অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯
অবকাঠামোর ভিতরেই মূল্যবোধের অবক্ষয় -ফরিদ তালুকদার

পর্ব ১
আমাদের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ধারাটি ব্যক্তি পর্যায় থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ক্রমশঃ জাতীয় অবকাঠামোর মধ্যেই চর্চা হচ্ছে কিনা সে বিষয়টা একটুখানি খতিয়ে দেখাই ধারাবাহিক এই নিবন্ধের লক্ষ্য। মন্তব্যে যে কোন যুক্তিসঙ্গত দ্বিমত আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ যোগ্য হবে।

১. সন্তানের স্কুলে ভর্তির তথ্য নিতে সেখানে গেলে মা ‘ছেলেধরা’ (শিশু ধরা) সন্দেহে গন মারধরের শিকার হয়ে ঘটনা স্হলেই নিহত হন। ৪ বছরের তুবা হয় মা হারা। ঘটনাটি ঘটে স্কুল প্রাঙ্গণের ভিতরেই! চিত্রটির ভিডিও ক্লিপ নেয়ার জন্যে চারপাশে সেলফোনের ছড়াছড়ি দেখা যায়। অথচ একটা লোকও তাকে উদ্ধারের জন্যে তৎপর হয় না। একটা লোকের মাথায় ও এ প্রশ্নটি আসে না কি করে প্রমাণিত হলো সে একজন শিশু ধরা। একটা লোকের মাথায়ও এ প্রশ্ন আসেনা শিশু ধরা হলেও তাকে এভাবে মারার আমাদের কোন অধিকার আছে কিনা। ভাবখানা যেন সবাই তারা একটা মহান উৎসব যজ্ঞে মেতে উঠেছে!

২. অন্ধ পারভেজ ভাই (আপেল মাহমুদ এর চাচাতো ভাই) টুকটাক গান শিখিয়ে কোনভাবে দিনাতিপাত করছিলো। বাস তাকে চাপা দিয়ে মেরে ফেললো। শোকে রাগে ক্ষোভে তার তরুণ ছেলে বন্ধুকে নিয়ে বাসের অফিসে গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বেড় হয়ে আসতেই সেই একই কম্পানির বাস তাদের দু'জনকেই চাপা দেয়। তার বন্ধুটি ঘটনাস্থলেই মারা যায় আর সে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়! নিরাপদ সড়কের দাবীতে কিছুদিন আগে দানা বেঁধে ওঠা মূলতঃ ছাত্র আন্দোলনের কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। কিন্তু কোন বিচার নাই। কোন পরিবর্তন নাই।

৩. দুর্বৃত্তরা রাজশাহী ইন্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সামনেই তার স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করছে। সে প্রাণপণে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে আর চারপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখতে থাকা লোকগুলোর দিকে সহযোগিতার জন্যে চিৎকার করে বলছে ভাই বাঁচান এ আমার বিবাহিতা স্ত্রী আমাকে সাহায্য করুন।  না কেউ এগিয়ে আসেনি!? 

৪. প্রতিবেশী দেশের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে দেশের স্বার্থকে বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে দেখে ফেসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাস এর ফলশ্রুতিতে দেশ প্রেমিক বুয়েটের ছাত্র আবরারের করুন মৃত্যুর দগদগে ঘা হয়তো এখনো আপনাদের বুক থেকে শুকিয়ে যায়নি। সে বিভৎসতার বিবরণ দিতে গেলে কলম থেমে যায়। তার হত্যাকান্ডের দীর্ঘ পরিসরে আবাসিক হলের অন্য শত ছেলেদের মধ্যে কেউ একজন বা সবাই একত্রিত হয়ে তাকে বাঁচানোর জন্যে কোন দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়নি। বা সাহস পায়নি। আর পুলিশ? ওহ্ হো হো.. ওনারা তো একবার এসে দেখে গেছেন যে বিল্ডিংটা যায়গা মতোই দাঁড়িয়ে আছে। কিংবা দানব গুলোকে চেহারা দেখিয়ে প্রকারান্তরে বলে গেলেন আমরা আছি কোন অসুবিধে নেই।  তোমরা যা করছো নির্বিঘ্নে করে যাও। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ভূমিকা? একটু পড়ে আসছি। এগুলো সব সাম্প্রতিক ঘটনা। এমন আরও আরও আরও হাজারও অহরহ ঘটে যাচ্ছে।

