অটোয়া, বুধবার ১৯ জুন, ২০২৪
মা - ঝন্টু চন্দ্র ওঝা

রণীতে সবচেয়ে মধুর একটি শব্দ ‘মা’-  যার ইংরেজী প্রতিশব্দ ‘মাদার’। ছোট্ট এই শব্দটির ব্যাপকতা পরিমাপযোগ্য নয়। এত মধুময় শব্দ অভিধানে আর দ্বিতীয়টি নেই। মাতৃসুধার মধ্যে লুকিয়ে আছে অফুরান স্নেহ, অপার্থিব মমতা ও প্রগাঢ় ভালোবাসা। ছেলে-মেয়ে যাই হোক, প্রতিটি সন্তানের সাথে মায়ের থাকে স্বার্থহীন, অনন্ত ভালোবাসার অটুট বন্ধন। কবি কাদের নেওয়াজ যথার্থই বলেছেন, ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে নামটি মধুর, তিন ভুবনে নাই...।’

মা হচ্ছেন প্রতিটি সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়-স্থল। মায়ের মতো পরম বন্ধু সন্তানের জীবনে আর মেলে না। মা সন্তানের যেমন অভিভাবক তেমন সন্তানের জীবনের আদর্শ শিক্ষক। নিজের মায়ের হাতের রান্না সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু ও সেরা খাবার। মায়ের কাছে সবকিছু নির্ভয়ে বলাা যায়। আবার মায়ের কাছে আবদার করে সবকিছু সহজে পাওয়াও যায়। মায়ের মতো সন্তানের সমস্ত আবদার আর কে পূরণ করতে পারে? তাই বোধ হয় বলা হয়, ‘মা নাই গৃহে যার, সংসার অরণ্য তার’।

সংসারে মায়ের কাজের কোনো অন্ত নেই। মা রাত-দিন শুধু শ্রম দিয়ে যান। বিনিময়ে তিনি কিছুই প্রত্যাশা করেন না। নিজের জীবনের চেয়েও তিনি সন্তানকে ভালোবাসেন, সংসার সামলে রাখেন। সন্তানের ব্যথায় মা সারাক্ষণ ব্যথিত বোধ করেন। সন্তান অসুস্থ হলে মা রাত জেগে সন্তানের সেবা করেন। এজন্যেই তিনি সন্তানের মমতাময়ী মা। আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘যার মা আছে, সে কখনোই গরিব নয়।’ 

মাতৃ আশিস সন্তানের সর্বদা শিরোধার্য। আমরা এও জানি, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী’ অর্থাৎ ‘মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেয়।’  তাই মাকে শ্রদ্ধা- ভক্তিসহ সেবা করা, অন্তরের শ্রেষ্ঠতম আসনে তাঁকে অধিষ্ঠিত করা প্রত্যেক সন্তানের একান্ত কর্তব্য। আমাদের দেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, ‘মা হলো পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ, কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময়ে নিই বিনা সুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা।’

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, ‘মাতৃভক্তি অটুট যত, সেই ছেলেই হয় কৃতী তত।’ তাই সন্তান মাত্রেই মায়ের সেবা করতে হয়। মাকে মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতে হয়। কারণ সকল ধর্মেই মাকে দেয়া হয়েছে অনন্য মর্যাদা। মায়ের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যায় না। জন্মের পর থেকে কম পক্ষে ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধ খেয়েই শিশু বেঁচে থাকে। এরপর আরও প্রায় দু-তিন বছর অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে থাকে। সুতরাং মাতৃদুগ্ধই হল শিশুর জীবন। আর এই মাতৃদুগ্ধের ঋণ সন্তান কোনোদিন শোধ করতে পারে না।

মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। অর্থাৎ বেহেশতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম করা হয়েছে জন্মদাত্রী মাতাকে। তাই মায়ের সঙ্গে সর্বদা সম্মানজনক ব্যবহার করা সন্তানের একান্ত কর্তব্য। গর্ভধারণের ক্ষণ থেকে সন্তানের সঙ্গে মায়ের অটুট বন্ধন তৈরি হতে আরম্ভ করে। শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীতে আগমন করে, তখন মা হয়ে যান শিশুর নিত্যসঙ্গী। মায়ের সর্বাত্মক ত্যাগের কারণেই সন্তান পৃথিবীতে আগমন করে। তাই মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব অসীম। মায়ের আদেশ পালন করা সন্তানের পবিত্র কর্তব্য। যদি সেই সন্তান বড় হয়ে মাকে ভুলে যায় কিংবা মাকে কোনোরকম কষ্ট দেয়, তাহলে সে সন্তান ক্ষমার অযোগ্য। 

শিশুসন্তানের জন্য মাসের পর মাস রাত জাগা, সারাক্ষণ যত্ন নেওয়া, খাওয়ানো, স্নান করানো, মল-মূত্র পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজগুলো সীমাহীন ধৈর্যসহ মা সামলিয়ে থাকেন। এজন্যেই সন্তানের কাছে মা এতো আপন। তাই আমাদের কোনো আচরণ  দ্বারা যেন মাকে আমরা কষ্ট না দেই। মা বেঁচে থাকাবস্থায় মায়ের ক্ষুধার অন্ন, পরিধেয় বস্ত্র, রোগেরপথ্য ও চিকিৎসার যেন সুব্যবস্থা আমরা করি। আমাদের নিজের ঘরে যথাযোগ্য মর্যাদা ও সম্মান দিয়ে মাকে যেন আমরা পরম যত্নে প্রকৃত ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে নিজ হাতে সেবা করি। ইহকালে এই পরমা জননীর পরিচর্য়া না করে অভুক্ত রেখে পরকালে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে শুধু লোক দেখানো স্মরণসভা করে লাভ কী? তাই, জগতে মাতৃসেবাই হোক প্রত্যেক সন্তানের পরম ব্রত।

ঝন্টু চন্দ্র ওঝা 
ঢাকা, বাংলাদেশ