অটোয়া, শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
বাংলা ভাষা আন্দোলনের অকথিত ইতিহাস - হাসান গোর্কি

ভাষার জন্য আন্দোলন করা, জীবন উৎসর্গ করা এবং অধিকার ছিনিয়ে আনার একটা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের আছে। তবে ভাষা প্রেমের এই ঘটনাটা প্রথম, একমাত্র বা অভূতপূর্ব নয়। ৫২-র ভাষা আন্দোলনের থেকেও বড় আত্মত্যাগের ইতিহাস আছে এবং সেটা বাংলা ভাষার জন্যই। তবে সে  ইতিহাসটি আলোচনায় খুব কম আসে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের নয় বছর পর ১৯৬১ সালের ১৯ মে তারিখে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক ভ্যালিতে ঘটেছিল ঘটনাটি। আসাম রাজ্য সরকার কর্তৃক অহমীয়াকে (অসমীয়া) একমাত্র ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে ঘোষণার প্রতিবাদে আন্দোলনরত জনতার ওপর আধা সামরিক বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে সেদিন নিহত হয়েছিলেন ১১ জন বাংলা ভাষাপ্রেমী মানুষ। ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের অন্যতম অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো। আমরা প্রতিবছর সাড়ম্বরে দিবসটি পালন করি। পালন করা হয় সারা পৃথিবীতেও। কিন্তু এই ১১ জন শহীদের মহান আত্মত্যাগ অনেকটা অন্তরালে থেকে গেছে।   

