অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
সংযুক্ত মোর্চা ও পদদলিত মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর - পার্থ প্রতিম হালদার

শ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোটের আনুষ্ঠানিক দামামা বেজে গেছে বা শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী রণডঙ্কা। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আরও চারটি রাজ্যে এই রণডঙ্কার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। শুনতে পাওয়া যাচ্ছে পদদলিত মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তথা ভাতের বা কাজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই বা এ লড়াই পিছিয়ে পড়া মানুষের এগিয়ে আসার লড়াই, বেকার যুবক যুবতীদের ভবিষ্যৎকে নিলাম করার বিরুদ্ধে লড়াই, ধর্মীয় কর্পোরেট ফ্যাসিবাদীদের হাত থেকে বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই। তাই আর ফুল বদল বা দল বদল নয়, এবার দিন বদলের আহ্বান সংযুক্ত মোর্চার। অর্থাৎ ধর্মের নামে রাজনীতি অনেক হয়েছে আর নয়, এখন জোরদার হয়ে উঠেছে ভাতের লড়াই। কাজের লড়াই। আর উল্টোদিকে বাবু রাজনীতিবিদদের কাছে এটা হচ্ছে ক্ষমতা দখলের লড়াই। তবে এটা ঠিক, হেরো মানুষের, গরীব প্রান্তিক মানুষের, পদদলিত মানুষের, পিছিয়ে পড়া মানুষের, খোঁচা খাওয়া মানুষের, পাত্তা না পাওয়া মানুষের বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার লড়াই তথা তাদের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর শুনে গদি মিডিয়াও স্তম্ভিত হয়ে গেছে। যার ফলে দৈনিক পত্র পত্রিকাতে, টেলিভিশনে শুরু হয়ে গেছে ভোট সমীক্ষা  বা কোন দল কত ভোট পাবেন তার চুলচেরা হিসাব। তবে দেশের অর্থনীতির সাথে রাজ্য অর্থনীতির যেভাবে চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটেছে তাতে করে মানুষ এমনিতেই বুঝতে পারছে বিকল্প কোন্ পথে! মানুষ বুঝেছে ঘাসফুল, পদ্মফুল বা দাঙ্গাবাজ, তোলাবাজ, হামলাবাজ কোনটাই নয়, এখন বিকল্প শুধু গরীব দরদী সংযুক্ত মোর্চা। কারণ ইতিহাস সাক্ষী আছে গরীব মানুষের রুটি রুজির দাবীতে বামপন্থীরা আগেও লড়েছে, এখনও লড়ছে, আর ভবিষ্যতেও লড়বে।

আমরা জানি, বিজেপি আর তৃণমূল এই দুটো দল একে অপরের পরিপূরক। তাই দুই দলের মধ্যে বিকল্প খুঁজতে যাওয়াই বৃথা। অর্থাৎ যা তৃণমূল তাই বিজেপি। যার ফলে বাংলাতে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল সরকার বা মমতা সরকার যেসব তৃণমূল নেতা কর্মীদেরকে এই নির্বাচনে প্রার্থী করেনি তাঁরা রাগে ক্ষোভে একে একে বিজেপিতে চলে যাচ্ছেন। এমনকি আবার তৃণমূল যাদেরকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অনেকে মমতার প্রতি তথা নিজের প্রতি আস্থা রাখতে না পেরে দল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। যার ফলে কয়েক দিন আগে আঁকা দেওয়াল লিখন গুলো আবার মুছতে হচ্ছে, প্রার্থীর নাম বদলে অন্য নতুন প্রার্থীর নাম যোগ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে তৃণমূলের সমস্ত দাঙ্গাবাজ তোলাবাজ হামলাবাজ চোরগুলো সব বিজেপির সভা সমিতিতে আলো করে বসে আছে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ ৭ই মার্চ ব্রিগেডে মোদীর সভায় উপস্থিত নেতানেত্রীদের মুখ গুলোর কথা ভাবলে বোঝা যেতে পারে। শুধু তৃণমূল দলের কর্মীদেরকেই বা দোষ দিই কেন? তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং এবারের নির্বাচনে আর ভবানীপুরে দাঁড়াতে সাহস পাননি। যে ভবানীপুরে ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি ২৫০০০ -র বেশি ভোটে জিতেছিলেন। এবারে ভয়ে আর ওখানে দাঁড়াননি। তিনি এবার দাঁড়িয়েছেন নন্দীগ্রামে। অন্যদিকে মিডিয়া গুলোও খুব ভালো করে বুঝতে পারছে তৃণমূলের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়েছে তা সত্ত্বেও তারা তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোন প্রচার করছে না। অপরদিকে তৃণমূলের চোর ডাকাতদের নিয়ে একই অবস্থা বিজেপিরও। আসলে ২৮ ফেব্রুয়ারি বাম - কংগ্রেসের সঙ্গে সেকুলার ফ্রন্টের যোগে সংযুক্ত মোর্চার আত্মপ্রকাশেই তৃণমূল ও বিজেপির ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তাই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বাবু রাজনীতিবিদরা বা ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা বামপন্থী দলের শুদ্ধতা নিয়ে সমালোচনায় মত্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা কথা ভাবলে অবাক লাগে, এই সিদ্দিকী যদি মমতার সঙ্গে জোট বাঁধতো তাহলে কারোর কোনো আপত্তি থাকতো না। যত আপত্তি, যত সমালোচনা বামপন্থীর বেলা। এমনকি বিভিন্ন চ্যানেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা হায় হায় রব তুলে দিয়েছেন। তাঁদের কথা, শেষপর্যন্ত বামপন্থীরা সিদ্দিকীর হাত ধরলো! এদের অবস্থা দেখে মনে হয়, যেন মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি ইফতার পার্টিতে যখন মমতাজ সাজেন তখন এদের কোন সমস্যা হয় না। যত দোষ কিনা বামপন্থীদের। আসলে তৃণমূল বা বিজেপি কখনও ভাবতেই পারেনি, নির্বাচনের আগে এমন করে গণ আন্দোলনের গর্ভ থেকে জন্ম নেবে বাম - কংগ্রেস ও সেকুলার ফ্রন্টের জোট সংযুক্ত মোর্চা।

