অটোয়া, বুধবার ৮ এপ্রিল, ২০২০
ভান ভিয়াং-এর স্বচ্ছ জলধারায় – চিরঞ্জীব সরকার

০০৪ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত চাকুরীসূত্রে ভিয়েতনাম ছিলাম। সেসময়ে ভিয়েতনামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এনামুল কবির স্যার। স্যার লাওসে তাঁর ক্রিডেনসিয়াল (পরিচয়পত্র) জমা দিয়ে হ্যানয়ে ফিরেছেন। এসেই আমাকে বললেন তুমি লাওস ঘুরে আসো,আশা করি খুব ভাল লাগবে। এত ছিমছাম শান্ত পরিবেশ আর কোথাও তেমন একটা পাবে না। আমি মনে মনে ভাবলাম স্যার পৃথিবীর বহুদেশ ঘুরেছে কর্মসূত্রে। স্যারের কাছে তার গ্রামের বাড়ি চন্দ্রদীঘলিয়া ও সেখানের বিলে ফুটে থাকা শাপলার অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু লাওসতো এমন কোন আহামরি দেশ না যা স্যারকে এতই মোহিত করত পারে। নিশ্চয়ই ওখানে এমন কিছু রয়েছে যা এ যুগে তেমন একটা পাওয়া যায় না। চলমান শতাব্দী তো মানুষের নিরন্তর ছুটে চলার গল্প। কারো একটু অবসরের ফুসরত নেই। সবাই মোটামুটি ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অনেকটাই মানসিকভাবে নির্বাক জীবন চাকার অতি ঘূর্ননে। তাই স্যারকে বললাম নিশ্চয়ই যাব।প্লেনের টিকিট কেটে আকাশে উড়লাম লাওসের রাজধানী ভিয়েন তিয়েনের উদ্দেশ্যে।

প্লেন যখন ভিয়েন তিয়েনের ওয়াট্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ডিং করবে তখন উপরে আকাশ থেকে দেখছি সবুজে আবৃত লাওসকে। মনে হচ্ছে যেন সবুজের চাদরে দেশটি আবৃত। ছোট এয়ারপোর্ট। লোকজন বলতে গেলে হাতেগোনা কয়েকজন। ইমিগ্রেশন অফিসার ধীরে সুস্থে আমাদের পাসপোর্টগুলি দেখে সীল মারলো। কোথাও কোন ব্যস্ততা নেই। মনে হচ্ছে যেন এখানে পৃথিবীর সব কর্মব্যস্ততা থেমে গেছে। এয়ারপোর্ট থেকে বেড়ানোর পরও মনে হচ্ছে এখানে মানুষ কোথায়। মাঝে মাঝে দুএকটি গাড়ি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গাছপালার কোন ঘাটতি নেই। নাক ভরে অক্সিজেন নিচ্ছি। আমাদের বহন করা গাড়িটি শহরের কেন্দ্রের দিকে রওহনা হল। গাড়ীর কাঁচ নামিয়ে লাওসের নাগরিকদের এ ধীর ও শান্ত জীবনের প্রবাহমানতা অবলোকন করছি। ইতোমধ্যে জার্নির কারনে ক্ষুধা পেয়ে গেল। ভাবলাম হোটেলে পৌঁছার আগেই স্ট্রীট ফুডে লাঞ্চ সেরে নেই। একটি রেস্তোরার সামনে গাড়ী থামালাম। কাস্টমার কেবলমাত্র আমরাই। দোকানের ম্যানেজার কাম রাধুনী এক মহিলা মেন্যু নিয়ে এল। ভাত, মাছ ও সবজির অর্ডার দিলাম। মিনিট পয়তাল্লিশ পর রান্না করা খাবার এল।

