অটোয়া, রবিবার ৬ এপ্রিল, ২০২৫
ফড়িং-ধরা বিকেল (প্রথম অংশ) - নূরুন্‌ নাহার

বার কাছেই লেখা চাই, পরিচিত-অপরিচিত, লেখক-অলেখক সবারই কাছে। সেই চাওয়াটা শুরু হয়েছিলো ২০০৯ সালে, অটোয়া হইতে ‘মাসিক আশ্রম’ প্রকাশের সময় থেকে। এখন ‘আশ্রম’ পত্রিকা কাগজ থেকে বর্তমান প্রযুক্তির উন্নত মাধ্যম অনলাইনে চলে এসেছে। কিন্তু লেখক সমস্যার সমাধান আজো হয়নি। এখনও সবার কাছে লেখা চাই। আর এভাবেই আমার একজন ফেইসবুক ফ্রেন্ড, শফিউল ইসলামকে আশ্রমে লেখার জন্যে অনুরোধ করি। বন্ধুবর শফিউল ইসলাম গল্প-উপন্যাস লেখায় অভ্যস্থ নয় বলে অপারগতা জানান। তবে বলেন- আমার বোন একসময় লেখালেখি করতেন, এখন আর লিখেন না। আমি তার প্রকাশিত বইয়ের একটি কপি আপনার কাছে পাঠিয়ে দিব। এই আলাপের দুইদিন পরে আমি শফিউল ইসলামের কাছ থেকে একটি ই-মেইল পাই, সাথে একটি ছোট কবিতা এবং একটি পিডিএফ ফাইল। কবিতার অনেককিছুই আমি বুঝি না, কবিতা আমার কাছে সবসময়ই অধরা। তাই কবিতাটি একঝলক দেখে, পিডিএফ ফাইলটি খুলি। দেখতে পাই ফাইলটি একটি প্রকাশিত বইয়ের। বইয়ের নাম – ‘ফড়িং-ধরা বিকেল’ লেখক- নুরুন্‌ নাহার। প্রচ্ছদ এবং বইয়ের নাম দেখেই কেন যেন মনে হল বইটি এখনই পড়া দরকার। আমাকে হয়ত নস্টালজিয়ায় পেয়েছিলো তাই পিডিএফ ফাইলটি একবারেই পড়ে ফেলি। পড়া বন্ধ করতে হয় নি। লেখাগুলো আমাকে নিয়ে যায় আমার শৈশবে—আমার অতীত জীবনে। তার বড় কারণ হতে পারে দীর্ঘ বিদেশ বাস। পড়া শেষ করেই আমি শফিউল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করি, তাকে অনুরোধ করি – আপনার বোনকে বলুন, আশ্রমের পাঠকদের জন্যে কিছু লিখলে আমরা আনন্দিত হব। তিনি উত্তর দিলেন- ‘না, সে তো অসুস্থতার কারণে লেখালেখি করতে পারে না। তবে আপনি চাইলে তাঁর পুরনো কিছু লেখা দিতে পারি।’ আমার মনে হলো পুরনো লেখা যদি ছাপতে হয়- তাহলে তো এইমাত্র পড়ে শেষকরা লেখাগুলোই ভাল। দ্বিধান্বিতভাবেই তাকে জিজ্ঞাসা করি, আমি কি ‘ফড়িং-ধরা বিকেল’ বইয়ের লেখাগুলো আশ্রমে ছাপতে পারি। শফিউল ইসলাম কোন ভনিতা না করেই আমাকে বললেন- ‘আপনি যদি আশ্রমের পাঠকদের জন্য আমার বোনের প্রকাশিত বইয়ের লেখাগুলো আবার ছাপতে চান তাহলে আমাদের কোন অসুবিধা নেই - আমরা খুশি হব।’

আমার বিশ্বাস, গল্প বলেন আর স্মৃতিকথা বলেন লেখাগুলো সবার ভাল লাগবে, আর সেই বিশ্বাস থেকেই আমি প্রকাশিত বইটি আবার আশ্রমবিডি.কম ওয়েবসাইটে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছি………কবির চৌধুরী, সম্পাদক, আশ্রমবিডি.কম, অটোয়া, কানাডা 


