অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
খিদে - বিমল মণ্ডল

১. 
রাতে চমকে উঠি  বিছানার দিকে চেয়ে
ছেলেমেয়েরা পাশ মেরে মাকে আছে ধরে
খিদের জ্বালায় ঘুম আসে না ছ'মাস ঘরে
সারারাত ধরে বৃষ্টি পড়ে ছাউনির ভেতর দিয়ে। 

ছেনি-হাতুড়ি, ঝুড়ি, কদাল বিশ্রামে বারান্দায়
কাদামাটি হেঁটে কত পথ খিদে নিয়ে যাই বুকে
আকাশের দিকে ঈশ্বরকে ডাকি থেকে থেকে
সারাদিন পরে ঘরে ফিরে শুনি গিন্নির কান্নায়। 

শাদা কাপড়ে মোড়া  উঠানে শুয়ে ছেলেটা
মুহূর্তে আগুন জ্বালাই  মরে যায় খিদেটা। 

২  
সারা গ্রাম মাথা তুলে
দু'হাত জড়ো করে 
খিদে কেটে কেটে প্রার্থনা
শরীরের গয়না খুলে খুলে পড়ে
প্রতিবারই অজানা হাওয়ায়
পুকুরের পাড়ে বসে 
খিদে জন্মান্তর ভুলে যায়।  


সময় গিলে খাচ্ছে মানুষ আর মানুষের খিদেকে
সারারাত উবু হয়ে বসে থাকে খিদে
তবুও মনে হয় কয়েকটি পাঁজর 
খসে পড়বে শূন্য চাঁদের উপর
তারপর 
সেইখানে   মৃত্যুর আগে 
কখনো মৃত্যুরপরে  
মাটি চিরে চিরে জেগে ওঠে খিদে 
শবেদের ধারাবাহিকতা।  


এইখানে মা শুয়েছিল। শীতলপাটি 
বিছানো খসখসে মাটির ঘরে
যেখানে জল থইথই উঠান জুড়ে
কচিকাঁচা হাত বাঁচার সুরে
প্রাণ ঝরে যায় নিবিড় মেঘমালায়
প্রতিকূল খিদে জলের জোয়ারে ভাসে
নিদ্রাহীন ভয় সমান্তরালে 
ডুব দিয়ে দিয়ে  খিদে মরে যায় 

মায়ের হৃদয় সমুদ্রে।      


একটা খালি থালা হাতে  নিয়ে শিশুটি
এখনো দাঁড়িয়ে
সে ও খিদে পাশাপাশি    
চোখের জল থালা ভরে 
কত আনন্দে খিদে ছুঁয়ে 
চুম্বনে সেই লবণ জল 

খিদের সরণীতে শিশুটির আঁকা
ভাঁঙ্গা ভাঙা খিদেলিপি ।       

৬.
বৃষ্টি এসে খারাপ করে  দিয়ে গেল মন
সকাল বৃষ্টি 
রোদের ছাউনিতে দু'একটা সংসারী কথা ভাসে
দুপুর   বৃষ্টি
দু'একটা মুখ তাকিয়ে সিঁদুরে রাঙানো পথে
বিকেল বৃষ্টি
খোলা আকাশের সমস্ত জানালা ও দরজা বন্ধ 
সন্ধ্যা বৃষ্টি
বৃষ্টির শব্দে  যে যার সেলে বসে
খিদের অনুভবে মানুষেরই অভিনন্দন।   

৭.
না খেয়ে খেয়ে 
আমি বোবা হয়ে গেছি। তুমি জানো। 
দু'মুঠো ভাত খুঁজতে খুঁজতে
আমি খোড়া হয়ে গেছি। তুমি জানো। 
আমি সাহস দেখাতে দেখাতে 
আমি অন্ধ হয়ে গেছি। তাও তুমি জানো

এভাবেই আমার সময়ে সব গেলে
আমার হাতে হাত ধরে না কেউ
এমনকি তুমিও না! 

স্তব্ধ হয় আমার পৃথিবী 
নিমেষে নেমে আসে আলকাতরার মতো অন্ধকার
তোমার গর্ভ স্থান থেকে উঠে আসে
জ্বালাময়ী খিদে।      

৮.
খিদে ছিলো বলে দুঃখের  পৃষ্ঠায়
রাগ, অভিমান, ভালোবাসার ভেতর   
দিন-রত  আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি
নিজেকে নিজের মধ্যে তুলে ধরতে 
কিন্তু সামনে পেছনে সর্বাংশে পাতাগুলো 
ভারী জোছনায় ডুবে যায় 
সেই চাঁদ বুড়ির সাথে

যতবার খুঁজি তাকে 
ততবারই পাতাগুলো ভাসে আমার সামনে
আমি তার প্রথম ও শেষ পাঠক।     

৯.
আজ সঙ্গম রাত
সংকল্প দীর্ঘায়িত জীবনের জন্য
পেতে রেখেছি অনন্য শাদা বিছানা
অপূর্ব শরীরী গন্ধে ডুবে যাই
নিবিড় অন্ধকারে 
দু'হাতে  ছুঁয়ে যাই বুকেরপরে 
স্তন থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে 
ভালোবাসার আগামী  আশা। 

১০.
খিদের হাত বাড়িয়ে আমি অনন্য আকাশ দেখতে পেলাম
কিছুক্ষণ তাকিয়ে আমি মজার হাসি হেসে
মুহূর্তে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম
আসলে আকাশ আর আমার দুরত্ব অনেকটা- 
আলোকবর্ষ

আমার চেরা চেরা হাতে সভ্যতার খিদে লেগে
তবুও চলেছে গণ বেগ
দিন ক্রমশ কালো হয়ে আসে 
প্রতিটি চোখে অন্ধকার জলপ্রপাত
আবারও আকুলতায়  দুহাত  ভরে
অসাধারণ ঘুঘুদের বিচরণ

বুকের ভেতর চিরস্থায়ী খিদে
এই সভ্যতার মাঝে 
চোখে বৃষ্টির সাদা জল ঝরে।    

বিমল মণ্ডল
কাঁথি, পূর্বমেদিনীপুর
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত