অটোয়া, মঙ্গলবার ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩
স্বয়ংসম্পূর্ণা - শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়

১ 
ন ২০৩৫। মুম্বাইয়ের উপকন্ঠে একটি সম্ভ্রান্ত হাসপাতালের সামনে একটি কালো রঙের মার্সেডিজ-বেঞ্জ এসে দাঁড়ালো। বিদেশী গাড়ির আনাগোনা এই হাসপাতালে কিছু নতুন ব্যাপার নয়। অত্যাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার  পরিকাঠামোযুক্ত খরচবহুল এই হাসপাতালে দীন-দরিদ্রের প্রবেশ স্বপ্নমাত্র। গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে এলেন একজন মধ্য-ত্রিশের মহিলা। সাধারণ ভারতীয় মেয়েদের তুলনায় তিনি অনেকটাই দীর্ঘাকৃতি, নির্মেদ দেহাবয়ব, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, রেশমি বাদামি চুল, চলাফেরায় বেশ আভিজাত্য ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে বেশ দৃপ্ত ভঙ্গিমায় মহিলাটি হসপিটালে ঢুকলেন। রিসেপশনে এসে মহিলা স্মিত হেসে বললেন, "আমি রূপা সেন, আমার কেবিন বুকড আছে- ৬০২।" রিসেপশনের মেয়েটি একটু অবাক হলো, একা ভর্তি হতে এসেছেন হসপিটালে, এমনভাবে বলছেন যেন হোটেলে রুম বুকড আছে, হসপিটালে নয়! তাও যথাসম্ভব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় মেয়েটি জিজ্ঞাসা করলো, "ম্যাডাম, আপনি একা এসেছেন? আপনার সঙ্গে কেউ আসে নি?" রূপা সেনের চিবুক একটু শক্ত হলো, ভ্রু সামান্য কুঞ্চিত, বললেন,"সেটা কি খুব প্রয়োজনীয়? আপনি ডক্টর কৌশিক বাসুর সাথে কথা বলতে পারেন, আমি ওনার পেশেন্ট। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অগত্যা ফোন তুললো ডক্টর বাসুকে কল করার জন্য। এইসব ছোটোখাটো ব্যাপারে ব্যস্ত ডাক্তারদের বিরক্ত করতে সত্যি খুব খারাপ লাগে; কিন্তু কি আর করা যাবে সম্ভ্রান্ত রোগীরা হসপিটালের লক্ষ্মী, তাদের অনেক আবদার বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়। ডক্টর বাসু কল ওঠালেন না, হয়তো অপেরেশনে ব্যস্ত। এবার শ্রীমতি সেন বললেন, "আচ্ছা, এক কাজ করুন না। আমি এডমিশন নিয়ে নি, আমার একটা অপারেশন হবে, তাই ভর্তিটা খুব জরুরি। আর আমার সে অর্থে কোনো অভিভাবক নেই। মাথার উপর শুধু মা ছিলেন, উনিও কয়েকদিন আগে..." শ্রীমতি রূপা সেনের গলা ধরে এলো। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি এবার নরম হলো, এই সুসজ্জিতা সম্ভ্রান্ত মহিলাটির সত্যি কেউ নেই? ঈশ্বর বোধ হয় কাউকেই সব কিছু উজাড় করে দেন না; কোনো না কোনো জায়গায় ফাঁক রেখে দেন। মেয়েটি জিজ্ঞাসা করলো, "আপনার প্রেসক্রিপশন টা প্লিজ একটু দেখাবেন?" "ওহ, শিওর!"  বলেই রূপা পার্স থেকে প্রেসক্রিপশন বের করে। মেয়েটি একবার প্রেসক্রিপশন আর একবার রূপার দিকে তাকালো। তারপর দ্রুত এডমিশন সেরে এটেন্ডেন্টকে  রূপাকে কেবিন ৬০২ তে পৌঁছে দিতে বললো। রূপা যেতে যেতে শুনতে পেলো, মেয়েটি ফোন বলছে , "হ্যালো, ৬থ ফ্লোর?" সে বুঝলো তার কেবিনে প্রবেশের আগেই তার আগমনবার্তা সংশ্লিষ্ট নার্সের কাছে পৌছে গেছে।


