অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
হাতেম আলীর খিড়কি দুয়ার - ফরিদ তালুকদার

"We are more imprisoned to our 
greediness than anything else in our life"

"জীবনের অন্য সবকিছুর চেয়ে আমরা 
আমাদের লোভের কাছেই সবচেয়ে বেশী জিম্মি"

সমাজ চিত্র পরিবর্তনের সাথে সাথে পৃথিবীর অনেকাংশেই দারিদ্র্যের শ্রেনী চরিত্রে পরিবর্তন এসেছে কিন্তু তার বিমোচন কখনো সম্ভব হয়নি। বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই একজন দিনমজুরের চেয়ে একজন শিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত বেকার কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে হয়ত চিত্রটা এমন ছিল না। "হাতেম আলীর খিড়কি দুয়ার" সে সময়েরই রূপায়ণ।

বেশ প্রকৃতি উদার হাতেম আলীর 
বিশ বাই পনের হাতের এই দোচালা ঘর।
কখনো শারদীয় জোছনার ফোঁটা
ঘরের মেঝেতে হামগুড়ি খায়
কখনো ভাঙা সানকিতে 
শ্রাবণ শাওনের ধারা টাপুস টুপুস ছন্দ তোলে।
ঘরের মধ্যে প্রকৃতির এই পালা বদলে
হাতেম আলীর ঘুমে কোন ফারাক পড়েনা।
বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা নড়বড়ে খিড়কি দুয়ারের পিছনে
পরিশ্রমী বলদের মত দেহটাকে গামছার আড়ালে ঢেকে
নিমেষেই সে ঘুমিয়ে যেতে পারে যে কোন রাতে।
পড়শী আলকাজ মিয়ার অকাল মৃত্যু 
অকাল বিধবা আছিয়া বেগমের বুকের হুতাশন
তাকে কখনো বিচলিত করে কি করে না বলা যাবেনা..।
মহা দার্শনিকের মত 
এসবই যেন মামুলি কোন বিষয় তার কাছে।

একটু বেশী জোড়েই বইছে আজ 
নিশীথের এই শ্রাবণ ঝড়...
হাতেম আলীর খিড়কি দুয়ারে আওয়াজ তুলে ঘুম ভেঙে দেয়...
হাতেম আলী শুধায়
ক্যাডা গো...?
আমি তোর স্বপ্ন রে হাতেম
তোর ছোড কালের স্বপ্ন...।
ছোট বেলায় ই বাপ হারানো হাতেম বলে
স্বপ্নডা আবার কি?
আমার কোন স্বপ্ন নাইক্যা...
ছোড বয়সেই খাইয়া ফালইছি সব প্যাটের খিদায়...।

একটু পর পর আসে দমকা বাতাস
হাতেম আলী বলে
আবার ক্যাডা...?
আমি তোর শখ রে হাতেম 
দুয়ার খোল...
শখ...?
হেইডা আবার কি জিনিস? 
মহাজনের বাড়ি গতর খাইডা বাঁইচা রইছি
শখ ফক জানিনা যাওগা তুমি...।

খিড়কি দুয়ারের ফাঁক গলে ঠান্ডা বাতাস
উড়িয়ে নেয় হাসেমের গায়ের গামছা
আবার ক্যাডা আইলা...?
আমি তোর ভালবাসা রে হাতেম...
বিরক্ত হাসেম বলে
এইডা তুমি কি কও?
আমার আবার ভালবাসা আইলো কইথাইক্যা?
কেনরে হাতেম পারুল বিবির লইগ্যা তোর মনডা যে
পুইড়া যাইতো হেইডা ভুইলা গ্যাছোস?
ভুলমু ক্যান... হেইডা ভুল কইরা অইতো
বছর গড়াইয়া গ্যালো
পারুল বিবি অহন জমির শেখের ঘর করে...!
হালের গরু নাই, জোয়াল নাই 
আমার আবার ভালবাসা...!?
দিনমজুরের ঘরে 
মহাজনের শোষন আহে
পরনারীর ভালবাসা আহে না...!
ওসব কতা না কইয়া অহন ঘুমাইতে দেও।

বাতাসের ঝাপটা আরও একধাপ বেড়ে এমন ভাবে এসে পড়লো মনে হোল ক্যাং করে শব্দটা খিড়কি 
দুয়ারের পাঁজর থেকে বেড়িয়ে আসছে।
অহন আবার ক্যাডা আইলা? হাতেম আলীর কন্ঠে রাগ
আমি তোর স্বাধীনতা হাতেম বাইরাইয়া পর...
তুমি আমার স্বাধীনতা অইলা ক্যামনে?
আমি তো স্বাধীন ই... 
এই প্যাটটার কাছে যা এট্টু আটকাইয়া গেছি
হ'...আর আমার মায়রে ছাইড়া যাই কই?
তোমারে আমার দরকার নাই...
ঐ মহাজনের বাড়িতে যাও
হেগোরই বেশী দরকার তোমারে
লোভের কাছে হেরাই বেশী পরাধীন 
দুনিয়ার হগল মহাজনের ই তোমারে দরকার
এহানে আর আইওনা।

