অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
ইউরোপের পথে পথে (তিন) – দীপিকা ঘোষ

ইউরোপের পথে পথে (দুই) পড়তে ক্লিক করুন

জ রাতের মতো আমাদের আশ্রয়স্থল ‘হোটেল কেবিন’। হোটেলটি এয়ারপোর্টের অনেক কাছাকাছি। রাজধানী রিকজাভিকের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। বিলাসিতাবর্জিত হোটেলটি চমৎকার ছিমছাম। সবকিছু পরিপাটি করে ছবির মতো সাজানো। ঠিকানা-Borgarton 32, 105 Reykjavik, Iceland. আট থেকে কুড়ি মিনিটের হাঁটা পথের মধ্যেই অনেকগুলো রেস্টুর‌্যান্ট। আমেরিকান, ইটালিয়ান, নেপালিস, জাপানিজ, ভারতীয়, পাকিস্তানী সব রকম খাদ্যের অনুসন্ধানই মিলবে এখানে। এমনকি হালাল, ভেগান, ভেজিটেরিয়ানদেরও নিরাশ হবার কারণ নেই। ‘গান্ধী রেস্টুর‌্যান্টে’ খেতে বসে মনে হলো –আধুনিক বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা কত দ্রুতই না ছোট করে দিয়েছে চব্বিশ হাজার, আটশো বারো মাইলের এই পৃথিবীটাকে! নেটওয়ার্ক কমিউনিকেশন বিস্তীর্ণ পর্যায়ে মিলিয়ে দিচ্ছে পরস্পরের সংস্কৃতিকে! মিলিয়ে দিচ্ছে পরস্পরের সভ্যতাকে! কবিগুরু বলেছিলেন -‘দিবে আর নিবে, মিলিবে, মিলাবে....’!  

এই মিলনমেলা আইসল্যাণ্ডের ক্ষেত্রে এক অসাধারণ বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। মাত্র কয়েক বছরে ৩৩৩০০০ মানুষের দ্বীপরাজ্যে বন্যার স্রোতের মতো দুর্দান্ত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পর্য্টকদের উপস্থিতি। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল বাইশ লাখের মতো। ২০১৬-এর তুলনায় ২৪.২% বেশি। মাত্র আট-ন বছরের মধ্যে ২০০৮ এর ধ্বসে পড়া অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে। অজস্র কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী মুক্তি পেয়েছেন বেকারত্বের অভিশাপ থেকে। আপাতত আইসল্যাণ্ডে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা তিন শতাংশের কাছাকাছি। জি ডি পি প্রবৃদ্ধির হার, বছরে সাত শতাংশ। ফরেন কারেন্সির রমরমা উপস্থিতিতে মধ্য আটলান্টিকের দ্বীপরাজ্যটি এখন ধনলক্ষ্মীর স্পর্শ নিয়ে ধন্য। 

সকালবেলায় প্রাইভেট কার নিয়ে স্টিফেন যথা সময়েই ‘হোটেল কেবিনের’ সামনে বন্ধুর মতো দেখা দিলেন। এদেশে এখনো উবারের প্রচলন হয়নি। ট্যুরিস্টদের জন্য হয় বাস, নয়তো পুরনো আমলের সুপার ট্যাক্সির ব্যবস্থা। অতএব স্টিফেনের সাহায্য বর্ষিত হলো স্বয়ং ঈশ্বরের করুণাধারা হয়ে। গাইড হিসেবে তার উপস্থিতি ছিল আমাদের জন্য যথার্থ কাম্যের। স্থানীয় লোক হিসেবে স্টিফেনের সবকিছু নিজের মুখের মতো চেনা। তার কাছ থেকে জানা যাবে গালফসের সব ইতিবৃত্তও। আর্ডিসের পরিচিত হওয়ায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে করমর্দন করে আমাদের অন্তরঙ্গ উষ্ণতার পরশ দিলেন ভদ্রলোক।
পাশ্চাত্যের প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে–
প্রথম দর্শনের করমর্দনেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়।
সেই উপলব্ধি থেকেই স্টিফেনকে নিপাট ভালো মানুষ বলে মনে হলো আমাদের। তার গাড়ি ছুটলো, রাজধানী শহর রিকজাভিকের পথ ছেড়ে আইসল্যাণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম অভিমুখে। অর্থাৎ বহু বছরের কিংবদন্তি ঘটনার সাক্ষীগোপাল ‘গালফসের’ দিকে। নর্ডিক ভাষায়, গাল মানে সোনালি, ফস মানে জলপ্রপাত। 