সুস্মিতার বুটিকে আজ বেজায় ভিড়। পুজোর আর বেশি দিন দেরি নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই শাড়ি প্রেমিকাদের আনাগোনা বেড়েছে দোকানে। রাস্তাঘাটে ক’টা  মেয়েকে আর শাড়ি পড়তে দেখতে দেখা যায় আজকাল, কিন্তু পুজোর বাজার মানে পুজোর শাড়ি, তা সে বছরে এক দিন পরলেও। সুস্মিতার বুটিক ইদানিং বেশ নাম করেছে, নকশার নতুনত্ব, সুলভ মূল্য ও সর্বোপরি সুস্মিতার অকৃত্রিম হাসিমুখ ও ব্যবসায়িক মুন্সিয়ানা বেশ শীঘ্রই সাফল্য এনেছে। কিন্তু এতো কাজের মাঝেও আজ সুস্মিতার মন উচাটন।  আজ রূপঙ্করের রিপোর্ট কার্ড দেবার দিন। এমনিতে রূপঙ্কর পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু ইদানিং তার মধ্যে কিছু কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার লক্ষ্য করেছে সুস্মিত। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও আগে অনেক বার বলেছেন সুস্মিতাকে। আগের বছরের ক্লাস টিচার মিস্টার অর্ণব ঘোষ তো বললেন "আপনার ছেলে ঠিক অন্য বাচ্ছাদের মতো নয়। দেখুন না সবাই কেমন হাসি-খুশি, খেলা-ধুলায় মেতে আছে | রূপঙ্কর বড্ডো চুপচাপ, শান্ত ছেলে তো অনেকেই হয়, কিন্তু ওর হাব-ভাব কেমন যেন মেয়েলি, যত বড়ো হচ্ছে ততো ব্যাপারটা প্রকট হচ্ছে। এই নিয়ে ওকে টিজড ও হতে হয়, কিন্তু আনফর্চুনেটলি ও নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে না বা চায় না। আমার মনে হয় ওকে একজন সাইকোলজিস্ট দেখানো দরকার।" 

সুস্মিতাও ভেবেছে কয়েকবার, কিন্তু সাহস করে যেতে পারে নি, কি জানি ছেলের মনে কি প্রভাব পড়বে, সে যেতে চাইবে কি না, এইসব ভেবে সে সাইকোলোজিস্টের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

বাবা দুঁদে আইপিএস অফিসার, তার ছেলে এমন লবঙ্গ-লতিকা! এর থেকে বড়ো অসম্মানের আর কি হতে পারে বাবার কাছে? সত্যি কথা বলতে কি তথাগতর সঙ্গে সুস্মিতা ও রূপঙ্করও ভারতের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ঘুরে বেরিয়েছে চাকরিসূত্রে। ছোট্ট রূপঙ্করকে নিয়ে মা-বাবার একটা সুন্দর সংসার। ছেলে ছিল বাবার নয়নের মনি। কিন্তু সেই নয়নমনি যেন কিছুদিন পর থেকেই চক্ষুশূল হতে শুরু করলো। রূপঙ্করের পুতুল নিয়ে খেলা ছিল তথাগতর প্রথম বিরক্তির কারণ। টিপ্ পরে, পনি টেইল করে আয়নায় নিজেকে দেখা ছিল দ্বিতীয় বাঁদরামির লক্ষণ। সুস্মিতা তথাগতকে বোঝাতে চেষ্টা করতো এ নিছকই ছেলেমানুষি, কিন্তু মনে মনে কি সেও উদ্বিগ্ন হতো না? অতঃপর তথাগতের সঙ্গে চাকরি সূত্রে এদিক ওদিক যাওয়া বন্ধ করলো সে। কলকাতায় বসতবাটিটার একতলায় বুটিক খুললো। ছেলেকে নামি স্কুলে ভর্তি করলো। কিন্তু আসল সমস্যার সুরাহা হলো না। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে স্বভাবের মিল না হওয়ায় রূপঙ্করের সব ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠলো মা। কেন যেন তার মনে হতো, পৃথিবীতে মায়ের চেয়ে মধুর আর কিছুই হয় না। এই একজন মানুষ ঠিক সুখে-দুঃখে আবেগে -প্রলাপে তার অবলম্বন হয়ে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত ক্লাস টিচারের পরামর্শ মতো সাইকোলজিস্ট ডক্টর চৌধুরীর কাছে রূপঙ্করকে নিয়ে গিয়েছিলো সুস্মিতা। ডক্টর চৌধুরী ব্যাপারটাকে বেশ সহজভাবে নিলেন, বললেন, "দেখুন মিসেস সেন, এতো চিন্তিত হবার মতো তো এখনই কিছু দেখছি না। আপনার ছেলে এখন সবে শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে পা বাড়াচ্ছে। এই সময়টা খুব সেনসিটিভ জানেন তো! এই সময়টা একটি ছেলে বা মেয়ে জগতের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে চিনতে শেখে। কি ভালো, কি মন্দ, কোনটা তার জন্য সঠিক আর কোনটা বেঠিক, সে সম্পর্কে একটা ধারণা এই সময় থেকেই তৈরি হতে থাকে। এই সময় কোনো কিছু জোর করে ওর ওপর চাপাবার চেষ্টা করবেন না মিসেস সেন, তাতে হিতে বিপরীত হবে। একটা জিনিস সবসময় মনে রাখবেন, পৃথিবীতে কোনো কিছুই অ্যাবসলিউট নয়, সবই রিলেটিভ বা আপেক্ষিক। প্রত্যেক মানুষের জগৎটা তার একান্ত নিজস্ব। যা একজনের কাছে স্বাভাবিক, তাই আর এক জনের কাছে অস্বাভাবিক। ওকে ধীরে ধীরে কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফুটে উঠতে দিন। আর আপনি নিরপেক্ষভাবে ওর ফুটে ওঠাটাকে প্রত্যক্ষ করুন।"  ডক্টর চৌধুরীর কথায় খানিকটা ভরসা পেলো সুস্মিতা। তার সন্তান অস্বাভাবিক নয়, প্রত্যেকের জন্য স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা আলাদা, এটা অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। কিন্তু কে বুঝবে সে কথা? আত্মীয়-বন্ধু- প্রতিবেশী দূরের কথা, ছেলের বাবা কি কথাটা বুঝবে? হঠাৎ সুস্মিতার মনে হলো, তার উচিত ছিল তথাগতকে ডক্টর চৌধুরীর চেম্বারে নিয়ে আসা। কিন্তু সে ব্যস্ত মানুষ, তাও এ শহরে থাকে না, তার আশায় আর কতদিন বসে থাকা যেত? ঈশানকোণে মেঘের ছায়া দেখতে পেলো সুস্মিতা, মনে হলো পথ চলাটা তেমন সহজ হবে না। 


