অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩০ মে, ২০২৪
ভালোবাসার সামার - শিরীন সাজি

শিলা বুঝতে পারেনা, কেনো ওর নিজের ভিতর এমন তোলপাড় হচ্ছে। ও তো জানতো এমন কিছুই হবে! তবু এতো অস্থির লাগছে কেনো? কেনো মনে হচ্ছে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। দম আটকে আসা অনুভবে ডুবে যাচ্ছে ও। ইজেলে ছবি আঁকতে গেলেই হয়ে যাচ্ছে থোকা থোকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে যেনো নিজের বুকের ভিতরের রক্তক্ষরণ! প্রায় ছয়মাস হলো দেশে ফিরেছে ও। ফিরেই চলে এসেছে ওদের খুলনার বাড়িতে। তালাবন্ধ ছিল বাড়ি। ধূলাবালি ঝেড়ে গোছাতে ভীষণ কষ্ট হয়েছে। মালির বউটা অনেক সাহায্য করেছে। শরীরের কষ্ট, মনের কষ্ট, সব মিলিয়ে এক অন্যরকম যুদ্ধ। একমাত্র মা থাকলে বুঝতেন ওর অবস্হা। আর একটা মানুষ নেই পৃথিবীতে যে ওকে বুঝতে পারে। পারবে কি কখনো? শিলা নিজে খুব সাধারন একজন মানুষ। সারাজীবন নিজের চেয়ে অন্যর কথাই ভেবেছে আর সেই ভাবনাতেই আজকের এই জীবন!

শরীরের ভিতরে এক ঝড় বইছে সারাক্ষণ! এত অস্বস্তি, এত কান্না আরো কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে কে জানে! কিছুতেই কী আর ভালো থাকা হবেনা ওর? চোখ বন্ধ করলেই কানের কাছে কান্নার শব্দ পায়! বাচ্চাদের কান্নার শব্দে কেমন এক সুরভি আছে। গভীর ঘুমে থাকলেও সেই কান্নার শব্দ তাকে জাগিয়ে দেয়। অজস্র বাচ্চার মধ্যে নিজের বাচ্চার কান্না আলাদা করে চেনা যায়! সে কান্নার কাছে পৌঁছে যায় ! আদরভরে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরতেই বাজপাখির মত ছোঁ মেরে নিয়ে যায় ওর বোন। ওর পেটে ধরা ওর বোনের সন্তান ! এই স্বপ্নটা প্রায়ই দেখে শিলা!

ভালোই জীবন চলছিল শিলার। ঢাকায় আর্ট কলেজে পড়া শেষ করে কেবল একটা ফার্মে ঢুকেছিল। হঠাৎ বাবা মায়ের সাথে কানাডা যেতে হলো। মেজোবোন নীলা স্পনসর করেছিল কয়েকবছর আগে। ও কিছুতেই নিজের ছবি আঁকার ক্যারিয়ার ছেড়ে যেতে চাইছিল না। বাবা মায়ের জোরেই যেতে বাধ্য হলো। বাবা মা মফস্বলের মানুষ। সারাজীবন হাইস্কুলে পড়িয়েছেন বাবা। মা সমাজ কর্মী।তিন মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। বড়বোন মালা সরকারী কলেজে পড়ায়, স্বামী প্রফেসর । চার ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখী জীবন। নীলা এমবিএ করে একটা প্রাইভেট ফার্ম এ কাজ করতো। পড়তে কানাডার আলবার্টায় যায়, সেখানেই একজনের সাথে প্রেম হয় এবং বিয়ে করে সেখানেই সংসার করছিল। আট বছর হয়েছে বিয়ের, তিনবার মিসক্যারেজ হয়ে গেছে, ভীষণ ডিপ্রেশন এ থাকে। বাবা মা আর শিলাকে নিয়ে যাচ্ছে ওকে সঙ্গ দেবার জন্য। সাসকাচুয়ানে পৌঁছানোর পর শীলার ভালোই লাগে। ছোট্ট ছিমছাম শহর। প্রায়ই হেঁটে হেঁটে শহর দেখে ও। নীলাকে দেখে খুব মায়া লাগে। অনেক শুকিয়েছে ও। মা সারাক্ষণ ওদের জন্য রান্না করে। ওরা যাবার পর বেশ খুশি নীলা। মাঝেমাঝে সবাই দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। নীলার স্বামীর নাম টনি ব্রাউন। ওর মা বাঙালী আর বাবা ক্যানাডিয়ান। বাংলা বেশ ভালো বোঝে। টুকটাক বলতেও পারে। মা শিখিয়েছিলেন। অসম্ভব আমুদে আর মিশুক সে। নীলাঅন্ত প্রাণ যাকে বলে! শিলা ঘরে বসে ছবি আঁকায় মন দেয়। কাজেও ঢোকে, একটা আর্ট গ্যালারিতে! পার্টটাইম কাজ, তবে ওর পছন্দের!