৫. প্রায় ৩৫ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলে আমার রুমে ছাত্রদলের পাণ্ডাদের সহযোগিতায় ঐ দলেরই সমর্থক প্রথম বর্ষের ছাত্রের অবৈধ ভাবে ছিট দখলের চেষ্টায় বাধা দিতে গেলে ওদের ক্যাডারদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হই (বিষয়টি কোনদিন উল্লেখ করতে চাইনি। হয়তো লেখাটির প্রয়োজনেই আজ তা করতে হলো)। না সেদিনও আমার অন্য রুমমেট বা ঘটনার সময় উপস্হিত আশপাশের বন্ধুদের কেউ এগিয়ে আসেনি। তবে ক্যাডারের রুমে (আমার দুইরুম  পরে) একঝাঁক গুন্ডার আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে যখন প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম তখন কোন এক বন্ধু পাশের রুম থেকে সিনিয়র নিজাম ভাইকে ডেকে আনলে তিনি এসে আমাকে উদ্ধার করেন। তবে সবচেয়ে দুঃখ জনক ঘটনা হলো এতোকিছু ঘটে যাবার পরে হল সুপার, হাউস টিউটর এলেন। কিন্তু কিছুই করতে পারলেন না। সিটের ঐ অবৈধ দখলদার ছেলেটি ই বহাল তবিয়তে থেকে গেলো! নিরীহ (ঐ ছেলের ডিপার্টমেন্টের ই সিনিয়র) ছেলেটি তার নামে নিবন্ধিত সিটটির কোন দিনই আর দখল পেলোনা!? 

আবরারের ঘটনার সময় এবং তার পূর্বাপর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সম্পর্কে এখন আমরা অনেকেই জানি। প্রায় ৩৫ বছর পূর্বে আমার রুমে ঘটে যাওয়া ঐ ঘটনাটির দুদিন পরে আমাদের হলের প্রোভোস্ট ঐ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি, ভূগোল বিভাগের শিক্ষক জনাব আমিনুল হককে আমি জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হয়েছিলাম যে প্রোভোস্টের ঐ চেয়ারটায় তিনি কেন বসে আছেন? ৩৫ বছর চলে গেছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে সিট নীতি সমস্যার কোন সমাধান হয়নি। বরং বেড়েছে। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে কিন্তু এই সিট দখলের নীতির কি হবে? আবরারের জীবনের করুন সমাপ্তি, সাথে আরও ১৯টা উজ্জ্বল তরুণের জীবন। এর জন্যে এই সিট নীতি কতোখানি দায়ী? দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে আসা একটি ছেলে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় তখন সে মরিয়া হয়ে ওঠে হলগুলোর কোথাও একটু ঠাই করে নিতে। এই সুযোগটাই তো নেয় হলের সিটের কর্তৃত্ব নেয়া ক্ষমতাসীন দলের পেটোয়া বাহিনী। আর এই বাহিনীটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের মদতেই চালিত হয়! 