প্রথম দর্শনের খানিক পরেই পরিষ্কার হয় গেল, আমাদের প্রবীন বন্ধু স্টিফেনের ব্যক্তিত্ব, বন্ধু আর্ডিসের ঠিক উল্টো। মাত্র দশ মিনিটের আলাপনে ভদ্রমহিলা আমাদের প্রায় আদ্যপান্ত জেনে নিয়েছিলেন। অথচ মাইল দুয়েক পথ অতিক্রমের পরেও স্টিফেন এখনো পর্য্ন্ত জিজ্ঞেসই করলেন না- 
তার মাতৃভূমি কেমন লাগছে? কিংবা কেমন আছি আমরা? 
কিন্তু একটু পরে হঠাৎই আমাদের সেই ভুল ভেঙে গেলো নতুন বন্ধুর কণ্ঠস্বরে। স্টিফেন স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করলেন –
কতদিন থাকছো এখানে?
কাল সকালেই লণ্ডনের ফ্লাইট। ঘোষের গলায় গাম্ভীর্য ছড়ালো।
উত্তরে স্টিফেন পেছনে এক ঝলক দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলেন – 
মাত্র একদিনের জন্য আইসল্যাণ্ডে এসেছো তোমরা? কিন্তু এখানে গালফস ছাড়াও আরও অনেক আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে! আইস কেভ! ম্যায়লিফেল ভলকানো! ন্যাশনাল পার্ক! ব্লু ল্যাগুন! পয়লা জুলাই থেকে ৩১শে আগষ্ট পর্য্ন্ত দর্শকের ভিড় এসব জায়গায় একেবারে উপচে পড়ে! কারণ এই সময়টাই এখানকার গ্রীষ্মকাল!

আগ্নেয়গিরির কথা শুনে কৌতূহল উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলো। ২০১০ সালের ‘ইজাফজাল্লাজোকুল’ নামের আগ্নেয়গিরির কথা মনে পড়ে গেলো মুহূর্তে। এর কারণে অজস্র ইউরোপিয়ান ফ্লাইট অনেকদিন উড়তে পারেনি আকাশে। তাতে বিরাট আকারে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ইউরোপের। কৌতূহলী হয়েই জিজ্ঞেস করলাম –
এই দ্বীপে আগ্নেয়গিরি কতগুলো আছে?
সব মিলিয়ে ১৩০। তবে জীবন্ত আগ্নেয়গিরির সংখ্যা ৩০টির মতো।
বাপরে! সেও তো অনেক!
হাঁ। সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে। উত্তর আমেরিকা আর ইউরেশিয়ার দুই টেকটোনিক প্লেটের ওপরেই দ্বীপটা দাঁড়িয়ে রয়েছে কিনা। আগ্নেয়গিরি দেখার জন্য আমাদের পর্য্টন বিভাগের ব্যবস্থাপনা কিন্তু বেশ ভালো। তবে একদিনের ভেতর তো আর দু জায়গা কাভার করা যাবে না।

না না ঠিক আছে। আমাদেরও সময় হবে না এবার। ইচ্ছে রইলো পরের বার...।
সেই ভালো। 

গাড়ি ছুটছে গালফসের উদ্দেশে। পথের দু’পাশে নানা দৃশ্যের সমাবেশ। দূরে-অদূরে অজ্রস পাহাড়। কোথাও খাড়া। কোথাও বা এঁকেবেঁকে বিভঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে। তাদের খাঁজে খাঁজে ঝাঁকড়া লোমওয়ালা মেষের পাল চরে বেড়াচ্ছে। এ পথেও চোখে পড়লো, পাহাড়ের তুলনায় অরণ্যের পরিমাণ অতি সামান্যই। মাইলের পরে মাইল অতিক্রান্তির পরেও সে রকম বন দূর থাকুক, বৃক্ষই নজরে পড়ে না। সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই স্টিফেন আবার মুখ খুললেন – 
হাজার বছরের বৃক্ষহীন পরিবেশের কুফল আমরা শুরু থেকেই ভোগ করছি। তার ওপর কয়েক বছর ধরে ট্যুরিস্টদের আগমন বেশি হওয়ায় ট্রান্সপোর্টেশনের ব্যবহার বেড়েছে। বিভিন্ন ইণ্ডাস্ট্রিতে বেড়েছে প্রডাকশনের পরিমাণ। সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন বাড়ায় গ্রীনহাউস গ্যাসও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

