অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
ভ্রমণ পিপাসুরা তৃষ্ণা মেটায় পিয়াইন নদীর জলে - জাবেদুর রশিদ

‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’- বেশকিছু দিন ধরেই মন ছটফট করছিলো বাইরে কোথাও ঘুরে আসার। কিন্তু যাবো যাচ্ছি বলে যাওয়া হচ্ছিল না। বন্ধু লিমনের ফোন আমার ভ্রমনতৃষ্ণা মেটাবার বারতা নিয়ে এলেও আমার মন তাতে সায় দিচ্ছিল না। এর কারন স্থান নির্বাচন। তার ইচ্ছে, ২ দিন পর জাফলং যেতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে অতিথি আসছেন, তাদের জাফলং দেখানোর জন্য আমাকেও যেতে তার সঙ্গে। কিন্তু আগের জাফলং আর এখনকার জাফলংয়ের মধ্যে যে তফাৎ সেটাই আমার অনীহার কারন। যেভাবে সাজানো গোছানো থাকার কথা সেরকমটি আর এখন নেই জাফলং। অনেকটাই শ্রী হীন হয়ে পড়েছে, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের লীলা নিকেতন। বন্ধু নাছোরবান্দা, যেতেই হবে। অগত্যা রাজী না হয়ে উপায় ছিলনা। শেষ পর্যন্ত যেতেই হলো। দিনটি ছিল শুক্রবার। সকাল ৯ টায় শহরের জিন্দাবাজার এলাকার একটি হোটেলের সামনে গাড়ি নিয়ে যথারীতি হাজির হই। গাড়ি পার্কিং করে ড্রাইভার আর আমি সকালের নাস্তা সেরে নেই। ততক্ষনে অন্যরাও এসে হাজির হন নির্ধারিত স্থানে। চট্টগ্রাম থেকে আসা অতিথিরা অবশ্য একটু বিলম্বে এসে যুক্ত হন আমাদের সঙ্গে। দীর্ঘ ভ্রমনের ক্লান্তি দূর করতে একটু বাড়তি বিশ্রাম নেওয়ার কারনে গাড়িঅবদি পৌছতে তাদের একটু দেরি হয়। যেহেতু তাদের জন্যই যাত্রা, তাই অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিলো না! সকাল ১০ টায় আমাদের বহনকারী মাইক্রোবাস যাত্রা করে জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে।  ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে বোধহয় একটু বেশিই খিদে পায়? অর্ধেক রাস্তা যাবার আগেই পেট চুচু করতে থাকে। এক বড়ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম তার বাড়ির পাশ দিয়েই আমরা যাবো। তিনি নিজে থেকেই আমাদের সঙ্গী হওয়ার আগ্রহ দেখানোর কারনে তাকে নিতে গাড়ি থামাতেই বললেন চলো। সাথে করে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়ে এসেছেন  তিনি। আমরাতো মহাখুশি।  তাকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। প্রকৃতিকন্যাখ্যাত জাফলং এর পথে এগিয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। সবাই সিলেট-তামাবিল সড়কের দুইদিকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য দেখার পাশাপাশি গল্প-গুজব আর হাসি-ঠাট্টা মগ্ন থাকতে থাকতে বুঝতেই পারিনি কখন পৌছে গেছি প্রমিলা রাণীর রাজ্য, জৈন্তাতে।জাফলং যাওয়া-আসা ছাড়াও অনেক বার এদিকে এসেছি কিন্তু জৈন্তারাণী বা তাঁর রাজ্য জৈন্তা সম্পর্কে তেমন কিছু জানা হয়ে উঠেনি। সিলেট-তাবামিল সড়কের পাশে অবস্থিত জৈন্তা বাজারেই যে তাঁর শাসনামলের কিছু স্মৃতিচিহ্ন এখনো বিদ্যমান সেটাও আমার জানা ছিল না। সফরসঙ্গী বন্ধু লিমনের মুখ থেকে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল ঐ দিন। রাণী ও তাঁর রাজ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি মূল সড়কের পাশে গাড়ি রেখে পায়ে হেটে আমরা দেখে নিই ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে সংরক্ষিত বিভিন্ন স্থাপনা। জৈন্তিয়া রাজবাড়ির সামনে রাখা বিশাল বিশাল পাথর। এছাড়াও এখানে রয়েছে জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শন নরবলির স্থান, চন্ডির থাল, বিরাট বিরাট পাথরের তৈরী কেদার, ঢুপির মঠ, সারীঘাট পান্থালসহ অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক  নিদর্শন!