পর্ব ২
লেখার দ্বিতীয় পর্ব শুরু করার আগে আমরা আবারও কয়েকটি বিষয় প্রায় স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নিয়ে এগোতে চাই। তা না হলে লেখাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। 

১. ‘আমরা করবো জয়’ এ সংগীত আমরা যতই গাই না কেন সার্বিক বিচারে আবহমান কাল থেকেই আমাদের মগজ তথা জাতীসত্মায় আমরা অসৎ, ভীত এবং তাবেদারী রক্ত বহন করে আসছি। ইতিহাস এই সত্যের পক্ষে কথা বলে। ওকে.. নিজেদেরকে শান্তি প্রিয় জাতি হিসেবে আখ্যা দিয়ে এ দুর্নামকে ঢাকার একটা অপচেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু তা ঠিক নয়। কারন আমাদের নিজ সমাজ জীবনে তা প্রতিফলিত করতে আমরা সম্পূর্ণ ব্যার্থ। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো উপলব্ধির। পুঁজি এবং স্বার্থের আগ্রাসী এই পৃথিবীতে ধমনীতে এই রক্তের প্রবাহ নিয়ে নিজের স্বকীয়তা নিয়ে বেঁচে থাকা একরকম অসম্ভব। মনে রাখা দরকার, মানবিকতার বোধ, সত্য এবং স্বাধীনচেতা সত্মা কোন পাত্রে হঠাৎ ফুটন্ত পানির চেহারা নয়। ধমনীর স্রোতে এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন উষ্ণ ধারা। আমৃত্যু যা বহমান রাখতে হয়। যার প্রবাহ চলবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। 

২. প্রায় ৭শত খৃষ্টাব্দে গ্রীক সমাজ ব্যাবস্হায় প্রথম আবিস্কৃত র‍্যগিং প্রথা বেশ কিছু বিবর্তন পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের এই উপমহাদেশে অনুপ্রবেশ করে। এবং বলাবাহুল্য চর্চার ধারাবাহিকতায় আমরা একটি প্রথার খারাপ দিকগুলোকে বেছে নিতেই বেশী পছন্দ করি বা গোটা প্রথাটিকেই একটা নষ্ট পথের দিকে চালিত করি। এটাও আমাদের জাতিগত স্বভাবের একটি বিশেষ দিক। র‍্যগিং প্রথার ভয়াবহ চিত্রের কারনে (মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে) ২০০১ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট সর্ব ভারতে এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এটি জানার পরেও আমাদের প্রশাসন কেন এটিকে চালু রাখে সে উত্তর আমার জানা নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কোন সেনাবাহিনীর ব্যারাক নয়। এখানে সিনিয়র ছাত্র ভাইয়েরা নবাগতদের কাছে তাদের ভালোবাসা, মমতা আর সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে বর্বরতার এ পদ্ধতি কেন বেছে নেয় তাও আমার বোধ সীমানার বাইরে। পরিস্কার মনে আছে ভর্তি হওয়ার প্রথম বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত নবীন বরণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জীবনের নূতন এই অধ্যায়ে আমরা অভিষিক্ত হয়েছিলাম। না.. সিনিয়র ভাইদের সাথে আমরা তো কোন বেয়াদবি করিনি। জোর করে সালাম পাওয়া যেতে পারে। দাসত্ব-প্রভূত্ব স্হাপন করা যেতে পারে। কিন্তু হৃদয় উৎসারিত সত্যিকারের সন্মান আশা করা বৃথা। আর এটুকুও যদি বুঝতে না পারি তাহলে কিসের লেখাপড়া শিখতে আসলাম? 

৩. এ নিবন্ধে বিএনপির বর্তমান দলটিকে নিয়ে আসার কোন অভিপ্রায় নেই। কারন যে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এখনও একজন প্রমানিত খুনি (২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা) সে দলের কাছ থেকে জাতি ভালো কিছু আশা করাই ভুল।

৪. স্বৈরশাসক এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে আমরা যেভাবে সোচ্চার ছিলাম, যেভাবে আন্দোলন করেছি বর্তমানের এই একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ যদি তেমনটি করতে যায় তাহলে হয়তো রাজপথে প্রতিদিন ২/৩ টা লাশ পরে যাবে। এ সত্যটি সম্ভবত তখনকার ছাত্রলীগ নেতারাও স্বীকার করবে। অবশ্য সে অবস্হাই তো এখন আর নেই দেশে। ধরপাকর, মেরেকেটে, প্রশাসনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই দলীয়করণ করে এমনিতেই মেরুদণ্ডহীন বিরোধী দলগুলোকে তো এখন অস্তিত্বহীনই করে দেয়া হয়েছে। চমৎকার অর্জন! কিন্তু কেন? 