হোটেলের জানালা দিয়ে ভিয়েন তিয়েনের খোলা আকাশ দেখছি। একেবারে সামনেই খোলা আকাশের নীচে হোটেলটির সুইমিং পুল।ওটাতে শরীর ডুবিয়ে জাগানো মাথা কাত করে সাদা পেজা তুলার মত ভেসে বেড়ানো মেঘের নীল আকাশকে দেখছি প্রানভরে। একটা হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। সন্ধ্যার দিকে হোটেলে আসলেন ম্যাথিউ শফিউদ্দিন সাহেব। বাংলাদেশের ভোলার সন্তান। বহুবছর ধরে লাওসে আছেন উনি। এখানে ওনার বড় বিজনেস আছে। তিনি আমাদেরকে একটা লাওসের ট্রাডিশনাল রেস্তোরায় নিয়ে গেলেন। অনেক আইটেমের ভিতর একটি ছিল কাঁচা বরবটি ও লাল মরিচের সংমিশ্রনের এক সালাদ। মুখে দিয়ে বুঝলাম এতো প্রচন্ড ঝাল। ঝাল খাওয়ার অভ্যাস আমার আছে কারন আমি দুবছর চিটাগাংয়ের লোকদের সাথে ছিলাম কিন্তু এ ঝালে মনে হচ্ছে কেউ যেন মুখে আগুন জ্বেলে দিছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল নাকি ক্যারোলিনা রিপার নামের এক ধরনের  মরিচ। এ বরবটির সালাদে মনে হয় সে গোত্রীয় কোন মরিচ মেশানো ছিল। এহেন সালাদ শেষ না করেই অন্য আইটেমে মনোনিবেশ করলাম।

ভিয়েন তিয়েন শহরটা সন্ধার একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ে। রাত আটটার দিকেই মনে হল সব পাখি নীড়ে ঢুকে গেছে। এখানে নেই কসমোপলিট্যান শহরের চিরায়ত ব্যস্ততা। সকালে ঘুম থেকে উঠৈ রাস্তার দিকে চেঁয়ে দেখি কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দোকানদারদের কাছ থেকে দান গ্রহন করছে। ভিয়েন তিয়েনে বেশ কয়েকটি সুন্দর প্যাগোডা আছে। আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামের মিনিস্ট্রিয়াল মিটিংয়ে ২০১৬ সালে আমি আরো একবার ভিয়েন তিয়েনে গিয়েছিলাম। হাঁটাহাঁটির এক পর্যায় দেখলাম এক যুবক ভ্যানে করে তেলাপিয়া মাছ ফ্রাই করে বিক্রি করছে। মাছগুলোর সাইজ বেশ বড়। এক একটা মাছের গায়ে লবন মাখিয়ে কয়লার আগুনে গরম করা হচ্ছে। এ যেন মোবাইল বারবিকিউর ব্যবস্থা। ফ্রাই হলে লেবুর রস দিয়ে পরিবেশন করছে।

পরের দিন লাওসে আমাদের গন্তব্য ভান ভিয়াং নামক একটি জায়গায়। লুয়াংপারাবাং ও ভিয়েন তিয়েনের মাঝামাঝি জায়গায় ভান ভিয়াংয়ের অবস্থান। এক টুরিস্ট কম্পানির মাইক্রো ভাড়া করে ভান ভিয়াংয়ের পথে রওহনা হলাম। পথে দেখলাম দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার বিখ্যাত ফল রাম্বুটানের অনেক গাছ। কোন কোন জায়গায় এ ফলটি বিক্রি করছে স্থানীয়রা পর্যটকদের কাছে। দাম অত্যন্ত কম। আমরাও মাইক্রো থামিয়ে কয়েক কেজি রাম্বুটান কিনলাম। এ ফলটি এখন ঢাকাতেও পাওয়া যায়। ভিতরটা অনেকটা লিচুর মত। ভিয়েতনামে বসে আরেক ধরনের লিচু যেটাকে তারা লংগান বলে প্রচুর খেয়েছি। ধূসর বর্নের গোল গোল ফলের থোকা প্রায়ই আমরা কিনতাম। ঘন্টা দুয়েক ড্রাইভের পর পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