[ ফড়িং-ধরা বিকেল, লেখকঃ নূরুন্‌ নাহার, প্রচ্ছদঃ মানযারে শামীম, প্রকাশকঃ মোহাম্মদ আলী, নন্দিতা প্রকাশনী, প্রকাশকালঃ অক্টোবর-২০১৬, ঢাকা, বাংলাদেশ, স্বত্বঃ লেখক ও Vision Creates Value, ISBN: 978-984-92426-0-4 ]      

প্রথম অংশ

ফড়িং-ধরা বিকেল 
[স্মৃতির মেলা থেকে]

[উৎসর্গঃ সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও ইলা মিত্র – যাঁদের দেশপ্রেম এখনো সাহস ও প্রেরণা যোগায়]

সেই কবে শৈশবে বাবার হাত ধরে নাচতে-নাচতে, গাইতে-গাইতে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা আমরা দু’বোন এসেছিলাম বেনাপোল বর্ডারে।
বাবা ছিলেন সৎ কর্তব্যপরায়ণ একজন কাস্টম-অফিসার। ত্যাগী ছিলেন কিনা জানিনে, তবে ভোগী ছিলেন না মোটেও। বাবা খুব অল্পতেই তৃপ্ত হতেন, তাই চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব তাঁকে অনেকখানি ছাড় দিয়েছিলো বুঝি। কাস্টম-কলোনির পুরো পরিচালনার দায়িত্ব ছিল বাবার ওপরে। বাবার পরিচালনায় কাস্টম-কলোনির পরিবেশ ছিল মমতায় বাঁধা। আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াতো বাবার সুনাম। আমরা ছিলাম দশ নম্বর বাসায়। বর্ণমালার সাথে কথা হয়েছিল বুঝি, বেনাপোল কাস্টম-কলোনি স্কুলেই। বর্ণমালার সাথিরা ছিলো মন ছুঁয়ে। কলোনি জুড়ে সবার সাথে ছিলো আত্মার সম্পর্ক।

আমরা সারাদিন কলোনির মাঠে-ঘাটে হইহই করে ঘুরে বেড়াতাম। দুপুর গড়িয়ে গেলেই প্রজাপতি রঙের জামা পরে কলোনির সাথিদের সাথে দল বেঁধে হারিয়ে যেতাম সবুজ মাঠে, ফড়িং-ধরা বিকেলে। পাল্লা দিয়ে ছুটোছুটি করে ফড়িং ধরতাম আমরা। কত রঙের যে ফড়িং। খুশিতে এলিয়ে পড়তাম একজনের গায়ের ওপরে আর একজন। তারপর আনন্দে হারিয়ে যেতাম রেললাইনের ধারে পাথরের বুকে।

আহা! কী যে সুখ ছিল সেই সুরেলা জীবনে। সুখ ছিল যেন অথই, আনন্দ ছিল যেন থইথই। আজ জীবনে বেসুরো সুর শুনি। তালহীন সে সুর। আজ বার বার মনে হচ্ছে, কোথায় ফেলে এসেছি সেই আনন্দ-জড়ানো দিনগুলি। বিষাদে ভরে ওঠে মনটা! অনেক প্রশ্নেরা এসে বুকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, বিষাদের বিষদাঁত ভেঙে আমরা কি কোনদিন ফিরে যেতে পারব না সেই আনন্দ-ছোঁয়া স্মৃতির দেশে?স্মৃতির চোখ মেলতেই দেখেছিলাম বেনাপোল বর্ডার, বাবার রচিত কাস্টম-কলোনি, রেললাইনের ধার, সবুজ মাঠ আর ফড়িং ধরা বিকেল।

আবারও ইচ্ছে করে সেই বর্ণমালার সাথিদের সাথে গলাগলি ধরে, অর্থহীন জীবনের দাঁড়িপাল্লা ছিঁড়ে, বেসুরো জীবনের বিষদাঁত ভেঙে, আমরা দু’বোন আবার হারিয়ে যাই সেই সুখ-ভরা রেললাইনের ধারে, আনন্দ-ঝরা সবুজ-বোনা মাঠে আর ফড়িং-ধরা বিকেলে ... ... .... চলবে 

ঢাকা, বাংলাদেশ

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন

ছড়া ও কবিতাঃ বর্ষা যখন - নূরুন্‌ নাহার