অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩০ মে, ২০২৪
শিক্ষকতার দিনগুলো - সুনির্মল বসু

দু হাজার এগারো সালের একত্রিশে অক্টোবর নঙগী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমার সুদীর্ঘ শিক্ষকতার কর্মজীবন শেষ হয়েছে। এখন আর ঘন্টা ধ্বনি, ক্লাসের ব্যস্ততা নেই, ছাত্রদের ভীড় নেই। 

প্রথমে অসুবিধা হোত, এখন মানিয়ে নিতে পেরেছি। একসময় আমি এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম, পুরনো অকৃতী ছাত্র। অন্যত্র যখন বিতাড়িত হচ্ছি, তখন প্রধান শিক্ষক অসিত রঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ডেকে চাকরি দিয়েছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতায় আমি প্রতিদিন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি।

প্রথম দিন ছাত্রেরা আমায় প্রশ্ন করেছিল, সবেদা ইংরাজি কি, বলতে পারি নি, আজো জানি না। অসিতবাবু এসব জেনে বলেছিলেন,ওরা তোমার জ্ঞান পরীক্ষা করছে, এমন হলে, কান মলে দেবে।

নীচের ক্লাসে বাংলা পড়াতাম, উঁচু ক্লাস চাইলে, স্যার বলতেন, তুমি পারবে না। আমার শিক্ষক ননীগোপাল দাশগুপ্ত অসুস্থ হলে, আমাকে উপরের ক্লাসে পাঠানো হোল, তবে সাহিত্য পড়াতে নয়, রচনার ক্লাসে। ছাত্ররা আমাকে চাইছিল বলে পরে নাটক উপন্যাস ও কবিতার ক্লাস দেওয়া হয়। আমি ছাত্রদের সাথে গভীর ভাবে মিশে গিয়েছিলাম, ওরা যখন নাটকের ক্লাস শুনতে চাইতো না, আমি তখন দেবানন্দ জিনাত আমানের সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে করতে রবীন্দ্রনাথের গান্ধারীর আবেদন পড়িয়েছি।

প্রয়াত গোপালচন্দ্র বেরা পদ্য পড়াতেন, সুকুমার আচার্য্য ব্যাকরণ ও আমি গদ্য পড়াতাম। গোপালদা আমার মধ্যে সূক্ষ্ম দৃষ্টি ভঙ্গি এনে দিয়েছিলেন, আমার প্রথম উপন্যাস টির সম্পূর্ণ প্রূফ তিনি দেখে দেন।  তিনি অবসর নেবার পর প্রতি রবিবার ফোন করতেন, আমি বেশি টিউশনি করি বলে বলতেন, সুনির্মল, আত্মার অবমাননা করছো কেন। কি করবো, আমি বাড়ির বড় ছেলে, সংসারে অনেক দায়িত্ব।

ভালো ছাত্ররা আমায় ঘিরে থাকতো, অথচ, আমার মন পড়ে থাকতো, অতি সাধারণদের মধ্যে, আমি ওদের মধ্যে অতীতের আমিকে দেখতে পেতাম। জীবনে কখনো কোনো ছাত্রকে শাস্তি দিই নি, তবে বছরে এক আধদিন বকেছি খুব, পরে আর পড়াতে পারতাম না, ওদের মিষ্টি খাইয়ে বলতাম, আমার উপর রাগ কোরো না। ওরা হাসতো, আমার রাগ পড়ে যেত।

গোপালদা আর আমি বাংলায় লেটার পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। এক বছর সতেরটা লেটার এলো। দীপঙ্কর নাগ উচ্চ মাধ্যমিকে অষ্টম হোল, পরে শুভজিৎ ধাড়া ও আরো অনেকে জয়ের মালা এনে দিল। ভালো কাজের আনন্দ পেয়েছি অনেক। ভালো বাংলা লিখতো বলে একটি ছাত্রকে খুব প্রশংসা করতাম, অন্য একজনকে বকেছি খুব। অনেক বছর পর ভালো ছাত্রটি পূজো প্যান্ডেলে আমাকে না চেনার ভাব করলো, মন্দ ছাত্রটি প্রনাম করে বলল, স্যার, আমি মুদির দোকান করে বোনের বিয়ে দিয়েছি, ভাইকে পড়াচ্ছি।হায়, কাকে আমি এতদিন ভালো বলতাম।  পরে ভেবেছি, আমরা ওদের শেখাই না, ওরাও আমাদের শেখায়।

