অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
এক বিম্বিত বিস্মিত বিজয়-গাথা - অশুদ্ধ আচার্য্য

উৎসর্গ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নিহত-আহত-জীবিত সকল মুক্তিযোদ্ধা, ৩০ লক্ষ শহীদ ও তাঁদের পরিবার এবং সকল নির্যাতিত মানুষ।   

এক বিম্বিত বিস্মিত বিজয়-গাথা
প্রতি বছরের মতো -
এবারও আবার ফিরে এলো এ দিন। 
আজ বাংলাদেশের ৫১তম “বিজয় দিবস।” 
এ দেশের মানুষের কাছে এ দিনটি 
শুধু মাত্র একটি দিনপঞ্জির তারিখই নয় –
এ দিনটি যেন -
অশরীরী হয়েও ধারণ করে এক ব্যক্তিত্ব -
যেন সে হয়ে উঠে এক মূর্তমান জীবন্ত সত্তা।
সে দেখা দেয় প্রতি বার অনাড়ম্বর-আড়ম্বরে -
কান্না-হাসির বিষাদে আর হরষে মিশায়ে; 
সে আসে তাঁর মনের স্মৃতিঘরের
সব ক’টা দুয়ার খোলে; 
তার মস্তিষ্কের নিউরনে স্মৃতির দীপ্ত-শিখা জ্বালিয়ে;
যদিওবা সে আসে শীতের শুরুতে –
আসে সে শীত আর বসন্তের সাজে একাকার হয়ে;
সে আসে হাতে লয়ে এক গুচ্ছ রক্তজবা -
আর গলায় পরে নিবিড় ভালবাসার ছোঁয়ায়  
কোন এক সুনিপুণ হাতের গাঁথা 
একটা কিংশুক ফুলের মালা। 

এ দিনটি প্রতি বছরই যখন আসে - 
সে সাথে করে নিয়ে আসে একটি 
সাদা-কালো আর ধূসর রঙের স্মৃতিচিত্র। 
সেখানে প্রবল ত্রাসে ভেসে আসে - 
১৯৭১-এর বর্বর পাকিস্তানী হানাদারদের 
পৈশাচিক অপকর্মের এক নরক-চিত্র:
পাকিস্তানী সামরিক জান্তার  
কুখ্যাত “অপারেশন সার্চলাইট” নামের 
পঁচিশে-মার্চের ভয়ঙ্কর এক কালো রাতের
এক ভয়াল দৃশ্য।
সে রাতে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন, 
পিলখানার ই-পি-আর প্রধান কার্যালয়
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল সহ 
সারা শহর ভেসে যায় বাঙালির রক্তের বন্যায়।
তারপর দীর্ঘ নয় মাস ধরে 
সারা বাংলাদেশে চলে -
এ মানুষরুপি পাকিস্তানী হায়েনা 
আর এদের এ দেশীয় দোসর 
কুখ্যাত রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের নির্বিচারে 
গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নি-সংযোগ আর লুন্ঠন।
মাঠে-ঘাটে-হাটে-বাজারে-রাস্তায় আর বাড়ির আঙিনায় -
লাইন করে দাঁড় করিয়ে রাইফেলের ব্রাশ-ফায়ারে আর
বেয়নেটের খোঁচায় লাখো লাখো বাঙালি নিধন। 
বাংলার মানুষের রক্ত নিয়ে 
পাক-জল্লাদদের চলে পৈশাচিক হোলি-খেলা।
রাস্তার দুই ধারে পড়ে থাকে 
শিশু-কিশোর-যুবা-বৃদ্ধার অগণিত মৃতদেহ।
খালে-বিলে-নদীতে ভাসে –
কেবল মানুষের লাশ আর লাশ। 
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র-বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-কর্নফুলী
সুরমা-তিতাস-তিস্তা-ধলেশ্বরী-কুশিয়ারা-মধুমতি-ধরলা সহ
বাংলাদেশের ৪০৫টি নদীতে বয়ে যায় -
কেবল রক্তের বন্যা –
চারদিক থেকে ভেসে আসে 
লক্ষ শিশুর অভ্রভেদী আর্ত-চিৎকার।
আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় - 
সন্তান-হারা মাতা-পিতা আর –
মাতৃ-পিতৃ-হারা পুত্র-কন্যার করুণ রোদন।   
শুধু কি তাই!
লক্ষ লক্ষ নারী হয় এই জন্তুদের নির্মম নিপীড়ণের শিকার।
নির্যাতিতা কন্যা-জননী-জায়া আর বোনদের
মর্মন্তুদ বেদনায় ধরিত্রী হয়ে উঠে দ্বিধান্বিতা-কম্পিতা!
গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে –
জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয় হাজারে হাজারে গৃহ -
আকাশে উড়ে আগুনের লেলিহান শিখা।
ভয়ার্ত মানুষের মিছিল ছুটে চলে প্রতিবেশী ভারতের পানে - 
একটু আশ্রয়ের আশায়। 
সেখানেও শরণার্থী শিবিরে - 
কলেরা-ডায়রিয়া আর নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে 
প্রাণ হারায় হাজারে হাজারে মানুষ।
তবুও এই নরপিশাচদের নাই সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ -
নাই এই দানবদের লেশমাত্র লজ্জা।

