অটোয়া, শুক্রবার ১২ জুলাই, ২০২৪
নীলগিরির ফিরতি পথে... - ফাহমিদা রিআ

কাশ জুড়ে পূর্ণিমার রূপালি স্নিগ্ধতা। এরই মাঝে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘেদের ছুটেছুটি। শরীর জুড়ানো হিমেল বাতাস, একেবারে মন পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। কটেজের একফালি বারান্দায় মিতির আকাশ রং তাঁতের শাড়ির আঁচলের দোলা যেন এক টুকরো ভাললাগা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে সারা মন জুড়ে।

সুজিতকে যেন কবি বানিয়েই ফেলবে আজ। রাত ভর জেগে থাকবে মিতি, একথা বহু আগেই ঘোষনা দেয়া আছে। অন্যথায় হলে সুনিলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ গলা ফাটিয়ে আবৃত্তি শুরু করবে। এই অভিযোগ নামায় শাসিয়ে দিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়েছিল মিতি। 
কপট গম্ভীর চেহারা করে বলেছিল সুজিত, 
-- নীলগিরির মত অত রোমান্টিক জায়গায় গিয়ে তুমি যদি অমন বিরহ কাতর অভিযোগ জানাতে থাক তবে আশেপাশের সব ভ্রমন পিপাসু মন গুলি হয় গলা ছেড়ে কাঁদবে নয় তেড়ে আসবে। 
-- কে কি করবে বা করতে পারে, সেটা আপনিই ভাবুন মশাই। আমার ভাবনা নয়। আমার ভাবনা তো জানই মাস গুনে গুনে পূর্ণিমার অপেক্ষা। উত্তর থেকে দক্ষিণে থিতু হব পুর্ণিমার রাতে। শুধু তাই নয়, সারাটা রাত দুচোখ ভরে দেখবো দুর পাহাড়ের হাতছানি আর মেঘমালাদের নৃত্য।
-- আর আমি?
--ঘুম কাতুরে কোথাকার। ভোঁস ভোঁস করে ঘুমেই নীলগিরি কমপ্লিট।

কলকলিয়ে স্বভাবজাত হাসিতে গড়িয়ে পড়ে মিতি। বিয়ের পরপরই সমুদ্রে যাবার ছক করা ছিল সুজিতের পরিকল্পনায়। কিন্তু অফিসের ছুটি ম্যানেজ, বস ম্যানেজ, বিয়ে বাড়িতে সুদুরথেকে আসা আত্মীয় স্বজনদের ম্যানেজ ইত্যাদিতেই আটপৌরে জীবনের নিত্যনৈমত্তিকতা চললো। মিতি ফিসফিসিয়ে বলেছিল,
-- অতো মন খারাপের কি আছে? বৌ তোমার পালিয়ে যাচ্ছেনা, নীলগিরিও না। যখন সব ম্যানেজ হবার হতে থাক, যাবার সময় হলেই যাবো।

সেই যাওয়া হলো হাতে গুনে ছ’ছটি পূর্ণিমা পার হয়ে সাত নাম্বার মাসে। সেদিন ট্রেনের আগাম টিকিট দুটো মিতির হাতে ধরিয়ে দিয়ে নির্বিকার কন্ঠে বললো সুজিত,
--এই নাও তোমার পূর্ণিমা দর্শনের ব্যবস্থা। 

মিতির চোখদুটো খুশিতে ঝলমল করে উঠলো
--বলো কি, টিকিট, ছুটি সব ম্যানেজ ?
--ম্যানেজ।
মিতির উচ্ছলতা উপভোগ করতে করতে চোখে চোখ রেখেই জবাব দেয় সুজিত। 

ব্যাস শুরু হয়ে গেল চটজলদি প্রস্তুতি। সুজিতের এক দুর সম্পর্কীয় রিলেটিভ চট্টগ্রামে টুরিজম ডিপার্টমেন্টে আছেন। উনার মাধ্যমেই হোটেল বুকিংটাও ভালয় ভালয় হয়ে গেল। একটানা ট্রেন জার্নি শেষে চট্টগ্রাম। সেখান থেকে সোজা কক্সবাজার। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকতে এসে মিতি এবং সুজিত দুজনেই ভাললাগা আর বিস্ময়ে দুচোখ ভরে কিছুক্ষণ শুধু অসীম নীলে চেয়েই রইল। আছড়ে পড়া ঢেউ যখন ওদের পা ভিজিয়ে ছুটে পালালো সেই সাথে তাল মিলিয়ে মিতির ছেলে মানুষিও যেন জেগে উঠলো। সুজিততো ধরেই নিলো পুরো ছুটিটা বুঝি এখানেই কাটাতে হবে।

কিন্তু না তারিয়ে তারিয়ে আনন্দগুলো উপভোগের স্বাদ গ্রহণ করতে করতে যথা সময়ে তাগাদা ছুঁড়লো মিতি, ‘
--বেলা থাকতে থাকতেই রওনা দেয়া চায় কিন্তু।’

-- তথাস্তু, আমি তৈরি। 
সুজিতের জবাব। অবশেষে কিছুক্ষণ পরে আবার রওনা মিতিকে নিয়ে। 

সুজিত এও বুঝলো পাহাড়ের কোল ঘেঁষা মায়াময় রূপালী চাঁদের আলো সমুদ্রের ভাললাগা থেকেও মিতিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যদিও পথ খানিকটা দূর্গম, কিন্তু চাঁদের গাড়ি বাহনটিও মন্দ নয়। বেশ তো পৌঁেছ দিলো আনন্দ মাখা এ্যাডভেঞ্চারের মত করে।

তখনও বেলা ডুবতে অনেকটায় বাকি। দুরে আকাশ আর মাটি ছুঁয়ে যাওয়া চোখে পড়েনা কোথাও। শুধু আকাশের ধার ঘেঁষে পাহাড়ের হেলান দেয়া দৃশ্য। ঘন সবুজ গাছ গাছালির পাতায় ঢাকা জঙ্গলগুলো অনড় আর স্থির মনে হয় দুর থেকে। 
বাতাসে মিতির আকাশ রঙা আঁচলের দোলা আর দুরের নীল আকাশ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে যেন।  
"মন মোর মেঘেরও সংগীতে
উড়ে চলে দূর দিগন্তেরও পথে......"

মিতির সুরেলা কন্ঠ রবীন্দ্রনাথের সুরে সাজে চার পাশ। আর সেই সাজে প্রকৃতির গভীর মমতায় আকন্ঠ ভালবাসায় ডুবে যেতে থাকে মিতির সাথে সুজিতও। কেটে যায় সেকেন্ড মিনিট ঘন্টা এবং সঞ্চিত দিন কটিও। অবশেষে ফেরার সময় হয়, ফিরতেও হয়।

রিটার্ণ টিকিটের বদৌলতে যথা সময়ে পথ চলা আবারও ঘর মুখে। আবারও চাঁদের গাড়ি বাস, সব শেষে যথারিতি টিকিট নাম্বার মিলিয়ে ট্রেনে আসন খুঁজ পাওয়া। বাংকারে লাগেজ ব্যাগেজ রাখতে না রাখতেই চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দেয় মিতি সুজিতের দিকে। কাপটা নিতে নিতে সুজিত বলে,
-- ঠিক এ কথাটায় ভাবছিলাম। তোমার?
--এই তো।
অন্য কাপে ফ্লাস্কের চা ঢালতে ঢালতে জবাব দেয় মিতি,
--আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, জোগাড় করলে কখন?
--তাইতো দেখলাম, চায়ের তেষ্টা পায় তোমার আর আমাকে তা মনে রাখতে হয়। হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে যখন তুমি হিসেব নিকেশ করছিলে, তখন আমিও শুন্য ফ্লাস্কটা ভরে ফেললাম হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগীতায়। 