রূপা সেন যখন কেবিন ৬০২ তে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, সেই সময় অপারেশন থিয়েটারের সংলগ্ন কামরায় সিনিয়র ডাক্তারদের একটা আলোচনা-সভা বসেছিল। ডক্টর কৌশিক বাসুর কপালে চিন্তার রেখা। সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনিই প্রথম বক্তব্য রাখলেন, বললেন, "রূপার মানসিক জোর দেখে আমি রীতিমতো অবাক। এতো বড়ো একটা ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশন হতে চলেছে, উনি একা এসে এডমিট হয়েছেন, নিজেই নিজের অপরেশনের কনসেন্ট দিয়েছেন, ভাবা যায়?" ঈষৎ বর্ষীয়ান এবং অভিজ্ঞ সার্জন ডক্টর আগরওয়াল মৃদু প্রতিবাদ জানালেন, " ইসন'ট ইট ভেরি ন্যাচারাল মিস্টার বাসু দ্যাট শি উইল গিভ হার ওন কনসেন্ট? পার্টিকুলারলি হোয়েন শি ইস এ ফেমাস ফ্যাশন-ডিসাইনার?" ডক্টর মূর্তির চিন্তাটা অন্য জায়গায়। এই কেসটা আর পাঁচটা কেসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আগে যতগুলো কেস তাঁরা করেছেন অঙ্গ প্রতিস্থাপনই ছিল তাদের চিকিৎসার প্রথম ও শেষ কথা। রূপা আগেই অনেক অপরেশনের ধকল সহ্য করেছেন, তাছাড়া তিনি অনেক ধরণের হরমোন থেরাপি পান - সব মিলিয়ে কেসটি যে জটিল তাতে সন্দেহ নেই। সর্বোপরি, রোগী ডাক্তারদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করলেও অপরেশনের ফলাফল নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী, যা পরোক্ষভাবে চিকিৎসকদের ওপর নিশ্চিত চাপ সৃষ্টি করছে। সবশেষে ডক্টর মূর্তি তাকালেন এককোণে বসে থাকা এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডক্টর সিনহার দিকে। জিজ্ঞাসা করলেন, "আর ইউ কনফিডেন্ট ডক্টর সিনহা দ্যাট উই উইল বি সাকসেসফুল?" ডক্টর সিনহা অল্প কথার মানুষ, বললেন,"কলকাতার এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডক্টর চ্যাটার্জী, যিনি রূপাকে দেখতেন, তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাছাড়া রূপা আদারওয়াইজ ফিট, আমার তো মনে হয় না কোনো সমস্যা হবে।” কিছুটা আশা, কিছুটা আশঙ্কা, কিছুটা উত্তেজনা বুকে নিয়েই প্রথিতযশা চিকিৎসকরা সে দিনের মতো সভাভঙ্গ করলেন। আগত দিনে তাঁরা সাফল্যের সূর্য দেখবেন না নৈরাশ্যের কালো মেঘ এসে ঘিরে দেবে তাঁদের, তা এখনো সকলেরই অজানা।


আই.সি. ইউ-র ভিতরটা রোগীদের জন্য এক আজব জায়গা। তারা বুঝতে পারে না এটা স্বর্গ না নরক, সেখানে এখন দিন না রাত! রূপার যখন জ্ঞান ফিরলো, সে ভালো করে চোখ খুলতে পারছিলো না। তারই মাঝে কানে আসছিলো নানারকম পিক পিক আওয়াজ। কেমন যেন আবছা আলো! পর্দা দিয়ে ঘেরা একটা বিছানায় সে শুয়ে আছে। কে যেন পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে মিষ্টি সুরেলা গলায় প্রশ্ন করলো, " কেমন আছেন, রূপা?" নিজের নাম শুনে চোখটা খুললো রূপা। এ নাম তার বড়ো প্রিয়, শুধু এই নামটুকু পেতে তাকে কম সংগ্রাম করতে হয় নি | চোখ খুলে সামনে দেখলো একজন শ্বেতপরী দাঁড়িয়ে আছে, মুখে স্মিত হাসি। তবে কি সে সত্যিই স্বর্গে পৌছে গেছে? মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে এলো রূপার, না, সে তো হাসপাতালে, তার তো অপারেশন হয়েছে, সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে তো নার্স। রূপা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "নার্স, আমার অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে?" অল্পবয়সী নার্সটি রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, "আপনার  শরীরে অনেক ধকল গেছে, টানা দশ ঘন্টার অপারেশন, এখন প্লিজ উত্তেজিত হবেন না। ডক্টর বাসু আপনার সাথে কথা বলবেন।"

দিন তিনেক বাদে কেবিন ৬০২ তে রাউন্ড দিতে এলেন ডক্টর কৌশিক বাসু। এই ক'দিন রোজই তিনি আই.সি. ইউ তে রাউন্ডে এসেছেন, কিন্তু রূপা তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে নি। আজ রূপার মুখ দেখে বেশ তরতাজা লাগছিলো। কৌশিক তাই রূপার সঙ্গে আজ আলোচনার সুযোগ পেলেন। কৌশিক রূপাকে জানালেন যে তাঁর শরীরে জরায়ু প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। কৌশিকের চোখে মুখে একই সাথে গর্ব ও প্রশান্তির ছাপ, মৃদু হেসে রূপাকে বললেন, " আজ আপনার নারীতে রূপান্তর সার্থক। এর আগে আমরা মূলতঃ সেইসব নারীদের শরীরে   জরায়ু প্রতিস্থাপন করেছি, যারা অপুষ্ট জরায়ু নিয়ে জন্মেছেন। এই প্রথম আমরা রূপান্তরিত নারীতে জরায়ু প্রতিস্থাপন করলাম, এবং তা একজন মৃতার শরীর থেকে নিয়ে। রূপার চোখের কোণে জল, " হ্যাঁ, ডক্টর বাসু, মা তাঁর সারা জীবন শুধু আমার জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন, এমনকি বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা ভেঙে গেছে শুধু আমার জন্য। যে মাতৃজঠরে আমার জন্ম, তা আপনি আমার দেহে প্রতিস্থাপন করেছেন। আমি একদিকে মা'কে হারিয়েও তাকে আমার মধ্যে ফিরে পেয়েছি, আর এক দিকে এক সম্পূর্ণা নারীতে রূপান্তরিত হতে পেরেছি। আর এই সব কিছুর জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ ডক্টর বাসু।"  একটু বিরতি দিয়ে রূপা আবার শুরু করলো, "কিন্তু ডক্টর বাসু, আপনি তো বুঝতেই পারছেন, আমি আমার লক্ষ্য পূরণের পথে অর্ধেক পথ পেরিয়ে এসেছি মাত্র।" কৌশিক একটু অবাক হলেন, জিজ্ঞাসা করলো, "ঠিক কি বলতে চাইছেন ম্যাডাম ?" রূপা অর্ধ-উত্থিত শয্যায় একটু হেলান দিলো, তারপর উপরে তাকিয়ে বললো, "ডক্টর বাসু, আমি একজন সম্পূর্ণ মানব হতে চাই?" কৌশিক একটু দ্বিধাগ্রস্ত, "মানব, না কি মানবী?" রূপা ঝটিতি উত্তর দিলো, " বলতে পারেন দু-ইই।” একটু চুপ করে থেকে রূপা আবার শুরু করলো, " দেখুন ডক্টর, আমি মনে-প্রাণে একজন নারী ঠিকই, কিন্তু আমার ভাবনা-চিন্তা গুলো একটু অন্যরকম। আমি আমার পুরুষ-শরীরের কাঠামো ছেড়ে নারীর অবয়ব ধারণ করেছি। তার জন্য যা যা করণীয়, হরমোন থেরাপি থেকে একাধিক সার্জারি, আমি সবই করিয়েছি। মা হবার আশা নিয়ে জরায়ু প্রতিস্থাপিত করিয়েছি। কিন্তু এখনো আমার মা হাওয়া বাকি।  আমার যুদ্ধ এখনো শেষ হয় নি কিন্তু। আমার চলার পথটা কাঁটা বিছানো কি না, তাই আমার সবসময় একটা অজানা আশঙ্কা হয়।"  কৌশিক আশ্বস্ত করলেন রূপাকে, " না না, ম্যাডাম, কাঁটা ভরা পথ শেষ, আপনার সামনের পথ গোলাপের  পাপড়ি বিছানো। শুধু একজন যোগ্য পার্টনার যোগাড় করুন, তারপর জীবন আপনি এগিয়ে চলবে। " রূপা বাধা দিলো, " এখানেই তো আমার আপত্তি ডক্টর বসু! আমি কোনো পার্টনার চাই না। যখন আমি রূপঙ্কর ছিলাম, আমি নিজের স্পার্ম প্রিজার্ভ করে রেখেছি স্পার্ম ব্যাংকে। আমি আমার নিজের শুক্রাণু দিয়ে নিজের জরায়ুতে নিজের সন্তান ধারণ করতে চাই।” ডক্টর কৌশিক বাসু খানিকক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকালেন। এই অসমসাহসী দৃঢ়-চরিত্র মেয়েটির ব্যক্তিত্ব তাঁকে মুগ্ধ করলো। ঠোঁটের কোণায় আলগা হাসি বজায় রেখে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ উপরে তুলে বললেন, "বেস্ট অফ লাক।"  তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন। মনের কোণে রয়ে গেলো কিছু ভাবনা, আর একরাশ শুভকামনা।


