অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
অপারেশন – তাপসদাস

য়েকদিন আগে কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে, পিছন থেকে ডাক শুনে ঘুরে দেখি সুপর্ণা, সুপর্ণা চ্যাটার্জি। কলেজের সহপাঠিনি।
অসাধারণ সুন্দরী, দম্ভহীনা, ভালো কালচারের মিশুকে মেয়ে ছিলো। খুব ভালো বন্ধু ছিলো। দীর্ঘ তেইশ বছর পর দেখা। মাঝে কোনো যোগাযোগ ছিলো না। গাড়ি ঘুরিয়ে গেলাম।

 স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই চুলের মুঠি ধরে নাড়িয়ে বললো,
-- বাঁদর, কি খবর তোর  ...এমা, টাক পরে গেছে রে, চেহারাটাও ভেঙে গেছে!

পাশে দাঁড়ানো ওর বর, একটা অসহায় অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে, নিজের কথা মনে পরে গেল। আমিও এমনই বোধ করি, যখন আমার স্ত্রী তার পরিচিত কারুর সাথে কথা বলেন আর আমি বোকার মত দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারিনা।
-- বলছি শোন না, কোথাও বসে কথা বলি? 
সামনের ময়ূরপঙ্খী ঘাটে গিয়ে বসলাম তিনজনে।

একই রকম আছে সুপর্ণা। ওর কথাই বলে চলেছে। আমি আর ওর স্বামী, দুজনেই শ্রোতা বসে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। অনেক্ষণ পর বুঝতে পারলো আমরা কথা বলছিনা।  -- এই জানো, কৌশিক কিন্তু খুব সুন্দর গল্প বলে ওর জীবন থেকে।
এই, আজ একটা বল প্লিজ। ওর জন্য, প্লিজ 

এই প্রথম ভদ্রলোক কথা বললেন, -- বলুন না, আপনার কথা অনেক শুনেছি ওর কাছে, তাই অচেনা লাগছে না। প্লিজ বলুন।

তিনজন তিনটে ঝালমুড়ি নিলাম। খেতে খেতে গল্প শুরু করলাম। 

সময়টা আমার প্রথম দিকের পেশাদার জীবনের। স্থান বলছি না। কোন পরিকল্পনা ছাড়া বানানো পুরাতন দোতলা বাড়ি। মধ্যবিত্ত পরিবার। কত্তা রিটায়ার করেছেন। কাশি শুনে আর দেখে বুঝলাম, অতিরিক্ত স্মোকিং করে সি.ও.পি.ডি ধরিয়েছেন। মুখ দিয়ে শ্বাস নিচ্ছেন। কণ্ঠার কাছটা সে কারণেই বড় গর্ত মতো হয়ে গেছে পেশিগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহারে। স্ত্রীর বছর বাষট্টি বয়স, লাম্বার-স্টেনোসিস ( কোমরের এক প্রকার সমস্যা ) এর যন্ত্রণায় বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন সে সময়। দেখলেই বোঝাযায় জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো নাওয়া খাওয়া ভুলে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেছেন সুখের সংসার গড়তে। একমাত্র ছেলে ডাবরের মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। বয়স বছর সাতাশ, দেখতে শুনতে বেশ।

অর্থোপেডিক সার্জেন ডাক্তার বর্ধন রেফার করেছিলেন আমার কাছে। বাড়ির লোক কলবুক করার পরেরদিন সন্ধ্যায় গেলাম রুগী দেখতে। যন্ত্রণার প্রকোপ কমাতে ইলেক্ট্রো থেরাপির সিদ্ধান্ত নিলাম, যা কন্টিনিউ করতে হবে প্রায় দিন পনেরো বা তার বেশি।

দু দিনের মধ্যেই আমায় ভালো লেগে গেলো ভদ্রমহিলার।   -- তোমার এত সুন্দর ব্যবহার, কি সুন্দর নিজের করে নাও!
প্রায় প্রতিদিনই শুনতে হতো হাসি মুখ করে। বোঝাতে চেষ্টা করতাম,
-- এটা আমার পেশার মুখোশ মাসিমা।
-- তুমি যাই বলো বাবা, তোমার ভালবাসাটা কিন্তু আসল।

ওনার স্বামী একদিন বললেন,
-- দেড়মাস পর হীরকের বিয়ে। তুমি কিন্তু আসবে। 
-- নিশ্চই আসবো (হাসতে হাসতে বললাম)।
-- আচ্ছা তার আগে কাবেরী হাঁটতে পারবে? ডাক্তার তো অপারেশন করবে সামনের সোমবার!
-- নিশ্চই মেসোমশাই।  তবে বেশি লাফঝাঁপ না করাই ভালো হবে।

ভদ্রমহিলার সুগার কন্ডিশন সাপোর্ট করলো না। অপারেশনের ডেট পেছিয়ে গেল। ছেলের বিয়ের পর অপারেশন করাবেন ঠিক করলেন ভদ্রলোক। ততোদিন আমার কাজ বাড়লো।

********** 

-- বাবা, আমার কিন্তু বেশ ভয় করছে!
-- ভয়ের কিছু নেই মাসিমা।
-- তুমি কি থাকবে বাবা, অপারেশনের সময়?
-- এখনই বলতে পারছিনা। তবে আপ্রাণ চেষ্টা করবো। আর তাছাড়া হীরক আছে, মেসোমশাই আছেন.....ভয় কি?