নীলারা নিয়মিত ডাক্তার এর কাছে যায়। ফেরার পর নীলার মুখের দিকে তাকানো যায় না। ওর রক্তের কোন এক জটিলতার কারণে ও কনসিভ করলেও শরীর বেবীকে রাখতে পারেনা। ডাক্তার সারোগেসি’র কথা বলেছে। কিন্তু এমন কাউকে পাবে কোথায়? মা একদিন শিলাকে বলে , ও রাজি কি না! সাত পাঁচ না ভেবে শুধু নীলার কথা ভেবে ও রাজি হয়ে যায়। এই নিয়ে অনলাইনে লেখাপড়া কারে। নিজের বোনের জন্য এ এমন কঠিন কী! নতুন প্রজন্মের মানুষ ও। একটা সম্পর্কে কষ্ট পাবার পর আর কারো সাথে জড়াবার কথা ভাবেনি শিলা। আরিয়ান ওর প্রিয় বান্ধবীকে বিয়ে করে তুমুল সংসার করছে! ওর কাছে নীলার আনন্দটা বড় মনে হয়! তিনমাস পেরিয়ে চারমাসে যেতেই শরীরের পরিবর্তন শুরু হয়। নিজের ভিতর একটা মানুষের অস্তিত্ব টের পেতে শুরু করে ও। সারাদিন কত বই পড়ে ও। ছবি আঁকতে গেলেই আঁকতে শুরু করে মানব জন্মের রহস্য! ওরা সবাই মিলে খুশি থাকে। আনন্দে ছলকায় নীলা আর টনি। শিলার যত্ন নেয় সবাই মিলে।

মানুষের কোন আনন্দ বোধ হয় বেশিদিন থাকেনা। সারা পৃথিবীতে শুরু হয় কোভিডের ভয়াবহ উন্মাদনা। কয়েকমাস ধরেই চলছিল। সারা পৃথিবীতে চলে এই যুদ্ধ। মাকে হাসপাতালে নিতে হয় হার্ট এর প্রবলেম এর জন্য, ওখানেই কোভিড হয়। কোনরকম দেখা হয়না কারো সাথে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাফনের ব্যবস্হা করে। ওদের মাকে হারিয়ে বাবা সহ ওরা সবাই ভীষণ ভেঙে পড়ে। ওরা সবাই গৃহবন্দী জীবন কাটায়। নীলা সারাক্ষন সবকিছু স্যানিটাইজ করে। শিলাকে কোথাও যেতে দেয়না। এ যেনো এক পাগলা গারদ। নিমেষেই সুখের জীবন পালটে এক বিভীষিকার জীবন পার করে ওরা সবাই। সবার মধ্যে একমাত্র টনিই সহজ। কোন সে ক্ষমতাবলে ও এখনো আগের মত হাসে। কথা বলে স্বাভাবিক ভাবে।

শিলার যখন ৩০ সপ্তাহ। আলট্রাসাউনড এর জন্য পাশের ছোট্ট এক শহরে যায় ওরা। ওই হাসপাতালে শুধু গাইনী রোগী ভর্তি করায়। ওখানে কোন কোভিড রোগী নেই। টনি আর শিলা যাবে। ওরা একজনের বেশি মানুষ সাথে যেতে দেবেনা। কোভিড টেস্ট করে তবেই ওদেরকে ভিতরে যেতে দিবে। শিলাকে হাসপাতালে নেবার পর, প্রেশার হাই থাকায়, বাচ্চার সেইফটির জন্য ওকে ভর্তি করে নেয়। একমাস টনি ওর সাথে থাকে। ওর যত্ন নেয়। শিলা দিনে দিনে এই টনিকে ভালোবেসে ফেলে। এ ভালোবাসায় চাওয়া নেই, পাওয়ার আকুতি নেই। একটা যত্নশীল মানুষকে দেখে, কথায় কথায় হাসতে থাকা মানুষটার প্রেমে পড়ে যায় শিলা। জানে এটা ঠিক না। তবু অনিয়মের বাঁধনে জড়ায় ও। একদম একপক্ষ ভালোবাসা। দিনরাত মানুষটা ওকে দেখে রাখে! নীলাকে ভিডিও কল করে সব দেখায়, জানায়। ভালোবাসার মানুষকে সুখী করার কি চেষ্টা! শিলা মুগ্ধ হয়ে যায়। শিলা আর টনি হাসপাতালের কোরিডর দিয়ে হাঁটে। ওরা সবাই সারাক্ষন মাস্ক পরে থাকে। টনি কোভিডের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কথা বলে। ওরা স্বপ্ন দেখে কোভিড মুক্ত পৃথিবী!

