অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
একটি অলীক গল্প -রহমতুজ্জামান রানা


-তোর কি মেয়ে পছন্দ হইছে?
-হু।
-হু কি, ভালো না লাগলে বল, আমরা তবে আর কথা বলবো না। সময় নিবো তাহলেই ওরা বুঝে নিবে।
-সময় নেয়া মানেই তবে “না” বুঝায়?
-হুম, এসব ক্ষেত্রে সময় নেয়াটা তাই বুঝায়।
-ও আচ্ছা।
-তুই কেশে কথা বলছিস না কেন? ইয়েস নো কিছু একটা পরিষ্কার করে বল।
-বলছি এক কাপ চা দাও।
-চা পরে দিচ্ছি কথা ঘুরাবি না। নিশা’র মামা ফোন করেছিল, এই যুগের ছেলেমেয়ে দরকার হলে তোরা আলাদাভাবে কথা বল। পরশু দু’জনে একসাথে কোথাও গিয়ে ঘুরাফেরা কর, খাওয়া-দাওয়া কর, তারপর ডিসিশন নে।
-হুম, এখন যাও চা নিয়ে আসো, চিনি দিয়ো না।

বারান্দায় বসে চা’য়ে চুমুক দিতে দিতে আপনমনে ডুব দেয় সাফি- কি অদ্ভুত ব্যাপার! আজকেই একটা মেয়ের সাথে প্রথম দেখা হল, ঘরোয়া পরিবেশে কথাবার্তা, ১৫ মিনিট দুজনকে আলাদা করে দেয়া হল, ব্যাস এইটুকুই! এখন বলে দিতে হবে মেয়ে পছন্দ হয়েছে কিনা? বিয়ে এখানেই করবে কিনা? একজন মানুষের সাথে অর্ধেক জীবন কাঁটাতে হবে, যার নামটা কিনা বেটার হাফ  নামে মনে সেভ করতে হবে, সেই মানুষটিকে জানার জন্য সময় মাত্র ১৫ মিনিট! শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা লাইন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে- এক ছাদের নিচে থাকলেই ভালোবাসা তৈরি হবে কিনা বলা যায় না, যেটা হয় সেটা হচ্ছে মায়া, বাকিটা জীবন ঐ মায়ার মোহেই কাটিয়ে দিতে হয় সেখানে ভালোবাসা আছে কি নেই তা খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক।

সবচেয়ে বড় এবং ক্র্যুয়েল ব্যাপার হল, মেয়েটার বাহ্যিক সৌন্দর্য বিচার করতে যাওয়া। মেয়েটার দুটি হাত আছে, পা আছে, চোখ আছে, গাঁয়ের রং ফর্সা। এটা সেটা খুঁটিয়ে দেখার পর বলতে হবে- হ্যাঁ পছন্দ হয়েছে বা হয়নি। আর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বলতে গেলে তো উত্তর একটাই- মেয়ে উচ্চ শিক্ষিত সুতরাং বুদ্ধিমতীও হবে। বৃষ্টি রাতে কেউ কাঁথা জড়িয়ে ঘুমায় কেউবা আবার রাতভর বৃষ্টি দেখার আয়োজন করে, পার্থক্যগুলো তো এভাবেই মানুষকে আলাদা করে। সৌন্দর্য নিজ থেকেই মনে ভিত গড়ে, তথাকথিত উচ্চশিক্ষার বইয়ের ভিতর বলে দেয়া থাকে না কখন কি করতে হবে? সৌন্দর্য ধারণ করতে হয়, এটা গাঁয়ের রঙে মিশে থাকে না কিংবা উচ্চডিগ্রীর ভিতরেও লুকায়িত থাকে না।  

অনেক কথা জমে আছে, অনেক কথা জানবার ছিল। কথা বলা দরকার, কি করবে ফোন দিবে? নম্বর তো জানা নেই, নম্বর নিতে হলে ফুফুকে আবার ডাকতে হবে। ভিজিটিং কার্ড তো মেয়েটার কাছে দিয়ে এসেছে, কিছু বলার বা জানবার থাকলে মেয়েটাও তো ফোন দিতে পারে।

সাফি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা কেমন দেখল মেয়েটাকে? সন্দেহ নেই মেয়েটা সাঁজতে জানে, সাঁজতে পারাটাও তো একধরনের আর্ট আর সবাইকে তো সবকিছু স্যুট করে না, হুম আপাতদৃষ্টিতে রুচিশীল, পরিপাটি মনে হয়েছে। সময় নিয়ে সেজেছে যেহেতু তারমানে খুশিমনেই সেজেছে মনে দ্বিধা রাখেনি বা পিছুটান নেই হয়তো।

-ওই সাফি তোর ফোন বাজছে কখন থেকে ধরিস না কেন?
-ওহ, ফোনটা দাও সাথে আরেক কাপ চা দিও।
-হ্যালো, সাফি বলছি।
-জী নিশা বলছি।
-ও হ্যাঁ, ভালো আছেন?
-জী।
-তারপর?
-তারপর?
-জী অনেক কথা হল, পরশু তবে দেখা হচ্ছে। ভালো থাকবেন। গুড নাইট।  


সকালে কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে যদি কাক ভেজা হয়ে বিশেষ কারও সাথে দেখা করতে হয় তখন বৃষ্টির দেখে আর কাব্য আসে না, বিরক্তি আসে। বনানীর রেস্টুরেন্ট খুঁজে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল।
বাহ! মেয়েটাকে শাড়িতে বেশ লাগছে।
-সরি, বৃষ্টিতে সিএনজি পেতে সমস্যা হচ্ছিল। আপনি কতক্ষণ হল এসেছেন?
-বেশিক্ষণ হয়নি জ্যামে বসেছিলাম।
-যাক তবে, অর্ডার করেছেন কিছু?
-নাহ করিনি।
-আমার এখানটায় আসা হয়নি আগে, ওদের স্পেশাল কিছু জানা থাকলে অর্ডার করতে পারেন, আমি সর্বভুক।
-তেলাপোকা, হা হা।
-শেষমেশ তেলাপোকা! ভয় পান না?
-হুম পাই তো।
-ম্যানেজার রুচিশীল মানুষ, বৃষ্টির গান চলছে। অথচ একটু আগেই বৃষ্টি’কে শাপান্ত করছিলাম এখন আর মন্দ লাগছে না। বৃষ্টিতে কি পছন্দ করেন রবিন্দ্রনাথ, অঞ্জন দত্ত নাকি ব্যান্ড বা ওয়েস্টার্ন কিছু?
-সবই শোনা হয়। বৃষ্টি ব্যাপারটাই সুন্দর।
-হুম মিউজিক হেস নো ল্যাঙ্গুয়েজ। .   
-মিউজিক শুধুই শোনেন নাকি করেনও?
-নাহ গিটারটা শেখা হয়নি তাই শুনেই তৃপ্ত থাকতে হয়। আপনি?
-নাহ, তবে ঝুম বৃষ্টিরও একটা রিদম আছে না চাইলেও অস্ফুট ভাবে বের হয়ে আসে।
-হুম প্রকৃতির সবক্ষণেই কিছু নিজস্ব রিদম আছে। দিনের কোন সময়টা ভালো লাগে?
-রাত, আপনার?
-রাত তো অবশ্যই, রাতের সবই সুন্দর, চুপচাপ চারিদিক হঠাৎ পাখির ডাক কিংবা জোছনার বৃষ্টি আর রাত শেষ হয়ে এলে ভোরের দিকে কেমন যেন স্নিগ্ধতা কাজ করে রাত্রি জাগার ক্লান্তি মোটেই আচ্ছন্ন করে না।  
-আপনি তো মনে হচ্ছে নিশাচর! 
-উম্ বলতে পারেন।
-তবে দুপুরেরও কিন্তু সৌন্দর্য আছে, এই যেমন শরতের দুপুরগুলো কিন্তু সুন্দর হয়।
- সেটা ঠিক।

 

রাত ৯ টা, তুহিন ফোন দিয়ে গেছে সারাদিন। 

-কিরে সাফি তুই তো ফোনই ধরছিস না,  কি করলি সারাদিন? 
-এইতো রেস্টুরেন্টে বসলাম তারপর রমনার ওদিকটায় হাঁটলাম কিছুক্ষণ তারপর বাসায় পৌঁছে দিলাম।
-সাবাস মামা, আর কিছু?
-ধ্যাৎ মাইর খাবি কিন্তু! 
-ওকে এইবার আর গরিমসি করিস না রাজি হয়ে যা। বাসায় কি বলে?
-টেবিলে খাবার দিয়েছে খেতে খেতে কথা হবে দেখি কি বলেন উনারা।
___  

সাফি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দাড়িয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা হল। বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে রাত ৯ টা বাজতে চললো প্রায়। ফোনটা বাজতেই চোখ চিকচিক করে উঠে, নাহ! নিশাদের পাশের বাসা থেকে বড় ফুপুর ফোন।
-হ্যালো কই তুই?
-জী আমি বাইরে আছি রাস্তায়।
-বাসা থেকে বার বার ট্রাই করছে ফোন ধরছিস না কেন?
-মিটিং এ ছিলাম, এরপর তো রাস্তায়।
-শোন একটা খারাপ খবর আছে।
-হুম বল?
-নিশাকে সন্ধ্যায় দেখলাম বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, ৯ টা বাজে এখনও ফিরেনি, আমার তো ভাবগতিক সুবিধে লাগছে না।
-হুম।
-আজকে মেয়ের আংটি পরানো হবে অথচ মেয়ে বাসায় নেই আর তুই বলছিস, হুম। 
-কি বলবো?
-কি বলবো মানে তাড়াতাড়ি বাসায় আয় আর শুনলাম তুই নাকি সকালে কাঁধব্যাগ নিয়ে বের হইছিস? ছেলের আজকে এনগেজমেণ্ট অথচ উনি ব্যাগ টানাটানি করে? 
-অফিসের কাগজ ছিল অনেক। 
-হুম বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হ, ভাই আর বড় জামাইকে নিয়ে তাড়াতাড়ি এইদিকে চলে আয়, আমি নিশা’দের বাসায় ওদিকটায় খোঁজ নিচ্ছি। আমি ঐ মেয়েকে আমি চিনি, টেনশনের কিছু নাই, দূরে কোথাও যায়নি চলে আসবে।   
-হুম রাখি। 

