অটোয়া, বৃহস্পতিবার ৩ এপ্রিল, ২০২৫
অপেক্ষার ফাগুন - শম্পা চক্রবর্ত্তী

কেমন আছিস রে বিধু? 
অনেকদিনপর লিখছি তোকে শুধু
চিনতে পেরেছিস?আমি খেপুপাড়ার দীপু
যে মার খাওয়ার ভয়ে সর্বদা থাকতাম জবুথবু।

মিনু আর ফাগুন আছে তো ভাল?
পলাকে দেখিনি অনেকদিন হলো
পলার শরীর এখন কেমন?
রাতবিরাতে জ্বরটা কি আগের মতন?

আচ্ছা বিধু কতদিন দেখা হয়নি বলতো!
সময়টা যেন ট্রেনের মত ছুটে চলল।
মা নেই আজ পাঁচ বছর,
বাবাকে তো হারিয়েছি সেই শৈশবে,
বরুণাটাও বিছানায় শয্যাশায়ী আজ চার বছর।

আচ্ছা বিধু বলতো কেন এমন হয়?
আর কেনইবা পোহাতে হয় এত দুর্ভোগ!
ভোগ করতে করতে হয় না তো এর কোনো বিয়োগ
কেনইবা একই হয় তোর আমার কপালের লিখন!
যেখানে থাকে না সুখের আবাসন।

সুখ!সুখ!হা হা হা বড্ড হাসি পায়....
সুখ যেন কটুদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলছে আয় আয়।

আচ্ছা বিধু 
তোর মনে পড়ে সেই বেলগাছটার কথা
যেটার পাশে বসে শিউলির মালা গাঁথা!
তুই হয়তো ভাবছিস আমি অরুণিমার কথা বলছি
না রে আমি তো বলছি সেই শিউলিতলা, বেলগাছ,বড়উঠান,পুকুরপাড় আর গৌরাদের বাড়ির বৌঠাকুরানীর কথা
বৌঠাকুরানীকে খুব মনে পড়ে রে
বড্ড ভালবাসত তোকে আর আমাকে
আদর করে খাওয়াত বসে লুচি আর তরকারিতে
কালো ছিল বলে আমি নাম দিয়েছিলেম কৃষ্ণকলি
আর তুই বলতিস- না না মহাকালী।

তোর মনে আছে,
সেবার বৌঠাকুরানীকে কি মারাটাই না মেরেছিল ওই পাষণ্ড লোকটা!
তুই আর আমি প্রতিশোধ নিতে লুকিয়ে রেখেছিলেম-
স্নান করে উঠে পরার পাজামাটা।

বিধু সেদিন দেখা হয়েছিল
কার সাথে বলতো!
তুই হয়তো ভাবছিস কাজল আর কেয়ার কথা
না রে দেখা হয়েছিল বিজয়লেখার সাথে
কলেজ রোড থেকে ফেরার পথে
যে রোজ দাঁড়িয়ে থাকত ফুল হাতে
বিজয়লেখার বিয়ে হয়েছে বরগুনায়
গার্মেন্টসই তার এখন একমাত্র সহায়
বরটা মরেছে বহু আগে,
মেয়ে দুটিকে বিয়ে দিয়েছে গড়িয়াহাটে।

কত স্মৃতি, কত পথ চলা, কত নিস্তব্ধ সকাল
তিন কাপ চা,তিনটে চেয়ার আর গল্পগাঁথা
চায়ের দোকানদার দীনেশ কাকা বলতেন-
তিনটে মাথা
আর জসীম স্যার ডাকতেন থ্রি এডভ্যানচারার।

ছেঁড়া পাতা গল্পগাঁথা,ভাঙা ছাতা
কবে হবে বলতো বরুণার সেই রঙিন কাঁথা!
মায়ের কাছে শিখেছিলাম
পড়ালেখা করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে।
পড়ালেখা তো অনেক হল
গাড়িচড়া আর হল কই!
তবে হ্যাঁ বরুণা কিন্তু আজ গাড়ি চড়ে
আমি কিনে দিয়েছি ৫০০০ টাকার দাম ধরে
কি গাড়ি জানিস?চার চাকার হুইল চেয়ার
বরুণার নেই তো  কোনো অভাব কেয়ার।

অরুণিমার বিয়ে হয়েছে মগবাজারে
রোজ সে চড়ে প্রাইভেট কারে।
একটা ছেলে আর একটা মেয়েতে
সংসার পেতেছে ভাল করে।
হাজবেন্ট থাকে এ্যামেরিকায়
এখানে তার ও ভাল কামাই।

আমার বুকটা খাঁ খাঁ করে
অপেক্ষায় আছি কত বছর ধরে
রাতের ট্রেনটা স্টেশন ছাড়ে
বরুণাটাও আঁচল ঢেকে কেঁদে মরে।

বিধু আর কত অপেক্ষা
আমার গলা শুকিয়ে পায় তেষ্টা
আমার কোলটা কি তবে খালিই থাকবে!
অন্ধকারে কেউ কি আমায় বাবা বলে ডাকবে?

জানিস বিধু,
বরুণা কিসব স্বপ্ন দেখে
মা নাকি ওর পথ চেয়ে
ওর নাকি খুব মাথা ঘুরে
শ্মশান থেকে কে নাকি বলে
বরুণা কবে আসবি মা?

বরুণা আমায় ডেকে বলে
ওপারে গেলে কে দেবে মুখে আগুন!
আমি বলি - রাখো তো এসব তোমার বাজে কথা
ফালতু প্রলাপ ছাতার মাথা
বরুণা বলে আসবে ফাগুন
চিতেয় তখন জ্বলবে আগুন।

আমি তখন নিস্তব্ধ
বরুণা বলে ওগো আর করো না কোনো শব্দ
পরজন্মে ঠিক হব গর্ভধারিণী জননী,
আমায় তুমি ক্ষমা করগো হে মাতৃভূমি ধরণী।

শুনশান রাত, কালো মেঘ
আমি বসে তার শিয়রে
চোখের জলে ভিজছে কপাল বরুণার
এ যেন হারিয়ে ফেলার ভয়ে অশ্রু
পিদিমের আলো নিভু নিভু
বাঁচার আশাটা ছেড়ে দিয়েছি বিধু
ছবির দিকে তাকিয়ে বলছি বরুণার
আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার প্রেরণা। 

ছোট্ট গোপন বাক্সে লুকিয়ে থাকা আশাটা বলছে-
দুঃখ করো না,পরের বার ঠিক আসবে ফাগুন
তোমার আর বরুণার হয়ে
এই ভেবে আমিও অপেক্ষার নয় প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি
ফাগুনের পথ চেয়ে।

জীবনের আলো নিভু নিভু
জানিনা কবে নিয়ে যাবে প্রভু-
ভাল থাকিস রে বিধু
ফাগুন আর মিনুকে দেখিস শুধু
সুযোগ পেলে আমার লেখা শব্দগুলো আওড়ে দেখিস
দেখবি সব অক্ষর ঝাপসা হলেও
একটা অক্ষর স্পষ্ট
আর সেই অক্ষর টা হলো
            ফাগুন।
                   ইতি
                দীপংকর
                        দীপু


শম্পা চক্রবর্ত্তী
ইংরেজি বিভাগ, এম এ
চট্টগ্রাম কলেজ।