অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
বিকার - হাসান গোর্কি


যুদ্ধের শুরুতেই আমরা বাড়ি ছেড়েছি। আমি, মা আর শিল্পী থাকি বড় মামার বাড়িতে─  ফুলপুরে। বাবা জুনের মাঝামাঝি ঢাকা গিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। মামা ফুলপুর প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এলাকায় তার অনেক প্রভাব। জমি - জমার পরিমাণ অর্ধ শতাধিক বিঘা। যুদ্ধের কারণে স্কুল বন্ধ। মামা রাজাকার কমান্ডারের দায়িত্ব পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে বড় ছেলে ফটিক। ফলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন সমস্যা নেই। এটা ভেবে বড়রা শান্তি পায়। আমার শান্তি অন্যখানে। আমি রাত দিন তুলিকে দেখি। কাল গোলাপের মত দেখতে। কথা বলে খুব বেশি। কখনও তার অর্থ থাকে। কখনও থাকে না।

ডিসেম্বরে ফাইনাল পরীক্ষার পর ছোটবেলায় মা- র সাথে তুলিদের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। তখন রাস্তাঘাট ছিল না। যেতে হতো যমুনার খাড়ি বেয়ে─  নৌকায়। স্রোতের অনুকূলে ধীর গতিতে নৌকা চলত। এই অবিরাম স্রোতধারার শেষ গন্তব্য নিয়ে আমি ভাবতাম। পৃথিবীর গা বেয়ে জলের ধারাটা যেখানে কোন এক গভীর খাদে পড়ে যাচ্ছে, মনে মনে সে জায়গাটা দেখার চেষ্টা করতাম। কেমন কুয়াশা কুয়াশা আধো আলো ছায়ার একটা গহীন খাদ। আমি বসতাম সামনের গলুইয়ে। চারিদিকে কি ভীষণ নীরবতা! ঢালচরের কাশবন পেরনোর সময় গায়ে কাঁটা দিত। কোথাও বাতাস না থাকলেও ঢালচরের কাশবনে থাকে। মেঘের মত ঢেউ তোলে। লোকেরা বলে পরীরা এখানে পাখার বাতাসে চুল শুকায়। আমি কখনও পরী দেখিনি। ছোটমামা নানাবাড়ির পেছনের মাঠে অনেকবার জ্যোৎস্নারাতে পরী দেখেছে। তাকে ঘিরে নাচের ভঙ্গিতে ওড়াউড়ি করেছে পরীরা। কিন্ত কাছে আসেনি। মানুষের ছোঁয়া লাগলে পরীদের ডানা শক্তিহীন হয়ে পড়ে। তারা আর উড়তে পারে না। আমি মাঝে মাঝে তুলিকে ডানায় সাজিয়ে কল্পনা করতাম। মেঠো চিলের মত কালো ডানা। মনে মনে বলতাম
‘তুলি পরী’, ‘কালো পরী’। হেঁটে যাস কই? 
খোলা চুল বাতাসে যে করে থৈ থৈ!
তুলির উদ্দেশ্যে নিবেদিত স্বরচিত অপরিপক্ক পংক্তিমালা; ভালবাসার এক ধরনের নিভৃত অনুশীলন।

সন্ধ্যার পর বৈঠকখানার সামনে খড়কুটো জ্বালিয়ে একটা অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়েছে। প্রতিদিনই কাজটি করা হয়। উদ্দেশ্য শীত নিবারণ হলেও এক ধরনের ছোটখাটো উৎসবের আমেজও আছে এতে। তুলি আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। কথা বলার একটা উপযুক্ত বিষয় উদ্ভাবন করা গেলে তুলিকে পাশে পাওয়া যাবে অনেকক্ষণ। বললাম
─  তুলি, তোর কী মনে হয় ? যুদ্ধে কে জিতবে, মুক্তিবাহিনী না মিলিটারি ?
তুলি বলল
─  মুক্তিবাহিনী জিতবে। একশ’বার জিতবে। এক হাজারবার জিতবে।
এখানেই শেষ নয়। কিভাবে ভাইজানের দল রাস্তায় মাইন পুঁতে মিলিটারি ট্রাক উড়িয়ে দিচ্ছে, ব্রিজ ভেঙে ফেলছে, দলছুট আর্মিদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলছে তার সবিস্তার বর্ণনা দিতে শুরু করল সে। 
বললাম
─  যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জিতলে মামার কী হবে ?
─  ক্যান, ফটিক ভাই আছে না। 
আমি হাত গরম করে তুলির দুই গালে চাপ দিলাম। বললাম
─  দেখ, কেমন গরম। 