কথা শেষ না করেই স্টিফেন ব্যস্তময় হাইওয়েতে সতর্কভাবে লেন পরিবর্তন করে আবার বলতে আরম্ভ করলেন –
এখন তাই অরণ্য সৃষ্টির তোড়জোর চলছে খুব। আমাদের সরকার ১৯৯০ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করছেন গ্রীনহাইস গ্যাসের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য। আমাদের জাতীয় বাজেটের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এই কাজেই এখন খরচা হচ্ছে।
ঘোষ এবার গভীর সংযমের বাঁধা পথ ধরে কথা বললো – 
সফলতা এসেছে?
প্রচেষ্টার তুলনায় খুবই কম! প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন গাছ লাগানো হয়েছে, কিন্তু বাঁচানো যায়নি! তবে শুনলে খুশি হবে, আগে যেখানে এক থেকে দেড় শতাংশ বনভূমি ছিল, এখন সেটা প্রায় দশ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। 
না বাঁচার কারণ? 
আসলে এখানকার পরিবশে কী ধরনের গাছ জন্মানো যাবে, সেটা বুঝতেই অনেকটা সময় লেগেছে আমাদের। তাছাড়া পাথুরে মাটিতে গাছ নিচের দিকে একদমই শেকড় ছড়াতে পারে না। আটলান্টিক থাকায় বৃষ্টির পরিমাণ অবশ্য কম নয়। তবে উর্বরতার অভাবে আইসল্যাণ্ডের মাটিতে গাছের পক্ষে বেড়ে ওঠা সত্যি ভারি শক্ত! আমাদের দেশকে অনেকেই তাই সম্বোধন করেন, ‘ভিজে মরুভূমির দেশ’ বলে।

বুঝলাম, আইসল্যাণ্ডাররা মর্ম দিয়ে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন অরণ্যের অবদানকে। যেটা তাদের হাজার বছর আগেকার পূর্বপুরুষেরা মোটেই আমলে নিতে চায়নি। সাগরের জলদস্যুরা নবম শতকে যখন জনহীন এই দ্বীপে বসতি স্থাপন করতে এসে কৃষিক্ষেত্র তৈরীর জন্য নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংস করেছিল, তখন তাদের এ সম্পর্কে বোধোদয়ই হয়নি, অরণ্যহীন পরিবেশ উত্তরপুরুষদের জীবনে কতবড় অভিশাপ বয়ে আনতে সক্ষম। জনমানবহীন এই মধ্য আটলান্টিকের দ্বীপে হাজার বছর আগে বনভূমির বিস্তার ছিল প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশ। অবশ্য বেশিরভাগই ছিল স্থানীয় বার্চ আর চায়ের পাতার মতো পাতাওয়ালা উইলো গাছ। কদাচিৎ দু’ একটি রোয়ান আর এসপেনও দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মধ্যে। তবে বার্চই ছিল মূলত আইসল্যাণ্ডের নেটিভ বৃক্ষ। স্টিফেনের কাছ থেকে জানা গেলো, বনায়নের জন্য বার্চের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বেড়ে ওঠা লজপোল পাইন, ব্ল্যাক কটনউড আর স্টিকা প্রুচও লাগানো হচ্ছে অনেক করে। উদ্দেশ্য, ২০৩০ সাল নাগাদ অন্তত ৪০ শতাংশ গ্রীনহাউস গ্যাস যাতে কমিয়ে আনা যায়।

