অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ঝরা পাতার গল্প - সাইফুল ভূঁইয়া

গেল শনিবার ছিল আমাদের অতিথিপনার দিন।  
সারাদিন ফুরফুরে ঠাণ্ডা বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর দিন। ভাবছি যাব ‘পয়েন্ট পিলী’ – যেখানে আছে সদ্যবাহিত বরফ যুগের স্মৃতিচিহ্ন। ভোর না হতেই মিল্টন ভাইকে একটা ফোন দিলাম আমাদের সঙ্গী হতে। কারন হচ্ছে উনারা এতো কাছে থেকেও দশ হাজার বছরের পুরনো এই হিমবাহের সৃষ্ট রূপ দেখার সময় করতে পারেন নি। কিন্তু সবই গুড়ে বালি – সংক্ষিপ্ত নোটিশের কারনে এবারো সুযোগ মিলেনি তাঁদের। শেষে আমরা একাই বের হলাম টরেন্টো থেকে আগত অতিথিদের নিয়ে। যাব ক্যানাডার সর্ব দক্ষিণ প্রান্তে, বহুবার গিয়েছি তবে এবারের যাওয়া একটু ব্যাতিক্রমি। হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাসে গাড়ী চালাচ্ছি আনমনে, গাড়ীতে বাজছে রুনা লায়লার বাংলা গান “মাঝি তুমি নাও বাইয়া যাও”। খুব দ্রুতই চলে এলাম লেক ইরীর কিংসভিল ফেরী টার্মিনালে। কিছু সময় ঘুরে বেড়ানো – হাজারো অভিবাসী পাখির ছবি তোলা – খুব ভাল লেগেছে এই রোদেলা হিমেল সকালটা। 

 

আবার শুরু লেকের পাশ ঘেঁষে ড্রাইভ করা। অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি - সারি সারি রেড ম্যাপল, সুগার ম্যাপল, সাওয়ার উড এবং ইয়েলু বার্চ এর বর্ণীল দৃশ্য দেখছি আর ড্রাইভ করছি। মাঝে মাঝেই চোখ পড়ছে দুপাশের ফলভরা আপেল বাগানে কিংবা সব্জীভরা গ্রীনহাউজ গুলোতে। আমরা এখন যাচ্ছি “ টমেটু ক্যাপিটেল অব ক্যানাডা” খ্যাত লেমিংটন শহরের উপর দিয়ে। এই শহরে রয়েছে হাজারো গ্রীনহাউজ, যাতে চাষ হয় ক্যপসিকাম, কিউকাম্বার, মাশরুম আর টমেটু। ক্যপসিকামের যেমন রয়েছে গ্রীন, রেড, ইয়েলু, অরেঞ্জসহ বহু জাত, তেমনি টমেটুরও রয়েছে চেরি টমেটু, হ্যাম-বারগার টমেটু ইত্যাদি বাহারি উচ্চ ফলনশীল জাত। অবাক ব্যপার এক একটি ক্যপসিকাম গাছ দশ থেকে বার ফুট লম্বা, ছোট্ট দুই/দুই ফোমের ভিত্তির উপর দাঁড়ানো, কোন মাটির ছোঁয়া নেই। টমেটুর গাছগুলোও বিশাল - কোন কোন টমেটু গাছ লম্বায় এক থেকে দেড়শ ফুট। এক গাছের সাথে অন্য গাছ আনুভূমিক ভাবে চেলি পাকানো। সারা বছরই এরা ফল দেয়, তিন মাস ফুল-ফল-পাতা নিয়ে বেঁচে থাকে আর এক মাস পাতাহীন শুধু কাণ্ড নিয়ে ঘুমোয়। প্রতিটি গাছের গোঁড়ায় খাবার দেয়া হয় চারটি ছেলাইনের পাইপ দিয়ে এবং খাবার হিসেবে দেয়া হয় ওজন ট্রিটমেন্ট করা বিশুদ্ধ রাসায়নিক জলীয় দ্রবন। আর সে গাছের দেয়া ফলই সযতনে বাজার থেকে কিনে আনি আমরা। যা বলছিলাম, ফল দেয়ার পর পরিমিত বিশ্রাম শেষে এই গাছগুলো ক্রমাগত বেড়ে উঠে স্বচ্ছ -প্লাস্টিকের ঘরে (গ্রীনহাউজে), প্রখর সূর্যের আলোতে। এদের মুল থাকে অতি স্বল্পকায় দুই-দুই-দুই আয়তাকার রক-ফোমের (যা সাধারনতঃ এদেশে ঘরের ইন্সুলেশনে ব্যবহৃত হয়) ভিতের উপর, সত্যিই এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। অতি আধুনিক এসব গ্রীনহাউজের পরিমিতি বোধ (আহার-বাতাস-আলো) নিয়ন্ত্রিত হয় কম্পিউটারে, যদিও গাছের পরিচর্য্যা করে মানুষ আর পরাগায়ন ঘটায় গ্রীনহাউজের ভিতরকার চাষকৃত মৌমাছিরা। 



