অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩০ মে, ২০২৪
আশ্রম আয়োজিত 'আমার মুক্তিযুদ্ধ- অন্তরঙ্গ পাঠ' :মুহম্মদ বজলুশ শহীদ

শাহেদ বখত ময়নু ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল আঠারো বছর আগে, তাঁর ছোটভাই মহসীন বখতের বাসায়। আমরা তখন প্রিন্স এলবার্টে মহসীন ভাই আর খসরু ভাইয়ের প্রতিবেশি। বৈকালিক চায়ের টেবিলে  তিনটি পরিবার একত্রিত হতাম, মাঝে মধ্যে বিশেষ দাওয়াত ও থাকতো। তেমনি এক দাওয়াতে মহসীন ভাইয়ের বৈঠক খানায় দেখলাম - এক সুদর্শন সুপুরুষ বসে আছেন। নিজের পরিচয় দিয়ে হাতটা বাড়াতেই বললেন - আমি শাহেদ বখত, মহসীনের বড় ভাই। 

সিলেটি ভাষার একটা শ্রতি মাধুর্য আছে যা কানাডায় যাবার পর থেকেই আমাকে টানছিল। তাই সুযোগ পেলেই একটা প্রসঙ্গ টেনে গল্প শুরু করতাম। ময়নু ভাই কিভাবে এলেন এদেশে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে, কিভাবে এখানে রেস্টুরেন্টে ব্যবসা শুরু করলেন এসব কথার ফাঁকে এলো তিনি কি ভাবে ভারতে গেলেন, কিভাবে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে এসে রাজাকারদের হাতে বন্দী হলেন, পাকিস্তানি মিলিটারি  ক্যাম্পে নির্যাতন ও বিভীষিকার কথা। উনার গল্পের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিলাম ১৯৭১ এ-  আমার মুক্তিযুদ্ধের মাঝে। 

গেরিলাদের জীবনে তখন কমবেশি একই ধারা, ঘাত অভিঘাত। আমি আর  মন্জু ভাই বিকেলের ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছিলাম নাটোর - রাজশাহী সড়ক ধরে।  নাটোরের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে আসতেই আমাদেরকে থামানো হলো।  আমার পাশ থেকে ধরে নিয়ে গেলো মন্জু ভাইকে পাক মিলিটারি, আমাকে নাম জিজ্ঞেস করে ছেড়ে দিল। আমি বাসায় পৌঁছে খবর দিলাম।  নাটোরের তখনকার রাজাকার কমান্ডার ওয়ারেশ আলী উনার দূর সম্পর্কের চাচা হতেন। তাঁরই  মুচলেকায়  তিনি প্রাণে বাঁচলেন।  শর্ত থাকলো প্রতি সপ্তাহে তাঁকে  নাটোরের ফুল বাগানে হাজিরা দিতে হবে - মিলিটারি ক্যাম্পে। তিনি সপ্তাহ শেষে এসে মিলিটারি ক্যাম্পে বন্দীদের আর্তনাদ,  কিভাবে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো সব কিছুর যে বর্ণনা দিতেন ময়নু ভাইয়ের কথার  মাঝে সেই একই প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। তাঁর মুক্তি যুদ্ধজীবনের কাহিনীগুলো শুনে মনে হচ্ছিল - এগুলো একদিন হারিয়ে যাবে। তাই্ বললাম - ভাই, এগুলো লিখে ফেলেন,প্রয়োজনে মহসীন ভাইয়ের সহয়তা নিন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল- মহসীন ভাইয়ের বেশ কিছু লেখা তাঁর পাঠাগারে বসে পড়বার আমার সুযোগ হয়েছিল- বেশ শক্তিশালী লেখা যা বাংলাদেশের সাহিত্য পত্রিকায় সে সময় ছাপা হয়েছিল। 

আজ আঠারো বছর পর ময়নু ভাইয়ের মুক্তি যুদ্ধের সেই কাঙ্ক্ষিত  বই -আমার মুক্তিযুদ্ধ' আত্ম প্রকাশ করেছে যা  সম্পাদনা করছেন তাঁর অনুজ- মহসীন ভাই। আমার কাছে তা এক মহা আনন্দের বিষয়। আর সেই আনন্দে আরো উদ্বেলিত হলো - যখন শুনলাম 'আশ্রম' মুক্তি যুদ্ধের সূর্য সন্তানের এই বইটির অন্তরঙ্গ পাঠের আয়োজন করেছে। বলে রাখা ভালো -অটোয়া থেকে প্রকাশিত 'আশ্রম' শুধু একটা সাহিত্য ম্যাগাজিন নয়, আশ্রম মাঝে মধ্যেই অটোয়ার সাহিত্য, সংস্কৃতি  ও শিল্প জগতকে আরো বিকশিত করার জন্য নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি এর আগে বিশিষ্ট লেখক- গণিতবিদ অধ্যাপক মিজানকে নিয়ে আশ্রম আয়োজিত স্মৃতিচারণ মূলক একটা  অনুষ্ঠানে গিয়ে ঋদ্ধ হয়েছিলাম। 

এছাড়া আশ্রম আটটি একক সংগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে যা' স্থানীয় সংগীত ও সংস্কৃতি  জগতকে প্রাণবন্ত করেছে যার দু'একটিতে যাবার সুযোগ আমার হয়েছ। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা কবির চৌধুরী ভাই আর সম্পাদক বিশিষ্ট কবি সুলতানা শিরীন সাজিকে আমাকে এই সৃষ্টি সুখের আনন্দে উল্লসিত হবার সুযোগ দেবার জন্য তাঁদের প্রতি  অন্তলীন শুভেচ্ছা, শুভাশীষ ও কৃতজ্ঞতা।   

যেহেতু 'আমার মুক্তিযুদ্ধ' বইটির উপর অন্তরঙ্গ পাঠ, আমার মনে হয়েছিল আজ অর্ধ শতক বছর পরে  আমি  সে সময়ের গেরিলা জীবনের আলো-আঁধারি পথে হেঁটে যাব, ব্রহ্মপুরের ভরা হাটে রাজাকারদের অস্ত্র ছিনেয়ে নিয়ে বারা নই নদীতে নাও ভাসিয়ে চলে  যাবো, বিল হালতি বা আঘদিঘা গ্রামের সম্মুখ যুদ্ধ, মাঝদিঘা গ্রামে পৌষ মাঘের শীতে খোলা মাঠে রাতে জুবু-থুবু হয়ে জোস্না স্নানে অবগাহন, ভোরে ঘন কুয়াশা মাঝে গেরিলা পায়ে নাটোরকে যেভাবে চারদিক থেকে ডিসেম্বরে ঘিরে ফেলেছিলাম তারই স্মৃতি চারণ করতে করতে ময়নু ভাইয়ের বইয়ের প্রতিটি শব্দে স্বপ্নচারী মনটা ফিরে যাবে ৭১'এর গেরিলা আশ্রমে। কিন্তু প্রথম দিকের বক্তাদের বইটার আলোচনার বাইরে বিষয় বহির্ভূত কথা  শুনতে হলো চারটে ঘন্টা বসে।

বাংলাদেশের নাট্য জগতের অনন্য নাম আফরোজা বানু এবং বাচনিক শিল্পী রমা বসু সময়াভাবে তড়িঘড়ি করে শেষ করলেন তাঁদের অন্তরঙ্গ পাঠ। বইয়ের লেখক - শাহেদ বখত ময়নু ভাই, সময়ের বৃত্তে বন্দী হয়ে ছড়াকার লুৎফর রহমান সাহেবের কতকগুলো প্রশ্নের জবাবও তড়িঘড়ি শেষ করলেন।

আমি তৃপ্ত হতে না পারলেও  এই অনুষ্ঠানে এসে দেখা পেলাম মুক্তি যুদ্ধের বিশিষ্ট গবেষক তাজুল মোহাম্মদ  (যাঁর লেখা অনেক বই আমি পড়েছি), বাংলাদেশের বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, এইসব দিন রাত্রির শক্তিশালী অভিনেত্রী আফরোজা বানু, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক জনাব সৈয়দ মহসীন রেজা সহ আরো অনেক বিশিষ্ট জন ও  মুক্তি যোদ্ধাদের  সাথে। 

প্রিয় কবি সুলতানা শিরীণ সাজি ' আগুণের পরশ মণি ছোঁয়াও প্রাণে' গান দিয়ে শুরু করেছিল তার অনবদ্য উপস্হাপনা, যা শেষ হলো আশ্রম প্রতিষ্ঠাতা  জনাব কবির চৌধুরীর অসাধারণ এক বক্তব্যে।  

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহেদ বখত ময়নু ভাইয়ের- আমার মুক্তি যুদ্ধ বইটি আমার হাতে। আমি  আত্মনিমগ্ন হয়ে  পড়ছি আর ফিরে যাচ্ছি আমার মুক্তি যুদ্ধের দিনগুলোতে -
'হায়রে আমার নানা রঙের দিলগুলি।'

মুহম্মদ বজলুশ শহীদ
অটোয়া, কানাডা