অটোয়া, শুক্রবার ১২ জুলাই, ২০২৪
গ্রীষ্ম সুবাস - নীনা হাসেল

জিন্সের উপরে ঘননীল ব্লেজার হাল্কা মেকআপ আর ক্রিশ্চিয়ান ডিয়রের সানগ্লাস চোখে।  ওর চেহারার ক্লান্তি ঢেকে দিয়েছে ‌অনেকটা। সন্ধ্যার মৃদু আলো অন্ধকারে হাল্কা নীল ছোট  টয়োটা টারসেল নিয়ে বেরিয়ে গেল কল্পনা। টেনথ এ্যভেনুর দুপাশের উঁচু ঝাঁকড়া ঘন গাছের সারি হঠাৎ করে গ্রীষ্মের সন্ধ্যাটাকে গাঢ় করে দিল। ওয়েস্ট ব্রডওয়ের মেৎজালুনা রেস্টুরেন্টে যাবে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ল্যাটিন ডান্স  হয। সচরাচর ওর বন্ধুরাও আসে।
ডলি, কেইট, জুলি ও ট্রিশ আগে থেকেই ডান্স ফ্লোরের কাছাকাছি একটা টেবিল দখল করেছিল। ওরা বিযার ওয়াইন, সিজারও সাইডার পান করছিল পছন্দের সঙ্গীত বাজলে ছুটে যায় ডান্স ফ্লোরে নাচতে। কল্পনা একটা গানের সাথে নেচেই হাপিয়ে গেল আজ।
টেবিলে ফিরে এসে খাবার অর্ডার দিয়ে বসল। স্পেঘেটি মিটবল সাথে সিজার সালাদ। কপালে বিন্দু বিন্দু স্বেদ। খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিল তখন দু একজন ভদ্রলোক তাকে নাচতে আমন্ত্রণ জানালো। কল্পনা বিনয়ের সাথে  অস্বীকৃত জানালো। 

সে ক্যানাডায় এসেছে কয়েক দশক আগে। জীবন চলছিল জীবনের মত করে। জীবনের উথ্থান পতনের মধ্য দিয়ে অনেকটা সময় পার হয়ে এসছে। ছোট ছেলেটার জন্মের পর থেকে সংসারে একটু টানাটানি ও ‌অশান্তি। জিম তার ছোটছেলে শনকে পেশাদার হকি খেলোয়ার বানাতে চায়। হকি প্রশিক্ষন অত্যন্ত  ব্যয় সাপেক্ষ। ইদানিংওর শরীরে ‌অপরিসীম ক্লান্তি। নাচতে আসতেও উৎসাহ বোধ করে না তেমন।

আলো ঝলমলে ক্লাব মনের আনন্দে নেচে চলেছে নারী ও পুরুষ। হঠাৎ মনে পড়ে গেল কল্পনার তার ব্যথার ওষুধের বোতলটা  প্রায় খালি হয়ে গেছে। ভেবেই পেল না কি করে এমনটা হল। উদ্বিঘ্ন বোধ করল। বিষয়টা মন থেকে তাড়াতে পারল না। 

গত সন্ধ্যায় সে নাসরীনের বাসায় গিয়েছিল নাসরীন তখন একা ছিলনা। ওর আত্মীয় স্বজনরা ডিনার করছিল। কল্পনা ওদের সাথে ডিনার করলো। ওর পছন্দের খাবার। সামুদ্রিক মাছের কারী, গরুর মাংস, স্যালমনের কাবাব, লাবড়া আর পোলাউ। মজা করেই খেল। নাসরীন অস্বস্তি নিয়ে দেখছিল কিন্তু কিছু বলল না। অজান্তেই চোখের জল মুছলো হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে। 
কল্পনা খাওয়া শেষ করেই উঠে পড়লো, নাসরীনের কানে কানে কিছু একটা বলে বেড়িয়ে গেল। নাসরীন ওঁকে গাড়ী পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল।

কল্পনা  বরাবরই ঘরবার সব ঠিক রেখেই চলেছে। আজকাল একটু বেশী বহির্মুখী। গতরাতে সে জাজ ফেস্টিভ্যালে রাত এগারটা পর্যন্ত তারকা ক্ষচিত খোলা আকাশের নীচে কাটিয়েছে। জীবনে এই প্রথম নিজকে ভারহীন দায়হীন মনে হয় নিজকে তার। শরীরের ভতরে স্টেজ ফোর বিগ “সি” তার অতি সুন্দর দেহটিকে কঙ্কালসার করে দিয়েছে। এখন সময়ের কাছে নিজেকে সমর্পন করে দিয়েছে। 
বন্ধু নাসরীন বাড়ীর ভিতরে তার অতিথিদের কাছে ফিরে যায়। কল্পনা সিটিয়ারিং হুইলে মাথা রেখে কয়েকটি বড় বড় নিশ্বাস নেয়। এটাই হয়তো নাসরীনের বাসায় তার শেষ আসা।

নীনা হাসেল
টরন্টো, কানাডা