অগ্নি উৎসবে আমাদের বয়সী কেউ নেই। সবাই বলতে গেলে শিশু। তারা কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তুলি আলতো করে শুধু আমার হাত দুটো সরিয়ে দিল। তারপর সোজা হেঁটে চলে গেল বাড়ির মধ্যে। আমি হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ে গেলাম। লোকজন নেই। অন্ধকারটা তখনও ঘন হতে শুরু করেনি। পুকুরের ওপর হেলে পড়া পিঠাহাড়ি গাছটায় কয়েকটা বক এসে বসেছে। এখানে রাত্রি যাপন করবে। আবার সূর্য ওঠার আগেই উড়ে চলে যাবে দোবিলের দিকে। মাঝে মাঝে কটকট শব্দ করে ডাকছে বকগুলো। পরিতৃপ্তির ডাক। কর্মক্লান্ত দিনান্তে তারা শান্তির নিরাপদ আশ্রয়ে এসেছে। এখানে তুলি থাকলে কি অপূর্ব একটা ব্যাপার হতো! দু’জন পাশাপাশি বসে আছি। হিমেল হাওয়ায় তুলির হাতদুটো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। শিশিরে ভিজে যাচ্ছে তার চুল, চোখের পাতা, কাষ্মিরী শালটা। সে কোন কথা বলছে না। আমিও না। শুধু বহুদূর হিমালয়ের বরফের গা ছুঁয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাস থেকে বাঁচার জন্যে মাঝে মাঝে তুলি আমার গা ঘেঁষে বসছে। ভাবনাটা তো অলীক নয়। অবাস্তব নয়। এরকম তো ঘটতেই পারে। এভাবে ঘণ্টা দুই বসে রইলাম পুকুর পাড়ে। একা। আমার দিগন্তপ্রসারী কল্পনা নিয়ে ঈশ্বরের মত একা, তারই মত স্থির প্রশান্তিতে।

এসময় হঠাৎ বাড়ির মধ্যে উঁচু স্বরে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা গেল। মামার কণ্ঠ। কাউকে খুব জোরে শাসাচ্ছেন মামা। অনেক ছোটখাটো বিষয় নিয়েও তিনি হৈ চৈ বাঁধিয়ে ফেলেন। এটা তার অভ্যাস। একারণে লোকজন তাকে ভয়ও পায়। বাধ্য না হলে কোন বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কেউ-ই তার মুখোমুখি হতে চায়না। মালিকানা নিয়ে সমস্যা আছে এমন ধরনের জমি কেনা মামার একটা শখ। এসব জমির মূল্য কম। তবে মূল্যের বিষয়টি মূখ্য নয়। তার কাছে মূখ্য বিষয়, একটা মামলা যুদ্ধে জড়ানো এবং তাতে জয়- পরাজয়ের উত্তেজনায় প্রতিনিয়ত শিহরিত হওয়া। আজকের বিষয়টিও হয়তো সেরকম একটা কিছু। তবে প্রতিপক্ষ সহজ নয় সেটিও সহজে অনুমান করা গেল। আমার হিম কুয়াশার স্বপ্ন ভেঙে গেল। ভয়ে ভয়ে বাড়ির ভেতর গেলাম। দেখলাম, স্টেনগান কাঁধে ঝুলিয়ে ফটিক ভাই উঠোনের মাঝখানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মামার হাতে একটা এসএমজি। মামা বলছেন
─  তুই হামার বড় ব্যাটা। একনও যদি তওবা কোরে আল্লার রাস্তাত আসিস তালে মাপ কোরে দিমু। আর কতা না শুনলে ত্যাজ্য করমু।
ফটিক ভাই বলল
─  তাজ্য করেন আর যাই করেন হামার কিছু কওয়ার নাই।
─  এই শোন। জাহান্নামোতও তোরকেরে লাগান নাফারমানের জাগা হবি না। দ্যাশটাক বিধর্মীকেরে হাতত তুল্যা দিবার চাস? পারবু না। আল্লাই পাকিস্তানোক হেপাজত করবি।
─  পাকিস্তানের সাথে আল্লার কী সম্পর্ক? 

মামা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎ এসএমজিটা উঁচু করে ফটিক ভাইয়ের বুক বরাবর তাক করলেন। ট্রিগারে তর্জনী রাখলেন। দেখলাম, তার হাত কাঁপছে, সারা শরীর কাঁপছে। মামাকে জীবনে বহুবার রাগ হতে দেখেছি, তবে এমন ভয়ঙ্কর মূর্তি তার কখনও দেখিনি। যে স্নেহাস্পদ ফটিকের কলেজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় মামা ভাত না খেয়ে অপেক্ষা করেন, জ্বর হলে সকাল- সন্ধ্যা ইয়াছিন সুরা পড়ে মুখে ফুঁ দেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন, তার দিকে যে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তিনি তাকাচ্ছেন তা অবিশ্বাস্য। মামা বললেন
─  এক্ষুণি বাড়িত থ্যাকা বার হ।

মামী সোজা এসএমজির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি এবং তুলি জাপটে ধরলাম মামাকে। আমাদের মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মামা ফটিক ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন । সশব্দে একটা চড় বসিয়ে দিলেন গালে। ফটিক ভাই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। উঁচু গলায় তুলি অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করল। তারপর কলতলা গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এসে সবার সাথে খেতে বসল। ভাত না খেয়েই মামা সে রাতের মত ক্যাম্পে চলে গেলেন। আমি বৈঠকখানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। লেপের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে ঘুমানো আমার ছোটবেলার অভ্যাস। নিজের গরম নিঃশ্বাসে লেপের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠলে মাথা বের করে কিছুক্ষণ প্রশ্বাস টানি। মনে মনে ভাবছিলাম, যুদ্ধে মামা এবং ফটিক ভাই মারা গেলে এ সংসারের দায়িত্বটা নিশ্চিতভাবেই আমার কাঁধে পড়বে। আর সেক্ষেত্রে তুলির বিয়ের জন্যে মামী আমার থেকে ভাল পাত্র আর কাউকে মনে করবেন না। আমি তখন পড়ন্ত বিকেলে হলুদ সর্ষে খেতের মধ্যে দিয়ে তুলির হাত ধরে হেঁটে যাব যমুনার পাড়ে। সানাইপুকুর ঘাট থেকে নৌকায় উঠে শহরে যাব। মেরিনা টকিজে রাতের শো দেখে যখন ফিরে আসব তখন ফুলপুরের মানুষজন ঘুমিয়ে পড়বে। চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে চারিদিক। তুলি বলবে
─  আমার ভয় করে।
─  কিসের ভয় ?
─  জিন- পরী।
─  তুই তো নিজেই পরী। তুলি পরী।

বৈঠকখানার দরজায় খুব সন্তর্পণে কেউ কয়েকটা টোকা দিল। আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। বুঝলাম, ফটিক ভাই ঘুমোতে এসেছে। মাঝে মাঝে রাতে আসে। বেঘোরে ঘুমায়। ভোর হবার আগেই চলে যায়। দরজা খুললাম। তুলি দাঁড়িয়ে আছে। আগাগোড়া চাদরে মোড়া। শুধু মুখটুকু বের করে রেখেছে। পেছনে মামী। আমি কোন কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মামী বললেন
─  কামাল একটা কথা শুনবা বাবা ?
─  কী কথা মামী? বলেন।
─  আমি তোমার মামার জীবনডা বাঁচাবার চাই।