আগেই বলেছি চমৎকার এই ভূখণ্ডের সন্তানদের কিছু অংশ বেঈমান আর বেশীরভাগই চাটুকার এবং ধোঁকাবাজ (ছোট বেলায় পড়া টোনাটুনির গল্প তাই আমাদের কাছে এতো জনপ্রিয় ছিল)। আর সে কারনেই যে মানুষটিকে জাতির পিতা বানিয়ে মাথার উপরে স্হান দেই মাত্র চার বছরের ব্যবধানে আমরা তাকে প্রায় সপরিবারে হত্যাকরি! অবশ্য এজন্যে মানুষের উপরে তার নির্বিবেচনায় অগাধ বিশ্বাস বা নির্বুদ্ধিতাও অনেকাংশে দায়ী। চারপাশে চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি চিনতেই ভুল করেছেন কে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আর কে না। যুদ্ধের সময় সরেজমিনে উপস্থিত না থাকাই হয়তো এর কারন। আরও একটা বিষয় আমার মনে হয় (হয়তো অনেকেই এটার সাথে একমত হবেন না) এবং তাহলো স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার পরিবার দেশত্যাগের বিষয়টুকু বাদ দিলে তেমন বিশেষ কোন ভুক্তভোগী ছিলো না। এটা হলে হয়তো বিষয়গুলোকে তিনি এতো সহজ ভাবে নিতে পারতেন না। সে যাহোক আমরা দেশ মাতার সাথে বেঈমানী করি। আমরা জাতির পিতাকে হত্যা করি এবং বন্দুকের নলের মাধ্যমে ক্ষমতার মঞ্চে আরোহন করি। কার মদতে সেটা হয়েছে তা বড় কথা নয়। তবে এই চালে আমরা কর্নেল তাহেরের মতো সাহসী দেশপ্রেমিক সৈনিককেও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে দেখি। পরবর্তীতে মঞ্জুরের মত মেধাবী মেজর জেনারেল এর ও জীবন নাশ হতে দেখি (জিয়া সহ এরা সবাই ই তো দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা!)। বিশ্বাঙ্গনে এখন এটাই আমাদের পরিচয়!

জামাতকে জোট হিসেবে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় বিএনপি ক্ষমতায় এসে যে বহুবিধ দূর্নীতি শুরু করে তার একটি হলো, যে কোন সরকারি চাকুরি সহ প্রশাসন এবং ক্যাডার ভিত্তিক পদ গুলোতে দলীয়করণ প্রক্রিয়া চালু করা। বিশেষ করে জামাতী মতাদর্শের লোকগুলোকে দাবার গুটির মত আস্তে আস্তে স্হাপন করা। দেশের নাগরিক হিসেবে সবারই চাকরি পাওয়ার সমান অধিকার আছে। তবে অবশ্যই তা যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।  এভাবে নয়। বাংলা সংস্কৃতিতে স্বজনপ্রীতি নূতন কোন ঘটনা নয়। কিন্তু সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এই দলীয়করণ স্বজনপ্রীতি সরকারের তত্ত্বাবধানে একটি জাতীর অবকাঠামোতে মূল্যবোধহীনতার বিষাক্ত বীজ বুনে দেয়। একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্হার ভিত্তি প্রস্তর স্হাপন করে। 

