অটোয়া, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০
হুমায়ূন আহমেদ'র ভূতের গল্প - হামীম রায়হান

     বাংলা সাহিত্য যদি একটি গাছ হয় তবে গাছের সবচেয়ে মোটা ও ফলদায়ক শাখাটি রবীন্দ্রনাথ হবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখনি দিয়ে বাংলাকে সারা পৃথিবীর কাছে নিয়ে গেছেন। তিনি যুগ জয়ী লেখক। রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে আরো অনেক কবি, লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। সে হিসাবে আমরা নাম নিতে পারি, শরৎচন্দ্র,  বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের মত নাম করা অজস্র লেখক। তাঁরা সকলেই বাংলা সাহিত্যকে ফুলে ফলে ভরিয়ে দিয়ে গেছেন।
     শরৎচন্দ্রকে বলা হয় অপরাজেয় কথাশিল্পী। শরৎচন্দ্রের পর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় যে লেখক তিনি হুমায়ূন আহমেদ বলে অনেক বিজ্ঞজন মত দিয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের যে নতুন পথচলা শুরু হয়েছিলো তার অগ্রপথিক হিসেবে ধরা যায় হুমায়ূন আহমেদকে। তিনি হেঁটে হেঁটে এক নতুন পথের সৃষ্টি করেছেন। ক্ষুধা, দারিদ্র্যগ্রস্থ সমাজকে বই পড়া শিখিয়েছিলেন। 
     খুব লেখকই তাঁদের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে বাজিমাত করতে পারেন। হুমায়ূন আহমেদ সেই কম লেখকদের মধ্যে একজন, যিনি প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরকে' প্রকাশের পর পরই পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। এরপর তিনি আর থেমে থাকেননি। দু'হাতে লিখেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। বাংলাদেশের বই প্রকাশনা জগতে যে দুর্দিন চলছিল, তিনি সেই বিপদ দূর করলেন। প্রকাশকরা তাঁর বাসায় গিয়ে বসে থাকতেন একটি নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি পাওয়ার আশায়। 
     হুমায়ূন আহমেদ যদিও উপন্যাসিক হিসেবেই অধিক পাঠক প্রিয় ছিলেন তবে তিনি ছোটদের জন্যও অনেক গল্প, উপন্যাস লিখেছেন। ছোটদের জন্য লিখিত লেখাগুলো পড়লে এক অন্য হুমায়ূনকে আবিষ্কার করি যেন আমরা। তাঁর লেখায় আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের চিত্র যেন সুন্দরভাবে ফুটে উঠে, ঠিক ছোটদের মনের অনেক চাওয়া পাওয়ারও হদিস মিলে।
     আজ আমরা ছোটদের জন্য তাঁর লেখা কিছু গল্প নিয়ে তাঁকে খুঁজার চেষ্টা করব। 'অনন্যা' প্রকাশনা থেকে তাঁর একটি ছোটদের গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়। বইটির ভূমিকায় লেখক লিখলেন 'খুব অবাক হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করেছি বাচ্চাদের জন্য এত লেখা কখন লিখলাম?' সত্যিই, তিনি বাচ্চাদের জন্য অসংখ্য লেখা রেখেগেছেন। সংকলনটিতে ১৮টি ছোট বড় গল্প রয়েছে। শিশুদের মন উপযোগী গল্পগুলো সহজেই সব বয়সী পাঠকের হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে। সংকলনটির