রাতেরবেলা একদিন ভীষন পিঠ ব্যথা হলে, ম্যাসাজ করে দেয়। কতবার বাচ্চার নড়াচড়া দেখে ওকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে! শিলার মনেহয় অন্য কথা! ও ওর ভিতরে বড় হওয়া সন্তানের কথা ভাবে। ভাবে ও যদি সারাজীবন এদের সাথে থাকতে পারে, থেকে যাবে। নিজের আলাদা জীবন না হয় নাই হলো। টনির মত অদ্ভুত একজন মানুষ দেখে ও। নিজের স্ত্রী, অনাগত সন্তান এমনকি সবার প্রতি কী ভীষণ কর্তব্যপরায়ণ। আগে ও ভাবতো সবাই বুঝি আরিয়ানের মত। সুযোগ সন্ধানী। ভাবতো ভালোবাসা বলে কিছু নাই। নাহ পৃথিবীতে ভালো মানুষও আছে। থাকে। ছেলে হবার দুই সপ্তাহ পর ওরা বাড়ি ফেরে। কোয়ারেনটাইন এর পর নীলা ছেলেকে দেখাশোনা শুরু করে। নীলার ডিপ্রেশন শিলার মধ্যে ঢুকতে শুরু করে! ডাক্তার টেলিফোনে খোঁজখবর নেন। ও ওর নির্ঘুম রাতের কথা বলে। মনের অশান্তির কথা বলে। ডাক্তার ওকে ডিপ্রেশনের ঔষধ দেয়। ঘুমের ঔষধ দেয়। নীলা কোভিড সময়ের বাড়তি পঁচিশ পাউন্ড ওজন কমিয়ে ফেলে তিনমাসেই আগের মত হয়ে যায়।

ছন্দ ভরা নীলার জীবন! শিলা আগের মতই ছিমছাম। বেবীর ওজন ছাড়া ওর তেমন ওজন বাড়েনি। ছেলের নাম ওরা রেখেছে সামার। ওদের ভালোবাসার সামার। বাচ্চাটা দেখতে নীলার মত। টনির মত শুধু গায়ের রং। বুকের মধ্যে প্রশান্তি পায় শিলা। মনেহয় মা বলছেন, তুই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বোন শিলা! বাবা অবশ্য মাঝেমাঝেই ওকে জীবন শুরু করার কথা ভাবতে বলে! শিলা সব জানতো তবু কোথা থেকে ঈর্ষা আসে। মনেহয় সবকিছু চেয়ে বসে। নীলাকে বলে দেয়, ও ভালোবেসে ফেলেছে টনিকে। এমন একটা অবাক করা ভালোমানুষকে ভালো না বেসে থাকা যায়না। ও বুঝতে পারে ওকে পালাতে হবে।ফিরে চলেও আসে একদিন! প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে শিলা দূরে চলে এসেছে ঠিকই। কিন্তু ভালোবাসা? বুকের মধ্যে অহর্নিশ থেকে যায় এই বোধ! সারাজীবনে ক’জনেই বা এমন ভালোবাসাকে এমন করে অনুভব করতে পারে? একটা ছবি আঁকার স্কুল করবে ভাবছে শিলা! নিজের ছবি আঁকাও চলছে। বিষয়, ভালোবাসার রং! ও জানে ভালোবাসাই পারে পৃথিবীকে সুন্দর করতে! আর পৃথিবীতে অবাক করা কত কিছু হয়, কে জানে শিলার জীবনে হয়তো অবাক সুন্দর অপেক্ষা করছে! প্রকৃতি মানুষকে ফেরায় না।

শিরীন সাজি
অটোয়া, কানাডা