শিল্পীর তুলিতে বরাক  ভ্যালির ভাষা আন্দোলন  

কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে বরাক উপত্যকা হিসেবে পরিচিত। মনিপুরের পাহাড়ে উৎপন্ন হবার পর মিজোরাম হয়ে দক্ষিণ আসামে প্রবেশ করেছে যে বরাক নদী তা-ই বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুরমা ও কুশিয়ারায় বিভক্ত হয়েছে। এই নদীর নামেই উপত্যকার নামকরণ। প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবন-জীবিকার তাগিদে এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ছিল সিলেটে। এই দুই অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক বন্ধনও তাই খুব জোরালো। সিলেটে অভিবাসীদের একটা বড় অংশ এসেছে এই বরাক উপত্যকা থেকেই।
ইতিহাসটা সংক্ষেপে এরকমঃ ১৯৬০ সালের এপ্রিলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অহমীয়াকে একমাত্র রাজ্য ভাষা হিসেবে ঘোষণার জন্য একটা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বৃহত্তর গোয়ালপাড়া ও কামরূপ নিয়ে গঠিত বহরমপুত্র উপত্যকা অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মধ্য বহরমপুরের দারাং, নয়াগাও এবং সুনিতপুর জেলা এবং পূর্বাঞ্চলীয় জেলা শহর লক্ষ্মীপুর, ডিব্রুগড় ও শিবসাগরে জনতা সমাবেশ ও বিক্ষোভের আয়োজন করে। একসময় উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে এবং অহমীয়া ভাষাভাষী লোকজন বাঙালি হিন্দুদের বসতবাটিতে আক্রমন শুরু করে। কিন্তু বাঙালিদের সংখ্যা কম হওয়ায় তারা কোনরকম  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। প্রায় একপাক্ষিক এই দাঙ্গার তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে অর্ধ লক্ষ বাঙালি পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। নব্বই হাজারের মত আশ্রয় নেয় বরাক উপত্যকা এবং রাজ্যের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি এলাকায়। এই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য আসাম সরকার বিচারপতি গোপাল মেহেতাকে প্রধান করে এক সদস্যের যে তদন্ত কমিটি গঠন করে, তার রিপোর্ট অনুযায়ী এই আক্রমণে নিহত হন ৯ জন বাঙালি হিন্দু এবং গুরুতর  আহত হন শতাধিক। চার হাজারের মত কাঁচা ও ৬০ টি পাকা বাড়ি ধ্বংস হয়। সবচেয়ে বেশি  ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘোড়সওয়ার ও কামরূপ জেলার ২৫ টি গ্রাম।  
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসে ভারতীয় ইউনিয়নের সংহতি রক্ষার কৌশল হিসেবে রাজ্য সরকারগুলিকে অধিকতর নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা অর্পণের লক্ষ্যে  কাজ শুরু করেন। একই বছর ডিসেম্বরে আসামের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন বিমলা প্রসাদ চালিহা; ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যিনি মহাত্মা গান্ধীর অন্যতম সহযোগী ছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি কেন্দ্রের কাছে দাবি করে আসছিলেন যে আসামে অভিবাসী হিসেবে আসা বাঙালিদেরকে পশ্চিমবঙ্গে সরিয়ে নিতে হবে। তার ধারণা ছিল অহমীয়া জনগণের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে হলে ভিন্ন ভাষার জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি রোধ করতে হবে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তিনি তদানিন্তন পূর্ব বাংলা থেকে আসামে পাড়ি জমানো তিন লাখ অভিবাসীকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং তার তৃতীয় মেয়াদে তাদের বিতাড়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেন।
চালিহা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার তিন বছরের মাথায় ১৯৬০ সালের অক্টোবর মাসের ১০ তারিখে অহমীয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য রাজ্য আইন পরিষদে বিল উত্থাপিত হয়। উত্তর করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিধায়ক ও বাঙালি হিন্দু নেতা রনেন্দ্র মোহন দাস এই মর্মে বিলটির বিরোধিতা করেন যে এর ফলে বরাক উপত্যকার দুই তৃতীয়াংশ মানুষের ভাষার ওপর এক তৃতীয়াংশ মানুষের ভাষাকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হবে। অধিকন্তু এটি ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপন্থী হবে। সেই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল কোন রাজ্যের জনসংখ্যার শতকরা ৭০ জন যদি একটি মাত্র ভাষায় কথা বলে, কেবলমাত্র তাহলেই ঐ ভাষা একক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। শিলচর, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দিতে বসবাসকারীদের ৮০ শতাংশই ছিল বাঙালি। কিন্তু প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে রনেন্দ্র মোহনের বিরোধিতায় কোন কাজ হয়নি। ২৪ অক্টোবর তারিখে বিলটি পাস হয় এবং অহমীয়া আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এতে করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিলেও তা প্রকাশ্য রূপ নিতে কয়েক মাস লেগে যায়।
১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে গঠিত হয়  কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ। রথীন্দ্রনাথ সেনকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সরকারকে বাধ্য করা। সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রথম কর্মসূচী হিসেবে শিলচর, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দিতে ‘সংকল্প দিবস’ পালন  করা হয় ১৪ এপ্রিল, ১৯৬১ তারিখে। এই কর্মসূচীর ব্যাপক সাফল্যের পর পরিষদ বরাক উপত্যকা জুড়ে সচেতনতা ও জনসম্পৃক্তি সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২৪ এপ্রিল তারিখে তারা পক্ষকালব্যাপী এক পদযাত্রার সূচনা করে যা শিলচর ও করিমগঞ্জ প্রদক্ষিণ করে মে মাসের দুই তারিখে শেষ হয়। পদযাত্রাটি অতিক্রম করে ২০০ মাইলের বেশি পথ। কয়েকদিনের মধ্যেই একই রকম একটা পদযাত্রা হাইলাকান্দিতেও অনুষ্ঠিত হয়।  
দ্বিতীয় পদযাত্রা শেষে ঘোষণা করা হয় ১৩ মে, ১৯৬১-র মধ্যে বাংলাকে অন্যতম ‘রাজ্য ভাষা’ (সরকারি ভাষা) হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে ১৯ মে সকাল সন্ধ্যা হরতাল পালন করা হবে। তাদের দাবির মধ্যে অন্য আরও কয়েকটি সংখ্যালঘু ভাষার স্বীকৃতির বিষয়টিও ছিল। আসাম সরকার এই দাবির প্রতি কর্ণপাত না করে বরং দমননীতি গ্রহণ করে। কিন্তু এই আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ ততদিনে এতটাই ব্যাপক আকার নিয়েছিল যে রাজ্য পুলিশের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। ১২ মে তারিখে শিলচরে গণসংগ্রাম  পরিষদের বিশাল পতাকা মিছিল ঠেকাতে আসাম রাইফেলস এর পাশাপাশি মাদ্রাজ রেজিমেন্ট এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ তলব করতে হয়েছিল। হরতালের আগের দিন ১৮ মে তারিখে নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন এবং বিধুভূষণ চৌধুরী নামে পরিষদের তিন শীর্ষ নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বিধুভূষণ ছিলেন ‘সাপ্তাহিক যুবশক্তি’র সম্পাদক; যিনি সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তার সাপ্তাহিকে সত্যাগ্রহ কর্মসূচী শুরুর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাতে বিপুল সাড়া পড়েছিল এবং প্রদেশব্যাপী তা পালিতও হয়েছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে।   