বৃষ্টি এখনো ঝড়ছে তবে বাতাসের বেগ কমে আসছে আস্তে আস্তে 
হাতেমের দেহও আরও নিস্তেজ হয়ে আসে শেষ রাতের ঘুমে কিন্তু বাইরে থেকে আবারও ডাক আসে
হাতেম ও হাতেম উঠছোচনি?
ক্যাডায়...?
আরে আমি মুজু...
তুমি এত্তো হক্কাল বেলা কির লাইগ্যা মুজু ভাই?
আরে আইজকা না মহাজনের দূরের জমিনে
কামলা দিতে যাইতে অইবো?
হয়.. হের লাইগা এত্তো হক্কালে? অহনও তো বৃষ্টি পড়তাছে।
হ'.. তয় থাইমা যাইব শিক্ঘরই..
তুমি দাওয়ায় উইঠা বও, আমি আইতাছি...।

হাতেমের এক চিলতে দাওয়ায় উঠে আসে মুজু
আপন মনে বিড়বিড় করে বলে
আহ্ কি তান্ডবটাই না গেল হারাডা রাইত
এবছর বাম্পার ফলন অইছে আউসের 
সব না আবার ঝইড়া যায়..।
শুনে হাতেম বলে
বাম্পার ফলন দিয়া আমাগো কি অইবো মুজু ভাই
এক ছডাক ধানও কি আমাগো দিব?
কামলার ট্যাহাডাই ঠিকমত দেয় না...!
তয়.. তুমি অইলা হের খাস কামলা
তোমার কতা মনে লয় এট্টু আলাদা।
হেইডা কিচ্ছু নারে হাতেম..
তয়.. তুই কইছোস কতা ঠিক...
কথা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মুজু।

গেল বছর থেকে মহাজনের উপর রাগটা একটু বেশী হাতেমের। মায়ের চিকিৎসার জন্যে কিছু টাকা ধার চেয়েছিল সে মহাজনের কাছে। বলেছিল মৌসুমে বেশী করে গায় খেটে শোধ করে দিবে ধীরে ধীরে। রাজি হয়নি মহাজন। অবশেষে দক্ষিণের ঐ বাগানটুকু বন্ধক রেখে টাকা নিতে হয়েছিল। 
এখন শুধু ছোট এই ঘর আর এর চারপাশে হয়তো দশহাত করে জায়গাটুকু ই মাত্র সম্বল হাতেমের। এও হয়তো বেহাত হয়ে যাবে একদিন...।

প্রায় নিশ্চিত এই ভবিতব্যের জন্যে হাতেমের ক্ষুধা দায়ী না মহাজনের সীমাহীন লোভ দায়ী না হাতেমের ভাগ্য দায়ী সে প্রশ্নের উত্তরে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে। তবে অতি পূরণ যেমন এই চিত্র পৃথিবীর মানচিত্রে তেমনি লক্ষ কোটি এর সংখ্যা। যার কোন পরিসংখ্যান কখনো তৈরী করে নি এ সভ্য সমাজ।

একটু নীরব থেকে মুজু বলে
হাতেম তোর দুয়ার তো একখান পরায় পইরা গ্যাছেরে..
হ'.. মুজু ভাই এই রাইতের ঝড়ে অইছে এইডা। চাল থাইকাও পানি পরে.. ঘরডার অনেক মেরামত দরকার..
তা.. ট্যাহা পামু কই? খালি মায়ের লাইগ্যা পইরা রইছি, নইলে এইডুও বেইচা দিয়া গ্যারাম ছাইড়া যাইতাম গা মুজু ভাই। 
কই যাবিরে হাতেম... যেহানে যাবি হেই হানেই এক অবস্থা..।
দেহি কাদা বইষ্যাডা এট্টু যাউক, আমি আইয়া আত (হাত) লাগামুনে তোর লগে।
যতটুক পারা যায় ঠিক করুমনে দুইজনে।
আইচ্ছা মুজু ভাই...। 
চাচীর শরীলডা অহন ক্যামন?
এই ক্ষনে এট্টু ভাল, ক্ষনে আবার...
শ্বাসের কষ্টডাই বেশী জ্বালা দিতাছে..!

আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে রাতের অন্ধকার। একটু পরেই জেগে উঠবে ভোর। পূরণ সূর্যের নীচে আর একটি নূতন ভোর। আবছায়া অন্ধকারে মুজু আর হাতেম বেড়িয়ে পরে আরেকটি নূতন দিনকে সামনে রেখে। পূরণ দিনগুলোর মতই আর একটি নূতন দিন!!

ফরিদ তালুকদার 
টরন্টো, কানাডা।