লাওসের হাইওয়েগুলি ঝকঝকে ওপ্রসস্থ। উঁচু নীচু পীচঢালা এ হাইওয়েগুলি সারা বিশ্বের সাইক্লিস্টদের জন্য যেন এক স্বর্গ। ভান ভিয়াংয়ে যাওয়ার পথে দেখলাম পশ্চিমা দেশের অনেক সাইক্লিস্ট যারা লাওসের এহেন হাইওয়ে ধরে দেশটির একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চষে বেড়ায়। জাপানীরা লাওসের জন্য মনোরিভাম এ হাইওয়েগুলি তৈরী করে দিয়েছে। ইংরেজীতে একটা কথা আছে ‘দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ’। জাপানীরা যে এগুলি এমনি এমনি লাওসের জন্য করে দিয়েছে ব্যাপারটি সেরকম নহে। ভালো রাস্তা হলে তাদের গাড়ি আরও বেশি বিক্রি হবে।লাওসে সেটাই দেখা যাচ্ছে। লাওসের বাড়িগুলিতে চোঁখ রাখলে অধিকাংশ বাড়িতেই দেখা মিলে ঢাউস সাইজর জাপানী পিক -আপ টাইপ গাড়ি। উইকেন্ডে তাঁরা মেকং নদীর উপর নির্মিত লাওস-থাইল্যান্ড মৈত্রী সেতু ক্রস করে থাইল্যান্ড থেকে পিক- আপ ভরে প্রয়োজনীয় বাজার সওদা করে আবার লাওসে ফিরে আসে। ভিয়েন তিয়েনে দেখলাম লাও বিয়ারের বিশাল ফ্যাক্টরী। লাওস তার হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট থেকে যে বিদুৎ উৎপাদন করে তা তাদের দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি বিদুৎ প্রতিবেশী দেশে রপ্তানী করে। দেশ বড় কিন্তু লোকসংখ্যা কম হওয়ার কারনে তারা বেশ স্বাচ্ছন্দেই আছে বলে মনে হল।

ভান ভিয়াং জায়গাটি নদী পাহাড়ের একেবারে কোল ঘেষে। রাবারের বয়া ধরে দেহ ডুবিয়ে নদীর মৃদু স্রোতের সাথে সবকিছু ছেড়ে যেন ভেসে চলা এখানে। অসংখ্য পর্যটকদের দেখলাম এভাবে দেহ ডুবিয়ে বয়া ধরে নদীর জলধারার ট্রেইলে ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক স্রোতে। আমরা একটা বোট নিয়ে নদীতে ঘুরলাম। অনেককে দেখলাম নদী তীরবর্তী স্থানে বসে ফিসিং হুইলে মাছ ধরতে প্রতীক্ষারত। স্রোতে ভাসা মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন জীবনের দুঃখ ক্লান্তিগুলি তাঁদের এ ভাসার মাঝে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। পায়ে হেঁটে এখানের পাহাড়ের শীর্ষে একটি আদিম গুহাতে ঢুকলাম। গুহার অনেকটা ভিতরে দেখলাম কয়েকটি বুদ্ধের মূর্তি। ধূপকাঠীর গন্ধ সারা গুহা জুড়ে। ওখান থেকে নামতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আবার রওহনা হলাম ভিয়েন তিয়েনের পথে।

আমি যখন দ্বিতীয়বার লাওস যাই তখন অক্সফ্যাম লাওসে কর্মরত বাংলাদেশের প্রভাসদার সাথে আমার আবার সেখানে দেখা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে আমি যখন ভিয়েতনামে কর্মরত ছিলাম তখন প্রভাসদা অক্সফ্যাম ভিয়েতনামে কর্মরত ছিলেন। প্রভাসদা জানাল ব্যাস্ততাহীন জীবনযাত্রাই লাওসবাসীদের কাছে আদর্শ। এখানে কোন কিছুর জন্য কেউ নাকি কখনো তাড়াহুড়া করে না। সবকিছু চলবে ধীরগতিতে। এ যেন ভূটানের প্রবর্তিত হ্যাপিনেস ইনডেক্সের অ্যাপ্লাইড ভার্সন। তাই জীবন চাকার অতিঘূর্ননে যারা ক্লান্ত ও অবসন্ন তাদের জন্য লাওস বলছে ‘এখানে চলে আস আমার কাছে, ফিরে পাবে এক অনাবিল শান্তির নির্ভেজাল বিশ্রাম।

চিরঞ্জীব সরকার । অটোয়া, কানাডা