এখানেই এ কাহিনির শেষ নয় - 
স্মৃতিছায়ায় ভেসে আসে আরো কত হৃদয়-বিদারক ছবি - 
সেখানে রাস্তার পাশে মা সজল চোখে দাঁড়িয়ে থাকে  
তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ছেলের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় -
কিন্তু তাঁর প্রতিক্ষার আর শেষ হয় না -
দিন যায় মাস যায় ছেলে আর ফিরে আসে না।
সদ্য বিবাহিতা বধূর স্বামী চলে গেছে মুক্তিযুদ্ধে - 
বধূ প্রতিটি ক্ষণ পার করে অধীর প্রতীক্ষায় - 
তার প্রিয়তম কবে ফিরে এসে 
ঘোচাবে তার বিরহ যন্ত্রনা -  
কিন্তু স্বামী আর কোনদিনই ঘরে ফিরে এলো না। 
পিতার অতি আদরের কন্যাটি তার বাবার জন্য 
চোখের জলে ভাসে দিন-রাত - 
কিন্তু তার বাবা কোথায় হারিয়ে গেল  
সে আর কোনদিনই তা জানতে পারলো না।
মায়াবতী বোনটি তার আদরের ভাইটির জন্যে 
প্রতিদিন আনমনে বসে থাকে বাড়ির আঙিনায় - 
কিন্তু ভাইটির আর কোন খবরই
কোন দিন আর সে পেলো না।  
বাবা-মায়ের অতি-আদুরী নির্যাতিতা কন্যাটি
যখন পাক-পশুদের ক্যাম্প থেকে মুক্ত হয়ে –
বাড়ির আঙিনায় ফিরে এলো -  
জঠরে নর-পশুদের নির্যাতনের চিহ্ন বহন করে -
তখন তার জন্মান্তরের আপন মা-বাবা বলছে - 
মা'রে আমাদের এই নির্দয় সমাজে 
তোরে স্থান দিব কী করে। 
শেষে এমন কত ধর্ষিতা-নির্যাতিতা মেয়ে
মুক্তির পথ বেছে নিলো আত্মহননে।
দেশ যখন প্রায় হানাদার-মুক্ত হবার পথে -
বিজয়ের মাত্র দিন দুই আগে পরিকল্পিতভাবে  - 
বাংলাদেশের ২৩২ জন সেরা বুদ্ধিজীবীকে
নৃশংসভাবে হত্যা করলো এই বর্বর দস্যুরা।
পাকিস্তানের কারাগারের ভয়ঙ্কর প্রকোষ্ঠে দীর্ঘ নয় মাস 
মৃত্যুর জন্য বঙ্গবন্ধুর অহর্নিশি আতঙ্কিত প্রতীক্ষা।
এ হলো আমাদের বিজয় গাথার বেদন-পর্বের
এক খন্ড স্মৃতি-ছায়া।

