অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
বিএনপি এখন কী করবে - মিঠুন চৌধুরী

বিএনপি এখন কী করবে?

নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবির পর এ জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মনে। এমন পরাজয়ের পর বিএনপি রাজনীতির মাঠে ‘কী’ও করতে পারবে কি না এমন নিষ্ঠুর প্রশ্নও উঠছে। কিন্তু দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এবং বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থকদের দিশা দেখাতে বিএনপিকে কিছু না কিছু করতেই হবে। এখন বাস্তবে তারা কী করবেন এবং কতটা করবেন সেটাই দেখার বিষয়।

বিএনপির সব থেকে বড় সংকট নেতৃত্বের। দলটির ৪০ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় ৩৪ বছর ধরে যার হাতে নেতৃত্ব সেই বেগম খালেদা জিয়া এখন জেলে। গত দশ মাস ধরে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের কথা মুখে বললেও কার্যত কোনো আন্দোলন বিএনপি শুরুই করতে পারেনি। দলটির আরেক নেতা তারেক রহমান এক দশকের বেশি সময় ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি দণ্ডিত হয়েছেন একাধিক মামলায়। প্রকৃত নেতৃত্ব ছাড়া একটি দল নাবিক বিহীন জাহাজের মত। একজন যোগ্য নাবিক ছাড়াই ভোটের দৌড়ে নেমে পড়েছিল বিএনপি। এসময় দলের নেতৃত্ব ছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে। আর নবগঠিত ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব ছিল বিভিন্ন দলের এমন নেতাদের হাতে যারা অতীতে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। কাজেই ভোটের লড়াইয়ের নেতৃত্ব আদৌ দল হিসেবে বিএনপির হাতে ছিল না, এটা বললে ভুল বলা হবে না।   

বিএনপিকে এখন প্রধানত যে দুইটি বিষয় সমাধান করে তারপর ভবিষ্যত পানে তাকাতে হবে সেগুলো হলো- দলটির নেতা কে হবেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সাথে রাজনৈতিক ঐক্য অটুট থাকবে কি না। মূল নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে তা বাছাইয়ে বিএনপি এখনই তড়িৎ সিদ্ধান্ত না নিলেও চলবে। আপাতত রাজনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে থেকেই কাউকে হাল ধরতে হবে। সেটাই সব দিক থেকে সুবিবেচিত হবে। প্রাথমিকভাবে নির্বাচনের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে হলে এবং দিকদিশাহীন নেতাকর্মী সমর্থকদের পথ দেখাতে হলে বিএনপির সামনে গঠনমূলক রাজনীতির কোনো বিকল্প খোলা নেই। সেটা না করে বিএনপি যদি আবারো তথাকথিত আন্দোলনের নামে নেতিবাচক রাজনীতির পথ বেছে নেয় তা হবে কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মত। 

নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে বিএনপি নেতারা যেসব অভিযোগ করেছেন তা যদি শুধু অভিযোগের খাতিরে অভিযোগ না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের উচিত সেসব অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে যাওয়া।  প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা হাজির করে এর প্রতিকার চাওয়া। এটি নির্বাচন কমিশনকে যেমন দায়বদ্ধ করবে তেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি বিএনপি যে গণতান্ত্রিক ধারায় পথ চলতে চায় তার একটি বার্তা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে যাবে। 

তবে এই বার্তাকে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিএনপিকে যে কাজটি জরুরী ভিত্তিতে করতে হবে তা হলো জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমেই এদেশের তরুণ প্রজন্ম তথা ভবিষ্যত রাষ্ট্রের মালিকরা এ প্রশ্নে নিজেদের রায় জানিয়ে দিয়েছিল। তারপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু হলে তরুণরা নিজেদের আপোষহীন মানসিকতার পরিচয় দিতে গড়ে তোলে গণজাগরণের আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বাংলাদেশের তরুণরা যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না তা নির্বাচনে এবং রাজনীতির মাঠে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৪ সালে নির্বাচনের ট্রেন মিস করা বিএনপি ২০১৮ সালে এসে প্রায় এক দশক আগে করা রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি করলো নিববন্ধনহীন জামায়াত ইসলামীকে নির্বাচনের সুযোগ করে দিয়ে। এবং সেই ভুলের জবাবে তারুণ্যের প্রত্যাখান এত তীব্র হলো যে বিএনপি ছিটকে গিয়ে রাজনীতির মাঠের বাইরেই পড়ে গেল প্রায়। 

বিএনপি যদি ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় সত্যিই ফিরতে চায় তাহলে জামায়াত প্রশ্নে তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর তা হলো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ। অসৎ সঙ্গে সর্বনাশের প্রবচন বিবেচনায় নিয়ে এক্ষেত্রে বলাই যায় জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করাতেই বিএনপির আজ এই রাজনৈতিক সর্বনাশের চরম পরিণতি দেখতে হলো। নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল ঘোষণা দিয়ে সঙ্গে বাংলাদেশ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে রেখে রাজনীতির কঠিন যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার মত নির্লজ্জ দ্বিচারিতায় সর্বস্ব হারালো বিএনপি। এর দায় নেতৃত্বের। এই দায় স্বীকার করে নিয়ে তাদের ভুল সংশোধন করতে হবে।  

এর পাশাপাশি বিএনপিকে ছাড়তে হবে জামায়াতের কাছ থেকে পাওয়া নাশকতার রাজনীতির ধারা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে-পরে নির্বাচন ঠেকানোর নাম করে দেশজুড়ে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে আন্দোলনের নামে যে বিভীষিকা তারা রচনা করেছে এর দায় থেকে কিভাবে তারা মুক্তি পাবে? মানুষের মন থেকে এই অপরাধের পাপ কিভাবে মোচন হবে? ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার মত রাজনৈতিক গণহত্যার অপরাধের শাস্তি তারা কিভাবে ভোগ করবে? সেসবের জন্য আগে অপরাধ স্বীকার করতে হবে। আদালতে যে শাস্তি হয়েছে তা ভোগ করতে হবে। তারও পরে জনগণের মনে যে ঘৃণা ও ভয় তারা জন্ম দিয়েছে তা নিবারণ করতে ভালোবাসার মন্ত্র নিয়ে মানুষের কাছে যেতে হবে।

বিএনপি যদি তাদের এসব অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে একটিরও পালনে আংশিক ব্যর্থতাও দেখায় তাহলে মানুষের কাছে ফিরে যেতে পারবে না। এই উপমহাদেশে অনেক বড় রাজনৈতিক দলের হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস আছে। আবার বড় বিপর্যয়ের পরও মানুষের কাছে ফিরে গিয়ে মানুষের ভালোবাসা নিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে রাজনীতির মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণও আছে। রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে বিএনপিকে আগে মানুষের কাছে যেতে হবে। মানুষের মনের কথা শুনে সে ভাষায় কথা বলা শিখতে হবে। তা না হলে এ লড়াইয়ে অনেক এগিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সাথে রাজনীতির দৌড়ে পেরে ওঠা তো দূরের কথা মূল প্রতিযোগিতার ট্র্যাকেই আর উঠতে পারবে না। বিএনপি যদি এবারও পথ ভুল করে সেটাই নিজ হাতে তাদের রাজনৈতিক কবর রচনা করার জন্য যথেষ্ট। ### 

মিঠুন চৌধুরী 
সংবাদকর্মী, বাংলাদেশ।