মামী যে সমস্যার কথা বললেন, সেটা আমি আগেই ভেবেছি। মামীর কথা হলো, এই বিপুল পরাক্রমশালী পাকিস্তানী বাহিনীকে কেউ হারাতে পারবে না। যুদ্ধে তারাই জিতবে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী মামাকে মেরে ফেলবে। এবং ঘটনাটা যে কোন দিনই ঘটতে পারে। নলডাঙ্গার চেয়ারম্যানকে মাস খানেক আগে মেরে ফেলেছে মুক্তিবাহিনী। তার অপরাধ ছিল, গ্রাম থেকে খাসি- মুরগি জোগাড় করে সে আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছে দিত। মামীর ধারণা, ফটিকের গতিবিধিও ভাল না। যে ফটিক বাবার সামনে পড়লে মাখনের মত গলে যেত, সে এখন তার চোখে তাকিয়ে কথা বলে। রুক্ষ কণ্ঠে তর্ক করে। আর সব কথার জবাব দেয়। মামা পাকিস্তানীদের ছেড়ে আসছেন না, এটা নিশ্চিত। আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হবার জন্যে মামা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের শেষে দোয়া করেন। তখন তার দু’চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। নামাজ শেষে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তার রুদ্র মূর্তি ফিরে আসে। তিনি বলতে থাকেন
─  সব হিন্দুক গলা ক্যাটা যামুনাত ভ্যাস্যা দেওয়া লাগবি। সব নিমক হারামক পুঁতে ফ্যাল্যা দেওয়া লাগবি।

এ অবস্থা থেকে রক্ষা পাবার জন্যে মামীর পরিকল্পনা হলো মামাকে পাগল বানানো। ফুলবাড়ির দুখু ফকির যে কাউকে পাগল বানাতে পারে, যে কোন পাগলকে সুস্থ করে তুলতে পারে, জিন তাড়াতে পারে; এমনকি  শ্যাওলা পড়া পুরনো বট- পাকুড়ের গাছ থেকে খল জিন পরীদেরও তাড়িয়ে দিতে পারে সে। মামী বললেন, মামার জন্যে তার কাছ থেকে একটা তাবিজ আনতে। পাগল হয়ে গেলে পাকিস্তানীরা তাকে তাড়িয়ে দেবে, আর মুক্তিযোদ্ধারা মাফ করে দেবে। তাবিজ কবজে আমার বিশ্বাস নেই। তবু ঝামেলা এড়ানোর জন্যে মামীকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ। একবার পাগল হয়ে গেলে সারাজীবনেও মামা আর সুস্থ না হতে পারেন। মামী কোন কিছুই মানতে রাজী নন। পাগলের তাবিজ-ই তার চাই। তার কথা একটাই─ আগে স্বামীর জীবন রক্ষা হোক, পরে সব ভালমন্দ ভাবা যাবে। তুলিও অস্থির। বাবার জীবন বাঁচাতে সে আমার সাহায্য চায়। 

পরদিনই দুখু ফকিরের আস্তানায় গিয়ে পাগলের তাবিজ নিয়ে এলাম; সাথে এক বোতল পানি পড়া। ফকিরের নির্দেশ মত তাবিজের সাথে পাঁচটা মরা মাছি আর একটা জীবন্ত টিকটিকি একটা হাঁড়িতে পুড়ে বাড়ির উত্তর দিকের কদমতলায় পুঁতে রাখলাম। হাঁড়িটা মাটি চাপা দিতে গিয়ে আমার হাত দুটো কেন জানি কেঁপে উঠল; শিরশির করে উঠল চুলের গোড়া। পরদিনই মামাকে পানিপড়া খাইয়ে দিলেন মামী। এক সপ্তাহ কেটে গেল। পানিপড়া এবং তাবিজে কোন কাজ হয়েছে বলে মনে হলো না। মামী আবার অস্থির হয়ে উঠলেন। মামা এখন আর প্রতিদিন বাড়ি আসেন না। মুক্তিবাহিনীর অত্যাচার বেড়েছে। এরই মধ্যে টহল আক্রমণ করে দু’জন বালুচ সৈন্যকে তারা হত্যা করেছে। টহল দলে মামাও ছিলেন। অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেছেন। তিনি তাতে সন্তুষ্ট নন। ছেলের বয়সী দু’জন বালুচ সাথীর ধাবধবে সাদা নিথর মুখাবয়ব থেকে মৃত্যুর পরে বেহেশতি নূরের যে আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল তার বর্ণনা মামা বারবার দিচ্ছিলেন বিভিন্ন জনের কাছে। বলছিলেন, আল্লাহ পাক যদি তাকে গাজী না বানান তাহলে যেন এদের মত শহিদী দরজা দান করেন। 

