অটোয়া, বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
রজনী - আবদুল্লাহ আল আহনাফ

নিয়তির অপকলঙ্কে যেন তার জন্ম হয়েছিল পল্লী গাঁয়ের অতি সাধারণ একটা পরিবারে। বলছিলুম সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের মতন স্নিগ্ধ কমনীয় বালিকা রজনীর কথা। এই ক্ষুদ্র বালিকাটি আমার জীবনের একসময়ের নিপুণা অভিভাবিকা ছিল, সমস্ত বিশ্বসংসারের দায়িত্ব যেন তার কাছেই অর্পিত ছিল। তার সেই বালিকামূর্তি আমার গল্পের চিত্তপটে রঙিন আঁচড় কেটে গেছে। আমার মাধ্যমিক শেষ হবার পর পল্লী গাঁয়ের সেই বালিকা কেমন করে যেন আমার সমস্ত মনপ্রাণ জুড়ে গেঁথে গেল;অবশেষে শ্রাবণের শেষে কোনো এক ক্লান্ত বিকেলে ওর সাথে প্রণয়ের গাঁটছড়া বেঁধে নিলুম। মুঠোফোনে খুদে বার্তায় কথা হত আমাদের। 

এরপর আমি উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার জন্য পল্লী ছেড়ে শহরে এসে উঠলুম। লক্ষ্য বিদ্যে অর্জন করে নামকরা প্রকৌশলী হওয়া। এভাবে কেটেছে তিনটে বছর। হ্যা, এই সময়টাতে আমাদের প্রেম, আবেগ, বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়ে উঠেছিল। 

আবার সেই শ্রাবণ মাস, সন্ধ্যে হয় হয় ভাব, আকাশটা ছেয়ে গেছে মেঘকন্যাদের ছায়া দিয়ে। এমন সময় আমার জীবনের ধরিত্রীপুরে কালো ছায়া নেমে আসলো, খবর পেলুম রজনীর বিবাহ। প্রথমত শুনে হেসেই ফেলেছিলুম। ভাবলুম এও কি সম্ভব? তবে অসম্ভবের কিছু ছিল না। পরিশেষে শুভ পরিণয় শেষ হলে, যখন ওর সাথে আর কথা বলতে পারলুম না। কেঁদে উঠল সমস্ত মনটা। কাঁদলুম, কান্নায় নাকি শোক মন্দীভূত হয়।

এরপর সাতটি বছর পেরিয়ে গেল। আর ওর সাথে যোগাযোগ হয়নি। আমি নামকরা প্রকৌশলী। শীত সবেমাত্র পড়েছে, এমন সময় গাঁয়ের বাড়িতে যাচ্ছি; সেই পল্লী গাঁ এখনো আছে তবে তার চেহারা পাল্টেছে। মেঠোপথের আদলে পিচঢালা রাস্তা, টিনের চালাঘরের পরিবর্তে ইষ্টক নির্মিত দালান। 
একদিন পুরনো বন্ধুদের সাথে নদীর ধারের পথটায় হাঁটছিলুম। হঠাৎ পাঁচ ছয় বছরের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে আসলো, পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলুম কয়েকজন মহিলা, এদের মধ্যে একজন অল্পবয়স্কা যে বাচ্চাটার হাত ধরে হাঁটছে। প্রথমটাতে আঁচ করতে পারলুম না, পরে বুঝলুম এ আমার সেই ক্ষুদ্র অভিভাবিকা যার হাতে অর্পণ করেছিলুম আমার সমস্ত বিশ্বসংসারের দায়িত্ব। দেখলুম ও আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তার সেই আহ্লাদী বালিকা ভাবমূর্তি আর নেই, চোখের চাহনিতে মুগ্ধতার বদলে একরাশ অসহায়ত্ব। আমাকে চিনতে ওর দেরি হয়নি। কিছু বলতে চেয়েও পারলনা।
আমি নির্বাক, অসার জীবের মত তার চলে যাওয়া দেখলুম। পাল্টে গেল আমার সমস্ত ধ্যান-ধারণা। বাড়ি ফিরে পুরনো এক বন্ধুকে ফোন করে জানলুম ওর এই কয়েকবছরের গল্প। এ যেন  নির্মমতার যাপিত জীবনের গল্পের প্লট। 

স্বামী ছিল মাদকাসক্ত, সংসার টিকে নাই, বিয়ের তিন বছর পর ডিভোর্স হয়েছিল। সব শুনে কেঁদে উঠল আমার অন্তরাত্মা। কেন এতকাল পর ওর খোঁজ নিলুম? সেইদিন সমস্ত রাত্রি ঘুম হয়নি। পরেরদিন সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে ঢের ভাবনা করলুম, ইচ্ছে হলো ওকে এখনই নিয়ে আসি আমার কাছে; ওর করুন চাহনিতে ফুটিয়ে তুলি রজনীগন্ধার অবয়ব, অবসান করে দেই সমস্ত যাতনার। ফেনিল জলরাশির দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই মনে  হলো নাহ এ কি করে হয়? সমাজ মেনে নিবেনাা,লোকে বাজে বকবে। আমার স্ত্রী পুত্রের  কি হবে? 

মানুষের অদৃষ্টের পরিহাস এত নির্মম কেন হয়? এরপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। সমস্ত ভাবনা অস্ত গেল। পশ্চিম আকাশ জানান দিল সূর্য তার কোলে মাথা রেখে এখনি ঘুমোবে। বাড়ি ফিরে স্ত্রীপুত্রের  বায়না ফর্দ করলুম। ওখানে ঘুরব,এখানে যাব আরো কত কি! সন্ধ্যার ম্লান আকাশ ক্রমে আঁধারে ঢেকে গেল। প্রকৃতি জানিয়ে দিল দিবসের ঘনঘটা। ধরিত্রী তার আঁধারের ডালি নিয়ে সমস্ত ছেয়ে দিল বিষাদময় আঁধারের গল্প দিয়ে। আর সেই সাথে সেই নিশ্চুপা বালিকামূর্তি যেন আবার জেগে উঠেছে অনেক বচ্ছর পর।আজ নিশ্চয়ই অভাগিনী মেয়েটি খুব করে কাঁদবে, তার কান্না শুনে ওধারের কুমড়োলতা কেঁদে উঠবে,লক্ষী পেঁচাটি তার সঙিনীর খোঁজ ভুলে সেই কান্নায় যোগ দিবে। আর ওপার থেকে ধরিত্রী কান্নার রোল শুনে হেসেই ফেলবে  যেমনটি করে রজনীর বিবাহের কথা শুনে আমি হেসেছিলুম।

আবদুল্লাহ আল আহনাফ
শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