গালফসে পৌঁছুতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ, তাই ভিড়ভাট্টা সেভাবে জমেনি এখনো। বেশ লাগলো, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য খানিকটা নিরালা হয়ে অন্তরের পেয়ালা ভরে পান করা যাবে জেনে। আশেপাশে বেশ কিছু রেস্টুর‌্যান্ট। অধিকাংশই এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুত করে। স্টিফেন সব সংবাদ জানিয়ে অবশেষে বললেন – 
পুরোটা ঘুরে দেখতে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা সময় নেবে। আমরা তাহলে লাঞ্চটা আগেই সেরে ফেলি? 
নিশ্চয়ই। সেই ভালো। 
ঘোষের কথায় খানিকটা এগিয়ে ডানপাশের একটি রেস্টুর‌্যান্টের সামনে গাড়ি পার্ক করলেন স্টিফেন। 
আমরা আগেই জানিয়েছিলাম, মাছ এবং শাকসব্জির যে কোনো আইটেম চলবে। ভেতরে ঢুকে জনারণ্য চোখে পড়লো না। স্টিফেন এবার ফিসফিস করলেন –
আরও ঘন্টাখানিক পরে লোকসমাগম হবে। আমরা একটু তাড়াতাড়িই এসে পড়েছি।

অর্ডার দেবার দশ মিনিটের মধ্যেই খাবার এলো টেবিলে। স্টিফেনের জন্য ভেড়ার মাংস আর শাকসব্জি দিয়ে  ট্র্যাডিশনাল আইসল্যাল্ডিক মিট স্যুপ। সঙ্গে ব্রেড এবং বাটার। আমাদের জন্য ক্রিম চিজ এবং টম্যাটো দিয়ে তৈরী স্মোকড শ্যামন। তার সঙ্গে শশা, ব্রেড, এ্যাসপ্যারাগাস।
স্টিফেন খেতে খেতে মুখ তুললেন –
এসব শাকসব্জি এখানকার স্থানীয় গ্রীনহাউসে জন্মানো।
উত্তরে প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই গর্বভরে উচ্চারণ করলেন – 
আমাদের দেশে এখন গ্রীনহাউসে ফরেস্ট তৈরীর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে! 
শুনতে শুনতে আগের মতো আরও একবার মনে হলো, সেই প্রবাদ বাক্যই সত্যি, দাঁত গেলে তবেই মানুষ দাঁতের মূল্য বোঝে! এই বৃক্ষহীন দেশের মানুষগুলো সেই কারণেই না হাড়ে হাড়ে এমন করে গাছের মূল্য বুঝেছেন!

পার্কিং পে মেশিনে টাকা ঢুকিয়ে গাড়ি পার্ক করে গালফসের কাছাকাছি এসে প্ল্যাটফরমের উঁচুতে উঠে দাঁড়ালাম। প্রকৃতির হাতে রচিত অসাধারণ ল্যাণ্ডস্কেপ মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে দেখার মতো! দেখলাম, গালফসের অফুরন্ত শক্তির তেজ অনেক উঁচু থেকে বিদ্যুগবেগে নেমে এসে দুর্দান্ত ঔদ্ধত্যে ফেটে পড়ছে উচ্ছ্বসিত জলের ধারায়। সূ্র্যস্নাত দিনে সূর্যের সহস্র রশ্মির ছোঁয়ায় তরল সোনার জোয়ার হয়ে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দুটো সুবিশাল জলধারা। প্রতি সেকেণ্ডে সাধারণ অবস্থায় তাদের জলপ্রবাহের পরিমাণ ৩৪৪৯ কিউবিক ফুট। তবে প্রতি সেকেণ্ডে সর্বোচ্চ রেকর্ড রয়েছে ৭০৬২৯ কিউবিক ফুটের। শক্তির উচ্ছ্বাস, সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যে গালফস বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ঝর্ণাগুলোর ভেতর আপাতত ষষ্ঠ অবস্থানে দাঁড়িয়ে। নায়াগারা জলপ্রপাতের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি এর উচ্চতা। তুষার যুগের শেষ অধ্যায়ে আইসল্যাণ্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিমবাহ ‘ল্যাংজোকুল’ থেকে এর উৎসরণ।  