বেশ ক’দিন পর মামা সন্ধ্যায় বাড়ি এলেন। মাঝের ঘরের বড় চৌকিটার ওপর লেপের মধ্যে পা ঢুকিয়ে রেডিওতে বিবিসি ধরলেন। আমিও পাশে বসলাম শোনার জন্যে। তাজউদ্দিন আহমেদ মস্কো গেছেন। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে দ্যুমায় তার বক্তৃতা দেয়ার কথা রয়েছে। ভারত পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তার সমর্থন পূনর্ব্যক্ত করেছে। পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। কাটাখালিতে মাইন বিস্ফোরণে দশ পাকিস্তানী সৈন্য মারা গেছে─  এ ধরনের আরো কিছু খবর। মামা তুলির কাছে পানি চাইলেন। মামী দ্রুত এক গ্লাস পানি নিয়ে হাজির হলেন। পানি খেয়ে মামা বিরবির করে কি যেন বলতে শুরু করলেন। হঠাৎ পশ্চিম দিকে ফিরে দুটো সেজদা দিলেন। বললেন
─  এক জগ পানি আন।  
মামী মাথার ইশারায় আমাকে ডেকে বাইরে নিলেন। বললেন
─  পানি পড়ার কাজ শুরু হয়্যা গেছে বাবা। একোন একটু সাবধান। ফটিকোক ডাকো; আর তোমার মামা ঘুমায়া পড়া পর্যন্ত দুইজনই একটু সজাগ থাকো।
মামীর কথা শেষ না হতেই ঘরের মধ্যে থেকে মামা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। চিৎকার করতে করতে বাইরে এসে শূন্যে কয়েকটা ফাঁকা গুলি ছুঁড়লেন। শ্যালো টিউবওয়েলের ঘরে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে ছিল ফটিক ভাই। আমাকে বলেছে মামা চলে গেলে খবর দিতে। মামীর সাথে দেখা করবে। ফুলপুরে থাকা কারো জন্যেই আর নিরাপদ নয়। বাড়ির সবাইকে দূর্গাহাটায় ছোট খালার বাড়িতে রেখে আসতে চায় ফটিক ভাই। স্টেনগান হাতে ফটিক ভাই দৌড়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল। তাকে দেখে আবারও ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মামা চারিদিক প্রকম্পিত করে তুললেন। আবারও শূন্যে গুলি ছুঁড়লেন। এসএমজির পুরো ম্যাগাজিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ট্রিগারে আঙুল চেপে রইলেন তিনি।
তুলি চিৎকার করে বলল
─  বাপজান আপনে কি পাগল হয়্যা গ্যালেন !

তুলি মামার দিকে এগিয়ে যেতেই তিনি তার কপাল লক্ষ করে পিস্তলের একটা গুলি ছুঁড়লেন। তুলি মাটিতে পড়ে গেল। আবার কষ্ট করে উঠে বসল। হাতরে হাতরে উঠোনে কি যেন খুঁজতে থাকল। কি যেন বলতে গেল তুলি। কপালের ফুটো আর নাক মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো। তারপর অনেকটা স্বেচ্ছায় সে আবার মাটিতে শুয়ে পড়ল। 

hassangorkii@royalroads.ca
 রয়াল রোডস ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ কলম্বিয়া