বিগত বছর গুলোর দিকে তাকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মজার বিষয় লক্ষ্মণীয় হয়। প্রতি মেয়াদের শেষে যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় তাহলে ক্ষমতাসীন দল (মুলত আওয়ামীলীগ বিএনপি অদলবদল) হেরে গিয়ে অন্যদল ক্ষমতায় আসে। ভালো গনতান্ত্রিক নিদর্শন তাই নয় কি? তবে সমস্যা হলো এই পট পরিবর্তনের পিছনে বিরোধী দলের যতোনা ক্রেডিট তার চেয়েও ক্ষমতাসীন দলের অপকর্মই বেশী সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তাও এখানে জনগনের একটা কিছু বলার সুযোগ থাকে। কিন্তু শেষবার আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে জনগনকে সে ক্ষমতাটুকু থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। জামাত বিএনপি প্রশাসনের আমলে  দলীয়করণের যে বিষাক্ত বীজ বোনা শুরু হয়েছিলো আওয়ামীলীগ শতগুন উৎসাহ নিয়ে সে কাজটি সম্পন্ন করে চলেছে। বাহ্.. বেশ সহমর্মিতা। অর্থাৎ তুমি খুন করেছো একটা আমি তোমার ধারাকে বন্ধ না করে বরং করবো পাঁচটা। দেশ এগোচ্ছে বেশ! তাই নয় কি? নাহ্.. তবে আওয়ামীলীগ বিএনপির মত গ্রেনেড চার্জ করে বিরোধী দলের নেত্রীকে খুন করার প্রকল্প হাতে নেয় নি। তবে লঘু পাপে গুরুদন্ডের মতো বিরোধী নেত্রীকে জেলে পাঠিয়ে দিলো। যেখানে তার দলের সব চেলা চামুণ্ডা, মন্ত্রী, পাতি মন্ত্রী মাসের ব্যবধানে হাজারপতি থেকে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক উজার করে দিচ্ছে।  দূর্নীতির বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্হাকে তো সাধুবাদ জানাতেই হয়? গ্রেফতার হওয়ার পর জি কে শামীম বলেছিলো শেখ হাসিনা ছাড়া তার প্রশাসনের সবাইকেই কেনা যায়। কথা ঠিক কিন্তু পূর্ন নয়। ও জানে না শেখ হাসিনা নিজেও সবার আগে বিক্রি হয়ে গেছেন। এবং তা হলো ঐ চেয়ারটির কাছে। চেয়ারটিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার অমোঘ ইচ্ছার কাছে। আর এ সত্যটি তার চারপাশের দুষ্ট চক্রেরা জানে বলেই তারা তার নাকের ডগায় বসে অবলীলায় বিক্রি হওয়ার সাহস দেখায়। ১৭ কোটি মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রী আজ একা একটি দ্বীপে। তিনি এখন একাই একটি সরকার। আর সেকারনেই তিনি যখন বিদেশে থাকেন, না আসা পর্যন্ত তার বিজ্ঞ মন্ত্রী পরিষদ কোন একটি ছোট সিদ্ধান্তও নিতে পারে না। আবরার হত্যার বিষয়টি দেশের আভ্যন্তরীন আইন শৃঙ্খলার আওতায় হলেও সেখানেও তিনি। সাধুবাদ জানাই। সাথে প্রশ্নও জাগে আমাদের কি কোন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আছেন? অন্যভাবে দেখলে এসবই যে আবার একনায়কতন্ত্রের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ তা কি উনি জানেন?

