আশিস চক্রবর্তী’র দু’টি কবিতা
আকাশ
সময়টা এখন শরৎ।
মেপে চুকে দেখিনি ঠিকই, তবে
দলা ধরা মেঘ মাথার ওপর রুপোলি আলো ছড়িয়ে-
উড়ে গেলেই, আপনা থেকেই মনের ভেতর কে যেন বলে,
জলাশয় এর পাশে গেলেই, কাশ ফুল দেখতে পাবি।
তীব্র রোদ উঠোনে বিছানো থাকলে, কালটা যে অন্য, আকাশই বলে দিত।
এরমই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণেই চলেছি আজ অব্দি।
সে দিকে লক্ষ্য রেখেই গরম পোশাক কিনি।
একবার বেশ মনে আছে, বুড়ি পিসিমা এসে ছিল বাড়িতে।
আকাশের দিকে কপালে হাত তুলে ও খালি বলতো' সময় ভালো ঠেকছে না রে
খোলা হাত এবার মুঠো কর।'
তারপর দিন কতক যেতেই, পিসিমা ওমনি
আকাশের দিকে চেয়েই, চক্ষু স্থির করলো।
ঘর শুদ্ধ লোক বলেছিল, স্বর্গে গেলো।
ও জায়গা আমি দেখিনি, আশে পাশের কেউ না।
তবে এটুকু দেখেছিলাম চিতার আগুন এর শিখা, ধোঁয়া সব উর্ধমুখী ছিল।
শ্মশান চারিণী ভৈরবী মাতু পাগলী, খোলা আকাশের নিচেই, আজীবন তপ করে।
রাতের আকাশের নক্ষত্র দেখে, আর নানান ভঙ্গিমায় বিড় বিড় করে।
বাজারে হাত পেতে, জামার খুট ধরে, যাকে হামেশাই দেখি এটা ওটা চেয়ে বেড়াই, সেই ফকির রমজান আলী, এক রাশ তারার দিকে চেয়েই ঘুমোয় সারাটা জীবন।
আমার বাড়ির কাজের মেয়ে, ওর মাথায় বিপদ ভেঙে পড়লে, দেখতাম আকাশের দিকেই ঘাড় উঁচিয়ে কাকে জানি জিজ্ঞাসা বাদ করতো।
ওপাশের আওয়াজ কখনো শুনিনি।
ছেলে বেলায়, খেলার ফাঁকে ফাঁকে, ওপরে হাত তুলে কপালে ঠেকাতাম।
সেই বিশ্বাস কত ওপরে, কার কাছে গিয়েছিল জানি না।
এখন ও ভরসা হারালে সেই আকাশের দিকেই চেয়েছি।
এ সবের আড়ালে উদ্ভিতদের বিচরণ যে দুমুখো,
সেটাও নজর এড়ায়নি।
বাকশক্তি হীন প্রাণীদের এসব আচরণে লিপ্ত হতে দেখিনি কখনও।
চর্ম চক্ষে যা কিছু আসা যাওয়া সব টাই লক্ষ্য করেছি ওই ওপর থেকেই।
সেবার মাঠে ফসল বুনেছিল লিয়াকত সেখ।
দুদিন যেতেই, কচি রং চোখে ধরলে ওপরে হাত তুলে দোয়া করেছিল, মেঘ কেটে জলের জন্য।
আবার পাশের বাড়ির গিরিশ, ঘরের চাল খুলে নতুন খড় চাপাতে চাপাতে ওদিকেই তাকিয়ে বলেছিল কটা দিন খটখটে থাক।
এরপরের ইতিহাস সবার জানা।
নিদ্রাহীন
এখনও অনেক ঘুম বাকি পড়ে আছে,
আঁশটে গন্ধ পূর্ন এই পৃথিবীর বুকে।
নিদ্রাহীন ক্ষয়িষ্ণু চোখে দেখেছি, অল্প আলোয়
আগাছা সরিয়ে, পাংশু হৃদয় জীবন্ত রাখে কেউ কেউ।
কর্মহীন শুকনো দড়ির মত হাত তুলে, ক্রমশ
আঁকড়ে পড়ে থাকতে চায় ধূলোয়।
হাজারো পতাকার তলায় স্বাস নিতে গিয়ে
ফুসফুসে ভরে ওঠে নিকোটিন।
হয়তো কয়েক লক্ষ বছর পড় স্তুপ ঘেটে ঘেটে
সেসব জীবাশ্ম উদ্ধার হলে লেখা থাকবে ত্রুটিপূর্ণ শাসকের লিপি।
লাশ কাটা ঘরে রেখে, ব্যবচ্ছেদের অছিলায় পচন ধরবে মেরুদন্ড ,মজ্জায়।
তারপর, ভুলে যাওয়া শোষণের ইতিহাস জেনে
শিশু দের আমরা উপহার দেব স্বপ্ন।
সে কল্পনার ও একদিন বিবর্তন হবে।
মুঠো মুঠো করে সকলে তুলে রাখবে বারুদ,
ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবে।
সংরক্ষিত হবে মাঠ ভরা ফসল,
আধ লেখা কবিতার খাতা।
পথ জুড়ে তখন, ভারী চাকার দাগ, আর
আকাশে তপ্ত ডানার শকুন।
ব্যাগ ভর্তি ঘুমের বড়ি তুলে এনে
মেঝেতে ছিটিয়ে বিলোবে প্রত্যেকেই।
ঘুমন্ত নবজাতকের বন্ধ চোখ,
উঠবে নিলামে।
আশিস চক্রবর্তী
পশ্চিমবঙ্গ
-
ছড়া ও কবিতা
-
13-09-2020
-
-