অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
অর্থশাস্ত্রের জনক চাণক্য -শেখ বিবি কাউছার

র্থনীতি শাস্ত্রের জনক চাণক্য ( ৩৭০-২৮৩ খ্রিস্টপূর্ব) ছিলেন একজন শিক্ষক, দার্শনিক এবং প্রধানমন্ত্রী, তাঁকে বিশ্বের প্রথম এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। এমনকি তাঁকে ’অর্থনীতির জনক’ বলে ও সম্বোধন করা হয়। চাণক্য অত্যন্ত কুটিল রাজনীতি বিশারদ হওয়ায় ওনার নাম ’কৌটিল্য’ হয়েছিল। চাণক্যের জন্মস্থান নিয়ে প্রচুর মতভেদ আছে। কেউ বলেন তাঁর জন্ম হয়েছিল তক্ষশিলায় (বর্তমান পাকিস্তানে ), কারো মতে তিনি দক্ষিণ ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। যাই হোক তিনি ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দেখতে ছিলেন অতি কুৎসিত, স্বভাবের দিক থেকে অভিমানী জেদি এবং বুদ্ধির দিক থেকে অত্যন্ত তীক্ষè বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। 

সেই সময় উত্তর-পশ্চিম ভারতে তক্ষশিলা ছিল বিদ্যাশিক্ষার শ্রেষ্ঠ স্থান। চাণক্য সেখানে পড়াশোনা করে অল্প বয়সেই সর্বশিক্ষার পন্ডিত হয়ে ওঠেন। পরে এখানেই তিনি শিক্ষক (আর্চায) পদে যোগ দেন।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাম্রাজ্যের নাম মৌর্য সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তিনি ভারতের প্রথম সম্রাট। পাটলিপুত্র (বর্তমান পাটলা, বিহার ) ছিল তাঁর রাজধানী।

যে মানুষটি চন্দ্রগুপ্তের পেছনে থেকে যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করেছিলেন তিনি এই কৌটিল্য। কৌটিল্য ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী। কৌটিল্য আর চন্দ্রগুপ্ত মিলে তৈরি করেছিলেন ভারতবর্ষের ইতিহাসের বিস্তৃত সাম্রাজ্য। প্রধানমন্ত্রী হয়ে ও কৌটিল্য খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তিনি শহরের বাইরে একটি কুটিরে বাস করতেন। চীনের ঐতিহাসিক পরিব্রাজক ফাহিয়েন ভারত ভ্রমণে এসে তা দেখে বলেছিলেন, ‘এত বিশাল দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন কুটিরে বাস করেন, সেখানকার প্রজারা সুন্দরভবনে বাস করেন আর যেদেশের প্রধানমন্ত্রী রাজপ্রসাদে থাকেন, সেখানকার প্রজারা কুটিরে বাস করেন।’ মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর চাণক্য চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী ও পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতে থাকেন। মনে করা হয় মানব কল্যাণে ইচ্ছায় চাণক্য প্রায় দু ’হাজার শ্লোক লিখেছিলেন। চাণক্যকে ভারতের সবচেয়ে বড় কূটনীতিজ্ঞ ও দার্শনিক হিসেবে গণ্য করা হয়। চাণক্য তাঁর দুটি গ্রন্থ লেখার জন্য আজ ও জগৎচজুড়ে সমাদৃত। একটি তাঁর অর্থশাস্ত্র এবং অপরটি নীতিশাস্ত্র বা চাণক্য নীতি। 

প্রথমে আসা যাক অর্থশাস্ত্রের কথায়, অর্থশাস্ত্রে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে। সম্পদের বিজ্ঞান হচ্ছে রাজনীতির বিজ্ঞান। অর্থাৎ অর্থ হচ্ছে রাজ্য আর অর্থশাস্ত্র হচ্ছে রাজ্য পরিচালনার বিজ্ঞান। কৌটিল্য অর্থনীতি ও রাজনীতিকে  সমার্থক দেখিয়ে সেই আমলেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এ দুটি বিষয় হচ্ছে মুদ্রার এপিঠ - ওপিঠ। বলে রাখা ভাল যে অর্থশাস্ত্র নাম শুনে মনে হতে পারে এটি একটি অর্থনীতিবিষয়ক গ্রন্থ।  হ্যাঁ, তা এ বইয়ে আছে, তবে সেটাই সব নয়, বরং একটি অংশমাত্র। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র তাহলে কী? এক কথায় রাজ্য বা রাষ্ট্র পরিচালনার বিজ্ঞান। অর্থশাস্ত্রের কিছু অংশে অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তার বাইরে অনেক আলোচিত হয়েছে রাজনৈতিক কলাকৌশল।  

আগেই উল্লেখ করেছি যে, আধুনিক পাটনার কাছে পাটালিপুত্রে ছিল মৌর্যদের রাজধানী। দিল্লি তখনো ভারতবর্ষের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের উত্তরসূরি সেলুকাম নিকাতরকে পরাজিত করে ভারতবর্ষকে গ্রিকদের আধিপত্য থেকে রক্ষা করেন। আফগানিস্তান ও তখন মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীন । মৌর্য সাম্রাজ্য গড়ে ওটার পেছনের ইতিহাস খুঁজলে শুধু একটি নামই পাওয়া যাবে, তিনি কৌটিল্য। সহজ ভাষায় তিনি ছিলেন কিং মেকার। বাল্যকালেই তাঁর প্রতিভা জেদ ও অহঙ্কার-সব বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ হয়েছিল আর এ তিন বৈশিষ্ট্যের পরিণামই মৌর্য সাম্রাজ্য। 

রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হচ্ছে মাৎস্যন্যায় এড়ানোর ব্যবস্থা করা। এটাই অর্থশাস্ত্রের মূল বক্তব্য ও উদ্দেশ্য। মৎস্যজগতের নিয়ম যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে এ রীতিকে বন্ধ করা। অর্থাৎ অন্য যে কোনো কিছু করার আগে রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই মঞ্চে রাষ্ট্রের মধ্যে সহিংসতা প্রয়োগের একক ক্ষমতা ও থাকতে হবে রাষ্ট্রের হাতে। বিচার বিভাগের সঙ্গে প্রশাসনকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রের শুরুতেই নির্দেশনা দিয়েছেন। তার মতে, একজন মন্ত্রীর মোট ২৫টি গুণ থাকা প্রয়োজন। তাকেই মন্ত্রী হিসেবে বাছাই করতে হবে যিনি তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন, বাগ্মী, কার্যসম্পাদনে দক্ষ, তীব্র স্মরণশক্তিযুক্ত, প্রতুৎপন্নমতি, যুক্তিতর্কের দ্বারা নিজ মত প্রতিণ্ঠায় কুশলী, তাকে হতে হবে পৌরুষের প্রতীক,  বলশালী, প্রভুত্ব করায় যোগ্যতা-সম্পন্ন,  কষ্ট সহিষ্ণু, মৈত্রীভাবাপন্ন,  রাজার প্রতি দৃঢ়ভক্তি,  সদাচারণকারী,  সুস্বাস্থ্যের অধিকারী,  ধৈর্যশীল,  চাপলবর্জিত, আত্নগর্বরহিত, সৌম্যাকৃতি। মন্ত্রী ও অমাত্যদের নিয়োগের জন্য শুধু তাদের গুণের তালিকা করেই কৌটিল্য ক্ষান্ত হননি, বরং কর্মক্ষেত্রে তারা সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছেনা কিনা, তা নির্ণয় করতে ও তিনি সচেষ্ট। তিনি বিভিন্ন ধরনের ছল –চাতুরী ও গুপ্তচর নিয়োগের মাধ্যমে মন্ত্রী ও অমাত্যদের বিভিন্ন গুনের পরীক্ষা নেয়ার জন্য রাজাকে বিশদ নির্দেশনা দিয়েছেন যেন তিনি তার সেনাপতিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিনয় করার নির্দেশ দেন। সেই সেনাপতি রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে অমাত্যদের অর্থলোভ দেখাবে। এতে যদি অমাত্যরা সাড়া না দেন তাহলে তারা উর্ত্তীণ বলে গণ্য করা হবে। এভাবে কৌটিল্য অমাত্যদের বিশ্বাস, কামপ্রবৃত্তি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরীক্ষা নেওয়ার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। অর্থশাস্ত্র কৌটিল্য লিখেছিলেন মূলত রাজ্য পরিচালনার জন্য রাজার গাইডবুক হিসেবে। কৌটিল্যের চোখ এড়িয়ে গেছে এমন বিষয় খুব কম আছে। ঘরের চারপাশে কোনো গাছগাছড়া রাখলে সাপের উৎপাত হবে না,  সেটাও তিনি লিখে রেখে গেছেন। কর ব্যবস্থা, কৃষি, বিয়ে, পশুপালন ও প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবেলা, এছাড়া ও সমাজকল্যাণ,  প্রজাকল্যাণ,  আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক এবং যুদ্ধের রণনীতি বিবিধসহ এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে নির্দেশনা দেননি। রাজার কর্তব্য বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে এই গ্রন্থে।

অর্থশাস্ত্র খ্রিস্টের জন্মের কয়েকশ বছর আগে রচিত। তবে আজকের দিনে প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা অর্থশাস্ত্রের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ প্রাচীন ভারতের রাজার জন্য যে নির্দেশনা কৌটিল্য দিয়েছিলেন,  তা আজকের দিনের কোনো প্রজাতন্ত্রের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু আজকের দুনিয়ায়  ও নিকট ভবিষ্যতে ও আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি বা হব সেগুলোকে বুঝতে এবং একটি বিস্তৃত রূপকল্পের মধ্যে দেখতে অর্থশাস্ত্র অধ্যয়ন প্রয়োজন।

অর্থশাস্ত্র আমাদের শেখায় যে, অর্থনীতি ও রাজনীতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতপক্ষে এদের আলাদা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের বাইরে অর্থনীতির কোনো অবস্থান থাকতে পারে না। অর্থনীতির জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজন। আর তাই রাষ্ট্রে বিভিন্নজনের চাহিদার মধ্যে সামাঞ্জস্য বিধান করে অর্থনীতিকে সবার কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। তবে অর্থনীতি নিয়ে যাই বলি না কেন, পররাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা প্রভৃতি বিষয়ে অর্থশাস্ত্র এখনো গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।  আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিদ্যায় ও অর্থশাস্ত্রকে স্মরণ করা হচ্ছে। করপোরেট চাণক্য অন ম্যানেজমেন্ট, করপোরেট চাণক্য অন লিডারশিপ, করপোরেট চাণক্য অন ট্রেইনিং, চাণক্য ’জ সেভেন সিক্রেট অব লিডারশিপ, চাণক্য ইন ইউ, চাণক্য স্ট্র্যাটেজি প্রভৃতি গ্রন্থের জনপ্রিয়তা দুই হাজার বছর পর ও কৌটিল্যের প্রাসঙ্গিকতাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সুকুমার শিকদার লিখেছেন, ’কালের পরীক্ষায় উর্ত্তীণ বলেই দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠসুচিতে এ গ্রন্থ (অর্থশাস্ত্র ) অন্তভুর্ক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এ গ্রন্থ ব্যবসার গতিতত্ত্ব ও কেন্দ্রীয় বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে সাহায্য করে, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে এটি ব্যবসার রণকৌশল শিখতে সাহায্যে করে। যুগ যুগ ধরে ব্যবসার ধরণ বদলে গেলে ও ব্যবসার মূলনীতি অপরিবর্তিত রয়েছে বলেই অর্থশাস্ত্রের গুরুত্ব কমেনি। এ গ্রন্থ পাঠ করে তাই শিল্পোদ্যোগী, ব্যবসায়ী, ম্যানেজার, ম্যানেজমেন্ট শিক্ষক, ছাত্র, পরামর্শদাতা, রাজনীতিবিদ, মানবসম্পদ উন্ন্য়ন দপ্তরের কর্মী, সরকার প্রশাসক, সামরিক দপ্তরের অফিসার এবং সামগ্রিকভাবে সব শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ উপকৃত হবেন।

নিম্নে  তাঁর কয়েকটি শ্লোক বা নীতি বাক্য উল্লেখ করা হল:

#  ধন দান করলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, বিদ্যা দান করলে বেড়ে যায়। সেইজন্য বিদ্যা দান করলে বেড়ে যায়। সেইজন্য বিদ্যা ধন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

#  কুকুরের লেজের মতোই মানুষের জীবন ব্যর্থ হয় বিদ্যা অর্জন না করলে । কুকুরের লেজ না গোপন স্থান ঢাকা দিতে পারে , না পারে মশা-মাছি ইত্যাদি তাড়াতে। 

#  গুরু যে শিষ্যকে একটিমাত্র অক্ষর ও শেখান, পৃথীবিতে এমন কোন বস্তু নেই যা দিয়ে শিষ্য ঋণশোধ করতে পারে।

#  শিক্ষার্থীর কাম,  ক্রোধ, লোভ, স্বাদ, কৌতুক, অতিনিদ্রা, এবং অধিকভোজন - এইগুলো বর্জন করা উচিত।

#  বাল্যকালে যদি বিদ্যা অর্জন না করা হয়, যৌবনে ধন অর্জন না করা হয় এবং বার্ধক্যে পুণ্য অর্জন না করা হয়, তাহলে মৃত্যুকালে কী করবে?

#  সমুদ্র হল পৃথিবীর আবরণ,  প্রাচীর হলো গৃহের আবরণ, রাজা হলেন দেশের আবরণ, আর চরিত্র হলো বধূর আবরণ।

#  একটি গুণী পুত্র অনেক ভালো একশো মূর্খ পুত্রের চেয়ে। চাঁদ একাই অন্ধকার দূর করে, এক হাজার তারা ও তা পারে না।

শেখ বিবি কাউছার
প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
নোয়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।
বাংলাদেশ।