আসলে তৃণমূল বলি, আর বিজেপি বলি দুই দলের নীতি আদর্শ একই। দুই দলই দেশ তথা রাজ্যের সম্পদ লুট করতে চায়। জালিয়াতি করতে চায়। এরা চায় মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে। জনতার প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নিতে। যার ফলে তৃণমূল ধীরে ধীরে বুঝে নিয়েছে বিজেপি হলো তাদের কাছে ওয়াসিং মেশিন। তাই প্রত্যেক তৃণমূল নেতা যেন এখন সম্ভাব্য বিজেপি। এ যেন শুধু যাওয়া - আসা, স্রোতে ভাসা বা দলবদলের রাজনীতি। যে কারণে কাল যে ছিল ঘাসফুল আজ সে মাথায় ঠেকাচ্ছে পদ্মফুল।
তৃণমূল নেতারা জানে সারদা, নারদ, রোজভ্যালির সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে এই বিজেপি। যেমন এ প্রসঙ্গে অনেকের নাম করা যেতে পারে। যারা কিনা একসময় তৃণমূলের বড় বড় চোর, তোলাবাজ, ঘুষখোর, তারা এখন বিজেপির সভাতে আলো করে বসে আছে। তাই ৭ ই মার্চ ব্রিগেডে মোদী বলেন, বাংলায় মমতা শাসন না থাকলে বিজেপি কখনও ঢুকতে পারতো না -' দিদি, তৃণমূলের অপশাসন না হলে এত পদ্ম ফুটতো না।'
তা নিয়োগে জালিয়াতি করে হোক আর আমফানের চাল চুরি, গরু বা কয়লা পাচার করেই হোক। তৃণমূলের একেবারে ছোট মাপের নেতারাই বিদেশি মার্বেলে মোড়া ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট বানিয়ে নিয়েছে, ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা দামের কালো কাঁচের প্রাইভেট গাড়ি কিনে নিয়েছে জনগণের টাকা লুঠ করে। যারা কিনা একসময় অ্যাসবেস্টরের বাড়িতে থাকতো আর সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। আর তাদের জীবন যাপন এখন সমাজের বাবু সম্প্রদায়ের মতো। তবে বাংলার মানুষ সব দেখতে পাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদে যে বাজেট পেশ হয়েছে তাও। একে একে সব বেসরকারি করণ হয়ে যাচ্ছে। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি চরম বিপদের সম্মুখীন হয়ে গেছে। রাষ্ট্রায়াত্ত  ব্যাঙ্ক, রাষ্ট্রায়াত্ত সাধারণ বিমা বেসরকারি করণ হচ্ছে। বিমা ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৪ শতাংশ করা হয়েছে। এগুলো মানুষ দেখতে পাচ্ছে, বুঝতে পারছে কিভাবে কেরোসিনের দাম, তেলের দাম, গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তাই ধর্মীয় ভাবাবেগকে নিয়ে রাজনীতি করে আর লাভ নেই। মানুষ বুঝেছে এই মুহুর্তে বিকল্প একটাই, তা হলো সংযুক্ত মোর্চা। তাছাড়া ২০১৯ এর লোকসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে সমীক্ষা করে আর কোন লাভ নেই। মাঝে গেছে বিষাক্ত ২০২০ সাল। যে সালে গোটা পৃথিবীটাই ওলট পালট হয়ে গেছে। আর সেই সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে একমাত্র বামপন্থী মানুষরাই দাঁড়িয়েছে। আর অন্যদিকে তখন মুখ লুকিয়েছে মোদী মমতার মতো বড় বড় মন্ত্রীরা। অপরদিকে ওমন পরিস্থিতিতে মানুষ পাশে পেয়েছে তার লাল ঝাণ্ডাকে, আর এখন বাঁচার একটু অক্সিজেন পেয়েছে এই বাম - কংগ্রেস ও সেকুলার ফ্রন্টের জোট সংযুক্ত মোর্চাকে দেখে।