বড় ফুপুর সাথে কথা শেষ করতেই দেখতে পেল নিশা আসছে।
-একটু লেট করে ফেললাম।
-নাহ ঠিক আছে, এখনও বাসের লোক আসেনি তেমন। আপনি চা বা কফি কিছু নিবেন?
-চা ঠিক আছে।
-ওকে দেখছি।  

বাস ছাড়লো প্রায় আধ ঘণ্টা, নিশাকে খানিকটা চিন্তিত দেখাচ্ছে, চিন্তাগুলো পাশে সরিয়ে রাখতেই হয়তো সিডনি শিল্ডনের বইটা পড়ছে। অবশ্য চিন্তা হবারই কথা, যেখানে আজ তাঁর এনগেজমেণ্ট অনুষ্ঠানে থাকার কথা ছিল অথচ মাত্র দুই দিনের পরিচয়ে একটা ছেলের সাথে একা বের হয়েছে। গোটা প্ল্যানটা সাফির মাথা থেকেই এসেছে, প্রথমে নিশাকে বলতে অবশ্য বেশ সংকোচ হচ্ছিল। মনের ভিতর পুষে রাখা অনেকদিনের ভাবনাগুলো খুলে বলতেই রাজি হয়ে গেল। আসলে, গোটা ব্যাপারটার যদি একটা সহজ ছক আঁকা যায় তবে এতে ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি- ধরা যা্‌ক, সামনের দুই দিন ট্যুরে এমন কিছু বিষয় উঠে আসলো যা হয়তো ভবিষ্যতে ভোগান্তি বাড়াতে পারতো আর যদি সেটা নায়ই হয় তবে তো চিন্তার কিছু নেই ট্যুর হতে ফিরে বাসায় সব খুলে বললো। যাই হোক জীবনটা তো নিছক জুয়ার আসর নয় যে বিয়ের মত বড় অংকের বাজি অচেনা কারও সাথে একদম না জেনেই ধরে বসবে।

বাসে উঠেই জড়তা কাটানোর জন্য ট্যুরের কিছু শর্ত ঠিক করে নেয়া হল- আলাদা হোটেল, পরিচিত হিসেবে বা ভবিতব্য সম্পর্কের প্রতি সমীহ নয় বরং ভালো লাগা খারাপ লাগা সব ব্যাপার অকপটে বলে ফেলতে হবে এরকম আরও বেশ কিছু। কথার পিঠে কথা গড়িয়ে চলছে- দর্শন, মুভি, সাহিত্য, গান, বন্ধু বান্ধব... কথা যেন ফুরচ্ছে না।   
রাত প্রায় তিনটা, চাঁদটা যেন বাসের সাথে প্রায় তাল মিলিয়ে চলেছে। জানালার পাশে প্রিয় সীটটা একটা  অচেনা মেয়ে দখল করে ঘুমাচ্ছে, মেয়েটার চুল উড়ে বার বার ওর মুখে এসে পড়ছে, কেমন কাকতালীয় হয়ে গেল না, মেয়েটা কি জানে এই দৃশ্যটা তাঁর মনে অনেক আগে থেকেই আঁকা ছিল? নাহ জানে না জানবার কথা নয়, এমন আরও অজস্র মুহূর্ত রয়েছে কল্পনায়। মনের কল্পনায় দাপিয়ে বেড়ানো সেই মুখটিকে খুঁজে পেতেই তো এতো আয়োজন। চোখটা কেমন বুজে আসছে...  সারা রাত জোছনা বৃষ্টিতে ভিজে এখন সূর্য উদয় দেখবে। পকেটে রাখা আংটিটায় আরেকবার হাত বুলায় সাফি।পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন সিনেমার মত হয়ে যাচ্ছে- যার সাথে গাঁটছাড়া বাধার কথা তাকে নিয়েই পালিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। কোন নাটক বা গল্পের কপি হয়ে যাচ্ছে নাকি, এমনটা কি কোথাও আগে পড়েছিল বা দেখেছিল? ধুর! হলেই বা কি গল্প, সিনেমা তো জীবন থেকেই নেয়া।    

 

রহমতুজ্জামান রানা