অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে -রমেন দাশগুপ্ত

দ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে জোরেশোরে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে এক ধরণের সন্তুষ্টির ভাব আছে। যারা হেরেছেন, তারা বলছেন- এই নির্বাচনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে। পরাজিত জোটের সমর্থক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী এমনও বলার চেষ্টা করছেন যে, বাস্তবিক অর্থে দেশে এখন আর কোন বস্তুনিষ্ঠ ও পেশাদার গণমাধ্যম নেই।  রাজনৈতিক দলাদলির বাইরে একটি নাগরিক সমাজ আছে দেশে। তাদের মধ্যে এক পক্ষ আবার গণমাধ্যমের ভূমিকায় তেমন কোনো ত্রুটি দেখেন না। আরেক পক্ষ তো কোমর বেঁধে নেমেছেন গণমাধ্যমের সমালোচনায়।

এরআগে গণমাধ্যম খুব কমই এই ধরনের প্রশ্ন ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। ক্ষমতাবানদের সন্তুষ্টি সন্দেহের উদ্রেক করছে। আবার গণমাধ্যমের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে কারো কারো কিছু কর্মকাণ্ডের জন্যও গণমাধ্যমকেই বিরাগভাজন হতে হচ্ছে, কোনোটাই অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু গণমাধ্যম নিয়ে মৌলিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনাটা একেবারেই উহ্য থেকে যাচ্ছে। আবার গণমাধ্যম যে রাষ্ট্র-রাজনীতির বাইরের বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, সেটাও বোধহয় আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। লেখার শেষাংশে এ নিয়ে আরও খানিকটা আলোকপাত করতে চাই।

গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা বা নৈর্ব্যক্তিকতা বলে একটা বিষয় আছে। ক্ষুদ্রজ্ঞানে বলি, সাংবাদিকতায় ‘ফাইনাল থট’ বা চূড়ান্ত ধারণা বলতে যা বোঝায়, বিশ্বব্যাপী সেটা আপেক্ষিক হিসেবেই বিবেচিত। দ্বারস্থ হই কানাডার বাসিন্দা সদ্যপ্রয়াত সাংবাদিক স্টুয়ার্ট অ্যাডামের। ‘সাংবাদিকতা: গণতান্ত্রিক শিল্পমাধ্যম’ শিরোনামে একটি বইয়ে তিনি সাংবাদিকতাকে বিচার ও বিশ্লেষণের জন্য একটি নিজস্ব ধাপভিত্তিক বিধিমালা তুলে ধরেন। এসব ধাপের মধ্যে অন্ত:ত তিনটি এখানে প্রাসঙ্গিক। এগুলো হচ্ছে, সংবাদ বিবেচনা (নিউজ জাজমেন্ট), নাগরিক জ্ঞান ও সংস্কৃতি এবং লক্ষ্য তথা মিশন।

প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক স্টুয়ার্ট অ্যাডাম এবং জিম কেরি ১৯৯১ সালে একযোগে একটি সাক্ষাৎকার  দেন। সেই সাক্ষাতকারে প্রশ্নকর্তা জিম কেরির কাছে জানতে চান- সাংবাদিকতার শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছে এ বিষয়ে কোনো ‘চূড়ান্ত ধারণা’ (ফাইনাল থট) আছে কি না? জবাবে জিম কেরি মার্কিন দার্শনিক কেনেথ ডুবা বার্কের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। ডুবা বার্ক বলেছিলেন- ‘জীবন একটি সংলাপ। যখন আমরা এতে প্রবেশ করি তখন এটি পূর্ব থেকেই চলমান। আমরা এর প্রবাহকে ধরবার চেষ্টা করি এবং এটি শেষ হওয়ার আগেই আমাদের প্রস্থান ঘটে।’ জিম কেরি বলেন, কাজেই এই অর্থে জীবন একটি চলমান সংলাপ। যা ক্রমাগত নিজেকে জন্ম দেয়। আমাদের কাজও (সাংবাদিকতা) এরূপ নবজীবন লাভের মতই এবং অন্যদেরও তাই। কাজেই কারো কাছেই শেষ শব্দটি নেই। চূড়ান্ত ধারণা বলেও কিছুই নেই। চলমান এ সংলাপেরও কোনো অবসান নেই।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমও এ ধরণের এক তোলপাড়ের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। এই যে সময়ের তোলপাড়, গণমাধ্যম যে শুধু এখনই এর মুখোমুখি হচ্ছে তা নয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বাংলাদেশে অভ্যুদয় পর্যন্ত সময়কাল, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে রাজনৈতিক হত্যাকা-, সামরিক শাসনের চড়াই-উৎরাই এবং গণতান্ত্রিক শাসনের নামে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা- সবকিছুরই সাক্ষী গণমাধ্যম নিরন্তর বাধা পেরিয়ে ‘চূড়ান্ত ধারণার’ বিপরীতেই এগিয়ে চলেছে।

 কিন্তু নিরপেক্ষতা, নৈর্ব্যক্তিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা, পেশাদারিত্বও প্রশ্নে গণমাধ্যম এবার যেভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গেছে বা দাঁড় করানো হয়েছে, অতীতে কখনোই এমনটা দেখা যায়নি। যা-ই বলা হোক না কেন, এদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালি মননে গণমাধ্যম সবসময় ‘গণ’র পাশে আছে, এমনটাই ধরা হয়। আদতে কি গণমানুষের পাশে থাকা নিয়ে এক ধরণের সুখ অনুভব করেন মধ্যবিত্ত বাঙালি? নাকি তাদের চিন্তা-চেতনা ধারণ করে বলেই তুষ্টিতে ভুগতেন ? এদেশের গণমাধ্যম কখন গণমানুষের কথা বলেছে? আদৌ বলেছে কি-না, নাকি গণমাধ্যম একশ্রেণীর মধ্যবিত্ত বাঙালির চিরায়ত মুখপত্র, সেটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতেই পারে- ভিন্ন কোন প্ল্যাটফর্মে।
 প্রশ্ন হচ্ছে, এবারই কি শুধু বাংলাদেশের গণমাধ্যম তার নিরপেক্ষতার সঙ্গে আপস করেছে? অতীতে করেনি? ভোটের আগে প্রচারণার সময় আমরা হেরে যাওয়া প্রার্থীদের কয়েকজনের উপর হামলা দেখেছি। ক্ষমতাসীনদের নেতাকর্মীদের কয়েকজনের প্রাণ যেতে দেখেছি। এসব বিষয় কি গণমাধ্যমে উঠে আসেনি ? এসেছে, গয়েশ^র রায়ের রক্তাক্ত ছবিটির কথা স্মরণ করুন। আবদুল্লাহ আল নোমানের ভয়ার্ত চেহারার কথাও স¥রণ করুন। রায় দিচ্ছি না, রায় দেওয়ার যোগ্য আমি কেউ নই। বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করছি মাত্র।

বলা হচ্ছে, ভোটের মাঠের সঠিক চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসেনি। এ প্রসঙ্গে আগে কয়েকটি প্রশ্নের দিকে তাকাই। ভোটের দিন পরিস্থিতি দৃশ্যত শান্ত ছিল কি-না ? সংঘাত-সংঘর্ষেও বড় ধরণের কোনো ঘটনার সংবাদ কী গণমাধ্যম এড়িয়ে গেছে? নির্বাচনে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে। মোটাদাগে মূলধারার গণমাধ্যম কি সেই অনিয়মের তথ্য পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে? উত্তর হলো- যায়নি, ভোটের পরদিনের দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সমকাল, যুগান্তরসহ মূলধারার সব পত্রিকা কী সাক্ষ্য দেয়?

প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম কোমর বেঁধে কেন নামেনি ? সেই প্রত্যাশা হয়তো গণমাধ্যম পূরণ করতে পারেনি। সংবাদ প্রচার এবং প্রকাশে হয়তো গণমাধ্যমের নিক্তিতে ভারসাম্যের পরিমাপ সঠিক হয়নি। নৈতিকতার ঘাটতির প্রসঙ্গটা বোধহয় এখান থেকেই উঠে আসছে। এই প্রেক্ষিতেই হয়ত বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখন গণমাধ্যম নেই, সবই প্রচার মাধ্যম।

তাহলে শুধু ২০১৮ সালের একটি নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে কী এই বিতর্কের সমাধান করা যাবে? স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই যদি ধরি, বাংলাদেশে গণমাধ্যম কোন সময়ে কতটা নিরপেক্ষ ছিল এবং নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ কতটা পেয়েছিল? এই প্রশ্নের দিকে দৃষ্টিপাতও জরুরী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম নির্বাচনে নীতিগত অবস্থান থেকে সরাসরি বিভিন্ন দলের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশে দলীয় মুখপত্র ছাড়া আর কোন সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলের এরকম পক্ষ নিতে দেখা যায়না। কিন্তু দলের পক্ষ না নিলেও সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষ নিতে দেখা যায়। এটা অন্যায্য কিছু নয়, যদি সেই আদর্শ রাষ্ট্রের মৌল চেতনার পক্ষে থাকে। আবারও বলছি, রায় দিচ্ছি না, রায় দেওয়ার যোগ্য আমি কেউ নই। বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করছি মাত্র।

