান। ভাবে সায়মাকে হয়তো সবাই ভুল বুঝছে। দেশে ফিরলে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। ভুলও ভাঙবে সবার। 
     অবশেষে দেশে ফেরে রোহান। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় বলা নেই কওয়া নেই গাড়ি বোঝাই করে মালামাল নিয়ে হাজির। গায়ে কালো কোট, হাতে ঘড়ি। আগের চেয়ে আরও ফরসা সুন্দর পালিশ চেহারা। এমন প্রত্যাবর্তন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। সায়মা ভেবেছে এটা মনে হয় রোহানের সারপ্রাইজ! আর রোহানের মা? তিনি সবচেয়ে খুশি হয়েছেন কিন্তু রোহানের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখে তার মনে খুব ভয় লাগছিল। তবে সেই ভয়ের কথা কাকে বলবেন? শুধু রোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলেন,
  — তুমি ভালো আছো বাবা?
     জল ছলছল চোখে রোহান বলে, হ্যাঁ মা আমি ভালো আছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না। 
     এরই মধ্যে দুতিন সপ্তাহ চলে যায়। রোহানের শরীর থেকে মুছে যায় বিদেশের গন্ধ। রোহান লক্ষ করে পরিবারের প্রতি সায়মা যেন কিছুটা আনমনা। কোনো কাজকর্মে মন নেই। কি একটা ধ্যানে দিনমান মগ্ন থাকে। প্রথম প্রথম বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত ভাত ভেড়ে বসে থাকতো সায়মা। কিন্তু এখন ভাবটা দায়সারা। দুই-আড়াই বছর আগের সায়মা আর আজকের সায়মার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য! তবে কি সায়মা কারো সাথে নিবিড় কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে? ফোনে সে যা শুনেছে তা কি সঠিক? ধীরে ধীরে সন্দেহের বীজটা রোহানের মনের গহিন জমিনে চারা গজাতে শুরু করে। রোহান সময়ে অসময়ে ফোন করতে থাকে সায়মাকে। অসময়ে ফোন পেলে হতচকিত হয়ে যায় সায়মা। ফোনের কারণ জানতে চাইলে রোহান বলে, এমনি ইচ্ছে হচ্ছিল তাই। 
  — এমনি এমনি ফোন দিয়ে পয়সা খরচ করে কোনো লাভ আছে? রোহানের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। সায়মা এমন কর্কশ সুরে কেন কথা বলছে? রোহান কিছুদিনের ভেতর সায়মাকে আবিস্কার করে খিটখিটে মেজাজী এক অন্য নারী হিসেবে। 
     অথচ রোহান? শান্ত সুবোধ। চালচলনে খুবই সাদামাটা, অল্পে সন্তুষ্ট। অন্তর্মুখী। সমমনা কাউকে না পেলে একাই পার করে দেয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পাড়ার গলিতে যে টেইলারিংয়ের দোকানটা ছিল। সেটা আবার চালু করে। সারাদিন দোকানেই পড়ে থাকে। ফেরে রাত দশটা এগারোটায়। সমস্ত কাজের ফাঁকে সায়মাকে রোহানের চোখ তীক্ষ্ণভাবে অনুসরণ করে। ভালোবাসে। টেইলারিং থেকে যা আয় রোজগার হয় তাতেই চলে যায় সংসার। 
     শ্রাবণের বিকাল। সেই সকাল থেকেই মেঘে আকাশ ঢাকা। বিকাল ঘনিয়ে আসতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি। রোহান ভাবে এই বৃষ্টিতেই সে বাড়ি ফিরবে। বাড়িতে আজ সায়মা একা। সবাই এক জায়গায় বেড়াতে গেছেন। সায়মা ঠিক কি করছে এই সময়ে তা স্বচক্ষে দেখে আসবে। অথবা এমন বৃষ্টির দিনে সায়মার সাথে সে খুনসুটি করবে। বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে। আকাশ যেন মাটিতে নেমে এসেছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পাড়ার রাস্তা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে একাকার। ঝর্নাধারা মতো সেই পানি উত্তরদিকে বয়ে চলেছে। এই বৃষ্টিতে রাস্তায় একটা রিকশা পর্যন্ত নেই। রোহান একটা ছাতা মাথায় নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে। কাক ভিজা হয়ে যখন বাড়ি পেঁৗছে তখন সন্ধ্যার আলো আঁধারি। বারান্দায় পা রাখতেই সায়মার খলখল হাসি তার কানে পৌঁছে। কার সাথে এতো হাসি? অন্যকোনো পুরুষ? রাগে ক্ষোভে কাঁপতে থাকে রোহানের শরীর। আবারও খলখল হাসি। সেই সাথে একটা পুরুষ কণ্ঠ! কণ্ঠটি রোহানের কাছে অপরিচিত মনে হয়। এ কার কণ্ঠ? কোনো কলিগ? দুজনে একসাথে চাকরি করে? কিন্তু চাকরি করলেও তো একা এসময়ে বাড়িতে আসার কথা না। রোহানের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে যা করার ঠাণ্ডা মাথায়ই করতে হবে। রোহান নিজেকে সংযত করে দরজার কড়া নাড়ে। কোনো সাড়া শব্দ নেই। আবারও কড়া নাড়ে। এমন ভাবে নাড়ে যেন বহুদিনের পুরনো দরজাখানা ভেঙে পড়বে। না, কোনো সাড়া শব্দ নেই। এবার একটু জোরে কড়া নাড়তে থাকে। কিন্তু কোন আওয়াজ নেই। সবশেষে সজোরে মারলো এক ধাক্কা। অমনি ভেতর থেকে কাঁপা গলায় সায়মা বলে, 
  — কে?