দিল্লীর উপকন্ঠে একটি ছিমছাম দোতলা বাড়ি। লোহার গেটটা খুলে ভেতরে ঢুকলে এক চিলতে বাগান। বাগানের মাঝখান দিয়ে মোরাম বিছানো রাস্তা। রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে দু ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠলে দামী সেগুন কাঠের দরজা। এই বাড়ির যিনি মালিক, তিনিও মানুষটি খুব দামী। মিস্টার মিত্র একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী, যাঁর ক্ষমতা না থাকলেও দাপট আজও বর্তমান। পোশাকে-আশাকে, ব্যবহারে আজও সম্ভ্রান্ততার ছাপ পরিস্ফুট। এ হেন ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষটির শুধু দুটি দুর্বলতা- এক, মাতৃহীনা কন্যা নীলাঞ্জনা, দুই, আদরের লাব্রেডোর কুকুর পেপসি। পেপসি নামটা অবশ্য নীলাঞ্জনারই দেওয়া।

সকালবেলা সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন মিস্টার মিত্র। পেপসি একমনে মনিবের পা চাটছিল। এমন সময় নীলাঞ্জনার প্রবেশ। "বাপি, কি করছ?" বলে সে মিস্টার মিত্রর গলা জড়িয়ে ধরল। বুদ্ধিমান বাপির বুঝতে অসুবিধা হলো না যে আদরিনী মেয়ের কিছু একটা আবদার আছে। তেমন বেয়াড়া আবদার না হলে মিস্টার মিত্র মেয়ের সব আবদারই পূরণ করার চেষ্টা করেন। বিশেষতঃ এখন তিনি আরোই কোমল চিত্ত, কেননা মেয়ে পরের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে রয়েছে। স্নেহের সুরেই তাই তিনি মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন,"কি চাই, বল মা!" নীলাঞ্জনা এবার বাপির গলা জড়িয়ে ধরেই বললো, "আমি চাই আমার ওয়েডিং ড্রেসটা ফ্যাশন ডিজাইনার রূপা সেনকে দিয়ে করাবো। হ্যাঁ, বাপি, প্লিজ।" মিস্টার মিত্র একটু অবাক হলেন, "এ আর এমন কি মা? তোর যাকে পছন্দ তাকে দিয়েই করাবি।" নীলাঞ্জনা একটু থেমে মাথাটা নিচু করলো, তারপর বললো, "না বাপি, ওটা একটু কস্টলি অ্যাফেয়ার, তাই তোমার পারমিশন নিলাম। কিন্তু ওনার ড্রেস গুলো সত্যি ইউনিক।" মিস্টার মিত্র এবার বেশ জোরেই হাসলেন, "খুব ভালো। আমার ইউনিক মেয়ের জন্য ইউনিক ড্রেসই তো চাই।" নীলাঞ্জনা অনুমতির অপেক্ষায় ছিল। খুশিতে ডগমগ করতে করতে সে যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিলো তেমনি ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। মেয়ের অপসৃয়মান শরীরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রৌঢ় পিতার কপালে ভাঁজ পড়লো। জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। পেশাগত জীবনে সাফল্যের শীর্ষে থেকেও বার বার ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় এসে তাঁকে অসহায় করে দিয়েছে। তাঁর শেষ সম্বল এই মা-মরা মেয়েটি, তা তাকে অন্ধের যষ্ঠিই বলো, বা ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো। তাঁর সেই একান্ত আপনজন, যাকে তিনি তাঁর বিশাল ডানা দুটি দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, সে যেন আজ তার নিজের ডানায় ভর করে উড়তে শিখেছে, পাখি আর বেশিদিন এই স্নেহের নীড়ে থাকবে না। একাকিত্বই বোধহয় তাঁর জীবনের একমাত্র অমোঘ পরিণতি।

