অটোয়া, বুধবার ১৯ জুন, ২০২৪
সঙ্গীতসন্ধ্যা ‘স্বপ্নের অন্তরে’ – সুপ্তা বড়ুয়া

গান আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক অংশ। গান আমাদের শত শত কষ্টের ভেতর জীবনের স্বপ্ন দেখায়, পরিশ্রান্ত জীবনে এনে দেয় প্রশান্তি, এই দূর পরবাসে প্রেরণা। আর সেই গান যদি হয় কোন সুরেলা, সুকন্ঠী কারো কন্ঠে নিজের ভাষায় নিজের দেশের স্মৃতিময় গান, যেসব গানের সাথে আমাদের বেড়ে ওটা, তাহলে তো কথাই নেই। আবার সেই সুরেলা কন্ঠশিল্পীর যদি একক সঙ্গীতসন্ধ্যা হয়, তাহলে বোঝাই যায় শিল্পী হিসেবে তিনি কতটা সমৃদ্ধ, অভিজ্ঞ, গুণী আর পরিপক্ব। কানাডার রাজধানী অটোয়া অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি শহর, যেখানে বাঙালীদের এমন সব শিল্পী রয়েছেন যারা কয়েক ঘন্টা পেশাদারএবং অভিজ্ঞ শিল্পীদের মতো দর্শককে তাদের গানে ভুলিয়ে রাখতে পারবে, পারবে দর্শকদের সামনে বাংলার সঙ্গীতের মধুরতা ছড়িয়ে দিতে আটলান্টিক মহাসাগরের এপাড়েও।

সেই অনেক গুণী শিল্পীদের একজন আমাদের সবার প্রিয় নাসরীন শশী, যার মাঝে অনেকেই রুনা লায়লার কন্ঠমাধুরতা শুনতে পান। আসলে বলতে গেলে বাংলা গানের বিশাল এক ভান্ডার তার দখলে। অনেক প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে হয়ে গেলো নাসরীন শশী'র সঙ্গীত একক সঙ্গীতসন্ধ্যা 'স্বপ্নের অন্তরে' এবং একই নাম 'স্বপ্নের অন্তরে' নামে একটি মিউজিক এ্যালবাম প্রকাশনা উৎসব উপলক্ষে নানা ধরণের সমৃদ্ধ, মধুময়, দারুণ সব গান নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন আমাদের মতো সঙ্গীত পিপাসুদের জন্য কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৈলাস মিত্তাল থিয়েটার হলে জুলাইয়ের ১৬ তারিখ, রবিবার। নাসরীন শশীর একটি মৌলিক গান "আর কিছুক্ষণ থেকে যাও" এর সাথে আফরোজা খানের নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে সঙ্গীতসন্ধ্যাটির শুভ সূচনা হয়। এরপর শিল্পী মঞ্চে প্রবেশ করেন রুনা লায়লার বিখ্যাত গান 'যখন থামবে কোলাহল'এর মাধ্যমে। এরপর শিল্পী একাধারে শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সাবিনা ইয়াসমিন, লতা মঙ্গেশকর, মিতালী মুখার্জি, লাকী আখন্দ, রাধারমণের লোকগীতি গানসহ নিয়ে আসেন নানা স্বাদের গান। নাসরীন শশী দর্শকদের সামনে ৭ ভাষায় গান গেয়ে শোনান বাংলা, হিন্দী, সিন্ধী, পাঞ্জাবি, উর্দু, তাজিক এবং পর্তুগিজ উল্লেখযোগ্য। পরিবেশন করেন ওপাড় বাংলার সোমলতা, মিতালী মুখার্জি কিংবা সার্বজনীন লতা মঙ্গেশকর'এর গানসহ আরো বহু শিল্পীর গান আমাদের সামনে। ইন্দ্রাণী চৌধুরীর 'নৃত্যশালা'র কিশোরী শিল্পীবৃন্দ, চন্দ্রিমা, মিথিলা, পূর্বা, পৃথা এবং ওয়ানিয়া, নিয়ে আসে নাসরীন শশীর আরেকটি মৌলিক গান "স্বপন মেখে চোখের পাতায়"এর সাথে নৃত্য। এছাড়াও একটি হিন্দী গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করে প্রকৃতি।

অনুষ্ঠানটি মূলত ছিলো নাসরীন শশীর একক সঙ্গীত এ্যালবামের প্রকাশনার মূল লক্ষ্য সাথে দর্শকরা পেয়ে যান শিল্পীর উপস্থিতি। আর কি চাই! অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ভাগে নাসরীন শশীর মৌলিক গান 'আজ এই ফাল্গুনে' এই গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যশালার কর্ণধার ইন্দ্রাণী চৌধুরী। নাসরীন শশীর এই মৌলিক গানটির গীতিকার শাহীনুর ইসলাম, সংগীতায়োজন রুপণ চৌধুরী। এই গানটির কথা আলাদা করে উল্লেখ করার কারণ হলো, প্রত্যেক শিল্পীরই একটি out of the world ধরণের গান থাকে। নাসরীন শশীর এই গানটি যদি সঠিক প্রচারণা পায়, তবে একদিন মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। আরেকটু বাড়তি করে বলতে চাই ইন্দ্রাণী চৌধুরীর নৃত্য পরিবেশনাও এই গানটির মর্মার্থ যেন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলো অনুষ্ঠান জুড়ে। সেজন্য উভয় শিল্পীকেই আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অত্যন্ত আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।


প্রকাশিত এ্যালবামে নাসরীন শশীর গান রয়েছে ৮টি, যেই গানগুলোর কথা লিখেছে্ন এই অটোয়া শহরেই বসবাসরত তিনজন গীতিকবি মহসীন বখত, শাহ বাহাউদ্দীন শিশির এবং শাহীনুর ইসলাম। মহসিন বখত বাংলা ভাষায় বলতে গেলে একজন জ্ঞানভান্ডার, যার কারণে তাঁর গানের কথাগুলো বাংলার ভাষার সমৃদ্ধ এবং উৎকৃষ্ট শব্দে ব্যাঞ্জনময়। অন্যদিকে শাহীনুর ইসলামের গানের কথাগুলো যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দোলাচলে সর্বদা অনুভূত শব্দরাজি। আমরা সত্যিই গর্বিত অটোয়া শহরের এসব গুণী মানুষদের সাহচর্যে থাকতে পেরে, তেমনি নানা গুণে গুণান্বিত আমাদের সকলের প্রিয় শাহ বাহাউদ্দীন শিশিরও একজন অত্যন্ত সুলেখক। সিডি'র গানগুলোর সংগীতায়োজন করেছেন রুপন চৌধুরী এবং রিপন চৌধুরী।


সঙ্গীত সন্ধ্যায় নাসরীন শশীকে বাদ্যযন্ত্রে সঙ্গ দিয়েছেন টরন্টো থেকে আগত মেহেদী ফারুক কিবোর্ড, জয় সরকার গিটার, সৌরভ ধ্রুব অক্টোপ্যাড এবং মন্ট্রিয়েল থেকে আগত ঝলক দেব চৌধুরী তবলা, মিঠুন কুমার দাস বেইস গিটার। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় ছিল শিউলি হক এবং এইডেন সেঙ্ক। Royal LePage Team Realty, Ottawa আয়োজিত অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল, Prince Mortgage Team, Shamim Hasan Law, La Via Immigration, ProPlus Tax, Balance Immigration & Education Services Canada, Immigration Beta, Quazi Mowla, CIBC; Shah Bahauddin, Royal LePage Team Realty; and Tanvira sultana, Industrial Alliance. 

নাসরীন শশী এরকম আরো সুন্দর, শ্রুতিমধুর, মননশীল মৌলিক বাংলা গান আমাদের উপহার দিবেন তার মোহনীয় কন্ঠে সে কামনাই করি। অদূর ভবিষ্যতে তার গান গুলো বর্তমান প্রজন্মের জন্য স্পটিফাই কিংবা আই-মিউজিকেও দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। বর্তমানে অনেক কম্পিউটারে (পিসি/ল্যাপটপ) সিডি চালানোর নির্ধারিত ডিস্ক নেই। নতুন প্রজন্মের জন্য তার এই উদ্যোগ, কোন মিউজিক এ্যাপে গানগুলো দেওয়া, সত্যি গানগুলো শোনার সুবিধা করে দিবে। আমরা ভবিষ্যতে আরো সুন্দর, মনোমুগ্ধকর এরকম সঙ্গীতসন্ধ্যা উপভোগ করবো, সে আশা রাখি। নাসরীন শশীর গানের প্রতি একাগ্রতা এবং নিষ্ঠাকে সাধুবাদ জানাই। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান এমন শিল্পীর গান সামনাসামনি দর্শক সাড়িতে বসে শুনতে পেরেছি। সঙ্গীতের সুস্থ চর্চা বিরাজ থাকুক এই প্রবাসেও। সঙ্গীত আমাদেরকে শুদ্ধ করুক, বাঁচিয়ে রাখুক আমাদের সংস্কৃতিতে এই প্রার্থনা রইলো।

সুপ্তা বড়ুয়া
অটোয়া, কানাডা

নোট: অনুষ্ঠানের ছবিগুলো ব্যবহার করতে অনুমতি দেয়ার জন্য আমরা মন্ট্রিয়েল থেকে আগত আলোকচিত্র শিল্পী আরিফ সিদ্দিকীর কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।