এক ছাত্র শান্তি মজুমদার স্কুল পালাতো, ফুটবল খেলার জন্য, আমি তাকে বহুবার রক্ষা করেছি, হেড স্যারের হাত থেকে, পরে সে মোহনবাগান দলের নামকরা গোলরক্ষক হয়। আর এক ছাত্র জয় গোস্বামীর পাগলী, তোমার সঙ্গে, পড়ছিল বুঁদ হয়ে। কবিতা পড়ার পর তাঁর মুখ চোখ কেমন বদলে যেত, সেটাও আমার চোখে পড়তো। পরবর্তীকালে সে লেখায় যথেষ্ট সুনামের অধিকারী হয়েছে।  হ্যাঁ, আমি লেখক স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর কথা বলছি।

পড়াতে গিয়ে দুবার বোকা বনে গেছি। একবার শিপ্রা কে পড়াতে গিয়ে ওর বাবা-মা পাশে এসে দাঁড়ালেন।  আমি কবি মুকুন্দ দাস পড়াচ্ছিলাম।  কথা শেষ হলে ওর বাবা বললেন, আমার কাকা তিনি, ইংরেজ পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতেন, স্বাধীনতার গান গেয়ে দেশ মাতিয়ে দিয়েছিলেন। আর একবার শরৎচন্দ্র পড়াচ্ছি শুভদীপ দত্ত কে, ওর দিদা হেসে বললেন, আমাদের পাশের বাড়িতে শরৎচন্দ্র থাকতেন।  কোনো বাড়ি ঝগড়া হলে বলতেন, জেনে এসে বলতো, ঐ ঘটনা নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখতেন। ভাবি, কি সৌভাগ্য আমার, এমন বাড়িতে আমি পড়াতে পেরেছি।

অবসর নেবার পর, ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ আছে।  কেউ সাংবাদিক, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ লেখক। আমি যখন ওদের পড়াতাম, তখন এসব ভাবিনি।  শিক্ষক নদীর মতো। তাঁর থেকে কেউ এক আঁজলা, কেউ এক কলসী জল নিতে পারে।যা সে নিতে পারলো, সেই তাঁর সঞ্চয়। বহু কৃতী ছাত্রের সূতিকাগার আমার স্কুল।  ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার খেলোয়াড় লেখক, এমন অনেককেই নিজের চোখে এখানে বড় হতে দেখলাম। সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল, সত্যিকার মানুষের মত মানুষ হওয়া, জীবনের সাফল্যকে আমি দেখি অন্য নিরিখে।  কে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারল, এই ভালো কাজগুলো আমার ছাত্রদের কাছে প্রার্থনা ছিল বরাবর। 

জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে মাপার যন্ত্র নেই।  মনুষ্যত্বের সাধনা যেন আমার ছাত্রদের আলোকিত করে চিরদিন। স্কুলে অনুষ্ঠান থাকলে মাঝে মাঝে ডাক পড়ে।  যাই, কিন্তু প্রাণের সেই উন্মাদনা আজ আর খুঁজে পাইনা। ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে আমি বহু আদর্শবাদী ছাত্রদরদী মায়াময় শিক্ষক দেখেছি।  তাদের কথা ভাবলে আজও চোখে জল এসে যায়। 

হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় অ্যালাউ হবার পর, সরস্বতী পুজোর দিন খেতে বসেছি, অঙ্ক স্যার আশুতোষ বণিক এসে সামনে দাঁড়ালেন, চারটে লেডিকেনির দুটো খাবার পর আমি আর খেতে পারছি না।  স্যার বললেন, সবটা না খেলে তোকে আমি পরীক্ষায় বসতে পাঠাবো না।  আজ তিনি নেই। তার কথাগুলো আজও কানে বাজে। এতো ভালোবাসা দিয়েছেন স্যারেরা, ভুলতে পারিনা। আমার প্রথম উপন্যাস শিকড়ে বৃষ্টির শব্দ আমারবাংলা স্যার কানাইলাল পণ্ডিতকে দিতে গেলে, তিনি জড়িয়ে ধরেছিলেন।  বলেছিলেন, তোমার সব খবরই আমি পাই। মনে মনে ভাবছিলাম, স্যার, বাংলাকে ভালোবাসা তো আপনিই আমাকে শিখিয়েছেন।

