অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
পেঁয়াজু এবং বন্ধুত্বের ভার্সনের স্বরুপ - শেখ ফিরোজ

ব্যস্ত নগরীতে হঠাৎ করে দেখা হবে ভাবতে পারিনি। সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততা শেষে ঘরমুখী মানুষের ভীড়ে খিলগাঁওয়ে পৌঁছে দেবার জন্য তোয়াজে ব্যস্ত মফস্বল শহর থেকে অফিসিয়াল  ট্রেনিং  আসা আমার বর্তমান সহকর্মী ও আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একই হলে, একই রুমে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা বন্ধু সোহরাব। অন্তত ১৫ জন রিক্সা ওয়ালাকে তোয়াজ শেষে ফিরে এসে দাঁড়ালাম একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে। আর তখনই দেখা হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বান্ধবী পপি'র সাথে। একই বিভাগে পড়াশোনা, আমার বিভাগের বিতর্ক টিমের সারথী। ১২ বছর হলো সরাসরি দেখা হয়নি। মোবাইলে কথা হয়না কমপক্ষে ৮ বছর। ও সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। ফেসবুকে মাঝে মাঝে দেখি বটে। তবে সম্পর্ক যখন ডিজিটাল ভার্সনে চলে গেছে; মানুষের দূরত্বটাও বেড়েছে ঢের। নিয়মিত আপডেটটা সহজেই জানা হয়ে যায়। বিবাহ, চাকুরী, সন্তানদের সংখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। সন্তানেরা কতটা বড় হয়েছে তাও অজানা নয়। তবে যোগাযোগের ছেদটা সাংঘাতিক ভাবেই ঘটে যায় অজান্তেই! 

রবিবার রাত ১০ টায় ঢাকায় পৌঁছেছি। রাতের খাবার শেষে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকতে ওর একটা স্ট্যাটাস সামনে এলো-
"আমার ছেলে Chittagong এর নেভাল এ এমন পেয়াজু খেয়ে এসে এখন বায়না ধরেছে বানিয়ে দিতে। খেয়ে বলেছে nice...."(পেঁয়াজু'র ছবি দেয়া তাতে)

আমি কমেন্ট করলাম, খাওয়ার তো ইচ্ছে করলো রে...

রিপ্লাই এলো, "আমার দুয়ারে এই গুনি পা রাখলে খুশি হব।"

আমি ঢাকায় সেটা জানালাম না। উত্তরে লিখলাম,  ইনশাআল্লাহ। কোন একদিন চলে আসব আমার গুণী বন্ধু'র বাসায়।(সোজাসাপ্টা ভার্চুয়াল উত্তর আর কী)   

পরের দিনই ট্রেনিং শেষে সোহরাব এবং আমি যখন রিক্সা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান; ওর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়াতেই ও বলে উঠলো, এই তোমার না পেঁয়াজু খাওয়ার কথা আমার বাসায়? তুমি ঢাকায় তাতো বলোনি! কালকেই আমার বাসায় তোমার এবং সোহরাবের দাওয়াত। রাত ৮ টায়। অবশ্যই আসবে। 

একটু বিপদেই পড়ে গেলাম। ঐদিন বন্ধু জহিরের বাসায় দাওয়াত আমার এবং সোহরাবের। জহিরের অনুরোধ ছিল এবার ওর বাসাতে আমাদের থাকতে হবে। অগত্যা এই নাছোর বান্দার গোস্বা থেকে বাঁচতে আমরাই ওকে বলে এসেছি -তোর বাসায় এবার থাকবনা। তবে পরশুদিন আমরা তোর বাসায় রাতের খাবার খাব। অন্তত তার আবেগের তীর থেকে এ যাত্রায়  মুক্তি পেলাম। 

তবে এ দফায় পপি'র দাওয়াত আর কোনভাবেই ফেরানো গেলোনা। বার বার প্রশ্ন কালই আসবে। আসবে তো? বলো। আসতেই হবে। সোহরাব এবং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম-জহিরের বাসা যেহুতু আমরা যেখানে থাকছি তার কাছাকাছি। তবে ওর ওখানে যে কোন দিনই যাওয়া যাবে। নাহয় তার পরের দিনই যাব। বিষয়টা জহিরকে জানালে সে রাজি হল বটে, তবে একটু নাখোশ চিত্তে। 

অতঃপর, পরের দিন দাওয়াত অনুসারে আমরা পপি'র বাসায় গেলাম। দুলাভাই নিচে এসে আমাদেরকে রিসিভ করলেন। তাঁর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। তাঁকে অত্যন্ত আন্তরিক মনে হলো অভ্যর্থনাতেই। বাসাতেই ঢুকেই রান্নার ঘ্রাণ! বাচ্চা দু'টো নিজেদের মত নিজেরা খেলছে। চেঁচামেচি করছে। আমাদের সাথে বাচ্চাদের খাপ  খাইয়ে নিতে সময় লাগলো বেশ। এরপর আমাদেরকেও বাচ্চা দু'টো  ওদের  খেলার সাথী করে নিলো। ফাঁকে পপি এসে মাঝে মাঝে দেখা করে যাচ্ছে। দুলাভাই নাস্তা পরিবেশন করে আমাদেরকে সময় দিচ্ছেন। বেশ গল্পও জমিয়ে দিয়েছেন আমাদের সাথে। আবার সহধর্মিনীকেও সাহায্য করছেন মাঝে মাঝে। পপি অফিস শেষ করে এসে রান্না করছে। ব্যাংকারের ঘরে ফেরা বলেই কথা! 

অতঃপর, টেবিল ভর্তি খাবার! সব নিজ হাতে রান্না করা। অসাধারণ একটা ভর্তা ছিল। খাওয়া শেষে আমি এবং সোহরাব কুইজ প্রতিযোগিতায় হেরে গেলাম। আমরা যখন বারবার বলছিলাম, ভর্তাটা চমৎকার হয়েছে। 
পপি জিজ্ঞেস করলো, বলোতো কিসের ভর্তা এটা? 
-আলু ভর্তা। আমরা দু'জনেই উত্তর দিলাম। 
-এটা আসলে কচু ভর্তা। পপি হেসে উত্তর দিল।

আমরা হেরে গেলাম। আসলে হারবই তো। আমরা যে ওর আন্তরিকতা, ওর স্বামীর আন্তরিকতার কাছে আগেই হেরে গেছি। আর আমি তো হেরে গেছি পপি'র বন্ধুত্বের কাছে। আসলে এই ভার্চুয়াল সহজ উক্তি আর লাইক কমেন্ট আমাদের স্বজনদেরকে প্রতিনিয়ত আপডেট দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু প্রকৃত যোগাযোগ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে এক যুগ করে।     

আর পেঁয়াজু? থাক পেঁয়াজুর কথা না হয় এবার না ই বললাম....

শেখ ফিরোজ 
ঢাকা, বাংলাদেশ।