সত্যি বলতে কি, গরীব প্রান্তিক আদিবাসী তথা পদদলিত মানুষগুলোর কন্ঠস্বর এখন খুব জোরালো হয়ে উঠেছে। তারা তাদের নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও এখন অনেক সচেতন। তারা সরব  হয়েছে ভোট বিক্রির বিরুদ্ধেও। তাই ভোটের সময় শাসক দলের দেওয়া প্রলোভন যেমন মদ, হাঁড়িয়া, শাড়ি, ধূতি দিয়ে তাদেরকে আর আগের মতো কেনা বেচা যাচ্ছে না। এভাবে তাদের ভোট যে ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না তা তারা বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট ঘোষণা করছে। তারা তাদের নিজেদের ভোট নিয়ে কতটা সচেতন তা ৭ই মার্চ মোদীর ব্রিগেডের সভার দিনে বোঝা গেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে ব্রিগেডে আসা বড় বড় বাসে ভর্তি ভর্তি মানুষ। কিন্তু সবাই যেন যন্ত্র, যেন কোথা থেকে তাদেরকে জোর করে তুলে এনে ব্রিগেডে মোদীর সভাতে নিয়ে আসা হয়েছে। তাই বাসে বসে তাদের কোন স্লোগান নেই, নেই তাদের স্বতস্ফূর্ত প্রাণবন্ত ভাব। তারা নির্জীব প্রাণীর মতো চুপচাপ বসে আছে। আর বসে বসে কেউ কেউ মোদীর সভায় ফ্রিতে দেওয়া ব্রিগেডের আধপেটা বিরিয়ানি খাচ্ছে। আবার তাদের পাশে বসে থাকা অন্য ব্যক্তিকে বিরিয়ানি দিতে গেলে রেগে গিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছে 'তুই খা, আমার লাগবে না।' সত্যি ভাবলে অবাক লাগে, যাদের দুবেলা দুমুঠো ভাত জোটে না তাদেরকে একদিন আধপেটা বিরিয়ানি খাইয়ে ভোট নেওয়ার নির্লজ্জ রাজনীতি চলছে। যে কারণে হয়তো কেউ কেউ জোরালো কন্ঠে বলেও উঠছে, 'তুই খা, আমার লাগবে না।' এ যেন ফ্যাসিবাদীদের গলার কলার ধরে সাধারণ জনতা সজোরে এক চড় কসিয়ে দিয়েছে। আঘাত করেছে বাবু রাজনীতির মডেলে। তাই সমাজের পদদলিত আদিবাসী মানুষেরা বুঝে গেছে দেশ বা রাজ্য চালানোর জন্য নেতা মন্ত্রীদের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন সুন্দর ব্যক্তিত্ব, দেশ সেবার ইচ্ছাশক্তি ও সুন্দর আচরণের। নির্বাচনে জেতার পরও যারা কিনা সবসময়ের জন্য সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলোকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারবে। আর তাদের জন্যই তারা ভোট বাক্স উপচিয়ে ভোট দিয়ে আসবে। কারণ মানুষই তো ইতিহাস রচনা করে, মানুষই পারে অরাজকতার অবসান ঘটাতে। মানুষই পারে নিজেকে বদলে ফেলতে, বদলে ফেলতে তার চেতনাকে।

পার্থ প্রতিম হালদার 
অধ্যাপক, স্বামী বিবেকানন্দ কলেজ
করিমগঞ্জ, আসাম