রাজ্যের এই স্থাপত্য দেখে আর রাণী শাসিত এই অঞ্চল নিয়ে অজানা অনেক কিছু জানতে পেরে কেন জানি ভ্রমণে যাওয়ার অনীহা কেটে যেতে লাগলো। ইচ্ছা এ রাজ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানার। গাড়িতে বসেই ঘাটতে শুরু করলাম ইন্টারনেট। সার্চ দিতেই অনেক তথ্য আমার আগ্রহের মাত্রা বৃদ্ধি করতে লাগলো। জানতে পারলাম, প্রাচীনকালে জৈন্তারাজ্যকে নারীরাজ্য বলা হত। তবে এ নারীরাজ্যের সঠিক বিস্তার জানা যায় না। তবে জৈন্তা পাহাড়কে কেন্দ্র করেই এ নারীরাজ্যের অবস্থান ছিল। খাসিয়া রাজবংশের সময় ষোড়শ শতক থেকে বারপুঞ্জি সম্বলিত জৈন্তা পাহাড়, সিলেটের উত্তরাঞ্চলের সমতল ভূমি অর্থাৎ জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের কিছু অংশ এবং আসামের গোভা ও ডিমারূয়া অঞ্চল নিয়ে জৈন্তা রাজ্যের অবস্থান ছিল। এ রাজ্যের উত্তরে অহম (কামরূপ), পূর্বে কাছাড়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও গৌড় রাজ্য এবং পশ্চিমে লাউড় ও কামতা রাজ্যের অবস্থান ছিল। চতুর্দিকে বিভিন্ন রাজ্যের অবস্থানের কারণে পাশ্ববর্তী রাজন্যবর্গের সাথে জৈন্তা রাজ্যের সারা বছর ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকতো।প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে লিখিত জৈমিনি মহাভারতে জৈন্তিয়া রাজ্যের অধিশ্বরী বীর রমণী প্রমিলার কথা উল্লেখ করা আছে। জৈন্তিয়াকে প্রমিলা রাজ্য বা নারী রাজ্য বলা হতো। প্রমিলার রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে মহাবীর অর্জুন তাকে বিয়ে করেছিলেন। কহলীন রজত রঙ্গিনী গ্রন্থের বর্ণনা মতে, ‘কাশ্মীরের রাজা জয়পীড় ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে দ্বিগ্বিজয়ে বের হন।’ তিনি পূর্ব দেশীয় রাজা ভীমকে পরাজিত করে নেপাল রাজ্যে প্রবেশ করেন। তারপর তিনি জৈন্তিয়া রাজ্য জয় করেন। সে সময় জৈন্তিয়া পাহাড়কে কেন্দ্র করে জৈন্তা রাজ্যের সীমানা ছিল।  ষোড়শ শতকে খাসিয়া রাজবংশের সময় থেকে জৈন্তা রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চল ছিল ১২ পুঞ্জি নিয়ে জৈন্তিয়া পাহাড় সিলেটের উত্তরাংশে সমতলভূমি নওগাঁ জেলার গোভা ও ভিমারণ্য অঞ্চল। রাজ্যের উত্তর-সীমায় অহম কামরূপ, পূর্বে-কাছার, দক্ষিণে-ত্রিপুরা ও গৌড় রাজ্য অবস্থান ছিল। খাসিয়া রাজবংশের ২৩ জন রাজা ১৫০০ সাল থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ইন্টারনেটে এতটাই আবিষ্ট ছিলাম, অতিথিরাযে রাস্তার দু’পাশের রূপলাবন্যে মুগ্ধ হয়ে হই হুল্লুরে মেতে উঠেছেন টেরই পাইনি। লিমনের ‘কিতা অইচে বেটা তর, অত চেটিং করছ কার লগে’- কথায় সম্বতি ফিরে আসে! আমিও সামিল হই রাস্তার দুইপাশে প্রকৃতির সাজানো গোছানো রূপ দেখায়। গন্তব্যের দিকে যতই অগ্রমর হতে থাকি  তাদের মুগ্ধতা আর উচ্চাশা বাড়তে থাকে। তামাবিল জিরো পয়েন্টে পৌছার আগে ২/৩ কিলোমিটার রাস্তা পেরুতে হাতের ডানদিকে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের দৃশ্য যে কোনও পর্যটকের মন