অধিকাংশ গল্পই ভূত বা পরী সম্পর্কিত। হুমায়ূন আহমেদ ভূত বিষয়ে গল্প লিখতে পছন্দ করতেন। হয়ত বিশ্বাসও করতেন। তবে এটা কতটুকু সত্যি তার প্রমাণ নাই। কিন্তু এটা সত্য যে গাজীপুরে অবস্থিত নুহাশ পল্লীতে অনেকেই অদ্ভুত সব কাণ্ড হতে দেখেছে। হুমায়ুন আহমেদ নিজেও এসব দেখেছেন। ভূত বিষায়ক গল্পগুলো সব বয়সী পাঠকের পছন্দ তাই এগুলোকে শুধুমাত্র শিশুদের জন্য রচিত এমন বলা যায় না। তাছাড়া তিনি ভূতের গল্পগুলোকে ভয়ের গল্প করে নয়, ভয়ংকর করে নয়, মজার করে লিখেছেন। ফলে লেখাগুলো পাঠে মনে হয়, এমনটা যদি আমার সাথে হতো! এ সংকলনের কিছু ভূতের গল্প নিয়ে আজ আলোচনা করব।
     গল্প সংকলনটির প্রথম গল্প 'তিনি ও সে'। অদ্ভুত একটি গল্প। মনসুর সাহেব একটি ক্লিয়ারিং হাউজে চাকরি করেন। বড় হন একটি এতিমখানায়। সেখান থেকে লেখাপড়া করেন। ভালোভাবেই এসএসসি, আই এ পাস করেন। কোন আত্মীয় স্বজন নেই তার। একা একাই থাকেন। তার জন্য মনে কোন দুঃখ নাই। অফিস শেষে গিয়ে বসেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি বেঞ্চে। সেখানে তিনি প্রকৃতির রূপ উপভোগ করেন। একদিন গরমে তিনি তার পাঞ্জাবি খুলে বেঞ্চে ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ তার পাঞ্জাবি কে যেন চুরি করে নিয়ে যায়। হতাশ মনে বাসা ফেরার পথে তিনি পাঞ্জাবি চোরকে পেয়ে যান। সে চোর একটা ছোট মেয়ে। মেয়েটির মায়াময় চেহারা দেখে মনসুর সাহেব কোন বড় কথা বলতে পারে না। কথায় কথায় মেয়েটি বলে সে পরীর মেয়ে। মনসুর সাহেব তার কথা বিশ্বাস করল না। ভাবল মেয়েটি মিথ্যা বলছে। যখনি পাঞ্জাবিটা মেয়েটির গা থেকে খুলে নিতে গেল তখনি অবাক হয়ে যান। একজোড়া ময়ূরের পেখমের মত পাকা মেয়েটির পিঠে। মেয়েটি তার মা পরীর সাথে চলে যায়। আর অবাক হয়ে তাদের দেখেন মনসুর সাহেব। তিনি এ ঘটনা কাউকে বলেন না। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। তারপরও তিনি প্রায় ঐ পার্কে গিয়ে গভীর রাত অবধি মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করেন। পকেটে চকলেট, কেক, চুইংগাম ইত্যাদি রাখেন ছোট পরীটিকে দিতে। অদ্ভুত একটি গল্প। একজন একাকী ব্যক্তি হয়ত নিজের অজান্তেই আপনজনের খোঁজ করে। কারণ মানুষ যে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে। গল্পের শেষ লাইনটি এমন 'তার খুব শখ মেয়েটিকে সামনে বসিয়ে কিছু খাওয়ানো। তার চুলে হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ আদর করা।'
     'বোকাভূ' গল্পটি বেশ মজার। ভূত নিয়ে শিশুদের মধ্যে কমবেশি আগ্রহ থাকে। আমরা অনেকবারই শুনেছি ভূতের বাচ্চারা আমাদের মত রূপ ধরে আমাদের স্কুলে পড়াশোনা করে। ভূতের বাচ্চারা মারামারি, কামড়াকামড়ি করবে এটাই তাদের স্বভাব। এক ভূতের বাচ্চা তা করে না। তার নাকি এসব করতে ভালো লাগে না। সে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে চায়, পরিষ্কার পানিতে গোসল করতে চায়, পরিষ্কার কাপড় পড়তে চায়, মানুষের মত স্কুলে পড়তে চায়। এ কারণে তার বাবার অনেক চিন্তা। ছেলের এ রোগ সারানোর জন্য এক ভূত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। সব শুনে তিনি পরামর্শ দেন তাকে মানুষের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। মানুষের সাথে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে আবার সে ফিরে আসবে। ভূতের বাবা বোকাভূকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। মানুষের বাচ্চার মতই সে স্কুলে যায় । এ গল্পটি পড়ে শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। আমরাও ভাবতাম হয়ত আমাদের সাথে কোন ভূত বাচ্চা লেখাপড়া করে কিন্তু তাকে আমরা চিনি না।
     শিশুতোষ গল্পে যে সবসময় শিশু চরিত্র থাকতে হবে এমনটা নয়। হুমায়ূন আহমেদ অসংখ্য ভূতের গল্প লিখেছেন। বেশ মজার সেসব গল্প। ভূত বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদের হয়ত কোন দূর্বলতা ছিল। তেমনি আরেকটি গল্প 'রুঁরুঁর গল্প'। লেখক চিটাগাং মেইল ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছেন। তার পাশে এক যাত্রী আসেন নাম মোবারক। তিনিও চট্টগ্রাম যাবেন। উদ্দেশ্য দোহাজারিতে অবস্থিত দু'শ বছরের একটা পুরনো বাড়িতে যাওয়া। ভূতের খোঁজে। মোবারক সাহেবের সাথে একটা ভূতের বাচ্চা থাকে। তার নাম রুঁরুঁ। সে তার বাবা মার সাথে ঢাকা শহর দেখতে আসে। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে গুলিস্থানে এলে মানুষের মারামারি দেখে তার বাবা মাকে হারিয়ে ফেলে। তারপর থেকে সে মোবারক সাহেবের সাথে থাকে। রুঁরুঁকে তার বাবা মার কাছে ফিরিয়ে দিতেই তিনি বিভিন্ন জায়গায় ভূতের সন্ধান করেন। গল্পের একদম শেষে লেখক বুঝতে পারেন মোবারক সাহেব পাগল কিন্তু সে নিজেকে পাগল ভাবে না। চমৎকার কিছু ঘটনা নিয়ে গল্পটির বিষয় এগিয়ে যায়। গল্পটি সব বয়সী পাঠকের মনোরঞ্জন করবে।                   
     শৈশবে লেখাপড়া বড়ই পীড়াদায়ক! বিশেষকরে অংক, ইংরেজি যেন যমদূত! তখন ভাবতাম এমন কোন মন্ত্র যদি থাকত যেটা পড়লেই অংক সহজ হয়ে যাবে! এমনি একটি বিষয়ের গল্প 'ভূতের মন্ত্র' গল্পটি। বাবলুর বাবা মা তাকে বাসায় রেখে ভৈরবে খালার বাড়ি বেড়াতে যায়। বাবলুর যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তাকে নেওয়া হয় না। বাড়ির কাজ হিসেবে বিশটা অংক করতে দেয় বাবা। কঠিন অনকগুলো সে করছিল। কাজের বুয়া এসে তাকে এক গ্লাস দুধ দেয়। দুধও তার পছন্দ নয়। এমন সময় একটা ছেড়া কাপড় পরা দুষ্ট দুষ্ট চেহেরার  ছেলে বাবলুদের দরজায় খট খট শব্দ করে। বাবলু ছেলেটিকে চিনতে পারেনা। তারপরও ছেলেটি বাবলুকে তুই তুকারি করে ডাকে। খেলতে বলে। বাবলু রাজি হয় না। দুধ ভর্তি গ্লাস দেখে সে একটা মন্ত্র পড়ে বলে দুধ পেপসি হয়ে যাবে। কিন্তু হয় না। এতে বাবলু আরো রেগে যায়। সে বাবলুকে বলে অংক সহজ করার মন্ত্র লিখে নেয়ার জন্য। কিন্তু বাবলু তাকে চলে যেতে বলে। সে নিজেকে ভূতের রাজার ছেলে বলে চলে যায়। যখন বাবলু দুধটুকু খেতে চুমুক দিল, তখন সে অবাক হয়ে যায়! এতো দুধ নয়, পেপসি। দরজা খুলে ছেলেটিকে খুঁজতে যায় কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায় না।