আমাদের মধ্যবিত্ত নাগরিকরা পাঁচবছর একটি সরকারের শাসন উপভোগ করেন। স্বাভাবিক নিয়মেই মেয়াদ শেষে অজনপ্রিয় অনেক কর্মকা- ও সিদ্ধান্তের দায় সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলটির মাথায় এসে পড়ে। সেটা ন্যায়সঙ্গতও বটে। পাশাপাশি অনেক ভালো কাজও তখন আড়ালে চলে যায়। জনমানসে সাম্প্রতিকতম বিষয়গুলোই বেশি প্রভাব বিস্তার করে। এমনকি নিকট অতীতও তখন বিবেচনার প্রেক্ষাপটে থাকে না।

নব্বইয়ের দশকে দেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের পর আমরা পাঁচ বছর পরপর এই চিত্র দেখেছি ২০০৮ সাল পর্যন্ত। এমনও দেখেছি, একশ্রেণির গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা মানে যে সরকারটি মেয়াদ শেষ করার পথে আছে তাকে কঠোর সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করে কোণঠাসা করে ফেলা। অথবা এরও আগে দেশে দুর্বৃত্তায়ন, লুটপাট কিংবা দেশকে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাবার জন্য যা যা ঘটেছে- সেগুলোকে আড়ালে নিয়ে যাওয়া। এটা একধরনের অদ্ভূত নিরপেক্ষতা আমাদের মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের একাংশ বেশ উপভোগ করেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা না করে শুধুমাত্র সর্ব সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বিচার করার একটি খন্ডিত মানদ- গুটিকয় গণমাধ্যম দাঁড় করিয়েছে এবং তাদের তৈরি করা পাঠকগোষ্ঠীর একাংশ সেটাকেই ধ্রুব সত্য ধরে নিয়েছে।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগের চিত্র একবার স্মরণ করুন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়নাল হাজারীর বাড়িতে রেইড দিয়ে তাকে বাড়িছাড়া করে ফেলল। এই নেতা নির্বাচনের মাঠে আসতেই পারলেন না। তখন গণমাধ্যমও কোমর বেঁধে নেমে গেল জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে তিন মাস মেয়াদী তত্তাবধায়ক সরকারের এই কর্মকাণ্ডে সমর্থন জানাতে। তখন এই মতের মধ্যবিত্ত নাগরিকদের একবারও কি মনে হয়নি যে, দেশে আইন-আদালত আছে। জয়নাল হাজারী অপরাধী হলে তার বিচার সেখানে হবে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা কেন ? ভাববেন না, জয়নাল হাজারীকে নিয়ে কয়েকছত্র লিখছি বলে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে জয়নাল হাজারীর কর্মকাণ্ডের কথা ভুলে গেছি।  

আবার ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালীন তত্তাবধায়ক সরকারের আমলে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কথা একবার স্মরণ করুন। তারা বিএনপিকে দুইভাগ করার জন্য কি কি করেছিল, সেটা পত্রিকার পাতায় ছাপানো তখনকার দলটির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যেই পাবেন। কিন্তু আমাদের ‘নিরপেক্ষ’ গণমাধ্যম কি একবারও লিখেছিল যে, নির্বাচন কমিশনের কাজ দলভাঙ্গা নয়। গণমাধ্যমও বলেনি, তাদের মতের অনুসারী মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজও বলেনি। কেন বলেনি ? কারণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনে মধ্যবিত্ত নাগরিকদের এই অংশটি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন, তারা উন্মুখ ছিলেন ক্ষমতার পরিবর্তনে। অথচ তখনই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিৎ ছিল। অথচ এখনও শামসুল হুদা কমিশনকেই দেশের এযাবৎকালের সেরা নির্বাচন কমিশন বলতে কসুর করে না কোন কোন গণমাধ্যম।

এই শামসুল হুদা নির্বাচন কমিশনের আরেকটি উদাহরণ দিই। এই কমিশনের একজন সদস্য ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বামপন্থী বিভিন্ন দল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি করেছিলেন। শুনে সাখাওয়াত হোসেন একদিন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বললেন, আপনারা যখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলেন, আমার খুব কষ্ট লাগে। তখনকার পত্রপত্রিকা উল্টালেই এই তথ্যের সত্যতা মিলবে।

যে কোন রাজনৈতিক দল, যে কোন দাবি তুলতেই পারে। আলোচনার টেবিলে বসে একজন নির্বাচন কমিশনার কি কোন একটি পক্ষ নিতে পারেন ? গণমাধ্যম কি এই প্রশ্ন কখনও তুলেছে ? তুলেনি, আমাদের মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের কারও মুখ দিয়ে এ বিষয়ে কোন সমালোচনা-প্রতিবাদ দেখিনি। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে দৈনিক ইত্তেফাকে বাসন্তীর জালপরা ছবিটির কথা স্মরণ করুন। এই ছবি দেশে-বিদেশে কী প্রতিক্রিয়াই না সৃষ্টি করেছিল! কিন্তুএকবারও ভেবে দেখা হলো না, সেসময় একটি জালের দামে কয়টি শাড়ি কিনতে পাওয়া যেত? এটাকে কি আমরা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতার ঘাটতি বলব না কী পেশাদারিত্বের ?