কারবে। মেঘালয় পাহাড়ের এই মনোরম দৃশ্য আমার খুবই ভাল লাগে। কেন জানি মনে হয় আরেকটু সামনে গিয়ে হয়তো হারিয়ে যেতে পারবো সুউচ্চ এই সবুজের বুকে, যেখানে মেঘ আর সবুজের অসাধারণ মিতালী আর সবুজের বুকচিরে বয়ে চলেছে ঝর্ণার জলরাশি! পাহাড়ের মোহনীয় রূপ প্রত্যক্ষ করতে করতে হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে যায় একটি ভাবনায়- মেঘালয় পাহাড়টা যদি আমাদের সীমানায় থাকতো? তাহলেতো ইচ্ছে করলেই যাওয়া যেতো কাছাকাছি! ভাললাগা আর ভাবনার দুলাচলে থাকতে থাকতে একসময় পৌছে যাই তামাবিল জিরো পয়েন্টে। ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে জিরো পয়েন্টের কাছে গাড়ি রেখে নেমে পড়ি সাবাই। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যে যার মত করে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। খানিকটা সময় কাটাই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে। তামালি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে কয়লা, কমলাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ট্রাক আমাদের দেশে আসে আবার আমাদের দেশ থেকেও বিভিন্ন পণ্যসামগী নিয়ে ট্রাক যায় ভারতে। ওপারে ভারতের সীমান্ত এলাকার নাম ডাউকি আর এপারে তামাবিল। দুই দেশের বেশ কিছু ভ্রমণ পিপাসী মানুষের আনাগোনা থাকায় সীমান্ত প্রহরীদের আচরণ অনেকটাই নমনীয়। যার জন্য খুব কাছে  গিয়ে দেখার বা ছবি তুলার সুযোগ পাওয়া যায়। সফরসঙ্গী মামার মাধ্যমে উনার পরিচিত দুই সংবাদকর্মী আমাদের আগমনের বার্তা জানতে পেরে  অপেক্ষারত ছিলেন জাফলংয়ের মামার বাজার এলাকায়। তাই আবার গাড়িতে উঠে পরা। মামার বাজার যাওয়ার রাস্তা কি পরিমান খারাপ তা বলে বুঝানো যাবে না। খানাখন্দে ভরা রাস্থার দুই পাশে যতদূর চোখ যায় পাথর ভাঙার ক্রাশার মেশিনের হাট। এই পরিবেশ ভ্রমনপীপাসুদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্থিকর। ড্রাইভারের আগে থেকে ধারনা থাকায় ঐদিকে যেতে চাইছিলেন না তিনি। তারপরও আমাদের জন্য অপেক্ষামান সংবাদকর্মীদের ভূল দিকনির্দেশনা এবং মামার একগুঁয়েমির কারণে অসহনীয় কষ্ট করে মামার বাজারে যেতে হয়। বলে রাখা ভালো পর্যটকদের জন্য ঐদিকে না গিয়ে খুব ভালো হয় মামার বাজারে যাওয়ার সামান্য পূর্বে হাতের ডানদিকে যে রাস্তা  বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষীদের ক্যাম্পের দিকে গেছে সেদিকে যাওয়া। ঐদিককার রাস্তাটা কিছুটা ভালো। তাছাড়া গাড়ি রাখার ব্যবস্থা আছে। আগত পর্যটকদের কথা চিন্তা করে সেখানে একটি বাজারও গড়ে উঠেছে। সেখানে নানা ধরনের উপহার সামগ্রীর দোকানের পাশাপাশি খাবারের জন্য গড়ে উঠেছে ভাল মানের কয়েকটি রেঁস্তোরা। মামার বাজারে পর্যটকদের গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট জায়গাতে গাড়ি রেখে আমরা হাটা শুরু করি খাসিয়া পুঞ্জির দিকে। সাথে খাবার আর পানি নিতে ভূল হয়নি। খারাপ রাস্তা দিয়ে এদিকে আসায় সবার মনে আনন্দের কোন লক্ষণ যে ছিলোনা তার চাপ চেহারাতে স্পষ্ট ছিলো। বালুর উপর দিয়ে হেটে চলেছি আমরা। ধূসর প্রান্থরের চারদিকে চলছে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের মহোৎসব! ভারত থেকে নেমে আসা পিনাই নদির বুকে জমে থাকা বালু খনন করে পাথর উত্তোলনের জন্য বসানো হয়েছে পরিবেশ বিনষ্টকারী বোমা মেশিন। এই মেশিনের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে দিনে রাতে তোলা হচ্ছে পাথর। যার ফলে এখানে বিশাল বিশাল মৃত্যুকূপ তৈরি হয়েছে। এই কূপের গভীরতা ১শ থেকে শুরু করে ৩শ ফুট পর্যন্ত। কিছুদিন পর পর এই মৃত্যুকূপে বালি ধ্বসে প্রাণ হারায় জীবিকার তাগিদে শ্রম বিক্রি করা নিরীহ শ্রমিক। যাদের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় আমরা শুধু তাদের কথা জানি বাকিদের লাশের হিসাব থেকে যায় অজানা।

আরো শিহরিত হই একটু দূর এগিয়ে গিয়ে যখন দেখি এই মৃত্যুপুরীতে শ্রমিকরা অস্থায়ী ঘর নির্মান করে শিশু সন্তান নিয়ে বসবাস শুরু করেছে। কি পরিমান ঝুঁকির মাঝে বসবাস করছে তারা তা কল্পনা করা যায় না। পিয়াইন নদীর বুক দিয়ে হেটে আমরা ওপারে পৌছাই কোনও ধরনের খরচাপাতি ছাড়াই। খরচের কথা বলার কারণ বালুর প্রান্থর দিয়ে হেটে আসার সময় ছোটো একটা কালভার্ট পার হতে সেখানে টাকা দিতে হয়। তবে জানিনা ঠিক কত টাকা নেয় ওরা। মিডিয়াকর্মী সঙ্গে থাকায় তারা কোন টাকা চায়নি আমাদের কাছে। খাসিয়া পুঞ্জিতে যাওয়ার আগে ছোটো কিন্তু খুবই জমজমাট একটি বাজার পাওয়া যায়। বাজারের ভিতর দিয়ে হাটলেই বুঝতে কষ্ট হয়না যে বাজারটা গড়ে উঠেছে স্থানীয় পাথর আর বালু শ্রমিকদের কেন্দ্র করে। বাজার পেরিয়ে যে রাস্তাটা সেই রাস্তা ধরে এগুলে খাসিয়া পুঞ্জিতে পৌছা যায়। এখান থেকে ছাউনি ছাড়া বিশেষ একধরনের গাড়ি ছাড়াও ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা পাওয়া যায়। আমরা অবশ্য হেটেই অগ্রসর হতে থাকি। রাস্তার দু’পাশে সুপারি আর খাসিয়া পানের বাগান মাঝে মাঝে খাসিয়াদের তৈরি মাচা জাতীয় ঘরের দেখা মেলে। বেশ কয়েকবছর পূর্বে যখন এসেছিলাম খাসিয়াদের এই ঘরগুলি এরকম ছিলো না। এখন প্রায় সবাই ঐতিহ্য ধরে রেখে শুধু বাঁশ-কাঠের পরিবর্তে ইট-পাথর দিয়ে ঘর তৈরি করেছে। বেশ খানিকটা পথ হেটে একটি সুপারি বাগানের মধ্যে ঢুকে আমরা ভোজনপর্ব সম্পন্ন করি। খাবার শেষ করে আবার পুঞ্জির দিকে হাটা শুরু করি। সবমিলিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেটে আমরা খাসিয়াদের পুঞ্জিতে পৌছাই। এখানে আমাদের কোনও এক খাসিয়া ঘরে আড্ডা দেওয়ার কথা ছিল তবে তিনি নাকি আমাদের পৌছার কিচ্ছুক্ষণ পূর্বে প্রয়োজনীয় কাজে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। তাই উনার ঘরের পরিবর্তে অন্যজনের ঘরে গেলাম এবং সেখানে কিছুটা সময় তাদের সাথে বসে পান-সুপারির আপ্যায়ণ শেষে জাফলং জিরো পয়েন্টের দিকে যাওয়ার জন্য ব্যাটারিচালিত অটোতে উঠি। মিডিয়াকর্মীরা বিদায় নিয়ে খাসিয়াদের পুঞ্জিতে থেকে গেলেন। আমরা সংগ্রামপুঞ্জি পয়েন্টে নেমে ধূসর বালু প্রান্থর দিয়ে কিছুদূর হেটে পৌছে যাই মেঘালয় পাহারের পাদদেশে। সবাই যেন এত সময় পর প্রাণ ফিরে পেল। মনে হল যে যার জন্য আসা হয়েছে তার দেখা পাওয়া গেছে। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ আর ঠান্ডা পানি দেখে সবাই মহা খুশি। নদীর এপার ওপার দু পারেই ভ্রমণপীপাসুদের ভীর। শুকনো মৌসুম হওয়ায় পানি অনেক কম থাকলেও পারাপারে নৌকা লাগে। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা করে আবার একসাথে কয়েকজন হলে ৫০/৬০ টাকা করে নেয় মাঝিরা। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ আর ঠান্ডা পানি দেখে যে কেউ নেমে পরবে পানিতে। আমরা আলাদাভাবে কোনও কাপড় না নেওয়ায় সাঁতারের জন্য নামা হয়নি স্ফটিক জলের এই নদিতে। তবে পা ভিজিয়ে নিতে ভূল করেনি কেউই! কেউ কেউ প্রথমে এদিকে না এসে সময় নষ্ট করার জন্য আক্ষেপ করতে থাকে। উপচে পরা পর্যটকদের ভিড়ে কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যাই সবাই। এখানে ভারতে শিলং, ডাউকি থেকে নেমে আসা কিছু ভ্রমণ পিপাসুদের দেখাও মিলে। তবে তারা তাদের সীমানার ভেতরে থাকে। বলা যায়, পিয়াইন নদীর বুকে দুই দেশের ভ্রমন প্রিয় মানুষের হাট বসে যা নিঃসন্দেহে ভালোলাগার। একদিকে, পাহাড় ওপরদিকে অনেকটা সমতল বালুর প্রান্থর। ভারত অংশে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ের সংযোগকারী ঝুলন্ত সেতু এখানকার সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা। এই সেতুর নীচ দিয়ে স্বচ্ছ পানির বয়ে চলেছে ভাটির দিকে। পিয়াইন নদীর ঐ পানির উৎস ওপারের মেঘালয় পাহাড়। আমাদের দেশের ভ্রমণ বিলাসীরা তাদের ভ্রমণ পিপাসা মেটান এই পিয়াইন নদীর পানিতে পা ভিজিয়ে বা সাঁতার কেটে। বলতে ভুলে গেছি যে, এই জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় আধাকিলো হাটলে একটি ঝর্ণার দেখা পাওয়া যায় ভরা বর্ষায়, যার নাম সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা। স্থানীয়রা এর না দিয়েছেন মায়াবী ঝর্ণা। এখন পানি নাই তাই ঐদিকে কেউ যায় না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমাদেরকে শহরে ফিরতে হবে। তাই আস্তে আস্তে বিজিবি ক্যাম্পের উচু সেই পাহাড়ের দিকে বেয়ে উঠতে শুরু করি। ড্রাইভারকে আগে ফোন করে বলায় উনি ক্যাম্পের সামনে এসে হাজির হয়ে আমাদের অপক্ষায় ছিলেন। পিয়াইন নদীর বুক থেকে শতফুট উপরে উঠতে উঠতে সবাই বেশ ক্লান্ত। অবসন্ন শরীর নিয়ে গাড়ির পাশে এসেও যেন ভ্রমণের পিপাসা মিটছে না। পাহাড়ের উপর থেকে অপরূপ প্রকৃতি দেখায় সবাই মগ্ন হয়ে পড়ি। দিনের আলো নিভে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে, শুরু হয় গন্তব্যে ফেরার আয়োজন। কিন্তু মন চাইছিলো থেকে ফিরতে।  অগত্যা, পুণরায় আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করে উঠে পরি গাড়িতে। আমাদের গাড়ি ছুটে চলে যান্ত্রিক জীবনের পথে, শহরের পানে।

লেখক : জাবেদুর রশিদ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, 'আভিমত' ও 'আশ্রম' ।