দেখতে দেখতেই আমরা সী-ক্লিফ পার্কের পাশ ঘেঁষে চলে এলাম লেমিংটন পিলী আইল্যন্ড ফেরি ঘাটে। এখান থেকে টুরিস্ট সীপে পিলী আইল্যন্ড যেতে সময় লাগে দুই-আড়াই ঘন্টার মতো, যদিও দ্বিপটি স্বচ্ছ আবহাওয়ায় খুব সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। পয়েন্ট পিলী হচ্ছে ক্যানাডার মেইন ল্যন্ডের সর্ব দক্ষিন বিন্দু, আর পিলী আইল্যন্ড হচ্ছে ক্যানাডার অসংযুক্ত শেষ সীমানা। ঠাণ্ডা শুরু হওয়ায় এই ঘাটটি থেকে এখন ফেরি চলাচল করছে না। আমরা তাই এখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার চললাম পয়েন্ট পিলীর পথে। মিনিট বিশেকের মধ্যেই পৌঁছলাম পার্কের গেটে। রিসিপসনিস্ট জানাল ভিতরে চলাচলের জন্য ব্যবহৃত ষ্ট্রীট-কার এখন বন্ধ, কারন হয়তো সামার শেষ, ঠাণ্ডা চলে এসেছে। যাই হোক তাও গেট-পাস নিয়ে নিজ গাড়ীতেই চললাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, পাড়ি দিতে হবে সাত কিলোমিটার পথ। সে এক অপূর্ব দৃশ্য, সোজা লেকের ভিতর ডুকে গেছে রাস্তা। রাস্তার দুপাশে কিছুটা জায়গা জুড়ে বিশালকায় বৃক্ষরাজি এবং লতা- গুল্মের মেলা, তাঁর পরই পানি আর পানি। রাস্তায় ঝরা পাতার মর্মর শব্দ – দুইধারে লাল-সবুজ আর হলুদ-কমলা রঙের বিচ্ছুরন, বিধাতার সে কি অপরূপ রঙের বাহার। বহুবার এসেছি এখানে কিন্তু শীতের শুরুতে আসায় এবার দেখেছি এক অপূর্ব মিষ্টি রঙের খেলা- ঝরা পাতার মেলা।  



পয়েন্ট পিলীর সাত কিলোমিটারের এই নাতিদীর্ঘ টিপটি (লেজটি) কিভাবে সৃষ্টি হলো এ নিয়ে আছে সূদীর্ঘ ইতিকথা। কার্বন ডেটিং করে জানা যায়, এই লেজের সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর সর্বশেষ বরফ যুগের পরসমাপ্তির সাথে সাথেই – আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে। জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে হিমবাহের স্তুপ গলতে শুরু করে এবং সৃষ্টি হয় লেক ইরীর। হিমবাহের পরিক্রমনের গতিপথে সংযুক্ত স্থলভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েই এই খরগাকৃতি লেজের বহিঃপ্রকাশ। কালের বিবর্তনে এখানে জন্ম হয়েছে অসংখ্য দূর্লভ প্রজাতির গাছ, সৃষ্টি হয়েছে অগভীর জলাভুমি এবং এখানে আশ্রয় নিয়েছে রঙ্গীন কচ্ছপ, বিশহীন শাপ সহ বহু প্রজাতির জলজ প্রানী এবং অভিবাসী পাখ-পাখালী। পাখি প্রেমীরা এখানে আসে ক্যম্পিং করতে – মার্শ বোর্ডওয়াকের সুউচ্চ টাওয়ার থেকে শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে অবলোকন করে বিচিত্র প্রজাতির দুর্লভ পাখি। এখানকার অগভীর জলাধারে (মার্শে) রয়েছে জলের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠা বাতাবন। এর ভিতর দিয়ে চলে গেছে এক কিলোমিটার দির্ঘ্য ভাসমান কাঠের সাঁকো পথ। আমরা বেশ কিছুটা সময় কাটালাম এখানে। নৌকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যদিও এবার জলাধারে নৌকা ভ্রমণ সম্ভব হলো না।