শেষ পর্ব
একটি রাষ্ট্র যন্ত্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিটিকে যে সব বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হয় তা নয়। তবে তার মধ্যে কিছু কিছু গুনাবলী থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। তার একটি হলো সঠিক কাজের জন্যে সৎ ও সঠিক লোকটিকে চিহ্নিত করা ও নিয়োগ দেয়া। নিজের ভুল সহ নিজের দলের লোকের ভুল সিদ্ধান্ত এবং দূর্নীতি গুলোকে চিহ্নিত করা এ সে সম্পর্কে যথাযথ ভাবে পদক্ষেপ নেয়া। তোষামোদিতে আপ্লূত না হওয়া। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মাঝে এ গুনগুলো কতটুকু আছ? তার নিয়োগ দেয়া মন্ত্রী মহোদয়দের কার্যকলাপ এবং তাদের যোগ্যতার দিকে তাকালে তিনি এখানে পাস মার্ক পান না। অবশ্য দফতর দিয়েও তিনি আবার সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চান কিনা তা পরিস্কার নয়। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু লেগেছে আবরার হত্যাকান্ডের পরেও তার দু একটি উক্তিতে। মনে হয়েছে এর দোষটাও যেন বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মীদের উপর চাপানোর চেষ্টা। প্রথম কথা হলো বহিরাগত ছাত্রলীগ বলতে তিনি কি বুঝাতে চান? মায়ের পেট থেকে তো আর কেউ কোন দলের সদস্য হয়ে আসে না? আর রাজনীতিতে দল পরিবর্তনও একটি স্বাভাবিক ঘটনা। একটি দল বা সংগঠনের কর্মীদের কর্মকান্ডের মাঝে ওটির সার্বিক চরিত্রেরই প্রতিফলন ঘটে থাকে। সেই চরিত্র ঠিক থাকলে অন্যদল বা সংগঠন থেকে দু’একজন এসেও তাতে খুব বেশী কিছু পরিবর্তন আনতে পারে না। এটুকু নিশ্চয়ই তার বোঝার ক্ষমতা আছে। সর্বোপরি এই বিশেষ হত্যাকান্ডের প্রধান দুই হোতা অমিত সাহা এবং অনিক সরকার তো পারিবারিক ভাবেই আওয়ামীলীগ করে আসছে। সুতরাং তার এই একপেশে দৃষ্টির কারনে জনগন যে তার উপর আস্হা শ্রদ্ধা দুটোই হারায় এটাও ওনার অনুধাবন করা উচিত।

এতদূর থেকে যা লিখছি তার সবই হয়তো এখন একটা কলেজ পড়ুয়া ছেলের কাছেও পরিস্কার।  কিন্তু কাউকে না কাউকে তো এটি বলতে হবে। কাউকে উপদেশ দেয়ার মতো যোগ্যতা আমার কখনোই ছিলো না এবং এখনও নাই। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর কাছে কয়েকটি অনুরোধ রাখতে চাই।

১. প্রথমেই আপনার নিজের দলের মধ্যে প্রকৃত গনতন্ত্রের চর্চা শুরু করেন। সবাইকে নির্বিঘ্নে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে উৎসাহিত করেন। নূতন মেধা ও নেতৃত্বকে স্বাগত জানান।

২. দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতাকে মুক্ত করে দেন। তাতে জনগনের কাছে আপনার গ্রহণ যোগ্যতার সত্যিকার চিত্রটি দেখতে পাবেন এবং নিজেদেরকে শুধরাতে পারবেন। অবশ্য সেই সদিচ্ছা যদি আপনার থাকে।

৩. একটু গভীরে তাকালেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে দেশে এখন একটি বাবল অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। দেশের ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যাওয়াই এর বড় উদাহরণ। এই রাশ টেনে ধরুন। দেশের অর্থনীতির প্রতিটা ক্ষেত্রকে নিয়ে যখন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দরকার সেখানে এখন আপনি নিজ দলের কুলাঙ্গার গুলোকে সামাল দিতেই ব্যস্ত। বিগত ১২ বছরে এটাই আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন তাতে কোন সন্দেহ নেই! 

