অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
ঐ নূতনের কেতন উড়ে - মিঠুন চৌধুরী

তুনদের ভাষা পুরনোরা ‍বুঝতে পারছেন কী? নবীনরা বলছে পরিবর্তনের কথা। যে পরিবর্তন সবার জন্য সুফল বয়ে আনবে। আগামীর বাংলাদেশ যে ডাক দিয়ে যাচ্ছে তা ক্ষমতার শিখরে বসে থাকাদের কানে পৌঁছাচ্ছে কী? যদি নূতনের আহ্বান শুনতে না পান তবে ছেড়ে দিতে হবে স্থান। চলে যেতে হবে বিস্মরণের পথে। 

“এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে। এদিনেরে নিবে তারা সেই দিনেরও কাছে”- আব্দুল কুদ্দুস বয়াতি এ গান গাইতে গাইতে যখন এগিয়ে যেতেন তখন তাঁকে অনুসরণ করে এগিয়ে যেত শিশু-কিশোররা। সেই গানের বাণী আজ তারা সত্য বলে মেনেছে। এই দিনকে সেই দিনের কাছে নিয়ে যেতে নিজেরাই পথে নেমেছে। 

এই দ্রোহের আগুন একদিনে জমেনি। এই ক্ষোভ শুধু একটি ঘটনাকে ঘিরে নয়। প্রতিদিনের দিনযাপনের শত গ্লানি আজ জড়ো হয়েছে এক মোহনায়। বৃদ্ধ আর পুরনোরা হয়তো ভাবছেন- কি আর হবে প্রতিবাদ করে? এভাবেই তো চলছে, এভাবেই চলবে। আর তো মাত্র কটা দিন। কিন্তু তারুণ্যই পারে সব বাধা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যেতে। পারে, কারণ তার কোনো পিছুটান নেই। নেই কোনো দায়বদ্ধতা, স্বার্থের হিসেব-নিকেশ, নেই পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা। তারুণ্য জয়ী হতে জানে। আরও জানে সত্য কী, আর কোনটা ন্যায়ের পথ। তাদের মস্তিস্কে জটিলতা নেই, হৃদয়ে কালিমা নেই। আছে শুধু দুর্বার সাহস। 

চোখের সামনে তারা দেখে দুটো বাসের চালকের এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় পোকা-মাকড়ের মত পিষ্ট হয় সহপাঠীরা। তখনই তারা প্রতিবাদ করে। এই প্রতিবাদ সাহসে ভরপুর এক সুন্দর। এই প্রতিবাদ তৈরি করে প্রতিবাদের নতুন ভাষা। 

এই বাংলাদেশের সড়কে কত মায়ের সন্তানের রক্ত ঝরেছে, কত কান্নার জলে ধোয়া হয়েছে? তা কী শুধুই সংখ্যা? যার গেছে সেই শুধু জানে হারানোর ব্যথা। প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ – যিনি ইতিহাস খুঁড়ে তুলে আনেন মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, তাঁকেও মরতে হয় সড়কে। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। তারেক মাসুদ তাঁর পরিবারের জন্য যতটুকু তার চেয়েও বেশি এ দেশের। তাঁকে হত্যা করা হলো, আর তখনো বিকারহীন মন্ত্রী। মিশুক মুনীরের সহধর্মিনীর কান্না জমা আছে জাতির নিউরনে। প্রতিদিন সড়কে যারা খুন হচ্ছেন তারা কী শুধুই সংখ্যা? প্রতিটি প্রাণের সাথে স্তব্দ হয়ে যায় প্রতিটি পরিবার। বাকিটা জীবন ধুকে ধুকে চলতে হয় তাদের। ধ্বংস হয় পরিবারের প্রতিটি সদস্যের স্বপ্ন। এর খোঁজ কী রাষ্ট্র রাখে? 

রাখে না, আর রাখে না বলেই ক্ষোভ জমা হয়। এখানে প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নামতে হয়। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়। তারপরও প্রতিকার মেলে না। এক ইস্যুর ভিড়ে অন্য ইস্যু, এক আন্দোলনের ভিড়ে অন্য আন্দোলন হারিয়ে যায়। চাপা পড়ে থাকে অপ্রাপ্তির বেদনা। প্রতিদিনের অনিয়ম আর অপ্রাপ্তির বিপরীতে জমা হয় বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ। জমে থাকা বারুদ একদিন স্ফুলিঙ্গের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে ভিসুভিয়াস। 

নবীন কিশোর নেমে আসে পথে। কতটা ক্ষোভ আর অনিরাপত্তা জমা হলে অভিভাবকরাও রাজপথে নামতে দেন শিশুদের। সেটা নীতি নির্ধারকরা ভাবেন না হয়তো। মা-বাবা জানে চারপাশে শ্বাপদের ভিড়। পথে পথে ঘাতক বাস-ট্রাক, এখানে-ওখানে ছড়ানো বিদ্যুতের তার, নির্মাণাধীন ভবনের খসে পড়া ইট, অপচিকিৎসার খড়গ, বিষ মেশানো খাবার আর সর্বোপরি দুর্নীতির এক মরণ জালে জড়িয়ে গেছে সন্তানের ভবিষ্যত। নিজেরা যখন অক্ষম তখন সন্তান পথে নামলে মা-বাবা আর বাধা দেন না। মনে মনে হয়ত ভাবেন- আমরা পারিনি, ওরা পারবে। 

হ্যাঁ, ওরা পারবে। সবসময় পেরেছে। পৃথিবীর সকল দেশে, সকল কালে। জাতির জনককে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদরা পেরেছিলেন। জাদরেল সামরিক শাসকের সিংহাসন কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই তোফায়াল আহমেদকেও সঠিক পথ দেখায় আজকের কিশোর। ন্যায়ের দাবি মেনে নিয়ে সে পথেই চলে যান তোফায়েলরা। সত্য ও ন্যায়ের দাবি এমনই অমোঘ। 

যে পুলিশ বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করবে সে পুলিশেরই লাইসেন্স নেই। এ সত্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আজকের কিশোর। লিখে দেয়- পুলিশ আঙ্কেল আমাদের নাস্তার টাকা তোমাকে দেব। নিজের সন্তানকে এভাবে রাস্তায় দেখে কোনো কোনো পুলিশেরও হাত থেমে যায়। তাঁদেরও সন্তান স্কুল বাসের জন্য পথে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন। তাঁদেরও বুকে কান্না জমা। পথের বাঁকে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনও যেন চেয়ে থাকে অন্তরাল থেকে। 

কিন্তু তবুও ঘাতকের পাষাণ হৃদয় নড়ে না। এ পৃথিবী মানুষের, দানবের নয়- এ কথা তাদের মনে পড়ে না। অপরাধীকে বাঁচিয়ে যে নেতা নেতৃত্ব ধরে রাখে সে মূলত আগলে রাখে পাপের জগত। অন্ধকার ডেকে আনে অন্ধকারকে। পাপীরা যার যা আছে তাই দিয়ে জিম্মি করতে চায় সাধারণ মানুষকে। যে চালক অন্যের সন্তানকে চাকায় পিষ্ট করে হাত ধুয়ে খেতে বসে তার থালায় তো বিষ মেশানো খাবার। যে ব্যবসায়ী খাবারে বিষ মেশায় তার সন্তান আসক্ত মাদকে। এই সত্য আজকের দিনে। তবুও তাদের চেতনা ফিরে না। দানব কখনো মানুষ হয় না। 

কিন্তু ঘুনে ধরা সমাজ আর রাষ্ট্র দানবকে প্রশ্রয় দিলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এই নবীন কিশোরদের মনের ক্ষোভ সঞ্চারিত হয় সকলের মনে। মানুষ এগুতে চায়। চারপাশে শুনি দেশও এগিয়ে গেছে। গাড়ি ফেলে ঘোড়া চলে গেলে গন্তব্য পৌঁছে তবে কী লাভ? আলো হাতে হেঁটে যাওয়া একাকী যাত্রী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন- ‘সব জায়গাতে উন্নতি দেখছি। এখন ন্যায়ের ভিত্তিটা যদি আসে। আসবেই। না হলে যে বিত্ত সম্পদ আমরা গড়ছি তা রক্ষা করা যাবে না। বিত্তশালীরাই তাদের বিত্তকে রক্ষা করার জন্য ন্যায়কে আনতে বাধ্য হবে। যদি ন্যায় আসে আমাদের অনেক অনেক সম্ভাবনা আছে।’ বিত্তশালীদের বিত্ত রক্ষার জন্য হলেও তো মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার দৌড়ে থাকা দেশটা অনেক বেশি মানবিক হওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠা করা উচিত ন্যায়। তা না হলে ওই যে নূতনের কেতন ওড়ে তা উড়িয়ে নিয়ে যাবে সকল অন্যায়-অমানবিকতা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ‘চির উন্নত মম শির’- বাংলাদেশে লেখা হতে নতুন ইতিহাস। তারই পদধ্বনি শোন যায়। 

“.. ঐ ভাঙ্গা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
বধূরা প্রদীপ তুলে ধর!
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর” (প্রলয়োল্লাস, কাজী নজরুল ইসলাম)। 

মিঠুন চৌধুরী
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, স্টাফ রিপোর্টার।
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।