শিক্ষকতা করেছি তিন দশকের ওপর।  অথচ, আমার বরাবর ছাত্র সেজে থাকার ইচ্ছে।  অসিত বাবুর ইংরেজি ক্লাস, পন্ডিত মশাই এর সংস্কৃত উচ্চারণ, কানাই বাবুর ছুটি গল্প পড়ানো, অথবা অভাগীর স্বর্গ গল্পের শেষ পর্যায়ের আলোচনা আজও আমি হুবহু মনে করতে পারি।  এ আমার পরম পাওয়া।  স্কুলের শিক্ষক হবার পরেও স্যারেদের অজস্র ভালোবাসা পেয়েছি।  ভালো খাতা পেলে ননী বাবু ডেকে বলতেন, দেইখা যা, কেমন লেখছে।

জীবনের অনেকগুলো বছর ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝেই কেটে গেছে।  যখন ছাত্র ছিলাম, তখন স্যারের কাছে বকা খেলে, মনে খুব কষ্ট হতো।স্যার এদের বিরুদ্ধে কখনো কখনো মনে মনে অভিযোগও ছিল, নিজে শিক্ষক হবার পর, মনে হল আজ সেই সব অভিযোগ গুলো তো আমার বিরুদ্ধে।  সত্যি বলছি, কোন স্যারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের কথা আজ মনেই করতে পারিনা।  তাদের ভালোটুকু রয়েছে মন জুড়ে। 

কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি বটে, তবে সেরা সময় মনে করি, আমার স্কুল জীবন। আমি ভাগ্যবান, নিজে অকৃতী ছাত্র হলেও, ভালো ছাত্ররাই সবসময় আমাকে ঘিরে থাকতো, যারা পড়াশোনায় ভালো নয়, আমি ছিলাম তাদের আশ্রয়।  আমি তো ওদের মধ্যে আমার অতীতকে দেখতে পেতাম। জীবনের সেরা দিনগুলো পেছনে রেখে এসেছি, প্যারিস থেকে চিত্রম ফোন করে, বলে, আমি ফোন না ছাড়লে আপনি ফোন ছাড়বেন না। লন্ডনে, আমেরিকায়, স্পেনে রয়েছে আমার ছাত্ররা। কত বকেছি ওদের, আজ ওরা আমাকে গর্বিত করে।

সেদিন এসব কখনো মনে হয়নি। দিন আসে, দিন যায়। সময় বদলায়, শিক্ষা ধারায় পরিবর্তন আসে। আর পরিবর্তন তো জীবনের ধর্ম। আমার ভালো লাগে এই ভেবে আমি একটা সুন্দর সময় এর সাক্ষী থেকে গেছি।  সাফল্যকে পাবার জন্য ছুটছি আর ছুটছি।

আলো জ্বালবো বলে কি ক্লান্তিহীন দৌড়, স্বপ্নের মধ্যে দৌড়ানো, সে তো কম কথা নয়। ওরা পাশে ছিল, ওরা সাথে ছিল, ওদের সঙ্গে মিশে এ বয়স বাড় ছিল না আমার, অবসরের সময় এসে গেল।  এই মায়ার টান ছাড়াতে বড় কষ্ট হয়েছে।  দূর থেকে আমার ভালোবাসার স্কুলকে প্রণাম করি, আমার শিক্ষাদীক্ষা, আমার জীবন ও জীবিকা জুড়ে রয়েছে আমার স্কুল, আমার ভালোবাসার বাড়ি, আমার দ্বিতীয় সংসার।

আমার স্মৃতিতে জেগে থাকে আমার স্কুল।  স্বপ্ন দেখি, পেছনের বেঞ্চে বসে গিরীন, অমিত, সুপ্রকাশ এর সঙ্গে গল্প করে চলেছি আমি, অসিত বাবু রেগে বলছেন, হোয়াই আর ইউ টকিং। দেখছি, একইভাবে আমি আমিও ছেলেদের বকছি, কবে যেন আমি স্যার হয়ে গেছি। গভীর রাতে আজো যখন স্কুলের পাশ দিয়ে যাই, তখন পুরোনো অকৃতী ছাত্র  সুনির্মলকে খুঁজি, না, শিক্ষক সুনির্মল বসুকে নয়, ছাত্র সুনির্মলকে, যে দুঃখে পড়ে গেলে, সারারাত স্কুলবাড়িটার চারপাশে হাঁটে, কেবলই হেঁটে বেড়ায়।
বলে, ভালো আছো, নঙগী স্কুল।

সুনির্মল বসু
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