আজকের এই দিনটি হিমেল হলেও মেঘমুক্ত সোনালী সূর্যের।  
আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি সারাদিন – ছবি তুলেছি পিলীর খরগাকৃতি টিপের। আমরা দেখেছি ইরি লেকের গহ্বরে ঢুঁকে যাওয়া পয়েন্ট পিলির শেষ-বিন্দু, রূপালী ঢেউয়ের তাণ্ডব আর অভিবাসী পাখিদের মাছ শিকারের মনোরম দৃশ্য। এবার পিলীর টিপ থেকে ফেরার পালা, বনের ভিতর দিয়ে পায়ে হাঁটতে হবে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা, তাঁর পরেই পাবলিক পার্কিং। শুরু হলো আবার ড্রাইভিং, পিলীর আঁকাবাঁকা সরু পথে। আমি প্রকৃতির অপার লীলা দেখছি আর আব্দুল করিমের বাউল গান শুনছি “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”। আমার কুটুম বলেঃ সাইফুল ভাই, ভয় হয় -গাড়ি চালান সাবধানে। আমি বলিঃ নৌকার মাঝি ভয় পায় মহিলা যাত্রীকে নৌকায় নিতে, আর আমি ভয় পাই নতুন গাড়ী-চালকদের গাড়িতে নিতে। বললামঃ ভয় নাই হিরু, গাড়ির চারদিকে সেন্সর লাগানো আছে। গাড়ী অফ রোড হওয়ার আগেই, কিম্বা কোন কিছুতে ধাক্কা দেয়ার আগে নিজে থেকেই শিশ বাজিয়ে থেমে যাবে। তারপরও রেহাই নেই – আহা! কি মায়া নিজের জীবনের, কি মায়া বউ বাচ্চার! কি আর করা, গাড়ী চলেছে কচ্ছপের গতিতে। তবে তাতে একটা লাভ অন্ততঃ হয়েছে, গাড়ি থেকে ছায়া ঢাকা পথের বর্নীল ছবি উঠানো হয়েছে অনেক।

দিন গড়িয়ে এখন বিকেল। 
পেটের খিদায় জীবন ত্রাহি ত্রাহি। খুঁজতে খুঁজতে কিংসভীলে এসে একটা ম্যকডোনাল্ডের দেখা পেলাম। কিন্তু সমস্যা বাচ্চারা – এরা এখন পুরো দস্তর ক্যানাডিয়ান- জাঙ্ক ফুড খাবে না এবং হালাল ছাড়াও খাবে না। তাই ওদের খাবার আর সেল ফোন দিয়ে রেখে আসতে হলো সাবওয়েতে, আমরা এলাম ম্যাকডোনাল্ডে ফিস এন্ড চিপস খেতে। খেলামও গোগ্রাসে। সবশেষে যখন বাসায় ফিরছি তখন গোধূলি বেলা, জননী সেজেছে গোলাপী সাজে। পড়ন্ত বেলায় গাড়ীতে বাঁজছে অবেলার হিন্দি গান “তেরে লিয়ে— হামহে জিয়ে - জ্বলতে রহিয়ে”। আমি ছাড়া গাড়ীতে থাকা আর সবাই মোটামুটি এই গানের খুবই ভক্ত। আমি হিন্দি বুঝিনা, বলতেও পারিনা, তাই আনিহা একটু। কিন্তু সবাই সুর মিলাচ্ছে বলে আমারও এখন বেশ ভাল লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে শিশ দিতে দিতে আমিও একাকি হেঁটে বেড়াই লেক ইরীর পাশ ঘেঁষে - 
শুধু আমি, শুধু একা, আর একটা নির্জন পৃথিবী।

সাইফুল ভূঁইয়া 
উইন্ডসর, কানাডা 

 Saifulbh00@gmail.com