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা মিতির হাতে ফিরিয়ে দিতে দিতে ভ্রু নাচিয়ে বললো সুজিত
--এজন্যই তো তুমি অর্ধাঙ্গীনি।

ট্রেনটা ততক্ষণে গা ঝাড়া দিয়ে চলতে শুরু করেছে । মিতি কিযেন একটা বলতে গিয়ে থেমে যায় সামনের ফাঁকা সিটটায় এক যাত্রীর হন্তদন্ত আগমনে। পকেট থেকে টিকিট বের করে সিট নম্বারটা আর একবার মিলিয়ে নিলেন আগন্তক। তারপর সুজিত এবং আগন্তক প্রায় সমস্বরেই হই হই করে উঠলো একে অপরের দিকে চোখ পড়তেই
--আরে তুই?
-- কোত্থেকে?
-- কোথায় গিয়েছিলি?
-- তুই কোথায় যাচ্ছিস?

কে কার কথার জবাব দেবে? অতপর হো হো হো।
সুজিতও হাসে, বলে
-- কেমন আছিস বল। কত দিন পর দেখা? একা যে, ভাবী কোথায়?
--যেমন দেখছিস। তোর ভাবী তো আর চাকরী করেন না, করি আমি। তাই অফিসের কাজে আমি এসেছিলাম চট্টগ্রাম। তুই ?
--আমি নই আমরা। পরিচয় করিয়ে দেই, আমার ওয়াইফ মিতি। আর এ হচ্ছে আমার বন্ধু আসিফ।
-- মানে? তুই বিয়ে করেছিস?
--বিয়ে না করলে ওয়াইফ পেলাম কি করে। 

দুচোখে বিস্ময়ের ঘোর তখনও আসিফের। মিতির দিকে তাকিয়ে সৌজন্যতাটুকু সেরে সুজিতের পাশ ঘেসে বসতে বসতে বলে,
-- কবে বিয়ে করলি, কই জানাস নি তো !
--জানালে এই সারপ্রাইজটাতো দেয়া হতোনা। দুষ্টুমি করে বলে সুজিত। 

কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে বলে আসিফ
--যেন তোর সারপ্রাইজের জন্যই আমি ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়াচ্ছি। যাকগে ওসব। 

মিতির দিকে তাকিয়ে 
--এবার বলেন তো ভাবী, কোথাকার রাজকন্যা আপনি? আমার এ বন্ধুটি কোথা থেকে আপনাকে হরণ করলো। 

আসিফের বলার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলে মিতি। সে হাসিতে যোগ দেয় সুজিতও। একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিয়ে আড় চোখে আসিফের দিকে তাকিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলে ওঠে “দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে” নিজের কথার ভঙ্গিতে সুজিত আবারও হেসে ওঠে। 

আসিফও বিস্মিত হয়ে মিতির মুখের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে কিযেন নিরীক্ষণ করে।

এতক্ষণ নীরবে দেখে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিলনা মিতির। এবার আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলো আসিফকে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে তারও। হয়তোবা পরিচিত কারো চেহারার সঙ্গে মিল রয়েছে কিংবা সুজিতের এ্যালবামে অনেক বন্ধুদের সাথে এবন্ধুর ছবিও দেখে থাকবে, হতেই পারে।
--কি ভাবী বললেন নাতো কোন শহরের রাজকন্যা আপনি?