৬ 
কলিং বেলের শব্দ শুনে নীলাঞ্জনা দরজা খুলে যাকে দেখতে পেলো, সে কোনোদিন তার বাড়ি আসতে পারে একথা সে স্বপ্নেও ভাবে নি। মৃদু হেসে রূপা সেন বললেন,"ভাবলাম তোমার ওয়েডিং ড্রেসটা আমি নিজেই বাড়িতে ডেলিভারি দিয়ে আসি। ফিটিংস ঠিক হয়েছে কি না নিজেই দেখে নেবো। এই সব ব্যাপারে আমি আবার একটু খুঁতখুঁতে।" নীলাঞ্জনার মুখে "থ্যাংক ইউ সো মাচ" ছাড়া আর কিছু কথা বের হলো না। রূপাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িং রুমে বাপির কাছে বসালো সে। তারপর ড্রেসটা হাতে করে নিয়ে ভেতরের ঘরে গেলো ট্রায়াল দিতে। খুশিতে ঝলমল করতে করতে ফিরে এসে নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করলো, "বাপি, দেখো না আমাকে কেমন লাগছে?" মিস্টার মিত্র একটু অন্যমনস্ক ছিলেন। একটু হকচকিয়ে বললেন,"আঁ?" নীলাঞ্জনা লক্ষ্য করেছে আজকাল বাপি একটু অন্যমনস্ক থাকে, কিন্তু আজ যেন একটু বেশি। একটু আহত স্বরে বললো,"কি এতো ভাবো বাপি? কেমন লাগছে জিজ্ঞাসা করলাম।" অপ্রতিভ মিস্টার মিত্র চকিতে নিজেকে সামলে নিলেন, "খুব সুন্দর লাগছে মা!"  

সেদিন সারাদিনই বাপিকে কেমন যেন অন্যমনস্ক লাগলো, তার পর দিনও। সন্ধ্যেবেলা নিজে থেকেই নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করলো, "বাপি, তোমাকে যেন কেমন মনমরা লাগছে। তুমি কি আমার ব্যাপারে বেশি চিন্তা করছো? তুমি তো অদ্রীশকে চেনো। সে আমাকে কোনো কষ্ট দেবে না।" মিস্টার মিত্র প্রমাদ গুনলেন, তার ব্যবহারে পরিবর্তন মেয়ের নজরেও পড়েছে | মুখে বললেন,"না, না! মেয়ের বিয়ে কি চাট্টি খানি কথা? চিন্তা একটু হওয়া তো স্বাভাবিক মা!"

সেদিন সকালে রূপা এ বাড়িতে আসার পর থেকে মিস্টার মিত্র সত্যি হতবাক হয়ে গেছেন। হাজার চেষ্টা করেও ভাবনাটা কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছেন না। দুটো মানুষের এতো মিল কি সম্ভব? বহু যুগের ওপার হতে আসা একটা মুখ চোখের সামনে কেবলই ভেসে বেড়াতে লাগলো- যে মুখ এক কালে তাঁর বড় প্রিয় ছিল। সুস্মিতা কি কোনো মন্ত্রবলে তার যৌবন ফিরে পেয়েছে? অঞ্জনা অর্থাৎ নীলাঞ্জনার মাকে বিবাহ করার পর মিস্টার মিত্র তাঁর বিগত জীবন ভুলে সুখী হতে চেয়েছিলেন; তাই সুতপার একটি ছবিও তাঁর ঘরে স্থান পায় নি। কিন্তু মন থেকে কি মুছে ফেলতে পেরেছিলেন তাঁর প্রথমা স্ত্রীকে? তার প্রতি তিনি অবিচার করেছিলেন। সন্তানকে নিয়ে মনোমালিন্যের জেরে একটা সম্পর্ক নষ্ট হওয়া হয়তো উচিত ছিল না। কিন্তু পৃথিবীতে সব ঘটনা কি আর আমাদের হাতে থাকে? এই হয়তো ছিল তাঁর অদৃষ্ট বা ভবিতব্য। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মিস্টার তথাগত মিত্র পোশাক পরিবর্তন করে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন।                                                      

দিল্লীর সম্ভ্রান্ত এলাকার বহুতল বাড়িটার সামনে তথাগত মিত্রের গাড়ি থামলো। কার্ডে ঠিকানা লেখা ছিল, তাই বাড়ি খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধা হয় নি।  লিফটে চড়ে সতেরো তলার ফ্ল্যাটের বাইরে  'রূপা সেন' নামাঙ্কিত ফলক দেখে কলিং বেল বাজালেন। অপ্রত্যাশিতভাবে দরজা খুলে দিলো একটি বছর পাঁচেকের ছেলে। ছেলেটির মুখটা যেন ভীষণ চেনা- যেন পূর্বজন্মে দেখা; বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ, স্থির দৃষ্টিতে তথাগতর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "কাকে চাই?" গত কয়েকদিন ধরে তথাগতর সঙ্গে কতগুলো অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে যা আগে কখনো ঘটে নি। অচেনা মানুষ দেখে মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা! তাঁর কি মস্তিস্ক-বিকৃতি ঘটেছে, না কি কোনো অদৃশ্য টাইম-মেশিনে চড়ে মুহূর্তে অতীতে পৌঁছে গেছেন? প্রাথমিক বিস্ময়ের ভাব কাটিয়ে তথাগত জিজ্ঞাসা করলেন, "রূপা সেন এ বাড়িতে থাকেন?" ছেলেটি স্পষ্ট স্বরে বললো, "হ্যাঁ, উনি আমার মা। ভেতরে বসুন, ডেকে দিচ্ছি।"

মাকে ডাক দিয়ে এসে ছেলেটি একটা খেলনার গাড়ি নিয়ে জোরে জোরে সারা ঘরে চালিয়ে বেড়াতে লাগলো। তথাগত চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন, রূপার ফ্ল্যাটটি বেশ বিলাসবহুল। সময় কাটাবার জন্য ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার নাম কি?" ছেলেটি বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে জবাব দিলো, "শুভঙ্কর সেন।" শুভঙ্কর....নামের মিলটাও কি কাকতালীয়? চেহারা আর নামের এতো মিল থাকলেও এই  ছেলেটি পুতুল নিয়ে খেলছে না, গাড়ি নিয়ে খেলছে- এই যা তফাৎ। 

অন্দরমহল থেকে রূপা সেন বেরিয়ে এলেন। দীর্ঘাকৃতি রূপার বাড়ির সাজপোশাকও বেশ ফ্যাশন-দুরস্ত। একজন ফ্যাশন ডিজাইনারের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। ইতস্তত করে তথাগত বললেন, " আপনি হয়তো আমাকে আপনার বাড়ি আসতে দেখে অবাক হয়েছেন।" রূপা হেসে উত্তর দিলেন, "মোটেই না।" তবে কি  রূপা ইচ্ছা করেই তাঁর বাড়ি গিয়েছিলেন? জেনে বুঝে তাকে কার্ড দিয়ে এসেছিলেন যাতে সন্দেহের অবসান ঘটাতে তথাগত তাঁর বাড়িতে আসেন? আর ভনিতা না করে তথাগত প্রশ্ন করলেন, "আপনি সুস্মিতা মিত্র বলে কাউকে চেনেন? আসলে তাঁর চেহারার সাথে আপনার অদ্ভুত মিল।" রূপা হাসলেন, "সুস্মিতা সেন আমার মা। ডিভোর্সের পর উনি মিত্র পদবী পরিত্যাগ করে বিয়ের আগের সেন পদবীই ব্যবহার করতেন। আমিও তাই রূপা সেন, মায়ের পদবী অনুসারে"

তথাগত ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হলেও যথাসম্ভব ধীরে বললেন, "কিন্তু আমি যতদূর জানি সুতপার তো কোনো কন্যাসন্তান ছিল না। তিনি কি আবার বিয়ে করেছিলেন?" রূপা আবার হাসলো, এবারের হাসি  যেন দুঃখমিশ্রিত অথচ ব্যাঙ্গাত্বক, বললো, " না, তাঁর একটিই বিবাহ ও একটিই সন্তান। পুনর্বিবাহ আপনি করেছিলেন, মিস্টার মিত্র, তিনি করেন নি। তিনি সারাজীবন তাঁর সন্তানকে আগলে রেখেছেন আর মৃত্যুতেও তাঁর অবদান শেষ হয়ে যায় নি। আমি তাঁর রূপান্তরিত কন্যা রূপা, বিগত জীবনে ছিলাম রূপঙ্কর। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর জরায়ু আমাকে দান করে যান, যা আমার শরীরে প্রতিস্থাপিত হয়।  আমার শুক্রাণু নিয়ে ইন ভিট্রো ফারটিলাইজেশন করে আমার প্রতিস্থাপিত গর্ভে আমি আমার সন্তান ধারণ করি। আমার পূর্বাবস্থার নামের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে আমার ছেলের নাম রেখেছি শুভঙ্কর। আর কিছু জানতে চান?" না, তথাগত আর কিছু জানতে চান না। তাঁর আর রূপার মধ্যে পিতা-পুত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা বোধহয়  আর সম্ভব নয়। তাঁর বহুদিনের সংস্কার আর ধ্যান-ধারণার এক অদৃশ্য প্রাচীর যেন তাঁদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে; একমাত্র সময়ই বলতে পারে সে প্রাচীর কোনো দিন ভাঙা সম্ভব কি না।  "আসি" বলে তথাগত দরজার দিকে পা বাড়ালেন। যাবার আগে মনে হলো, আগে জানলে তিনি বাচ্ছাটার জন্য একটা চকোলেট অন্তত আনতেন। বেরোবার আগে শুভঙ্করের মাথায় হাত রাখলেন, তারপর তার চিবুক স্পর্শ করলেন; এই সেই রূপকথার রাজপুত্র যাকে তিনি বহু বছর আগে স্বপ্নে দেখেছিলেন। দেরিতে হলেও তাঁর স্বপ্ন আজ সফল হয়েছে। 