১৯ মে ২০১৩- তে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত এই সময় সংবাদপত্রের একটি রিপোর্ট  

১৯ মে তারিখে হরতাল শুরু হলে শিলচর, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দির জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। জনতা সবগুলো সরকারি দপ্তর, আদালত ভবন এবং রেল স্টেশনের সামনে অবস্থান নেয়। ভোর ৫ টা ৪০ মিনিটে শিলচর থেকে যে ট্রেনটি ছেড়ে যাবার কথা ছিল, একটা টিকেটও বিক্রি না হওয়ায় সেটি এবং পরবর্তী সব কটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। দিনের সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল বিকেল ৪ টায়। জনতা সে সময় পর্যন্ত স্টেশনে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল। দিনের প্রথম ভাগ পার হয়েছিল কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে দুপুরের পর আসাম রাইফেলসের কিছু সদস্য রেল স্টেশনে এসে অবস্থান নেয়। কিন্তু বিপুল সংখ্যক জনতার উপস্থিতি দেখে তারা কোন আক্রমণে যায়নি। 
পুলিশি আক্রমনের ঘটনা ঘটে শহরের তারাপুর স্টেশনে দুপুর আড়াইটার দিকে। কাটিগোড়া এলাকা থেকে গ্রেফতারকৃত ৯ জন পিকেটারকে একটা খোলা বেডফোর্ড ট্রাকে তুলে নিয়ে পাশের রাস্তা দিয়ে এই স্টেশন অতিক্রম করছিল। জনতা এই ট্রাক আক্রমণ করলে আটককৃতদের ফেলে সব ক’জন পুলিশ সদস্য ও ট্রাক ড্রাইভার পালিয়ে যায়। উত্তেজিত জনতা রেললাইনের কাঠের স্লিপারে আগুন দেয় এবং ষ্টেশনে ভাংচুর শুরু করে। অগ্নি নির্বাপক দলের সদস্যরা দ্রুত সেখানে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে বাধার সম্মুখীন  হয় এবং পিছু হটে যায়। মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে সেখানে আধা সামরিক বাহিনীর একটা সুসজ্জিত দল এসে হাজির হয়ে জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে এবং বেয়োনেট চার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে না পেরে পুলিশ এক পর্যায়ে নির্বিচার গুলি বর্ষণ করে।  


তারাপুর রেল স্টেশনে পুলিসের লাঠি চার্জের দৃশ্য 

ঘটনাস্থলে এবং হসপিটালে নেওয়ার পথে মারা যান ৯ জন। পরে হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই জনের মৃত্যু হয়। কৃষ্ণ কান্ত বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তি বুকের মধ্যে আটকে থাকা বুলেট নিয়ে পরবর্তী ২৪ বছর বেঁচে ছিলেন। নিহতরা হলেনঃ (১) কানাইলাল নিয়োগী (২) চন্ডিচরণ সূত্রধর (৩) হিতেশ বিশ্বাস (৪) সত্যেন্দ্র দেব (৫) কুমুদ রঞ্জন দাস (৬) সুনিল সরকার (৭) তারানি দেবনাথ (৮) শচীন্দ্র চন্দ্র পাল (৯) বীরেন্দ্র সূত্রধর (১০) সুকমল পুরকায়স্থ এবং (১১) কমলা ভট্টাচার্য। (পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা বিতর্কে আরও তিন বাঙালির নিহত হবার কথা জানা যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন ঘটনায় তারা মারা গেছেন তা জানা যায়নি। এরা হলেন বিজন চক্রবর্তী -১৭ আগস্ট ১৯৭২; জগন্ময় দেব ও দিবেন্দু দাস - ২১ জুলাই, ১৯৮৬।) 
২০ মে তারিখে সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে নিহতদের মৃতদেহ নিয়ে মিছিল বের হলে তাতে জনতার ঢল নামে। আসাম সরকার এটি উপলব্ধি করেন যে, একটা  ন্যায়সঙ্গত দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ঐক্য ও উন্মাদনা তৈরি হয়েছে তা দমন করা সম্ভব নয়। সরকার বাঙালির প্রাণের দাবি মেনে নেন এবং বরাক উপত্যকায় বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শিলচরে নির্মিত শহীদ মিনারের নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে এই ১১ জন বীর বাঙালির যে দেহভস্ম মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা আজও জাতি হিসেবে আমাদের বীরত্বগাথা বহন করে চলেছে। 


তারাপুর শহীদদের স্মরনে কারফিউ ভেঙে মিছিলঃ ২০ মে, ১৯৬১

ভাষা আন্দোলনের ক্ষুদ্র হলেও আরও একটা অকথিত ইতিহাস আছে। বাংলা ভাষা নিয়ে যে আন্দোলন ভারতের বিহার রাজ্যে হয়েছিল, সেটাই প্রথম ভাষা আন্দোলন এবং বাঙালির ভাষা প্রেম এবং সহিষ্ণুতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটা ছিল আমাদের ৫২-র ভাষা আন্দোলনেরও আগের ঘটনা। ৪৭-এ ভারত  স্বাধীন হবার পর বিহারে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষীরা বাংলাকে অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের চেষ্টা শুরু করে। তাছাড়া পাঠ্য বিষয়ে হিন্দির পরিবর্তে মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তির দাবিও ছিল তাদের। বহু কাঠ খড় পোড়ানোর পর ১৯৪৮ এর ২৩ মে বিহার রাজ্য কংগ্রেসের এক সভায় বাংলাকে মানভুম জেলার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের এক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবটি ৪৩-৫৫ ভোটে হেরে যায়। এতে হতোদ্যম না হয়ে ৪৮-র জুনে বাঙালিরা ‘লোক সেবক সঙ্ঘ’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে আবার কাজ শুরু করে। মহাত্মা গান্ধির ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের আদলে অনুপ্রাণিত বাঙালি সমাজ এক অনুকরণীয় অহিংস আন্দোলন শুরু করে। এর একটি ছিল ‘সত্যাগ্রহ’ ; অন্যটি ‘হাল জোয়াল’। 
এই আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করায় কেন্দ্রীয় সরকার ৫৩-র ডিসেম্বরে স্টেট রিঅর্গানাইজেশন কমিশন গঠন করে। এই কমিশন এক বছর কাজ করার পর ৫৫-র ফেব্রুয়ারিতে মানভুমে এক গণ শুনানির আয়োজন করে। কমিশন মানভুম জেলার বাঙালি অধ্যুষিত ১৬ টি থানা নিয়ে পুরুলিয়া নামে আলাদা একটা জেলা গঠনের প্রস্তাব করে। সাড়ে এগারো লক্ষ অধিবাসী ও দুই হাজার বর্গ মাইল ভূখণ্ড নিয়ে এই ক্ষুদে বঙ্গভূমি পশ্চিম বঙ্গের সাথে যুক্ত হয় ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর। রচিত হয় প্রথম ভাষা আন্দোলনের সাফল্য গাঁথা। 
পুনশ্চঃ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হওয়ায় জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমরা যখন আমাদের ভাষা শহীদদের পরম শ্রদ্ধায় স্মরন করি তখন বরাক উপত্যকার সেই মহান আত্মোৎসর্গকারীদের কথাও স্মরণ করা উচিত। সালাম, বরকত, জব্বার, রফিকের পাশাপাশি সেই ২৩ জন শহীদের (নিদেনপক্ষে সরাসরি আন্দোলনে নিহত ১১ জনের) নাম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট চত্ত্বরে একটা স্মৃতিফলকে লিখে রাখা যেতে পারে। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া পৃথিবীর একমাত্র নারী শহীদ, কমলা ভট্টাচার্যের জন্য ক্ষুদ্র একটা স্মৃতি স্তম্ভ ঢাকার কোন গার্লস স্কুল বা কলেজ প্রাঙ্গনে নির্মাণ করা গেলে ইতিহাসটা টিকে থাকবে।    


হাসান গোর্কি
রয়্যাল রোডস ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ কলম্বিয়া
 ইমেইলঃ hassangorkii@yahoo.com

লেখকের অন্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন-
গল্পঃ টান- হাসান গোর্কি