মিতি কিছু বলবার আগেই সুজিত হেসে বলে
-- রাজশাহী শহরের। 

আসিফের উদ্যমটা মিইয়ে পড়ে ততক্ষণাৎ। উঠে দাঁড়ায় তেমনি সবেগে। ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগটা হাতে নিয়ে সামনে এগোতে গিয়ে পিছন ফিরে সুজিতের দিকে তাকায় একবার। সম্পূর্ণ রসকসহীন কন্ঠে বলে,
--উপযুক্ত কারনটা আমি নিজেই খুঁজে পেয়েছি। চলি।

সুজিত ওর হাতটা টেনে চেঁচিয়ে বলে 
--এই চলন্ত ট্রেনে ‘চলি’ বললেই হল? কোথায় যাচ্ছিস?

আসিফ হাত ছাড়িয়ে সামনে যেতে যেতে জবাব দেয় 
-- ভয় নেই ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নামবোনা।
আমাকে আড়াল করে নাটক তো শুরু করেছিস তুই। শুধু কম্পার্টমেন্ট বদল করবো।

মিতি ঘটনার আকস্মিকতায় সুজিতের দিকে তাকায়। অবাক কন্ঠে বলে
--ভালই তো কথা বলছিলেন উনি, হুট করে কেনই বা এমনটা করলেন।

সুজিতও প্রথমটায় চুপ হয়ে যায় ঘটনার আকস্মিকতায়। কন্ঠ নামিয়ে বলে,
-- ঐযে “দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে”
--সেতো কবিতার লাইন।
-- তার জীবনেরও লাইন। সুজিত জবাব দেয়।
--মানে? বিস্ময় ঝরে পড়ে মিতির কন্ঠে।
-- মানেটা তুমিও জানো।
-- আমি?
--হ্যাঁ তুমি। মনে পড়ে আমাদের বিয়ের মাস ছয়েক আগে তিলকপুর থেকে তোমাকে দেখতে গিয়েছিল এক বড় ব্যবসায়ী। সেই এই আসিফ।

মিতি ঘোর লাগা চোখে সুজিতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পলকও পড়ছেনা বিস্ময়ের ঘোরে। সুজিত বলেই চলেছে 
-- আসিফের সঙ্গে যে তিন জন ছিল আমিও তাদের মধ্যে একজন। অনেক আপ্যায়ন আর দেনদরবার শেষে ‘পরে জানাবো’ বলে আমরা যখন ফিরে এলাম আসিফ অবলিলায় ঘোষনা দিল, এখানে তার পোষাবেনা, এর আগে সে আরও দু’তিনটি মেয়ে দেখেছে। তারা সবাই এই মেয়ের পরিবারের চেয়ে অনেক বেশি দেনদরবারে রাজি।

বেশি লাভের হিসাবটা কষে ঐদিকে এগোলো আসিফ কদিন পরে। স্তম্ভিত মিতির ঠোঁট দুটো নড়ে উঠলো এবার, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো
-- তাই বুঝি করুনা হয়েছিল? ছ’মাস পরে গিয়ে উদ্ধার করলে - - -

সুজিতের হো হো হাসিতে কথা থেমে যায় মিতির। সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে ট্রেনটা। জানালার ওপাশে গাছপালা, নদী, অবারিত সবুজ ক্ষেত সব, সব ছুটে চলেছে তাল মিলিয়ে। সুজিত হাসি থামিয়ে মিতির কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলে
-- করুনা করবো আমি? সেতো আমার সাধ্যি নয়। করুনাতো করেছ তুমি। আমাকে। এই যে এত্তো ভালবাসা দিয়ে একটা সংসারে বেঁধে ফেলেছ নইলে এই অধমের ঠাঁই হত কোথায় ?
মিতি আর স্থির থাকতে পারেনা। সুজিতের বুকের ওমে ওর ভেতরের বরফ জমা অভিমানগুলো যেন বাঁধ ভেঙ্গে আসতে চাইছে। কিন্তু অনতি দুরে বসা যাত্রিদের ঢুলুঢুলু চোখের দৃষ্টির সামনে তা জমিয়ে রাখে আপন ঘরে ফেরার অপেক্ষায়।

ফাহমিদা রিআ 
মালিবাগ, ঢাকা।