৪. অন্যদল কবে কি করেছে সেই উদাহরণ টেনে নিজের দলের অপকর্মকে বৈধতা দেয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন। যদিও এটা আমাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য যে আমরা অন্যদের ভালোটাকে মনে রাখিনা। শুধু খারাপ টাকেই ধরে রাখি আর নিজেদের খারাপের সাথে তার তুলনা করি।

৫. জানি আপনার চতুর্দিকে এখন পাহাড় সমান সমস্যা।  কিন্তু এর জন্যে নিজেকে আপনি কতটুকু দায়ী মনে করেন তা আমাদের জানা নেই।  বিগত কোন এক সরকারের সময় (সম্ভবত বিএনপি)  একটি বড়সড় রেল দূর্ঘটনার পরে রেলমন্ত্রী বলেছিলেন ‘ আমার কি দোষ?  আমি কি ট্রেন চালাই?’ বাহ্.. এই না হলে বাংলাদেশ? এখানে এ ধরনের লোকগুলো শুধু মাখন খাবে আর দায়বদ্ধতা সব জনগনকে নিতে হবে! জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কে নিয়ে এতোবড় কেলেঙ্কারি ফাঁস হলো। আর বুয়েটের ভিসি কে নিয়ে তো কিছু বলতেই ঘেন্না লাগে। দেশের অবকাঠামোর মাঝেই মূল্যবোধহীনতা চর্চার এর চেয়ে আর বড় উদাহরণ কি হতে পারে? প্রশ্ন হলো এরপরেও এরা ঐ চেয়ারটিতে কিভাবে আসীন থাকে? এরা তো সরাসরি আপনার দ্বারা নিয়োগ প্রাপ্ত। জাতির কাছে, ছাত্রদের কাছে এই যদি হয় এদের জবাবদিহিতা তাহলে আপনি যে ন্যায়ের শাসনের কথা বলেন দেশের জনগন তার উপর কতটুকু আস্হা রাখতে পারে তা একবার ভেবে দেখতে বলছি।

৬. জন্মের সাথে আমরা একটি মাত্র নিশ্চিত বিষয় নিয়ে আসি এবং তা হলো মৃত্যু। আপনাকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনি আজও এই ১৭ কোটি মানুষের মাঝে আছেন। হয়তো তাদের জীবনে, (শুধু আওয়ামীলীগ সমর্থকদের জন্যে নয়) এই জাতীর জীবনে ভালো কিছু করার জন্যে।  আপনাদের মতো অবস্হানের মানুষগুলো ইতিহাসে দু'ভাবে জায়গা করে নেয়। ধিকৃত হয়ে অথবা সমাদৃত হয়ে।  সেখানে আপনি কিভাবে বেঁচে থাকতে চান তা আপনার বিষয়। তবে লেখা শেষ করার আগে আর একটা অনুরোধ করতে চাই.. চিরদিন তো আর কেউ এখানে থাকেনা সুতরাং আপনিও থাকবেন না। তাই যাবার আগে অন্ততঃ একটি কাজ করে যান। এবং তা হলো দেশে দীর্ঘদিন ধরে  এই যে পরিবার তান্ত্রিক ক্ষমতা বলয়ের এক বেড়াজাল তৈরী হয়েছে তা থেকে দূর্ভাগা এই জাতিটাকে মুক্ত করে যান।   

“বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়, --  শতবছরের ও আগে মনের ক্ষোভে স্বভাব কবি গোবিন্দ দাস বাঙালী সম্পর্কে এ উক্তিটি করেছিলেন। এমনি ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্যের প্রধান চালক হয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে আপনি আছেন। সফলতা? সময়ই উত্তর দিবে। তবে আর একটি কথা বলি.. যদি আপনি সত্যিই দায়িত্বের প্রতি সৎ হন তাহলে কাজটি খুব কঠিন নয়। গোবিন্দ দাস যা ই বলুন এই ১৭ কোটির চাহিদা খুব বেশী নয়। এরা খুব অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। আর তার জন্যে প্রয়োজন শুধু ভালোবাসার পথ, প্রতিহিংসার নয়।।

ফরিদ তালুকদার । টরেন্টো
অক্টোবর ১৭, ২০১৯