তথাগত বেরিয়ে যাবার পর শুভঙ্কর প্রশ্ন করলো, "মা, কে এসেছিলো?" রূপা বললো," উনি আমাদের একজন আত্মীয়, খুব কাছের লোক।" ছোট্ট শুভঙ্কর বোধহয় এই নতুন অতিথির প্রতি কিছুটা আকর্ষণ অনুভব করেছিল। তাই জিজ্ঞাসা করলো,"আবার আসবে আমাদের বাড়ি?" রূপার কাছে এর উত্তর নেই। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, "জানি না।" যে মানুষটা একতলায় যাবার জন্য রওনা দিলেন, তিনি যদি জানতেন মাঝের প্রাচীরটার ভিত আলগা হয়েছে, হয়তো তিনি আবার লিফটের বাটনটা সতেরো তলায় টিপে ফেরত আসতেন। কিন্তু কোনো পক্ষই প্রাচীরটাকে এক ধাক্কায় ভাঙতে পারলেন না, বলা ভালো চাইলেন না; যদি ভাঙা দেওয়ালের টুকরোগুলো আঘাত করে কাউকে! তার থেকে যেমন আছে থাক, যেমনি চলছিল চলুক। 


রূপা সেনের গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু সপ্তকাণ্ডের শেষ কাণ্ডের অবতারণা এমন একজনের জন্য যে না থাকলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো। ডক্টর কৌশিক বাসু একটা কনফারেন্সে দিল্লী এসেছিলেন। রূপার জীবনের রূপরেখা পরিবর্তনের কান্ডারী তিনি। কিছু কিছু বিশেষ রোগীদের সঙ্গে ডাক্তারদের অনেকদিন অবধি যোগাযোগ থাকে। কৌশিক দিল্লীতে এসে রূপার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলেন। রূপার এক্সক্লুসিভ কালেকশন থেকে কিছু পোশাক কিনে স্ত্রী জয়তিকে সারপ্রাইজ  উপহার দেওয়াই মনের উদ্দেশ্য। কৌশিক দিল্লী এসেছেন  জানতে পেরে রূপা তাঁকে বাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। অর্থাৎ কি না রথ দেখা- কলা বেচা দুটোই একসাথে হবে।

রূপার আত্মপ্রত্যয়, তার সাফল্য কৌশিককে গর্বিত করে। রূপাকে তার পছন্দের জীবন দেওয়ার পিছনে কৌশিকের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ! কৌশিক খুব মনোযোগ সহকারে পোশাক বাছাই করছিলেন। "না, না! এটা নয়, ওটা দেখি! জয়তি আবার খুব খুঁতখুঁতে, এতো জমকালো নয়! একটু লাইট কালার, অথচ বেশ গ্রেসফুল! হ্যাঁ হ্যাঁ! ওটা দেখান তো!" অনেক কষ্টে মনের মতো পোশাকের সন্ধান পেলেন কৌশিক। রূপা একটু হেসে বললেন, "আপনি কিন্তু খুব কেয়ারিং হাসব্যান্ড!" কৌশিকও জোরে হেসে উঠলেন, "ইয়েস, আই এম! যতই ব্যস্ত থাকি না কেন স্ত্রী এবং সংসারের খেয়াল রাখার চেষ্ঠা করি। ওর পছন্দ- অপছন্দগুলোকে গুরুত্ব দি।"

একটু থেমে কৌশিক বললেন, " আপনাকে বলেছিলাম না, আপনার কাঁটা-বিছানো পথে একদিন গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো থাকবে। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে আপনি সত্যিই স্বয়ংসম্পুর্ণা। আপনি অনেকের কাছেই উদাহরণস্বরূপ।" রাতে খাওয়া-দাওয়া করে কৌশিক চলে গেলো একরাশ প্রশংসা আর শুভেচ্ছায় তাকে ভরিয়ে দিয়ে। তার সম্পূর্ণ মানব হওয়ার চ্যালেঞ্জ সার্থক হওয়ার জন্য কোনো অভিনন্দনই না কি যথেষ্ঠ নয়। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রূপা বহুতল আবাসন থেকে কৌশিকের দ্রুত নিষ্ক্রমণ লক্ষ্য করছিলো। হাতে পোশাকের প্যাকেট, যেন কত তাড়াতাড়ি তার আদরিনী প্রেয়সীকে সেটি তুলে দিতে পারবে সে কথা ভেবে এই খুশির দৌড়। কৌশিক দ্রুত জন অরণ্যে  মিশে গেলো। 

সতের তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এক সম্পূর্ণা মানবী তার গতিপথের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, তার সম্পূর্ণতার মধ্যে কোথায় যেন এক অসম্পূর্ণতার হাহাকার! কেউ যদি কৌশিকের মতো তার পোশাক নির্বাচন করে দিতো! এমন করে তো সে আগে ভাবে নি কখনো! প্রেম ছাড়া জীবন সম্পূর্ণতা পায় কি না আগে ভেবে দেখে নি তো। তবে কি সে নিজের সাথে নিজের প্রেমে ক্লান্ত আজ? ভাবনায় ছেদ পড়লো কচি গলায় 'মা..আ..আ' ডাক শুনে। এই একটি মধুর স্বর তাকে সত্যি করে তোলে স্বয়ংসম্পূর্ণা।

শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়। কলকাতা