     এক ছোট্ট মেয়ে মৌ আর এক ডাইনী বুড়ির মজার গল্প আছে 'কানী ডাইনী' গল্পটিতে। মৌর গল্প শুনতে খুব ভালো লাগে। মা তাকে সবসময় গল্প শোনায়। কিন্তু সবসময় তো আর গল্প শোনানো যায় না। তাই একদিন মৌ খুব রাগ করে গল্প না শোনানোতে। সে ঘর ছেড়ে চলে যায় ঐ দূর কটক পাহাড়ে। যেখানে কানী ডাইনী থাকে। কেউ ভয়ে ঐ পাহাড়ে যায় না। এদিকে কানী ডাইনীর অনেক বয়স হয়েগেছে। মন্ত্রগুলো আর আগের মত মনে নাই। উল্টা পাল্টা মন্ত্র পড়ে। এতে কাজ হয় না। না খেয়ে মরার অবস্থা কানী ডাইনীর। মৌ সেই ডাইনীর কাছে যায়। ডাইনীর সাথে তার কথা হয়। ডাইনীকে সে পানি খাইয়ে বাঁচায়। ডাইনী মৌকে একটা গল্প শুনায়। সে গল্প মৌর পছন্দ হলে ডাইনীকে মৌর সাথে যেতে বলে। ডাইনী ভাবে এখানে না খেয়ে মরার চেয়ে মেয়েটির সাথে যাওয়াই ভাল। ডাইনী মৌর সাথে তাদের গ্রামে চলে আসে। সন্ধ্যায় সব ছেলেমেয়েদেরকে গল্প শুনায়। ছেলেমেয়েরা ডাইনীকে আর ভয় পাইনা।   
     আরেকটি মজার গল্প দিয়ে এবারের লেখা শেষ করব। আচ্ছা যদি কারো হাতে আলাদীনের সেই যাদুর চেরাগ পেয়ে যায় তাহলে কী হবে? তেমনি একটা ঘটনা ঘটে বাবলুর সাথে। তাদের বাড়িতে আলাদীনের চেরাগটা পড়ে ছিল। বাবলু সেটায় ঘষা দিতেই বেরিয়ে আসে সেই দৈত্য। কিন্তু বাবলু কোনভাবেই বিশ্বাস করতে চাই না যে এটাই সেই দৈত্য। বাবলুদের বাসায় কেউ নাই। তার বাবা মা চাকরিতে গেছে। তাই সে দৈত্যকে ঘরে এনে টিভি দেখায়। টিভি দেখেতো দৈত্য অবাক। আরে এ তো যাদুর আয়না! ডিভিডিতে আলাদীনের ছবি দেখে দৈত্য আরো অবাক হয়! পাখা, বিদ্যুৎ, লাইট ইত্যাদি দেখতে দেখতে দৈত্য ভয় পেয়ে যায়! দৈত্যের চেয়েও বেশি যাদু যে এখন বাবলুদের হাতে! দৈত্য সেই চেরাগে চলে যায়। আর সময় করে বাবলুর কাছ থেকে অংক, ইংরেজি, ভূগোল ইত্যাদি শিখে। কারণ সে বুঝেছে এগুলোই নতুন দিনের যাদু শেখার মন্ত্র।  
     এভাবেই হুমায়ুন আহমেদ রচনা করেছেন মজার মজার সব গল্প। সেসব গল্পের আড়ালে তিনি আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করেছেন। ভূত নিয়ে শিশুরা যে ভয়ের গল্প শুনতো, সেই ধারা থেকে তিনি বেরিয়ে এসে ভূতকে মজারভাবে লিখেছেন। পড়ে মনে হবে ভূততো কোন ভয়ের বিষয় নয়, এমন মজার ভূত থাকলেইতো ভালো। 
     হুমায়ুন আহমেদ বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়েছেন তার জন্য তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। কখনো হিমু, কখনো মিসির আলী অথবা রূপাদের মনে। তবে তাঁর শিশুতোষ লেখাগুলোও তাঁকে অমরত্ব দিবে এতে কোন সন্দেহ নেই। শিশুমনের নানা ইচ্ছেগুলো যেন জীবন্ত হয়েছে লেখাগুলোর মাঝে।   

হামীম রায়হান,
পটিয়া, চট্টগ্রাম