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের ইতিহাসের দিকেও যদি তাকাই, জাসদের দলীয় পত্রিকা দৈনিক গণকন্ঠের ভূমিকা কি নিরপেক্ষ ছিল ? বাংলার বাণী কি নিরপেক্ষ ছিল ? দৈনিক ইত্তেফাক কি নিরপেক্ষ ছিল ? দৈনিক সংবাদ তো মস্কোপন্থী ন্যাপ-কমিউনিস্টদের পত্রিকা ছিল, এখনও পত্রিকাটি তো সেই ধারাতেই আছে। এর বাইরে জামায়াতের দলীয় পত্রিকা সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা দিনকালের ভূমিকা কি? প্রত্যেক গণমাধ্যমই কি তাদের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী কোন একটি রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষাবলম্বন করেনি? অবশ্যই করেছে। কারণ দৈনিক সংবাদে বামপন্থীদের ভুলত্রুটি নিয়ে তো কোন সংবাদ চোখে পড়েনি। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে জামায়াত ইসলামীর নেতাদের বিচার নিয়ে কি দৈনিক সংগ্রাম-নয়াদিগন্ত-আমার দেশ (বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত) নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছিল ?

বলতে পারেন, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে এসে তো গণমাধ্যমে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের একটি ধারা তৈরি হয়েছিল, সেটি ধরে রাখা গেল না কেন ? আসলেই কি নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের ধারা তৈরি হয়েছিল? আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষতা মানে তো, সব শক্তির প্রতি সমান মনোভাব প্রদর্শন। কথিত নিরপেক্ষ গণমাধ্যমে তো সেই সমান মনোভাব দেখিনি। নিরপেক্ষতার অদ্ভূত চরিত্র দেখেছি। নিরপেক্ষতা মানে দেখেছি, আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমানতালে অথবা কখনও বেশি, কখনও কম সমালোচনা করে তাদের সমান প্ল্যাটফর্মে অথবা ক্ষমতার দ্বিদলীয় বৃত্তে রাখার চেষ্টা। নিরপেক্ষতার নামে দেখেছি একশ্রেণীর সামরিক-বেসামরিক অবসরপ্রাপ্ত আমলা, দেশি-বিদেশি এনজিওতে কর্মরতদের মুখপত্র হয়ে যাওয়া। বলতে গেলে, পাঁচবছর পর পর তিন মাসের তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার নামে একটি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার যে বিধান আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো চালু করেছিল, সেটির মুখপত্র হিসেবেও কথিত এসব নিরপেক্ষ গণমাধ্যমকে ব্যবহার হতে দেখেছি।

তবে একটি বিষয় দেখেছি, সব শক্তির প্রতি সমান মনোভাব প্রদর্শন করতে গিয়ে অনেকসময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা যারা করেছিল সময়ে-অসময়ে সেই শক্তির পক্ষ নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি আমাদের কথিত নিরপেক্ষ গণমাধ্যম। আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের প্রগতিশীল, বামপন্থী দলগুলোর প্রতি বৈরিতা, অবিচার-কটাক্ষও তো দেখেছি। কথিত নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার নামে বিরাজনীতিকরণ কিংবা ‘আই হেইট পলিটিক্স’ প্রজন্ম তৈরির অভিযোগও আছে। 

বিতর্কিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পর সমালোচনার মুখে তত্তাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর এই ‘অদ্ভূত নিরপেক্ষ’ সংবাদ পরিবেশনের ধারাটা থিতিয়ে এসেছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে যে সমালোচনাটা হচ্ছে, অধিকাংশ গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নেমেছিল। কিন্তু এর মধ্যেও দু’য়েকটি মূলধারার সংবাদ মাধ্যম যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে অনড় ভূমিকা পালন করে গেছে, সেটাও তো দেখেছি। আলোচনায় সেটা আসছে না, কারণ ওই যে- তাদের অনুসারী ক্ষমতাবান মধ্যবিত্ত বাঙালি নাগরিক সমাজের একাংশ!

তবে এবার আরেকটি কর্মকা- দেখা গেছে। দেশজুড়ে সাংবাদিকরা দলে দলে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোট চাইতে নেমে গিয়েছিল। দৃষ্টিকটু লেগেছে বিষয়টা, সমালোচনাটাও স্বাভাবিকভাবেই তীব্র। বাংলাদেশের গণমাধ্যম কর্মীদের এই কৃতকর্মের সমালোচনা তো সহ্য করতেই হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত কয়েকটি নির্বাচনে তো বটেই, অতীতেও অনেক সাংবাদিক দলীয় ব্যানারে প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে অবিভক্ত পাকিস্তানের শেষ জাতীয় নির্বাচনে তো দলে দলে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুর নৌকা মার্কার জন্য ভোট চেয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, এমনটাই শুনেছি অগ্রজদের মুখে। বলতে পারি, দলীয় সাংবাদিক হওয়ার পক্ষে নয়, তবে রাজনৈতিক নীতি-আদর্শের পক্ষে থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। এক্ষেত্রেও আবারও বলব- রায় দিচ্ছিনা, রায় দেওয়ার যোগ্য আমি কেউ নই। বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করলাম মাত্র।

গণমাধ্যমের সমালোচনা করুন, তীব্রভাবে করুন। গণমাধ্যমের দেওয়ালে লিখেও গণমাধ্যমের সমালোচনা করা যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি নাগরিক সমাজের সেই নিরপেক্ষতাবাদী অংশ, একবার বলুন তো বুকে হাত দিয়ে- আপনি আপনার রাজনৈতিক-আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গী সুবিধামতো সময়ে না পাল্টে সবসময় সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলেছেন ?

হে ‘নিরপেক্ষতাবাদী’ নাগরিক সমাজ, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মূল ইস্যুটার কি এখনও ফয়সালা হয়েছে ? কী ইস্যু ? এক কথায়, মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ তো প্রকৃতই জনযুদ্ধ ছিল, মানেন তো ?  তাহলে সেই জনযুদ্ধের বিপরীতে যারা একে ‘সেনাযুদ্ধ’ হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিল, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে আপনি কোন ধরনের নিরপেক্ষতা গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশা করেন ? বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ই যারা চায়নি, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষেও গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে ? পৃথিবীর আরেকটা দেশ দেখান তো, যেখানে স্বাধীনতার পক্ষশক্তি আর স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তি একইমাঠে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করে যাচ্ছে। যদি গণমাধ্যমের কাছে নিক্তি-পাল্লায় মাপা নিরপেক্ষতা চান, তাহলে এই ইস্যুর সমাধান করেন। নিরপেক্ষতার নামে স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তিকে নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকবেন না। স্বীকার করুন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাবও গণমাধ্যমের সামগ্রিক অবস্থানের মূল প্রভাবক।

আবার এর মানে এই নয় যে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাবকে মেনে নেওয়া, অসাম্য-বৈষম্য, লুটপাটের অর্থনীতিকে মেনে নেওয়া। এর অর্থ এই নয় যে, স্বাধীনতার চেতনার নামে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করাকে ম্যান্ডেট দেওয়া।

যারা প্রকৃতই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চান, যারা সকল ধরনের বৈষম্য-বঞ্ছনার বিরুদ্ধে সোচ্চার, তাদের পক্ষে জীবনে ক’টা লাইন লিখেছেন, ক’টা মুখের বুলি খরচ করেছেন হে নিরপেক্ষতা প্রিয় নাগরিক সমাজ ? তাহলে নিরপেক্ষতা মানে শুধু স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির মধ্যে সমতা?

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই যে বেশিরভাগ গণমাধ্যমের আপাত অবস্থান এটাও চূড়ান্ত কোনো ধারণা নয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যম আগাগোড়াই কখনও নিরপেক্ষ, কখনও নিজের অবস্থানে অনড়। এই যে, গণজাগরণ মঞ্চের সময়কালের কথাই বিবেচনা করুন। বাংলাদেশের প্রায় সব গণমাধ্যমই কি তখন এই মঞ্চের পেছনে এসে দাঁড়ায়নি। কেন দাঁড়িয়েছে ? সময়ের প্রয়োজনে। সময় চূড়ান্ত নির্ণায়ক।

আবারও বলছি, রায় দিচ্ছি না, রায় দেওয়ার যোগ্য আমি নই। বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করলাম মাত্র। আসুন, বিতর্কে শুদ্ধ হই, কুতর্কে নয়।

রমেন দাশগুপ্ত
লেখক: সাংবাদিক, বাংলাদেশ