গালফসকে নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি লোককাহিনী আজও আইসল্যাণ্ডাররা শ্রদ্ধাভরা ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন। চার ঘন্টার পর্যটন শেষে হোটেলে ফিরে আসার পথে বুকের দরদে স্টিফেন সেই গল্পই শোনালেন আমাদের। স্টিফেনের বলার ভঙ্গিটি চমৎকার। কথা গুছিয়ে আকর্ষণীয় করায় তার শিল্পবোধ অসাধারণ! গল্পের শুরুটা কুড়ি শতকের গোড়ার দিককার। যখন শিল্পবিপ্লবের কারণে জলবিদ্যুৎ তৈরীর প্রয়োজন উত্তর আমেরিকাসহ ইউরোপের সর্বত্র দেখা দিয়েছে। স্টিফেন বললেন – 
কুড়ি শতকের শুরুতে গালফসের দুই মালিক টমাস টমাসন, আর হলডর হলডরসো, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান্ট তৈরীর কাজে বিদেশীদের কাছে গালফসকে লিজ দেবার উদ্যোগ নেন। পরে অবশ্য আইসল্যাণ্ড স্টেটের কাছে পুরো জায়গাটা চলে যায়। 

কথা বলতে বলতে গাড়ির গতি কমিয়েছেন প্রবীন বন্ধু। সামনেই বড় রকমের ভিড়। কে জানে অ্যাক্সিডেন্ট হলো কিনা। রাস্তাঘাটে এসব তো হরহামেশা লেগেই আছে। না অ্যাক্সিডেন্ট নয়। কাছের পাহাড় থেকে একটি পাথর গড়িয়ে পড়েছে। পাশের লেনটি বন্ধ হওয়ায় চাপ পড়েছে একটি লেনের ওপর। অন্য লেনের গাড়িগুলো সেখানে মার্জ করছে ধীরে ধীরে। স্টিফেন আবার বলতে আরম্ভ করেছেন –
টমাস টমাসনের কন্যা সিগরিঔর টমাসদত্তির, প্রতিবাদ করে জানালেন - গালফসকে ধ্বংস করা হলে তিনি আত্মহত্যা করবেন! এই জলপ্রপাতকে তিনি ভালোবাসতেন। প্রতিরোধের জন্য খালি পায়ে অনেক মাইল বন্ধুর পথ পেরিয়ে রাজধানী রিকজাভিকে উপস্থিত হলেন টমাসদত্তির! তার পদযুগল তখন রক্তাক্ত! অনুপম কান্তি নিষ্প্রভ হয়ে গেছে! তখনকার আইসল্যাণ্ড তো আজকের মতো ছিল না! টমাসদত্তির তাঁর জীবন দিয়ে গালফসকে রক্ষা করলেন!

এর কতটুকু বাস্তব, কতটুকু মিথ জানি না। তবে শুনতে শুনতে সিগরিঔরকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম – 
তোমাকে ধন্যবাদ টমাসকন্যা সিগরিঔর! কারণ তুমিই হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলে - একমাত্র অপরশ প্রকৃতিই পারে, এভাবে তার নগ্নরূপের সৌন্দর্য দিয়ে মহিমার বিস্ফোরণ ঘটাতে! 

পথের বন্ধু আমাদের নামিয়ে দিলেন হোটেলের দোরগোড়ায়। সূর্যের উজ্জ্বল প্রভা মলিন না হলেও ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাত। এবার আর করমর্দন নয়, আমাদের আলিঙ্গন হলো অন্তরের প্রগাঢ়তায়। মন আবারও বললো – 

সত্যিই বড় ছোট হয়ে গেছে মানুষের পৃথিবী! স্টিফেন আমাদের জন্মজন্মান্তরের আপনজন!

পারিশ্রমিকের অংক দেখে মুখের ওপর হাসি ফুটলো স্টিফেনের। বন্ধুত্বের সৌহার্দ নিয়ে আবেগভরে বললেন – 
আবার এসো এখানে বেড়াতে। আরও অনেক কিছু দেখা বাকী রয়ে গেলো। এই ই-মেইলের ঠিকানায় যোগাযোগ রাখতে ভুলো না! বলেই তার কার্ডটি তুলে দিলেন আমাদের হাতে। চলবে...

দীপিকা ঘোষ
ওহাইয়ো, আমেরিকা।