অদ্ভুত একটা নীরবতা।
-- দুদিন ধরে সেই নিয়ে অশান্তি চলছে বাবা...... 
ওরা হানিমুনে যাবে। সব বুক করা হয়ে গেছে। ছুটিও কোনও রকমে ম্যানেজ করেছে।
তোমার মেসোমশাইকে ডাক্তার এর মধ্যেই অপারেশনের ডেট বলে দিয়েছেন। কি যে করবে....একা?
বয়স হয়েছে....ছেলে মুখের ওপর ওভাবে বলবে....

যে আমরা ন্যাকামো করছি, ভাবতেই পারিনি।
ভাবতেই পারিনা কি মতাদর্শে মানুষ করে, কি পেলাম। ও স্পষ্ট বলে দিয়েছে থাকতে পারবে না। তোমার মেসো মশাই জানতে চেয়েছিলেন যে, যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়?
ও বললো 'আমি কি করবো। কিছু ঘটলে ফিরে দেখবো কি করণীয়'। বৃদ্ধ মানুষটা কেমন যেন হয়ে গেছে! কাল থেকে মুখে 'রা' পর্যন্ত কাটছে না। চুপ করে সব করে যাচ্ছে। তাই তোমায় লজ্জায়  মাথা কেটে থাকতে বলছি। যদি কথা দাও, মনটা একটু শান্ত হয়। আসলে বয়স হয়েছেতো, একটা ভয় সব সময় তাড়া করে ফিরছে।
-- আপনি ভয় পাবেন না। আমি সাধ্যমতো সাহায্য করবো..... থাকবো সে দিন ওনার সাথে।

অপারেশন শেষ। ভালো আছেন ভদ্রমহিলা। ওনার স্বামী আমার হাত ধরে বললেন, 
অনেক বড় হও'। 
এরপর ছুটি। গাড়িতে তুলে বললাম,
-- আজ বিকেল থেকেই শুরু করবো কাজ।
-- কটা দিন যাক বাবা। তারপর খবর দেবো।
-- যা ভালো বোঝেন, তবে বেশি দেরি করবেন না, সেটা ঠিক হবে না রুগীর ভবিষ্যতে হাঁটা চলার ক্ষেত্রে। 

দিন চারেক পর, সকালে।

-- হ্যালো, কৌশিক দা ....হীরক বলছি...  -- হ্যাঁ বলো... 
-- বাবা মা কোথায় গেছেন আপনি জানেন? 

আজ সকালেই ফিরেছি। বাড়িতে অন্য লোক। বলছেন, কিনেছেন। আপনি কি কিছু জানেন, বাবা মা কোথায়?  বাবার ফোন বন্ধ। কিছুই বুঝতে পারছি না! রাস্তায় বউ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
হীরকের গলায় কি ভয়ের আভাস পেলাম,  নাকি আমারই শোনা, বোঝার ভুল!
পরের ঘটনা জানতে ঠিকানা অথবা ফোন নাম্বার, কোনওটাই আমার কাছে ছিলো না। এই ঘটনার বহু দিন পর, হয়তো বছর তিনেক,  আমার হাসপাতালে হীরক ডাক্তার ভিজিটে এসেছিলো। তখন জেনেছিলাম, ওরা এখন ঘর ভাড়া করে থাকে এক জায়গায়। বহু খোঁজ করেও বাবা মায়ের কোনো খোঁজখবর পায়নি।

সেদিন হাসপাতালে আমার ঘরে, ছেলেমানুষের মতো কাঁদছিল হীরক, লোকলজ্জার ভয় না পেয়ে। অপরাধ বোধ ওকে বোধহয় সারাজীবন তাড়া করে চলবে।

গল্প শেষের পর তিনজনে গঙ্গার দিকে নীরবে চেয়ে রইলাম। জীবনও এই ভাবে বয়ে চলবে। তাতে নোংরাও থাকবে আবার পুণ্যের ফুলও থাকবে। স্রোত এবং চোরাস্রোত দুটোই থাকবে। দুকূল ভাসিয়ে দেবার প্রচন্ড রাগ অভিমান থাকবে। তবুও শীতল থাকতে হবে, বয়ে যেতে হবে নিঃশব্দে, মোহনার দিকে। দু দিকের সবুজকে বাড়তে দিয়ে, এই নদীর মতো। নীরবে নিজের কাজ করে যেতে হবে, আত্মনির্ভর হয়ে, নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে।

তাপসদাস
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত