অটোয়া, শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
আশ্রম সঙ্গীতানুষ্ঠান - মহসীন বখ্‌ত

 আশ্রম প্রতিবেদনঃ  গত ৪ঠা নভেম্বর ২০১৮, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের  কৈলাশ মিথাল থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল  ‘আশ্রম বিডি ডট কম’ নামের অনলাইন পত্রিকার পূর্বঘোষিত সঙ্গীত সন্ধ্যা। ভার্সেটাইল সঙ্গীতশিল্পী নাসরিন শশীর একক পরিবেশনায় টানা ৩ঘন্টার পিনপতন নিরবতায় গোটা অনুষ্ঠান দারুন উপভোগ্য হয়ে ওঠে সঙ্গীতক্ষুধিত বিপুল দর্শক-শ্রোতার একাগ্র ভালবাসায়। 
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত জনাব মিজানুর রহমান ও দূতাবাসের অপরাপর কর্মকর্তারাও ‘আশ্রম’ আয়োজিত সঙ্গীত সন্ধ্যায় হলভর্তি বাঙালি দর্শকদের সঙ্গ দেন এবং উপভোগ করেন অটোয়ার অপূর্ব কোকিলকন্ঠী শিল্পী নাসরিন শশীর কিন্নরকন্ঠের ইন্দ্রজাল।

 সঙ্গীত পরিবেশন করছেন কণ্ঠশিল্পী নাসরিন শশী   

মূল অনুষ্ঠানে প্রবেশের পূর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে ডাকা হয় অটোয়ায় অতি পরিচিত তরুণ ব্যক্তিত্ব ড. নাসিম সাইদীকে । চৌকশ এই বক্তা আশ্রমের এহেন আয়োজনকে প্রসংশায় বন্দনা করে নবীন প্রজন্মকে নিয়ে আগামীতে এমন আয়োজনে আরও উদ্যোগী ভূমিকা রাখার আহবান জানান।     
রাষ্ট্রদূত জনাব মিজানুর রহমান তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে ‘আশ্রম’ এর এই আন্তরিক আয়োজনকে সাধুবাদ জানান ও বলেন, ‘এভাবেই বাংলাদেশের বাইরে প্রবাসীদের থোকাথোকা অবস্থানগুলো বাংলাদেশ আর বাঙ্গালিপনা ধরে রাখতে আশ্রমের মতই সকল বাঙালি সংগঠনগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষায় ইতিবাচক নীতির কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারের জনহিতকর  সকল কর্মকান্ডের সারসংক্ষেপ বর্ণনা করে বলেন, এই সরকার জনগনের মৌলিক  অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া তিনি, কানাডায় অবস্থানরত জাতির জনকের খুনী নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে দিতে কানাডাপ্রবাসীদের মূল ধারায় ইন্ধন যোগাতে এগিয়ে আসার আহবান জানান।’ 

 কণ্ঠশিল্পী নাসরিন শশী     

অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধের অন্তিমে ‘আশ্রম’ সম্পাদক ও প্রকাশক কবির চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে একই দিনে আরও তিনটি অনুষ্ঠান অটোয়ায় থাকার পরও আশ্রমের অনুষ্ঠানে হলঘর উপচেপড়া দর্শক সমাগমে অটোয়াবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আশ্রমের যাত্রাপথে আপনাদের এই ভালবাসা আমাদের প্রেরণা এবং অনাগত দিনগুলোতেও আপনাদের এই সহযোগিতা  কামনা করি। তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মাননীয় রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের সদয় শোভাগমন এবং প্রবাসী বাঙ্গালিদের সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়ে আশ্রম মঞ্চের বর্ণিল এই অনুষ্ঠানটিকে উপভোগে বিশেষ মহার্ঘ যোগ করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সম্পাদক কবির চৌধুরী জাতির জনক বাংলাদেশের স্থপতি  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বঘোষিত খুনী নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশের কাছে ফিরিয়ে দিতে সকল প্রবাসীদের সন্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে আহবান জানান। তিনি বর্তমান রাষ্ট্রদূত জনাব মিজানুর রহমান ও বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের অনন্য  সেবাপ্রদান ও সহযোগীতার জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং অটোয়াবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানকে ‘আশ্রম ক্রেষ্ট’ প্রদান করার জন্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অটোয়া প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে;  আনোয়ার হসেন, শাহেদ বখত ময়নু, ড.নূরুল হক, সিকদার মতিয়ার রহমান, ফারুক হোসেইন ও মুনির  জামান প্রমুখদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁদের মাধ্যমে অটোয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জনাব মিজানুর রহমানকে ‘আশ্রম ক্রেষ্ট’ প্রদান করেন। 

সঞ্চালক লেখক মহসীন বখ্‌ত

এছাড়া কবির চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে সঙ্গীতশিল্পী নাসরিন শশীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে আশ্রমের এই রকম আয়োজনের প্রধানতম সহযোগি আর উৎসাহদাতা নাসরিন শশী এবং তাঁর জীবনসঙ্গী শাহ বাহাউদ্দীন। আশ্রমের প্রচার আর প্রসারে ‘আশ্রম মঞ্চে’ সঙ্গীত পরিবেশন করার জন্যে মাননীয় রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে অটোয়ার  ম্যালোডিকন্যা  সুকন্ঠী সঙ্গীতশিল্পী নাসরিন শশীকে বিশেষ ‘আশ্রম ক্রেষ্ট’ উপহার দেওয়া হয়।   
অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনকারী কিশোরী লারিসাকেও উপহার প্রদান করা হয়। 

  শিল্পীকে আশ্রম ক্রেষ্ট প্রদান করছেন মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান

উল্লেখ্য যে, পূর্বঘোষিত সময় বিকেল সাড়ে ৫ঘটিকায় অনুষ্ঠান শুরুর প্রতিশ্রুত সময়ের পরিবর্তে  ঠিক ৬ঘটিকায় মঞ্চে আসেন অটোয়াপ্রবাসী আশির দশকে মূল ধারায় সম্পৃক্ত বিরলপ্রজ একজন লেখক মহসীন বখত। তিনি আশ্রম মঞ্চে ডাক পড়েছে বলে আজকের এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি  সঞ্চালনার দায়িত্বে অবতীর্ণ হবার কথা বলে দীর্ঘ এক গৌরচন্দ্রিকায় এই শহর অটোয়ায় অভিবাসী বাঙ্গালির আসরে আশ্রমের অনেকগুলো অনন্য অর্জনের কথা উল্লেখ করেন। এখানে প্রবাসী পরিবেশে স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে একক সঙ্গীত আসরের মহতি আয়োজন শিল্পীদের প্রাণোদনা যুগিয়ে যাচ্ছে বলে আশ্রমের উদ্যোগকে বন্দনা করেন।

 বক্তব্য রাখছেন মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান, পাশে আশ্রম সম্পাদক কবির চৌধুরী

সঞ্চালক বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সম্প্রতি প্রয়াত খ্যাতিমান বাঙালি গনিতজ্ঞ ও পাঠক নন্দিত সুলেখক মীজান রহমানকে সম্বর্ধনা প্রদান ও তাঁকে নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র  প্রকাশ যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তাজুল মোহাম্মদের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে অভিজাত প্রকাশনীর মুদ্রনে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। অভিজিত রায়ের সাথে ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ গ্রন্থের ক’লেখক মিজান রহমানের জগতজোড়া খ্যাতি ছিল কিন্তু আশ্রমই এই শহরে দীর্ঘ দিনের অভিবাসী এই লেখককে নিয়ে দাপটের সহিত মূল্যায়ন করেছে। আশ্রম প্রবাসে অল্প পরিচিত বা নতুন নতুন বাঙালি লেখকদেরকে দাঁড়াবার মত ভূমি তৈরী করে দিয়েছে বলেও আশ্রমকে বন্দনা করেন সঞ্চালক। মহসীন বখত স্বভাবসুলভ  বাক্যবন্ধে অনুষ্ঠানের এই ফাঁকা সময়টি  কানায়কানায়  বাজিয়ে উপভোগ্য করেন প্রবাসীদের মনের প্রতিভাস নির্মান করে যেন মরমী কাব্যিক আবহে। পিনপতন নিরবতায় অভিবাসী জীবনের অন্তরাটুকু যেন বেজে ওঠে মন্দ্রমধুর কণ্ঠে।   
তিনি যা বলেন,  ‘আশ্রম আয়োজিত সঙ্গীত সন্ধ্যার এই মঞ্চ থেকে আমি আপনাদের অভিবাদন জানাচ্ছি। অনুষ্ঠান শুরু করার ঘোষিত মোক্ষম সময় হয়ে গেছে। দেখতে পাচ্ছি  আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি  কানাডায়  নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্টদূত জনাব মিজানুর রহমান ও দূতাবাসের অপরাপর  কর্মকর্তাদের অনেকে এসেছেন, দূরবর্তী শহর থেকেও  অনেকে এসেছেন। কিছু অবাঙ্গালি অতিথি এসেছেন। সকলকে আশ্রমের মঞ্চ থেকে সাদর অভিবাদন জানাচ্ছি। 
I am delighted to welcome our special guests who might not speak in Bengali but we are grateful to them for their passion in our music and culture.Of course, music, regardless of what language it is, and whether you understand it or not, still has the same impression in anyone’s mind.A special thanks to our friends for being with us.

 মাননীয় রাষ্ট্রদূত মহোদয়কে আশ্রম ক্রেষ্ট উপহার দিচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ

এই মেরু  অঞ্চলের দেশ কানাডাতে  দারুন  রঙ্গিন নভেম্বর  আসে তুষার  তান্ডব আর নিদারুন  দুঃস্বপ্নের মত  প্রকট শীতের বার্তাটি  নিয়ে। এরই মধ্যে  বৃক্ষশাখের শেষ  পাতাটি  ঝরে যাবে।  বন্য বাইসনের মত শৃঙ্গ উচিয়ে  সাঁই সাঁই করে তেড়ে আসবে হিমজাড়। আমরা  বাঙালিরা তখন হাড়েহাড়ে  বুঝব এটা আমার গা-সওয়া প্রকৃতি নয়।
যদিও এদেশে আমরা বাস করি দিনের পর দিন। আমরা ঝুম্পা লাহিড়ির  নেইমসেক উপন্যাসের সেই অমি বা অমিতের মত মরমে মরে যেতে থাকব। হিমালয়ের ডেলটা রিজনে  উষ্ণ পলিমাটির  বদ্বীপ সমুদ্রমেঘলা বাংলার মানুষ আমরা। তুষারমৌলি মেরুর এমন বিদঘুটে শীতের প্রকৃতি আমাদের প্রাণে সয়না।
একেতো আমরা প্রবাস জীবনে পরীযায়ী পাখির মত  নিজ মায়ের কুলে ফিরে যাবার উরুউরু মনের নৌকা  উদাসী মাঝির মত মরমে বাইতে থাকি। সত্যি কথাটা বলতে গেলে নিজ খায়েশে নিরাপদ জীবনের লোভে আমরা প্রবাসে বিপন্ন এক মানুষের দল।এখানে আমাদের বাস্তু থাকলেও   মনের দিক দিয়ে বাস্তুহারা আমরা। আমাদের প্রাণের বাস্তু বাংলাদেশ। মা-বসুন্ধরার  উষ্ণতার বেদীতে নরম মাটির ভিটে ছিল আমাদের।এখানে আমাদের প্রতিটি সূর্যোদয় হয় বাংলা ও বাংলাদেশের ভাবনা বুকে নিয়ে। প্রতিটি সূর্যাস্ত ,প্রতিটি রাতে আমাদের বুকের ভেতর জেগে থাকে  বাংলাদেশ। পরীযায়ী পাখি যেমন স্বপ্নের ভেতরে বাস করে,ফিরে  যেতে চায় আপন ভূমে ঠিক তেমনি  নিত্যদিন বুকের কৌঠোতে বাংলা আর বাংলাদেশ ভাবনা আমাদের  প্রতিদিনের অমোঘ বাস্তবতা। আমাদের মনের অলিন্দে একজন জীবনানন্দ সারাক্ষণ গাইতে থাকে ‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’। কিন্তু আমরাতো ফিরে যেতে পারিনা। তাই যেখানেই থাকি এক বাউন্ডলেস বাংলার স্বপ্ন বুনতে থাকি।  সুধীজন, আশ্রম এই শহর অটোয়ায় সেরকমই একজন স্বপ্নবাজের ঝাপি। আশ্রম মূলত একটি সাহিত্যের কাগজ। এর অটুটদেহী একজনমাত্র কারিগর আছেন, তিনি নিভৃতে স্বপ্ন বুনতে বুনতে পথ হাঁটছেন ক্লান্তিহীন। তার নাম কবির চৌধুরী। সেই ২০০৯ সালে আশ্রম নামের পত্রিকাটি প্রকাশ করে  যাত্রা শুরু করেছিলেন।  কালে আশ্রম দাঁড়াবার মত শক্ত ভূমির মত এই শহরে সাংস্কৃতির কর্মী, লেখকদের আলিঙ্গন করতে থাকে।  আমি আশ্রম সম্পাদক কবির চৌধুরীকে বলেছিলাম একদিন, আশ্রম একটি সাহিত্যের পত্রিকা, কেন দায় পড়েছে  আশ্রমের সময় এবং কাড়িকাড়ি  অর্থ গচ্ছা দিয়ে এইসব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের,তারচেয়ে এই কঠিন জীবন সংগ্রামের দেশে আশ্রম পত্রিকাটিকে আরও বেশি সময় দিয়ে অনলাইন জগতে একটা বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা তরান্বিত করা যেত।  উত্তরে আশ্রম সম্পাদক কবির চৌধুরী যা বললেন তা এখনও মনে  পড়ে,বলেছিলেন, দেখুন আমরা দেখতে পাই চারদিকে মানুষে মানুষে দূরত্ব, সাম্প্রদায়িক বিবেধ, বিভাজন, বৈরীতা। এর চিকিৎসা একটাই। আর তা হচ্ছে এই ব্যাধি থেকে নিরাময়ের পথ হল আবহমানকালের পথ ধরে সংস্কৃতির চর্চা। এতে মানুষে  মানুষে দূরত্ব আর বিভাজন কমিয়ে আনা সম্ভব। তাছাড়া বিভূঁইয়ে আমাদের অনেক সম্ভাবনাময়  প্রতিভাগুলো বিকশিত হতে পারেনা উপযুক্ত সুযোগের অভাবে। আমাদের শিশুগুলো ঘরের বাইরে বাংলাকে দেখতে পায়না,তাদের জন্যেই আশ্রমের মঞ্চ। আশ্রম  এই চেষ্টাই করে যাচ্ছে। আমি আর মিছে তর্ক করিনি এই অকাট্য যুক্তিতে। অতএব, জয়তু আশ্রম!’   সঞ্চালক মহসীন বখত  আশ্রমের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই  দীর্ঘ কথামালায়  প্রবাসী বাঙালির আবেগ উথলে  দেওয়া প্রানের আকুতিরই প্রতিভাস নির্মান করে আকুল মুগ্ধতা যেন ছড়িয়ে দেন। যেন দুপুরের ঘুঘুডাকা নির্জনতার ভেতর বসে প্রবাসী বাঙ্গালিরা দর্পনে দেখছে আপন মুখ।তিনি  বলেন, ‘আশ্রম এই পরবাসে আমার প্রিয় প্রসঙ্গ,অনুষ্ঠান সঞ্চালনা আমার নেশা নয়,তবু আসতে হয় , কারন এটা যে আশ্রমের মঞ্চ !’  
অনুষ্ঠান সঞ্চালক ঠিক ৬ঘটিকায় মূল সাংস্কৃতিক পর্বের প্রথমার্ধ শুরু হচ্ছে বলে মঞ্চ উন্মুক্ত হবার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘এবারে আমরা আশ্রমে আজকের প্রতিশ্রুত  অনুষ্ঠানে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। প্রথমেই একটি নৃত্য। 
লারিসা নামের এক বাঙ্গালি কিশোরী মা-বাবার সাথে এই শহরে বাস করছে খুব বেশিদিন হয়নি।একট্টুখানিএক প্রাণের মধ্যে এত ছন্দ তা আমি দেখেছিলাম একটি  অনুষ্ঠানে একবার একঝলক।লারিসা নামের এই কিশোরী  নাচ শিখতে শুরু করে সে যখন ৩বছরের নিতান্ত শিশু।

 নৃত্য পরিবেশন করছে লারিসা

সে তার গুরু পার্থপ্রতিম দাসের কাছে উপমহাদেশের বিখ্যাত কথক ঘরানার নৃত্যছন্দের  তালিম নেয়। সে লোকনৃত্যের তালিমও গ্রহণ করে নানা সময়ে শিশু একাডেমী, স্বরবর্ণ নৃত্যশালা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে।
লারিসা এই ক্ষুদে বয়েসেই অনেকগুলো নৃত্য ওয়ার্কসপ ও অনুষ্ঠানে স্ট্রেজ প্রোগ্রামে তার দক্ষ নৃত্য কুশলতা প্রদর্শন করে সে বেশ কিছু পুরষ্কার লাভ করতে সক্ষম হয়।
খুব বেশিদিন হয়নি এই বাঙালি কিশোরী  শহর অটোয়ায় এসেছে।কিন্তু কিছু অনুষ্ঠানে গোটা কতেক নৃত্য প্রদর্শন করে সে নিজেকে যেন স্বর্গের দেবসভায় বাঙ্গালির মীথকন্যা বেহুলার মত চোখধাধানো নৃত্যের পাখির মর্যাদা লাভ করেছে। ইন্দ্র-দেবসভায় যেমন মীথকন্যা বেহুলা উথালপাথাল নাচের মুদ্রা প্রক্ষেপনে দেবাদিদেব মহাদেবকেও মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল ঠিক তেমনি যেন আমাদের এই নাচুনে খঞ্জনা পানাপুকুর কি দলদামের   আসর মাথিয়ে  দেওয়া ছোট্ট পাখিটি লারিসা। আসুন তাহলে কানায় কানায় উপভোগ করি  আমাদের বাঙালি এক কিশোরী যেন আমাজনের নৃত্যের পাখি বার্ড অব প্যারাডাইস লারিসার কথক নৃত্য।’ লারিসা এই পর্বে প্রদর্শন করে কথক নৃত্য।  অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ার্ধের প্রারম্ভে লারিসা পরিবেশন করে  রাড় বঙ্গের ঝুমুর ঘরানার একটি অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন লোকনৃত্য।  কিশোরী লারিসার নৃত্য কুশলতায় মুগ্ধ করতালিতে ফেটে পড়ে হলভর্তি দর্শক।

  শিল্পীদেরকে উপহার দিচ্ছেন মাননীয় রাষ্ট্রদূত

তারপর অনুষ্ঠান সঞ্চালক যাকে নিয়ে আশ্রমের এই আয়োজন তাঁর সম্পর্কে বন্দনা গেয়ে বলেন , ‘আজ আমরা আশ্রমের এই মঞ্চে যার গান উপভোগ করতে এসেছি তিনি এই শহর অটোয়ার বিশেষ সঙ্গীতব্যক্তিত্ব, আমি বলব তিনি অটোয়ার শিল্পী হয়েও অটোয়ায় বিরলপ্রজ এজন্য যে, আন্তর্জালের তথ্যজালে দেখা যায়  তিনি দূরের বাঙালি ও ভারতীয় জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত  টরন্টো, মন্ট্রিয়েল , ক্যালগেরী, সাসকাচুয়ান, ডালাস, এডমিনটন প্রভৃতি শহরগুলোতে মঞ্চ দাপিয়ে কনসার্ট করে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু তারই আরশি নগরে আমরা পড়শিরা শিল্পীর যাদুই কণ্ঠের গান শুনতে পাইনা। তিনি সঙ্গীতের বাণীর অন্তরে সুরের ইন্দ্রজাল রচনা করে কন্ঠে প্রাণের  দরদ ঢেলে গান-গাওয়া অটোয়ারই একজন বিশেষ এবং অনন্য গানের পাখি নাসরিন শশী।  তার কণ্ঠ বেয়ে যেন  সুরের কুজ্ঝটিকায় অলৌকিক জোছনা ঝরে শ্রোতার উঠোন জুড়ে। শ্রোতার প্রানের তন্ত্রী বাজিয়ে দেওয়া এক বিরল কন্ঠের অধিকারী এই শিল্পী যেন শ্রোতার প্রান বেঁধে দিতে পারেন সুরের ধ্বনিতে। তার কন্ঠে শুদ্ধ সঙ্গীতের ভাষা মন কাড়ে। প্রান কাড়ে। বেদনা মন্দ্রিত করে নাসরিন শশীর গায়কী। মোহিত করে সঙ্গীত রসিকজনদের প্রত্যাশা। প্রান ভরিয়ে দেয়। মন জুড়িয়ে দেয়। 
শশী যখন নিতান্ত শিশু তার চেয়ে বছর আটের বড়বোন  নার্গিস রুনী ওস্তাদের কাছে গানের তালিম নিতেন নিয়মিত।সে অনেকদিন আগের কথা।কিন্তু বড়বোনের কন্ঠে সুরের অলৌকিক লহরিতে শশী গানের প্রেমে পড়ে  যান ঠিক যেন অকালবোধনে,সেই শিশুকালে।সুরের  যাদুবিস্তারী আবহ শশীর উৎপল-কোমল শিশুমন গ্রাস করে নেয়। আর বয়েসী দাদি সুর গলিয়ে নিত্যদিন গান করে শোনাতেন নাতনি শশীকে। সঙ্গীতশিল্পী হবেন সেই বয়েসেই মনের গোপন অলিন্দে বাসনাটা দানা পাকাতে থাকে তার।
পরবর্তীতে ঢাকায় স্কুল ও কলেজে পাঠকালিন সময়ে এবং দূরের রাশিয়ায়,মস্কোতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময়ে নাসরিন বিশেষ করে রবীন্দ্র সঙ্গীত করতেন সাংস্কৃতিক  অনুষ্ঠানগুলোর মঞ্চে। 

 শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখছেন ড. নাসিম সাইদী

একদিন সঙ্গীতকে ব্রত হিসেবে নেবেন এমন বাসনা শশীর  মনে ইচ্ছেঘুড়ির মত ওড়তে থাকে। পথ চলতে চলতে তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীতগুরু  বিমলকুমার রায়,তপন নন্দী,ওস্তাদ ভিনে ভিদায় প্রমুখের কাছে বিশেষ তালিম গ্রহণ করেন।
এখনও শশী বিপুল উদ্যমে সঙ্গীতের হরেক অলিগলিতে কণ্ঠকে চারিত করার নিয়মিত তালিম নিচ্ছেন ওস্তাদ আব্দুস জাকির খান কাছে।
এই অটোয়াতে স্থায়ীভাবে যাপিত জীবনে ভার্সেটাইল সঙ্গীতশিল্পী নাসরিন শশী চাকুরী ও সংসার ধর্মের  পাশাপাশি এখন সঙ্গীতেই মগ্ন আছেন বলেই শুনেছি। 
স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালীন সময়ে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি  লালন সাইজীর  গান, লোকঘরানার চিরায়ত গীতি, গজল, ভজন এমনকি আধুনিক গানের চর্চা করতে থাকেন নিয়মিত।
এরই মধ্যে শিল্পী নাসরিন শশী তার গাওয়া বেশ কিছু মৌলিক গানের রেকর্ড ও ভিডিও মুক্ত করেছেন যেগুলো আমরা অনেকেই শুনেছি এবং ইতিমধ্যে বিপুল শ্রোতার  মনোযোগ কেড়েছে।
আর সঙ্গীতশিল্পী নাসরিন শশীর ভাগ্য বটে। তার মৌলিক গানের অন্যতম একজন পদকর্তা খোদ শিল্পীর সাথে যৌথজীবনের পথিক যিনি তার নাম শাহ বাহাউদ্দিন শিশির। শশীর পেছনে ক্রমাগত ইন্দন দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তাহলে আসুন আমরা  কানায়কানায় উপভোগ করি  আশ্রমের মঞ্চে অপূর্ব কোকিলকন্ঠী গায়িকা নাসরিন শশীর সুরের ইন্দ্রজাল।’ 
সঞ্চালক মহসীন বখত বিশেষভাবে উল্লেখ করেন অপূর্ব কোকিলকন্ঠী এই শিল্পী নাসরিন শশীর ইতিমধ্যে রিলিজ  হওয়া মৌলিক গানগুলোর কথা। তার গাওয়া সব মৌলিক গানগুলোর পদকর্তা যথাক্রমে মহসীন বখত,শাহিনুর ইসলাম ও শাহ বাহাউদ্দিন শিশির এই শহর অটোয়ারই বাসিন্দা।শিল্পীর রিলিজকৃত মৌলিক গানগুলো শুদ্ধ সঙ্গীতের মর্যাদায় ইতিমধ্যে অগনিত বোদ্ধা শ্রোতার মন কেড়েছে ও অকুন্ঠ প্রশংসা লাভ করেছে। নাসরিন শশীর আসন্ন একটি জমানো মৌলিক গানের আগাম তথ্য দিয়ে সঞ্চালক গানটির প্রথম চরন, ’ও গরিধর!/ ডাইনে বৈঠা বাও গরিধর,বামে বৈঠা বাও/ মন পবনে বাও  গরিধর,শূন্যে উড়াল দাও‘  উল্লেখ  করে সঞ্চালক জানান, ‘ গানটির গল্প নেওয়া হয়েছে মনসামঙ্গল থেকে। উর্ম্মীমুখর ফেনিল  কালি দরিয়ায় মনসার শাপে ঝঞ্জার কবলে ডুবতে বসেছে চাঁদ-সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা তখন প্রধান মাঝি  গরিধরের প্রাণান্ত সংগ্রামকে  উপলক্ষ করে নৌকা-বাইচ ধরনের এই লোকগানটি। মধ্যযুগে বাঙ্গালির বহুল চর্চিত মনসামঙ্গল আজকের প্রজন্ম বিস্মৃত হয়েছে প্রায়,কলিকাতার মঞ্চে একশ এক রজনি মনসামঙ্গলের গল্প নিয়ে মঞ্চস্ত ‘চাঁদ বনিকের পালা ‘  শম্ভু মিত্র বিখ্যাত করেছিলেন,কিন্তু মনসামঙ্গলের গল্পটি বাংলা লোকগানে ফিরে আসেনি। ‘ শশীর কণ্ঠে এই গানটি রিলিজ হলে বাঙ্গালির একখানমাত্র মীথ আবার চর্চায় চলে আসবে বলে গানটির পদকর্তা ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আশাবাদ ব্যক্ত করেন,গানটির সুর দিয়েছেন অটোয়ার আরেক তরুনতুর্কী সুরকার ও গীত রচয়ীতা শাহিনুর ইসলাম। আশ্রমের আয়োজনে শাহ বাহাউদ্দিন শিশির রচিত একটিমাত্র মৌলিক গান ‘মেঘের ভেলায়’ সহ ২০টি গান পরিবেশন করেন শিল্পী নাসরিন শশী। প্রতিটি গানই পরম দরদ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। শিল্পীর কন্ঠশ্রোতে যন্ত্রসহযোগের  পারদর্শিতায় অভিজ্ঞ যন্ত্রী যথাক্রমে; মেহেদী ফারুক, সৌরভ ধ্রুব, উসমান জাকির, জয় সরকার, অপূর্ব বোল তুলে মন কেড়েছেন দর্শক-শ্রোতার। শিল্পী নাসরিন শশীর যাদুই সুরের কিন্নরকন্ঠ আবহের পরম উষ্ণতা নিয়ে শহরের বাঙালি অভিবাসীরা টানা ৩ঘন্টার বিশদ বুননের অনুষ্ঠানটির  রেশ নিয়ে ঘরে ফিরে যান, কিন্তু আশ্রমের এই অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি যেন হয়না, আলোচিত হতে দেখা যায় সবখানে। আশ্রমের আয়োজনে অটোয়ায় এটি ছিল শিল্পী নাসরিন শশীর দ্বিতীয় একক সঙ্গীত সন্ধ্যা।

অটোয়া, কানাডা। 
আশ্রমের জন্যে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন লেখক মহসীন বখ্‌ত।