  — আরে দরজা খোল। আমি। 
     ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সায়মা। কাঁপতে থাকে ভয়ে। 
  — তুমি?
  — হ্যা আমি।
     সায়মার চোখমুখ ফ্যাকাশে। বিচলিত মুখাবয়ব। দাঁড়াবে না পালাবে ঠিক বুঝতে পারছে না। তবু কাঁপা গলায় রোহানকে বলে,
  — দাঁড়াও! দাড়াও! তোয়ালে দিচ্ছি। মাথা মুখ আগে মুছে নাও। 
     রোহানের কি আর হুঁশ আছে? সে হুড়মুড় করে ভেজা কাপড়ে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখে বেডরুমে বসে আছে এক যুবক। নাম সাদমান। সায়মার নতুন গলিগ। কলিগ তো কলিগের বাড়িতে আসতেই পারে। কিন্তু সময়ে অসময়ে কোন আকর্ষণে পরষ্পরের এমন সান্নিধ্যের প্রয়োজন পড়ে? তাও এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়? একেবারে বেডরুমে? এসব প্রশ্নের উত্তর রোহানকে কেন? কাউকেই বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।  
     সাদমান রোহানের কাছে এক অচেনা মানুষ। তার চোখেমুখে অপরাধবোধের স্পষ্ট রেখা। রোহান নিজেকে সামলাতে না পেরে শুধু দাঁত কিড়মিড় করে সাদমানের চোখে চোখ রেখে বলল,
  — এসব কি হচ্ছে এখানে?
  — কী আর হবে? নিজের স্ত্রীকেই জিজ্ঞেস করো না? 
     কথাটা শোনামাত্র মাথাটা চন করে ওঠে। আর শব্দগুলো হৃৎপিণ্ডের গহিনে ঢুকে পড়ে রোহানের। 
  — তুই এক্ষণই আমার সামনে থেকে বেরিয়ে যা! না হলে অবস্থা ভালো হবে না বলে দিচ্ছি!
     সাদমান আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ বেরিয়ে যায়। বাইরে তখন বৃষ্টিটা এতটুকুও থামেনি। রোহানের মাথায় রীতিমতো খুন চেপে গেছে। সে সায়মাকে কি করলে যে স্বস্তি পাবে ভেবে পায় না। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সায়মাকে বলে,
  — এসব কি দেখলাম? 
     সায়মা নিরুত্তর! 
     রোহান যখন রাগ করে তখন তার কণ্ঠ কঠোর হয়ে যায়। মুখে প্রবল এক বিকৃতি ধরা পড়ে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে রোহান শান্ত গলায় সায়মাকে বলে,
  — বেরিয়ে যাও! তোমার মুখ আমি আর দেখতে চাই না! এখনই বের হও! 
     সায়মা তখন কেঁদে ফেলে। একটু ঝুঁকে রোহানের পায়ে ধরে মাফ চাইতে উদ্ধত হয়। কিন্তু রোহানের হাতটা তখন অনেক উপরে উঠে যায়। আর কখন যে সায়মার গালে গিয়ে সজোরে বসে তা টের পায় না রোহান। ক্ষমা মহৎ গুণ- কথাটা ভেবেছিল রোহান। কিন্তু পরক্ষণেই সে কঠিন হয়ে যায়। কঠিন সুরে আবারও বলে,
    - বেরিয়ে যাও! তোমার মুখ আমি আর দেখতে চাই না! পথভ্রষ্ট পাপী।
     সায়মা তাৎক্ষণিক বুঝে ফেলে এখানে আর থাকা হবে না। তাই সে একরাশ অপরাধবোধ মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আর বৃষ্টিস্নাত রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার তাকে যেন নিমিষে আড়াল করে দেয়।   

মহিদুর রহমান
গল্পকার ও শিশুতোষ লেখক
মৌলভীবাজার, বাংলাদেশ