তবুও এ ১৬ই ডিসেম্বর -
এ "বিজয় দিবস" - আমাদের এ বিজয়ের মাস -
বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে 
সোনার অক্ষরে লিখা 
এক অমর মহাকাব্যের নাম।
এ কাব্যের প্রতিটি অক্ষরে বাঙময় হয়ে আছে   
এক গভীর বোধের অনুরণন।
এ মহাকাব্যের পরতে পরতে খেলা করে
এক অবিনাশী আনন্দ-বেদনার ছন্দ।
এ মহৎ-মহাকাব্যের পটভূমিটি হলো -
বাঙালির বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন,  
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং  
১৯৭০-এর পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে
আওয়ামীলীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন;
আর এর ভূমিকাটি হলো -
১৯৭১-এর ৭ই মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের
ঐতিহাসিক জনারণ্যে বাঙালি জাতির জনক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হৃদয় মথিত করা ভাষণ -
যেখানে এ মহা-মানবের বজ্রকণ্ঠে দীপ্ত ঘোষণা: 
"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"
এই মহাকাব্যের বিশেষ অধ্যায়গুলো হলো –
১৯৭১-এর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে 
পাকিস্তানীদের হাতে গ্রেপ্তারের আগে 
আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা।
১৯৭১-এর ১০ই এপ্রিল –
তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে ও প্রধানমন্ত্রিত্বে 
বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” গঠন।  
পাকিস্তানের বর্বর ইয়াহিয়ার হিংস্র সেনাদের বিরুদ্ধে –
১,৪৭,৫৩৭ জন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধার 
অস্র হাতে মরণ-পণ লড়াই -
ত্রিশ লক্ষ মানুষের দেশের জন্য আত্ম-বলিদান।
প্রতিবেশী ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং,
পৃথিবীর আরো অনেক বন্ধু রাষ্ট্রের 
সহৃদয় সমর্থন-সহায়তা।    
এ কাব্যের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছে 
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা
দেশের সব রণাঙ্গনের মুক্তিযুদ্ধের খবর;
দেশ-মাতার প্রতি আত্ম-নিবেদনের আকুতিতে ভরপুর 
অসাধারণ সব উদ্দীপনামূলক হৃদয় ছোঁয়া গান;
পাকিস্তানের কুখ্যাত কসাই টিক্কা খান
আর রাও ফরমান আলির উদ্দেশে  
এম আর আখতার মুকুলের তির্যক-"চরমপত্র"।
এই কাব্যের সাথে আরো গেঁথে আছে - 
বিজয়ী-বীরের বেশে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে ফেরা।  
ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কাছে
পরাজিত পাকবাহিনীর ৯১,৬৩৪ সদস্যের
আত্মসমর্পনের এক সরস-দৃশ্য। 
এই মহৎ মহাকাব্যের সাথে লীন হয়ে আছে -
সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মাঝে আঁকা
বাংলাদেশের হলুদ মানচিত্র খচিত অমর পতাকা। 
সাড়ে সাত কোটি মানুষের কণ্ঠে
ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত অবিনাশী এক শ্লোগান "জয় বাংলা।"
এ মহামহিম মহাকাব্যের সারাংশটি হলো - 
চব্বিশ বছর ধরে পাকিস্তানী স্বৈর-শাসকদের 
শোষণ, নিপীড়ন আর অপশাসন থেকে মুক্ত হয়ে 
বাঙালির পরম কাঙ্ক্ষিত অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
আর এই মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়টির সাথে 
এক সূত্রে গাঁথা হয়ে আছে –
বাংলাদেশের সাড়ে-সাতকোটি মানুষের কণ্ঠে গীত - 
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত বাঙালির অমর গীতি - 
"আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।"

ছবি কৃতজ্ঞতা: গুগল ইমেজ  

ডিসেম্বর ১৬, ২০২২ সাল 
অশুদ্ধ আচার্য্য
ইকালুইট, নুনাভুট, ক্যানাডা